Posts

ফিকশন

ইভটিজিং

July 23, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

8
View

আয়শা। নামটা শুনলেই মনে হয় যেন এক টুকরো শান্ত আলো, যা অন্ধকার রাতের আকাশে একা জ্বলছে। সে ছিল ঢাকার একটা মাঝারি পাড়ায় বেড়ে ওঠা সাধারণ একটি মেয়ে। পাড়াটার নাম মিরপুরের একটা ছোট অংশ, যেখানে পুরনো বাড়িগুলোর পাশাপাশি নতুন করে গড়ে ওঠা কয়েকটা অ্যাপার্টমেন্ট। রাস্তাগুলো সরু, ভরা বিকেলে চায়ের দোকানগুলোতে লোকজনের ভিড়, ছেলেরা ক্রিকেট খেলে, আর মেয়েরা দল বেঁধে স্কুল-কলেজ থেকে ফেরে। আয়শার বাবা ছিলেন একটা সরকারি অফিসের ক্লার্ক, মা একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষিকা। দুজনের চাকরির আয়ে সংসার চলত সাধারণভাবে। ছোট ভাই লাবিদ, যে তখন ক্লাস টেনে পড়ত, আয়শার সাথে খুব ভালোবাসার সম্পর্ক ছিল। সে তার বোনকে 'আপু' বলে ডাকত, আর আয়শা তাকে পড়াশোনায় সাহায্য করত প্রতি সন্ধ্যায়।
আয়শার জীবনটা ছিল স্বপ্নে ভরা। কলেজে পড়ত সে, ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রী। পাশাপাশি একটা নামকরা কোচিং সেন্টারে যেত ইংরেজি আর ম্যাথের ক্লাসের জন্য। তার চোখে স্বপ্ন ছিল বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে যাওয়ার। সে ভাবত, সমাজের জন্য কিছু করবে—বিশেষ করে মেয়েদের জন্য, যারা প্রতিদিন রাস্তায়, বাসে, অফিসে ছোট ছোট অপমানের শিকার হয়। বাড়িতে বসে সে অনেক রাত পর্যন্ত বই পড়ত, নোট তৈরি করত। তার ঘরটা ছিল ছোট, কিন্তু পরিপাটি। দেওয়ালে রবীন্দ্রনাথের ছবি, একটা ছোট বুকশেল্ফ ভর্তি বই, আর জানালা দিয়ে দেখা যেত পাড়ার ছাদগুলো। সে প্রায়ই মাকে বলত, “মা, আমি যখন অফিসার হব, তখন তোমাদের নিয়ে ঘুরতে যাব সমুদ্রে। লাবিদকে ভালো স্কুলে ভর্তি করব।”
কিন্তু সমাজ তাকে সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ দেয়নি। প্রতি সন্ধ্যায় কোচিং থেকে ফেরার পথটা তার কাছে ধীরে ধীরে আতঙ্কের হয়ে উঠেছিল। রাস্তাটা ছিল প্রায় এক কিলোমিটার লম্বা, দুপাশে পুরনো দোতলা বাড়ি, কয়েকটা চায়ের দোকান, একটা ছোট মসজিদ আর কিছু দোকানদার। প্রথম প্রথম কয়েকটা ছেলে শুধু হুইসেল দিত, “কেমন আছো আপু?” বলে হাসাহাসি করত। আয়শা মাথা নিচু করে, কখনো কখনো দ্রুত পায়ে হেঁটে যেত। তার পরনে সাধারণ শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজ, কোনো অসাধারণ সাজসজ্জা নয়। কিন্তু তার সৌন্দর্য ছিল স্বাভাবিক, শান্ত চোখ, লম্বা চুল, আর একটা নরম হাসি যা সে কদাচিৎ দেখাত।
