নোবেলের ইতিহাস
নোবেল পুরস্কার বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি মানবজাতির কল্যাণে অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেয় বিজ্ঞান, সাহিত্য এবং শান্তির ক্ষেত্রে। এই পুরস্কারের ইতিহাস শুধুমাত্র একটি পুরস্কারের গল্প নয়, বরং একজন মানুষের জীবন, তাঁর অনুশোচনা, দর্শন এবং মানবতার প্রতি তাঁর শেষ ইচ্ছার গল্প। আলফ্রেড নোবেল নামের সেই মানুষটির উইল থেকেই শুরু হয় এই মহান পুরস্কারের যাত্রা। আজ আমরা সেই পূর্ণ ইতিহাস জানব—কীভাবে এটি শুরু হয়েছিল, কোথায়, কেন এবং কীভাবে এটি আজকের রূপ নিয়েছে।
আলফ্রেড নোবেলের জীবন ও পটভূমি
আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল জন্মগ্রহণ করেন ২১ অক্টোবর ১৮৩৩ সালে সুইডেনের স্টকহোমে। তাঁর পরিবার ছিল প্রকৌশলী ও উদ্ভাবকের পরিবার। পিতা ইমানুয়েল নোবেল ছিলেন একজন উদ্ভাবক এবং ব্যবসায়ী। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সবসময় ভালো ছিল না। শৈশবে পরিবার রাশিয়ায় চলে যায়, যেখানে আলফ্রেড শিক্ষা লাভ করেন। তিনি রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান এবং ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি ফরাসি, জার্মান, ইংরেজি এবং রুশ ভাষায় সাবলীল ছিলেন।
আলফ্রেড নোবেলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল ডিনামাইট। ১৮৬৭ সালে তিনি নাইট্রোগ্লিসারিনকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য করে ডিনামাইট আবিষ্কার করেন। এর আগে নাইট্রোগ্লিসারিন অত্যন্ত বিপজ্জনক ছিল এবং অনেক দুর্ঘটনা ঘটত। নোবেলের এই আবিষ্কার নির্মাণকাজ, খনন এবং শিল্পক্ষেত্রে বিপ্লব এনে দেয়। তিনি আরও অনেক ধরনের বিস্ফোরক এবং বারুদ তৈরি করেন। তাঁর ব্যবসা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি প্রায় ৯০টির বেশি কারখানা স্থাপন করেন বিভিন্ন দেশে। ফলে তিনি অত্যন্ত ধনী হয়ে ওঠেন।
তবে নোবেল শুধু ব্যবসায়ী বা বিজ্ঞানী ছিলেন না। তিনি সাহিত্য ও দর্শনেও আগ্রহী ছিলেন। তিনি কবিতা লিখতেন এবং নাটক রচনা করতেন। তাঁর জীবনে একাকীত্ব ছিল। তিনি কখনো বিয়ে করেননি এবং সন্তানও ছিল না। তাঁর জীবনের শেষের দিকে তিনি মানবতার কল্যাণ নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করেন।
“মৃত্যুর ব্যবসায়ী” শিরোনাম এবং অনুশোচনা
নোবেল পুরস্কারের জন্মের পেছনে একটি বিশেষ ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৮৮৮ সালে আলফ্রেডের ভাই লুডভিগ নোবেল ফ্রান্সের কান শহরে মারা যান। ফরাসি সংবাদপত্রগুলো ভুল করে আলফ্রেডের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে। একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল—“Le marchand de la mort est mort” অর্থাৎ “মৃত্যুর ব্যবসায়ী মারা গেছেন”। এই খবর পড়ে আলফ্রেড গভীরভাবে মর্মাহত হন। তিনি বুঝতে পারেন যে পৃথিবী তাঁকে শুধু বিস্ফোরক তৈরির জন্য মনে রাখবে, যা যুদ্ধ এবং ধ্বংসের সঙ্গে যুক্ত। তিনি চাননি যে তাঁর নাম শুধু মৃত্যু ও ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত থাকুক। এই ঘটনা তাঁকে নিজের উত্তরাধিকার নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
এছাড়া আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল অস্ট্রিয়ান শান্তিবাদী বারথা ফন সুটনারের। ১৮৭৬ সালে নোবেল প্যারিসে একজন সচিব নিয়োগের বিজ্ঞাপন দেন। বারথা সেই পদে যোগ দেন, যদিও মাত্র কয়েকদিনের জন্য। পরে তিনি বিখ্যাত শান্তিবাদী হয়ে ওঠেন এবং “ডাউন উইথ আর্মস!” (Lay Down Your Arms) নামের উপন্যাস লেখেন। নোবেলের সঙ্গে তাঁর চিঠিপত্রের সম্পর্ক ছিল। বারথার শান্তির আদর্শ নোবেলকে প্রভাবিত করে। তিনি মনে করতেন, বিজ্ঞান ও সাহিত্যের পাশাপাশি শান্তির জন্যও পুরস্কার থাকা উচিত।
উইল এবং পুরস্কারের ভিত্তি
