Posts

গল্প

অপেক্ষা (ছোট গল্প)

July 4, 2026

মোঃ বজলুর রশীদ

Original Author মোঃ বজলুর রশীদ

7
View


রশিদ সাহেবের মেজাজটা আজ অসম্ভব খারাপ। ডাওয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিনি টানা তিনবারের চেয়ারম্যান। মানুষ হিসেবে অসম্ভব ভাল,তবে মেজাজটা সবসময় ভালো থাকে না । কথায় কথায় অল্পতেই রাগ করেন তবে ভেতরের মনটা খুব নরম ঠিক তুলোর মত । আজ চরের জমি নিয়ে একটা সালিশ আছে। সালিশে বসার আগে তিনি চারপাশটা গম্ভীর মুখে দেখে নিলেন। তিনি কোথাও শুভ্রকে দেখতে পাচ্ছেন না ।

কুদ্দুস! ওরে কুদ্দুস, শুভ্র আসে নাই? রশিদ সাহেব গম্ভীর গলায় ডাক দিলেন।
চৌকিদার কুদ্দুস আলী তড়িঘড়ি করে নিজের খৈনি ডলতে ডলতে বলল, আইতাছে চেয়ারম্যান সাব। ঢাকা থাইকা বড় পাশ দিয়া আইছে, একটু ভাব-ভঙ্গি তো থাকবই।

ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্য থেকে টুং করে একটা সাইকেলের বেল বাজার শব্দ হলো। শুভ্র সাইকেল থেকে নামল। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, পরনে ইস্ত্রি করা হালকা নীল শার্ট, পায়ে স্যান্ডেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিজিক্সে ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে মাস্টার্স শেষ করেছে সে।সমস্ত গ্রামে তার খুব নামডাক যেমন মেধাবী, তেমনই ভদ্র।

শুভ্র কাছে আসতেই চেয়ারম্যান সাহেব তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। আসো বাপজান, বসো। তুমি পাশে বসলে মনে একটা জোর পাই। দুনিয়াটা তো মূর্খ মানুষে ভইরা গেছে। এই যে মজিদ মিয়া নিজের জমি দাবি করতাছে,
এর একটা সমাধান দাও তো দেহি!
শুভ্র চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে বলল, চেয়ারম্যান চাচা, এটা তো জাল দলিল।
​চেয়ারম্যান সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি চশমার ওপর দিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন, কও কী বাপজান! মজিদ মিয়া তো একেবারে বুক ফুলাইয়া দলিলের কাগজ দেখাইলো। তুমি বুঝলা কেমনে?

​শুভ্র পকেট থেকে একটা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস বের করল। সেটার ভেতর দিয়ে দলিলের কাগজটার দিকে এক চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে পর্যবেক্ষণ করলো । 
​শুভ্র ম্যাগনিফায়িং গ্লাসটা পকেটে রেখে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল, এই দলিলের বয়স বড়জোর তিন দিন, চাচা। যে কালিতে সই করা হয়েছে, সেটা এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। তাছাড়া স্ট্যাম্পের ওপর যে জলছাপ আছে, সেটা আসল না। নকল জিনিস যতই নিখুঁত করার চেষ্টা করা হোক, তার ভেতর কোথাও না কোথাও একটা খুঁত থেকে যায়। প্রকৃতি কখনো শূন্যস্থান পছন্দ করে না, আর মিথ্যা কখনো পূর্ণতা পায় না।

​চেয়ারম্যান সাহেব মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুভ্রর কথা শুনছিলেন। তিনি দলিলের দিকে একবার আর শুভ্রর দিকে একবার তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। শুভ্রর মতো এত কম বয়সী একটা ছেলের মাথায় যে এত বুদ্ধি, এটা ভাবলেই তার বুকটা গর্বে ভরে ওঠে।