দিন যত গড়াতে লাগল, তাদের সাহস বাড়তে লাগল। একদিন একজন এসে তার হাত ধরে টানল, “একটু কথা বলি না আয়শা?” আয়শা চমকে হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে পালিয়েছিল। বাড়ি ফিরে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলেছিল সবকিছু। মা শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, “সাবধানে যাস বুবু। রাত না করে ফিরিস। ছেলেগুলোকে পাত্তা দিস না।” বাবা অফিস থেকে ফিরে শুনে বললেন, “পুলিশে বললে কী হবে? ওরা কিছু করে না। তুইই সতর্ক থাক।” আয়শার মনে হতো, এটা তারই দোষ। হয়তো তার হাঁটার ধরন, হয়তো তার চোখের দৃষ্টি, হয়তো সে খুব সুন্দর করে শাড়ি পরে—সবকিছুতেই যেন ছেলেগুলোর খারাপ আচরণের কারণ। সে নিজেকে দোষ দিতে শুরু করল। কোচিংয়ের বন্ধুরা বলত, “অভিযোগ কর, পুলিশে যা। আমরা সাথে আছি।” কিন্তু আয়শা জানত, এই শহরে প্রতিদিন শত শত মেয়ে এমন ভোগে। কেউ কিছু করে না। পুলিশের কাছে গেলে হয়তো আরও অপমানের শিকার হবে।
সে তার রুটিন বদলাতে চেষ্টা করল। কখনো অন্য রাস্তা দিয়ে যেত, কখনো বন্ধুদের সাথে ফিরত। কিন্তু সেই ছেলেরা ঠিক খুঁজে বের করত। একদিন বিকেলে একজন তার ব্যাগ থেকে বই বের করে ছুড়ে দিল। আরেকদিন তার পেছনে পেছনে হেঁটে অশ্লীল কথা বলতে বলতে গেল। আয়শা রাতে ঘুমাতে পারত না। তার মনে ভয়ের ছায়া পড়ল। সে তার ডায়েরিতে লিখত, “আমি কি অপরাধী? কেন আমাকে এমন করে? আমি তো শুধু পড়তে চাই, স্বপ্ন দেখতে চাই।” তার বন্ধু রিয়া তাকে বলত, “তুই চেঞ্জ কর আয়শা। অন্য কোচিংয়ে যা।” কিন্তু আয়শা ভাবত, সব জায়গায় তো একই। সমাজটাই এমন।
একদিন সন্ধ্যায় আকাশ ভারী হয়ে বৃষ্টি নামল। কোচিং থেকে বেরিয়ে আয়শা ছাতা খুলে হাঁটছিল। রাস্তায় লোকজন কম ছিল, বৃষ্টির জন্য। হঠাৎ চার-পাঁচজন ছেলে পেছন থেকে এসে তাকে ঘিরে ধরল। তাদের চোখে নেশার ঝিলিক, মুখে বিকৃত হাসি। আয়শা চিৎকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু একজন তার মুখ চেপে ধরল। তারা তাকে জোর করে একটা পরিত্যক্ত পুরনো বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেল, যেটা রাস্তা থেকে একটু ভেতরে। সেখানে যা ঘটল, সেটা আয়শার জীবনের সব আলো, সব স্বপ্ন, সব আশা নিভিয়ে দিল। তারা তাকে ছাড়ল অনেকক্ষণ পর, হাসতে হাসতে চলে গেল। আয়শা কোনোমতে কাপড় ঠিক করে, শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা আর মনে অপমানের বোঝা নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। তার চোখে জল ছিল না, শুধু ফাঁকা দৃষ্টি। বৃষ্টিতে তার শরীর ভিজে যাচ্ছিল, কিন্তু সে কিছু অনুভব করছিল না।
বাড়ি ফিরে সে সোজা তার ঘরে চলে গেল। মা ডাকলেন, “কী হয়েছে রে আয়শা? এত দেরি করলি কেন?” সে কোনো উত্তর দিল না। দরজা বন্ধ করে দিল। রাত গভীর হলে আয়শা বাথরুমে গেল। সেই যন্ত্রণা, লজ্জা, অপমান, সমাজের চোখে নিজেকে অপরাধী মনে করা—সবকিছু তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। সে আর বাঁচতে চাইছিল না। তার স্বপ্নগুলো, ভবিষ্যতের ছবিগুলো সব মিলিয়ে গিয়েছিল। সে তার জীবনের ইতি টেনে দিল।
