Posts

গল্প

বাঁশ বাগানের ভূত

June 28, 2026

Saifh Ahmed

39
View

গ্রামের শেষ মাথায় পুরনো সেই বাঁশ বাগানটা নিয়ে মানুষের ভয়ের অন্ত নেই। সন্ধে নামার পর গ্রামের মাতব্বর থেকে শুরু করে ছোটোখাটো চোর—কেউই ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটার সাহস করে না। শোনা যায়, রাতে সেখান থেকে অদ্ভুত সব কান্না আর ধাতব শব্দ ভেসে আসে। শহরের ছেলে আকাশ আর নিলয় গ্রামবেড়াতে এসে এসব ভূতের গল্প শুনে হাসাহাসি করছিল। তাদের মতে, ভূতের ভয় হলো মানুষের মনের দুর্বলতা। তাই প্রমাণ করার জন্য তারা ঠিক করল—অমাবস্যার এই রাতে তারা বাঁশ বাগানটা ঘুরে দেখবে।

​রাত তখন প্রায় বারোটা। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। আকাশ আর নিলয় টর্চ হাতে বাগানের কাঁচা রাস্তায় পা রাখল। বাঁশঝাড়ের ঘন পাতার আড়ালে চাঁদের আলোও পৌঁছাতে পারছে না। বাতাসে বাঁশগুলো যখন একে অপরের গায়ে ঘষা খাচ্ছে, তখন মনে হচ্ছে কেউ বুঝি ফিসফিস করে কিছু বলছে।

​কিছুটা ভেতরে ঢুকতেই নিলয় থমকে দাঁড়াল। টর্চের আলোয় সে দেখল, বাঁশের গায়ে অদ্ভুত এক লাল রঙের চিহ্ন আঁকা। দেখে মনে হয় যেন তাজা রক্তের ছাপ। আকাশ বিদ্রূপের হাসি হেসে বলল, “কেউ হয়তো ভয় দেখানোর জন্য এসব করেছে।” কিন্তু তার কথা শেষ হতে না হতেই বাগান থেকে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে একটা নীল রঙের আলো জ্বলে উঠল। কোনো মোমবাতি বা টর্চ নয়, আলোটা যেন জীবন্ত—মাটি থেকে ওপরের দিকে অদ্ভুতভাবে লকলক করছে।

​তারা দুজনে নিশব্দে আলোর দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু কাছাকাছি পৌঁছাতেই আকাশ কুঁচকে গেল ভয়ে। তারা দেখল, বাগানের মাঝখানে একটা পুরনো কুয়া, যার ভেতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার শব্দ! নিলয় কাঁপাকাঁপা হাতে কুয়ার দিকে টর্চের আলো ফেলল। আলো পড়তেই সে চিৎকার করে উঠল। কুয়ার ভেতরে কোনো জল নেই, সেখানে দেখা যাচ্ছে সারি সারি মানুষের পায়ের ছাপ—যা ওপরের দিকে উঠে আসছে!

​ঠিক সেই মুহূর্তে তাদের টর্চলাইটটা ঝিকমিক করে নিভে গেল। ঘোর অন্ধকার। আর তখনই তাদের ঠিক পেছনে, একেবারে কানের কাছে ভেসে এল নিজেদেরই গলার স্বর—যেন কেউ তাদের অনুকরণ করে বলছে, “তোরা কেন এলি? তোরা কেন এলি?”

​আতঙ্কে তাদের হৃদস্পন্দন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। অন্ধকারের ভেতর থেকে মনে হলো লম্বা, কালো কোনো ছায়া তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আকাশ কোনোমতে একটা হাত বাড়িয়ে কিছু একটা স্পর্শ করল। সেটি ছিল একটা ঠান্ডা, ধাতব বস্তু—একটি পুরনো আমলের অদ্ভুত মুদ্রা! আকাশ সেটি পকেটে ভরল। তারা দুজনে অন্ধকারের ভেতর কোনো এক দিকে দৌড়াতে শুরু করল, কিন্তু মনে হলো বাগানটা যেন শেষই হচ্ছে না, তারা যেন একই বৃত্তে ঘুরে মরছে!

