
লেখক: সঞ্জীব রায়
গ্রামের নাম শালবন। শান্ত, সবুজ, নিরিবিলি। কিন্তু সেই গ্রামের সবচেয়ে বিখ্যাত মানুষ ছিলেন হরিপদ কাকু। কারণ তিনি যতবার "ও মা!" বলতেন, ততবারই গ্রামের মানুষ বুঝে যেত—এবার নিশ্চয়ই নতুন কোনো কাণ্ড ঘটেছে।
একদিন ভোরবেলা হরিপদ কাকু উঠেই দেখলেন তাঁর মুরগি নেই। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন, "ও মা! আমার মুরগি চুরি হয়ে গেল!"
চিৎকার শুনে পাশের বাড়ির বিমল দৌড়ে এল।
— "কোথায়? কোথায়?"
— "মুরগি নেই!"
বিমল চারদিকে খুঁজে দেখে বলল, "কাকু, মুরগিটা তো আপনার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে!"
হরিপদ ঘুরে দেখে সত্যিই তাই।
— "ও মা! তাহলে আমি কাকে খুঁজছিলাম?"
সবাই হেসে গড়াগড়ি।
এরপরের দিন বাজারে গেলেন। আলু কিনে বাড়ি ফিরছেন। পথে এক ছাগল এসে থলেটা মুখে নিয়ে দৌড় দিল।
হরিপদ কাকু ছাগলের পিছনে দৌড়াতে দৌড়াতে চিৎকার করছেন—
"ও মা! আলু নিয়ে পালালো!"
লোকজন ভেবেছে বোধহয় সোনা নিয়ে ডাকাত পালিয়েছে। সবাই ছুটল।
শেষে দেখা গেল ছাগল একটা আলু খেয়ে বাকি সব ফেলে দিয়েছে।
এক বৃদ্ধ বললেন,
— "ছাগলও বুঝেছে এই আলু খুব ভালো নয়!"
আবার হাসির রোল।
গ্রামের স্কুলে একদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। হরিপদ কাকুকে অতিথি করা হয়েছে।
মঞ্চে উঠে তিনি বক্তৃতা শুরু করলেন।
— "প্রিয় ছাত্রছাত্রীরা…"
হঠাৎ মাইক থেকে বিকট আওয়াজ।
তিনি লাফিয়ে উঠে বললেন,
— "ও মা! মাইকেরও রাগ হয়েছে!"
দর্শকরা হাততালি দিয়ে হেসে উঠল।
কিছুদিন পরে তিনি স্মার্টফোন কিনলেন।
দোকানদার বলল,
— "কাকু, এতে ফেস লক আছে।"
হরিপদ ভাবলেন, ফোন নিশ্চয়ই তাঁর মুখ দেখে কথা বলবে।
বাড়ি এসে বললেন,
— "হ্যালো ফোন, আমি হরিপদ!"
ফোন চুপ।
তিনি আবার বললেন,
— "ও মা! এত দাম দিয়ে কিনলাম, কথা-ই বলে না!"
নাতি এসে বলল,
— "কাকু, শুধু মুখ দেখলেই খুলবে।"
ফোন খুলতেই হরিপদ বললেন,
— "ও মা! এটা তো আমাকে চিনে ফেলেছে!"
একদিন গ্রামের ডাক্তার বললেন,
— "হাঁটাহাঁটি করবেন।"
পরদিন দেখা গেল তিনি পুরো গ্রাম ঘুরে হাঁটছেন।
লোকজন জিজ্ঞেস করল,
— "কোথায় যাচ্ছেন?"
— "ডাক্তার বলেছেন হাঁটতে। তাই হাঁটছি।"
বিকেল পর্যন্ত হাঁটার পরে বাড়ি এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,
— "ও মা! ডাক্তার কি আমাকে ম্যারাথনে পাঠিয়েছেন?"
পূজার মেলায় তিনি প্রথমবার নাগরদোলায় উঠলেন।
উপরে উঠতেই চোখ বন্ধ।
নিচে নামার পর বললেন,
— "ও মা! আমি তো আকাশ দেখে এলাম!"