সকালে মা যখন দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকলেন, আয়শা আর নেই। পুরো বাড়ি চিৎকারে, কান্নায় ভরে গেল। বাবা অজ্ঞান হয়ে পড়লেন। লাবিদ, যে তখন ক্লাস টেনে পড়ত, বোনের শরীর দেখে পাথর হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছিল না কী ঘটেছে। পুলিশ এল, মামলা হলো। কিন্তু সাক্ষী কোথায়? কেউ কিছু দেখেনি বলে দাবি করল। ছেলেগুলোর নাম পর্যন্ত কেউ বলতে পারল না। তদন্ত চলতে লাগল, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই। পুলিশ বলল, “প্রমাণ নেই, তদন্ত চলছে।” সমাজের লোকজন আসতে লাগল, কেউ সান্ত্বনা দিতে, কেউ গুজব ছড়াতে। “মেয়েটা হয়তো নিজেই...” এমন কথাও শোনা গেল। আয়শার মা দিনরাত কাঁদতেন, বাবা চুপ করে বসে থাকতেন।
লাবিদের জীবন একেবারে বদলে গেল। সে আর পড়াশোনায় মন দিতে পারছিল না। রাতে ঘুম আসত না। বোনের শেষ মুখটা, তার হাসি, তার স্বপ্নের কথা—সব তার চোখের সামনে ভাসত। স্কুলে যেত, কিন্তু ক্লাসে মন বসত না। বন্ধুরা জিজ্ঞাসা করলে সে চুপ করে থাকত। গোপনে সে খোঁজ নিতে শুরু করল। কোচিংয়ের আশেপাশের দোকানদারদের সাথে কথা বলল, রাস্তার ছেলেদের জিজ্ঞাসা করল, কয়েকটা রাত জেগে পাড়ায় ঘুরল। অনেক কষ্টে, ভয়ে ভয়ে একটা ছোট ছেলে বলল, “ওরা তো রহিম, কামাল, সোহেল আর তার বন্ধু রাজু। ওই পরিত্যক্ত বাড়িটায় প্রায়ই এমন ঘটনা ঘটে। ওরা সবাই এলাকার মাস্তান। কেউ কিছু বলে না।”
লাবিদ আর অপেক্ষা করল না। সে জানত পুলিশ কিছু করবে না। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিল। দিনের পর দিন সে তাদের খুঁজে বের করল একে একে। প্রথমে রহিমকে একা পেল একটা গলিতে সন্ধ্যায়। তারপর কামালকে তার বাড়ির কাছে। সোহেল আর রাজুকে অন্য জায়গায়। যা ঘটল, সেটা ছিল প্রতিশোধের আগুন। লাবিদের হাতে রক্ত লাগল, কিন্তু তার মনে শান্তি ছিল না—শুধু একটা ফাঁকা, শূন্য অনুভূতি। সে বোনের জন্য এটা করেছে, কিন্তু আয়শা তো আর ফিরবে না।
পুলিশ তাকে ধরল পরের দিন। লাবিদ নিজেই থানায় গিয়ে বলল, “আমি করেছি। আমার বোনকে যারা নষ্ট করেছে, তাদের আমি শেষ করেছি।” আদালতে তার বিচার হলো। সে জেলে গেল। তার বাবা-মা একা হয়ে গেলেন। লাবিদের জেলের ভেতর থেকে চিঠি আসত, “মা-বাবা, আমি দুঃখিত। কিন্তু আমি আর কিছু করতে পারিনি। সমাজ আমাদের কোনো নিরাপত্তা দেয়নি।”
আজও সেই পাড়ায় ইভটিজিং চলছে। মেয়েরা ভয়ে কাঁপছে, বাবা-মায়েরা চিন্তায় থাকেন। আয়শার গল্পটা হয়ে রইল একটা সতর্কবার্তা। একটি মেয়ের আত্মা আর এক ভাইয়ের রক্তাক্ত প্রতিজ্ঞা—ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধে নির্মম সত্য। সমাজ যদি না বদলায়, তাহলে আরও অনেক আয়শা হারাবে, আরও অনেক লাবিদ পথভ্রষ্ট হবে।

🎉 ১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login