রশিদ সাহেব চোখ বড় বড় করে কুদ্দুস চৌকিদারের দিকে তাকিয়ে বললেন, শুনছস কুদ্দুস? কী গভীর পর্যবেক্ষণ! মজিদ মিয়া, শুনছ? জমি তোমার না,অতএব ক্যাচাল বন্ধ করো।

সালিশ শেষ করে শুভ্র যখন ফিরছিল, তখন গঞ্জের সবচেয়ে চঞ্চল ও সুন্দরী মেয়ে পদ্ম গাছের আড়াল থেকে ডাকল, এই যে বিজ্ঞানী সাহেব! শুনুন।
শুভ্র লাজুক পায়ে এগিয়ে গেল। কী ব্যাপার পদ্ম?

কী ব্যাপার মানে? কাল বিকেলে একটু নদীর ঘাটে আসার কথা বলেছিলাম না? আপনি তো আইনস্টাইনের শীর্ষ , আপনার এত স্মৃতিশক্তি লোপ পেল কিভাবে? পদ্ম চোখ রাঙাল।
শুভ্র আমতা আমতা করে বলল, আসলে একটু ব্যস্ত ছিলাম,

থাক এত ব্যস্ততা দেখাতে হবে না। এই নিন, এটা আপনার জন্য। পদ্ম একটা কাঁচের বয়াম শুভ্রর হাতে ধরিয়ে দিল।
এটা কী?

আচারের বয়াম। সরিষার তেল দিয়ে জলপাইয়ের আচার বানিয়েছি। খবরদার, চিবিয়ে খাবেন না, চুষে চুষে খাবেন। বেশি বুদ্ধিমানদের টক খেতে হয়, তাহলে মাথায় রক্ত চলাচল বাড়ে। পদ্ম মুখ টিপে হেসে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলে গেল। শুভ্র বোকার মতো বয়াম হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো।

রাত তখন আনুমানিক ২টা। আকাশে কার্তিকের চাঁদ। চারপাশ কুয়াশায় ঢাকা।
হঠাৎ তীব্র ও কর্কশ চিৎকার-চেঁচামেচিতে পুরো গ্রাম জেগে উঠল। চোর! চোর! ধর ব্যাডারে, ধর!
সিঁধ কেটে চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছে তিনজন। উত্তেজিত গ্রামবাসী তাদেরকে পশুর মতো পিটিয়ে বেঁধে নিয়ে এলো ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণে। খবর পেয়ে লুঙ্গি আর চাদর গায়ে জড়িয়ে ছুটে এলেন চেয়ারম্যান রশিদ সাহেব। কুদ্দুস চৌকিদার ততক্ষণে চোর তিনটাকে একটা কাঁঠাল গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে।মানুষের হুজুগ বড় ভয়ঙ্কর জিনিস।

মাঝরাতে রশিদ সাহেব লোক পাঠালেন শুভ্রর বাড়িতে।শুভ্ররে ডাকো। উত্তেজিত জনতারে শান্ত করতে ওর মতো ঠান্ডা মাথার মানুষ লাগবে। মানুষ খেপলে বাঘ হয়ে যায়। শুভ্র ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাত উঁচিয়ে শান্ত গলায় বলল, আপনারা দয়া করে শান্ত হোন।

আইন নিজের হাতে নেবেন না। একটা মানুষকে এভাবে মারা অন্যায়। চেয়ারম্যান সাহেব আছেন, বিচার উনি করবেন।
ভিড়ের মধ্য থেকে মজিদ মিয়া চেঁচিয়ে উঠল, চোরের বিচার লাঠি দিয়া হইব! মজিদ মিয়ার কথায় উত্তেজিত জনগণ চোরদের মারতে লাগলো।

থাম থাম! চেয়ারম্যান চিৎকার করলেন। শুভ্র দুহাত বাড়িয়ে চোরদের বাঁচাতে গেল,নাহ, মারবেন না! দয়া করে মারবেন না!
কিন্তু উন্মত্ত জনতা তখন বধির। চোখের পলকে, কোনো বিচার হওয়ার আগেই, চোর তিনজন নিথর হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। চারপাশের শোরগোল হঠাৎ থেমে গেল। শুভ্র স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চশমাটা ভিড়ের ধাক্কায় কখন ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে, সে টের পায়নি। তার ঝাপসা চোখে শুধু দেখাতে পেল চাঁদের আলোয় তিনটা রক্তাক্ত নিথর দেহ।

পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই পুলিশ এলো। লাশ তিনটা মর্গে নিয়ে গেল, গ্রামে তখন থমথমে অবস্থা ,হত্যাকাণ্ড তো আর এমনি এমনি পার পায় না। চোরদের পরিবারের পক্ষ থেকে মার্ডার কেস হলো। কিন্তু আসল অপরাধী, অর্থাৎ সেই উত্তেজিত জনতা ততক্ষণে ভালো মানুষ সেজে ঘরে বসে আছে। পুলিশের খাতায় প্রধান আসামি হিসেবে নাম উঠল তাদেরই, যারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছিল,চেয়ারম্যান রশিদ সাহেব, কুদ্দুস আলী, এবং দুর্ভাগ্যবশত, এলাকার সেই ‘ভদ্র মেধাবী ছেলে’ শুভ্র।

আইনের মারপ্যাঁচ বড়ই অদ্ভুত, সত্যকে মিথ্যা করা আর মিথ্যাকে সত্য করা।মজিদ মিয়া আদালতে মোটা অঙ্কের টাকায় মিথ্যা সাক্ষী কিনে প্রমাণ করে দিল, আসামিদের উপস্থিতিতে এবং প্ররোচনাতেই নাকি এই পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

রায়ের দিন আকাশ ঘনকালো মেঘ করে বৃষ্টি নামল। যেন প্রকৃতিরও মন খারাপ। বিচারক গম্ভীর গলায় রায় শোনালেন
দণ্ডবিধির ৩০২ ধারা মোতাবেক অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় আসামিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হইলো।

শুভ্র যখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রায় শুনছিল, তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি ছিল না। 
সে কাঁদল না, তার চোখ দুটো পিটপিটও করল না। মানুষ যখন তীব্র কোনো ঘোরের মধ্যে চলে যায়, তখন তার চারপাশের বাস্তব জগৎটা অবাস্তব মনে হতে থাকে। শুভ্রর ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হচ্ছিল।

​সে তখন ভাবছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের কথা। লাল ইটের ওই দালানটার সামনে এখন হয়তো বৃষ্টিতে ভিজছে কৃষ্ণচূড়ার গাছগুলো। বারান্দা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে চশমা পরা কোনো তরুণ, যার হাতে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের মোটা বই। শুভ্রর নিজের টেবিলটাতেও তো ফিজিক্সের অনেকগুলো বই পড়ে আছে। হলের ডাইনিংয়ের ডাল ভাত আর বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানের আড্ডা সবকিছু যেন ছবির মতো ভেসে উঠছে তার চোখে।

​আর মনে পড়ছিল পদ্মর কথা। মেয়েটার স্বভাবটাই অদ্ভুত। যেদিন শুভ্র প্রথম পুলিশের হাতে ধরা পড়ে, তার আগের দিনও পদ্ম একটা কাঁচের বয়ামে করে জলপাইয়ের আচার নিয়ে এসেছিল। বলেছিল,খুব ঝাল হয়েছে বিজ্ঞানী সাহেব সাবধানে খেয়ো।

একটি উজ্জ্বল, অসম্ভব সম্ভাবনাময় জীবন আদালতের রায়ে,চিরকালের জন্য নিভে গেল।
অথচ বাইরে তখনো মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে।
শুভ্রর বৃষ্টি খুব পছন্দ। প্রকৃতি কি সেটা জানত? হয়তো জানত। খুব প্রিয় মানুষকে বিদায় দেওয়ার জন্য এর চেয়ে সুন্দর আয়োজন আর কী-ই বা হতে পারে!

Comments

    Please login to post comment. Login