এক ছোট্ট ছেলে বলল,
— "কাকু, আপনি তো পুরো সময় চোখই বন্ধ রেখেছিলেন!"
সবাই আবার হেসে উঠল।
একদিন তিনি ইউটিউবে রান্না শিখবেন ঠিক করলেন।
ভিডিওতে বলা হলো—
"এক চামচ লবণ দিন।"
তিনি দিলেন এক বড় হাতা লবণ।
রান্না খেয়ে সবাই মুখ বাঁকিয়ে ফেলল।
হরিপদ বললেন,
— "ও মা! ইউটিউবও ভুল শেখায় নাকি?"
স্ত্রী বললেন,
— "ভুল ইউটিউব নয়, ভুল তোমার হাতা!"
একদিন গ্রামের ফটোগ্রাফার ছবি তুলতে এল।
বলল,
— "হাসুন।"
হরিপদ এত জোরে হাসলেন যে চেয়ার থেকেই পড়ে গেলেন।
ছবি বেরোলে দেখা গেল তিনি মাটিতে শুয়ে আছেন।
তিনি বললেন,
— "ও মা! আমি কি সিনেমার নায়ক?"
গ্রামে নতুন এটিএম বসেছে।
তিনি কার্ড ঢুকিয়ে পিনের বদলে নিজের মোবাইল নম্বর লিখলেন।
মেশিন কিছুই করল না।
তিনি বললেন,
— "ও মা! এটা আমাকে চেনে না!"
পাশের ছেলে এসে ঠিকভাবে পিন লিখে টাকা বের করে দিল।
হরিপদ বললেন,
— "মেশিনেরও শিক্ষা দরকার!"
একদিন বাড়িতে বিড়াল আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে ভয় পেয়ে লাফ দিল।
হরিপদও দেখে চমকে উঠলেন।
— "ও মা! আরেকটা বিড়াল ঢুকে পড়েছে!"
নাতনি বলল,
— "ওটা আয়না।"
তিনি মাথা চুলকে বললেন,
— "তাহলে ওই বিড়ালটা এতক্ষণ আমার দিকেই তাকিয়ে ছিল কেন?"
এক সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেল।
তিনি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছেন।
হঠাৎ মোবাইলের টর্চ জ্বলে উঠল।
তিনি চমকে উঠে বললেন,
— "ও মা! ফোনের ভেতরেও আলো থাকে!"
নাতি বলল,
— "অনেক দিন ধরেই আছে!"
এরপর গ্রামের সবাই ঠিক করল, হরিপদ কাকুকে নিয়ে একটা নাটক হবে।
নাটকের নাম রাখা হলো "ও মা!"
নাটক শুরু হতেই হরিপদ কাকু দর্শকদের মধ্যে বসে বললেন,
— "ও মা! আমার নামেই নাটক!"
মঞ্চের অভিনেতা সংলাপ ভুলে গেল।
দর্শকরা এত হাসল যে পাঁচ মিনিট নাটক বন্ধ রাখতে হলো।
শেষে গ্রামের প্রধান উঠে বললেন,
"হরিপদ, তুমি না থাকলে আমাদের গ্রামের অর্ধেক হাসি কমে যেত।"
হরিপদ একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,
"আমি তো কিছুই করি না।"
ঠিক তখনই তাঁর পকেট থেকে মোবাইল বেজে উঠল।
রিংটোন—
"ও মা... ও মা... ফোন ধরো!"
পুরো মাঠ আবার হেসে উঠল।
হরিপদ মাথা নেড়ে বললেন,
"ও মা! এবার বুঝলাম, আমার ফোনও আমাকে নিয়ে মজা করছে!"
সেদিন থেকে গ্রামের মানুষ যখনই মন খারাপ করত, শুধু হরিপদ কাকুর সঙ্গে পাঁচ মিনিট গল্প করলেই হাসিতে পেট ব্যথা হয়ে যেত। আর কেউ যদি হঠাৎ জোরে "ও মা!" বলে উঠত, সবাই আগে হেসে নিত, তারপর জিজ্ঞেস করত, "আবার কী কাণ্ড ঘটল?"
সমাপ্ত।