​হঠাৎ কুয়াশার ভেতর থেকে একটা বিকট শব্দে বাঁশঝাড় ভেঙে পড়ল তাদের ঠিক সামনে।​বাঁশঝাড়ের বিকট ভাঙার শব্দে আকাশ আর নিলয় দুজনেরই কান ঝালাপালা হয়ে গেল। ঠিক তাদের মাথার ওপরে একটা আস্ত বাঁশ ভেঙে পড়েছে, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—বাঁশটা পড়লেও তাদের গায়ে একটি আঁচড়ও লাগেনি, যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি সেটাকে আটকে রেখেছিল।

​কুয়াশার মধ্যে তারা দেখল, ভাঙা বাঁশগুলোর ওপাশে একটা আবছা নীল আলো আবার জ্বলে উঠেছে। তারা ভয় না পেয়ে এবার কৌতূহলের বশবর্তী হলো। আকাশ পকেট থেকে সেই পুরনো মুদ্রাটা বের করল, দেখল চাঁদের আলোয় মুদ্রাটি উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। মুদ্রাটির পিঠে খোদাই করা কিছু লিপি যা অদ্ভুতভাবে দপদপ করছে।

​আকাশ ফিসফিস করে বলল, “নিলয়, এই মুদ্রাটাই হয়তো আমাদের পথ দেখাচ্ছে।”

​তারা সাবধানে সেই আলো অনুসরণ করে এগোতে লাগল। বাগানটা যেন মায়ার গোলকধাঁধা! দশ মিনিট হাঁটার পর তারা হঠাৎ এমন একটা জায়গায় এসে পৌঁছাল, যেটা গ্রামের মানচিত্রে থাকার কথা নয়। মাটির নিচে একটা বিশাল সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ! সুড়ঙ্গটি পুরনো ইটের গাঁথুনি দিয়ে তৈরি, গায়ে শ্যাওলা আর লতাপাতার স্তর।

​সুড়ঙ্গের ভেতর থেকে বাতাসের শব্দের সাথে মিলিয়ে এক ধরনের অদ্ভুত সুর ভেসে আসছে—যেন কেউ বাঁশি বা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছে। তারা যখন সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকল, দেখল সেখানে কোনো ভূত নেই, আছে বিশালাকার এক প্রাচীন লাইব্রেরি! ঘরের কোণায় কোণায় সেই নীল আলোর ছত্রাকগুলো জ্বলছে। দেয়ালের তাকে তাকে শত শত প্রাচীন পুঁথি।

​ঠিক তখন তাদের পেছনে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “তোমরা সাহস করে এসেছ, এটা কম কথা নয়।”

​তারা পেছনে ফিরে দেখল, গ্রামের সেই অতি পরিচিত কিন্তু রহস্যময় বৃদ্ধ পাগল দাদু দাঁড়িয়ে আছেন। দাদু হাসছেন, তবে সেই হাসিতে ভয় নেই, আছে অদ্ভুত এক তৃপ্তি। দাদু জানালেন, এই বাঁশ বাগানটি আদতে কোনো ভূতুড়ে জায়গা নয়, এটি ছিল ব্রিটিশ আমলের এক স্বাধীনতা সংগ্রামীর গোপন আস্তানা। তিনি এখানে পুরনো জ্ঞান আর ইতিহাসের দলিল সংরক্ষণ করতেন। আর মুদ্রাটি ছিল এই সুড়ঙ্গের চাবি।

​দাদু জানালেন, আকাশের গলার স্বর যে তাদের ডাকছিল, তা ছিল সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাসের প্রতিধ্বনি আর দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা সুরের কারসাজি। মানুষের পায়ের ছাপগুলো ছিল অনেক আগেকার এক প্রাচীন অভিযাত্রী দলের, যারা সুড়ঙ্গের রহস্য খুঁজতে এসে আর ফিরে যায়নি।

​আকাশ আর নিলয় বুঝতে পারল, ভয়ের চেয়েও বড় কিছু লুকিয়ে আছে ইতিহাসের পাতায়। তারা সেই রাতে কেবল ভয়ের হাত থেকেই বাঁচেনি, বরং গ্রামটির এক অকথিত ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রইল। পরদিন সকালে যখন গ্রামের মানুষ তাদের মাঠে খুঁজে পেল, তারা তখন ঘুমিয়ে ছিল বাঁশ বাগানের ঠিক বাইরে। হাতে সেই মুদ্রাটা নেই, কিন্তু তাদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি—যেন তারা কোনো অজানাকে জয় করে এসেছে।

​বাঁশ বাগানটা এখন আগের মতোই নীরব, কিন্তু আকাশ আর নিলয় জানে—মাটির নিচে ঠিক কতটা রহস্য এখনো নিভৃতে জেগে আছে।

Comments

    Please login to post comment. Login