১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর প্যারিসের সুইডিশ-নরওয়েজিয়ান ক্লাবে আলফ্রেড নোবেল তাঁর শেষ উইল স্বাক্ষর করেন। এটি ছিল তাঁর তৃতীয় এবং চূড়ান্ত উইল। এই উইলে তিনি তাঁর সম্পত্তির প্রায় ৯৪ শতাংশ (তৎকালীন প্রায় ৩১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার) একটি তহবিল গঠনের জন্য দান করেন। এই তহবিলের সুদ প্রতি বছর পাঁচটি সমান অংশে ভাগ করে পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে এমন ব্যক্তিদের, যারা পূর্ববর্তী বছরে মানবজাতির সবচেয়ে বেশি উপকার করেছেন।
উইল অনুসারে পাঁচটি ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়:
পদার্থবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উদ্ভাবন।
রসায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার বা উন্নতি।
শারীরবিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার।
সাহিত্যে আদর্শ দিকনির্দেশনায় সবচেয়ে অসাধারণ কাজ।
জাতিগুলোর মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি, স্থায়ী সেনাবাহিনী হ্রাস এবং শান্তি সম্মেলনের প্রচারের জন্য সবচেয়ে ভালো কাজ।
উইলে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে জাতীয়তা বিবেচনা করা হবে না। সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিই পুরস্কার পাবেন, তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান হোন বা না হোন। পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের পুরস্কার দেবে সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস, চিকিৎসাবিজ্ঞানের পুরস্কার দেবে স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট, সাহিত্যের পুরস্কার দেবে সুইডিশ একাডেমি এবং শান্তি পুরস্কার দেবে নরওয়ের পার্লামেন্ট (স্টর্টিং) দ্বারা নির্বাচিত পাঁচ সদস্যের কমিটি।
মৃত্যু এবং প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম
১৮৯৬ সালের ১০ ডিসেম্বর ইতালির সান রেমোতে আলফ্রেড নোবেল মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণে মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। উইল প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। নোবেল পরিবারের অনেকেই এই উইলের বিরোধিতা করেন। তাঁরা মনে করতেন সম্পত্তি পরিবারেরই পাওয়া উচিত। সুইডেনের কিছু রক্ষণশীল মহলও আপত্তি জানান, কারণ পুরস্কার আন্তর্জাতিক হবে এবং সুইডিশদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে না। নরওয়ে ও সুইডেন তখনও ইউনিয়নে যুক্ত ছিল, কিন্তু শান্তি পুরস্কার নরওয়েকে দেওয়ার সিদ্ধান্তও বিতর্কের জন্ম দেয়।
উইলের নির্বাহক ছিলেন র্যাগনার সোহলম্যান এবং রুডলফ লিলজেকুইস্ট। তাঁরা কঠিন আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে যান। অবশেষে ১৯০০ সালের ২৯ জুন নোবেল ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। সুইডেনের রাজা দ্বিতীয় অস্কার ফাউন্ডেশনের সংবিধান অনুমোদন করেন। এভাবে নোবেলের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ তৈরি হয়।
প্রথম পুরস্কার প্রদান: ১৯০১
১৯০১ সালের ১০ ডিসেম্বর, নোবেলের মৃত্যুর পঞ্চম বার্ষিকীতে প্রথম নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। স্টকহোমে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও সাহিত্যের পুরস্কার এবং অসলোতে (তখন ক্রিশ্চিয়ানিয়া) শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়।
প্রথম বিজয়ীরা ছিলেন:
পদার্থবিজ্ঞান: ভিলহেল্ম কনরাড রন্টগেন (জার্মানি) — এক্স-রশ্মি আবিষ্কারের জন্য।
রসায়ন: জ্যাকোবাস হেনরিকাস ভ্যান ’ট হফ (নেদারল্যান্ডস) — রাসায়নিক গতিবিদ্যা ও অসমোটিক চাপ নিয়ে কাজের জন্য।
শারীরবিজ্ঞান বা চিকিৎসাবিজ্ঞান: এমিল ভন বেহরিং (জার্মানি) — ডিপথেরিয়ার বিরুদ্ধে সিরাম থেরাপির জন্য।
সাহিত্য: সুলি প্রুধোম (ফ্রান্স) — কবিতার জন্য।
শান্তি: জাঁ-আঁরি ডুনঁ (সুইজারল্যান্ড) ও ফ্রেডেরিক পাসি (ফ্রান্স) — যথাক্রমে রেড ক্রস প্রতিষ্ঠা এবং শান্তি আন্দোলনের জন্য।
এই প্রথম অনুষ্ঠান থেকেই নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করে।
পুরস্কারের কাঠামো ও পরিচালনা
