Posts

গল্প

একজন মনসুর আলী

July 9, 2026

মোঃ বজলুর রশীদ

Original Author মোঃ বজলুর রশীদ

9
View

আমার ছোটমামা মনসুর আলীর মাথায় টুপি মুখে দাড়ি , তাঁর চোখে এমন একটা আধ্যাত্মিক ভাব আছে যে, যে কেউ প্রথম দেখায় তাঁকে পীর সাহেব ভেবে ভুল করতে পারে। লবিং জিনিসটাকে মামা বলেন ‘ললিতকলা’। তাঁর মতে, পৃথিবীর সব মানুষসের কাছাকাছি আসার জন্য মাত্র দুটা জিনিস লাগে এক-  মুখে বোকা ধরনের হাসি আর  সামান্য একটু প্রশংসা করা।

​মামা হুট করে একদিন দেশের সংস্কৃতি মন্ত্রী হয়ে গেলেন। কীভাবে হলেন, সেই রহস্য হিমালয়ের চেয়েও দুর্গম। তবে মামা মন্ত্রী হওয়ার পরদিন বিকেলবেলা আমাকে ডেকে পাঠালেন।
​তিনি তখন তাঁর বিশাল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সরকারি দপ্তরে বসে আছেন। ঘরের এক কোনায় একটা অতি প্রাচীন তানপুরা রাখা, যদিও মামা সঙ্গীতের 'স' ও বোঝেন না।

​আমি গিয়ে সালাম দিতেই মামা বললেন, শান্ত, বসো। চা খাও। সরকারি চা, ট্যাক্সের টাকায় তৈরি। খেতে একটু নোনতা লাগার কথা, কিন্তু লাগছে মিষ্টি। কারণ কী জানো? ক্ষমতা। ক্ষমতার একটা নিজস্ব মিষ্টি আছে।

​আমি বললাম, মামা, তুমি সংস্কৃতির কী বোঝো যে মন্ত্রী হলে?
​মামা চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে বললেন, সংস্কৃতি হলো একটা আবেগের জায়গা। এর কোনো আকার নাই, প্রকার নাই। একটা বাঁশের বাঁশিতে ফুঁ দিলেও সংস্কৃতি, আবার তিন কোটি টাকা খরচ করে চারটা লোহা জোড়াতালি দিয়ে 'বাঙালির চেতনা' নামক ভাস্কর্য বানালেও সংস্কৃতি। আমি দ্বিতীয় পথটা বেছে নিয়েছি।
​কেন?
​কারণ লোহার চেয়ে চেতনার মূল্য অনেক বেশি। তিনশো কোটি টাকার একটা প্রজেক্ট পাস করিয়েছি। একে বলে 'বিমূর্ত শিল্প'। কেউ এর আগামাথা বুঝবে না, কিন্তু সবাই হাততালি দেবে। যে জিনিস মানুষ বোঝে না, সে জিনিসের প্রতি মানুষের ভক্তি বেশি থাকে।

​আমি চুপ করে রইলাম। মামা একটা সিগারেট ধরালেন। ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, দুর্নীতি শব্দটা খুব সস্তা, শান্ত। আমি দুর্নীতি করছি না। আমি দেশের টাকা একটু বাইরে পাঠিয়ে রাখছি। দেশের টাকা দেশে থাকলে মূল্যস্ফীতি হয়, মানুষ গরিব হয়। আমি দেশের অর্থনীতিকে বাঁচানোর জন্য টাকাগুলো সুইজারল্যান্ড আর লন্ডনে পাচার করছি। একে বলে দূরদর্শী অর্থনীতি।

​মামা মন্ত্রী হিসেবে মাত্র কয়েক মাস ছিলেন। এই কয়েক মাসে তিনি দেশের বারোটা বাজিয়ে সংস্কৃতির এমন এক রূপ দার করলেন যে, আসল শিল্পীরা দেশ ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজতে লাগল। আর মামার অ্যাকাউন্টে তখন টাকা আর টাকা।
​যেদিন মামার বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি বসল, তার আগের রাতেই মামা আমাকে ডাকলেন। তাঁর স্যুটকেস গোছানো।
​মামা বললেন, শান্ত, আমার শরীরটা ভালো নেই। দেশের সংস্কৃতি রক্ষা করতে গিয়ে শরীরের বারোটা বাজিয়ে ফেলেছি। চিকিৎসার জন্য কাল ভোরে লন্ডন যাচ্ছি।

​আমি বললাম, আর ফিরবে না?
​মামা হাহাহা করে হাসলেন। বললেন, বোকার মতো কথা বোলো না। যেখানে তিনশো কোটি টাকা অপেক্ষা করছে, সেখানে মানুষ একবার গেলে আর ফেরে? তাছাড়া লন্ডনের আবহাওয়া শরীরের জন্য খুব ভালো।

​দেশের মানুষ কিন্তু তোমাকে বাটপার বলছে, মামা।
​মামা আমার কাঁধে হাত রাখলেন। তাঁর চোখে সেই চিরন্তন মায়াবী ভাব। বললেন, বলুক। বাংলার মানুষ বড় আবেগপ্রবণ। আজ গালি দিচ্ছে, কাল আবার ভুলে যাবে। পাঁচ বছর পর যখন আমি লন্ডনের টেমস নদীর পাড়ে বসে একটা আত্মজীবনী লিখব "আমার মন্ত্রিত্বের দিনগুলি", তখন এই মানুষগুলোই আবার লাইনে দাঁড়িয়ে বই কিনবে।

বাঙালি বাটপারদের ঘৃণা করে না শান্ত, বাটপারদের সাফল্যকে ঈর্ষা করে বুঝলি।
​পরদিন ভোরে মামা লন্ডন চলে গেলেন।

​আমি রাস্তায় একা একা হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম, মামার যুক্তিটা ফেলে দেওয়ার মতো না। 
আমাদের সমাজে মনসুর আলীদের জায়গা কখনো খালি থাকে না। একজন যায়, আরেকজন লবিংয়ের ফাইল বগলে নিয়ে রেডি হয়ে বসে থাকে।

Comments

    Please login to post comment. Login