নোবেল ফাউন্ডেশন পুরস্কারের অর্থ ব্যবস্থাপনা করে। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে পদার্থ, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য ও অর্থনীতির পুরস্কার এবং অসলোতে শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয়। বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, সনদপত্র এবং নগদ অর্থ পান। অর্থের পরিমাণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে।
মনোনয়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয়। বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পূর্ববর্তী বিজয়ীরা মনোনয়ন দিতে পারেন। কমিটিগুলো গভীর মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণত তিনজনের বেশি ব্যক্তি একসঙ্গে একটি পুরস্কার ভাগ করতে পারেন না।
অর্থনীতি পুরস্কারের সংযোজন
১৯৬৮ সালে সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (Sveriges Riksbank) তাদের ৩০০তম বার্ষিকী উপলক্ষে আলফ্রেড নোবেলের স্মরণে অর্থনৈতিক বিজ্ঞানে একটি পুরস্কার প্রতিষ্ঠা করে। এটি আনুষ্ঠানিকভাবে “Sveriges Riksbank Prize in Economic Sciences in Memory of Alfred Nobel” নামে পরিচিত। প্রথমবার এটি দেওয়া হয় ১৯৬৯ সালে। যদিও এটি মূল নোবেল পুরস্কার নয়, তবুও এটি নোবেলের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে যায় এবং একই অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয়।
যুদ্ধকালীন বাধা ও অন্যান্য ঘটনা
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কয়েক বছর কিছু পুরস্কার দেওয়া হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪০-৪২ সালে অধিকাংশ পুরস্কার স্থগিত ছিল। কিছু বছর কোনো যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায়ও পুরস্কার দেওয়া হয়নি।
ইতিহাসে কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তও রয়েছে। সাহিত্যে অনেক মহান লেখক (যেমন লিও টলস্টয়, জেমস জয়েস) পুরস্কার পাননি। চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু পুরস্কার পরে সমালোচিত হয়েছে। শান্তি পুরস্কারও প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।
নারী বিজয়ীদের সংখ্যা প্রাথমিকভাবে কম ছিল। মেরি কুরি প্রথম নারী হিসেবে পদার্থবিজ্ঞানে (১৯০৩) এবং পরে রসায়নে (১৯১১) পুরস্কার পান। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি ভিন্ন বিজ্ঞানে নোবেল পেয়েছেন। পরবর্তীতে আরও অনেক নারী বিজয়ী হয়েছেন।
নোবেল পুরস্কারের প্রভাব ও তাৎপর্য
নোবেল পুরস্কার শুধু সম্মান নয়, এটি বিজ্ঞান ও মানবতার অগ্রগতির প্রতীক হয়ে উঠেছে। আইনস্টাইন, মেরি কুরি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র—এঁদের মতো অসংখ্য মহান ব্যক্তিত্ব এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়ে এশিয়ার প্রথম বিজয়ী হন এবং বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পরিচিত করেন।
আজ পর্যন্ত (২০২৫ পর্যন্ত) শতাধিক বার পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে এবং এক হাজারেরও বেশি ব্যক্তি ও সংস্থা এই সম্মান পেয়েছেন। নোবেল ফাউন্ডেশন আজও নোবেলের ইচ্ছা অনুসারে কাজ করে চলেছে।
উপসংহার
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস একজন মানুষের আত্মউপলব্ধির গল্প। আলফ্রেড নোবেল ডিনামাইট তৈরি করে ধন-সম্পদ অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন তাঁর নাম ধ্বংসের পরিবর্তে সৃষ্টির সঙ্গে জড়িত থাকুক। তাঁর উইলের মাধ্যমে তিনি মানবজাতির জন্য একটি স্থায়ী উপহার রেখে গেছেন। একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে এই পুরস্কার বিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তির অগ্রগতিকে উৎসাহিত করেছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে একজন মানুষের ইচ্ছাশক্তি কতটা শক্তিশালী হতে পারে এবং কীভাবে ব্যক্তিগত সম্পদ সমগ্র মানবতার কল্যাণে রূপান্তরিত হতে পারে।
নোবেলের ইতিহাস শুধু অতীতের কাহিনি নয়—এটি ভবিষ্যতের জন্যও একটি অনুপ্রেরণা। যারা মানবজাতির উপকারে কাজ করেন, তাঁদের স্বীকৃতি দেওয়ার এই ঐতিহ্য আজও অব্যাহত আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে।্
্
১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
