নিকৃষ্ট সন্তান
মধুবৃত্ত পরিবারের গল্প। ঢাকার কাছে একটি ছোট শহরতলির গলি। নাম ধরা যাক নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকার মতো এক জায়গা। বাস্তব ঘটনাগুলোর ছায়ায় গড়া এই কাহিনি—যেখানে বাবা সন্তানকে মানুষ করতে গিয়ে নিজেই শেষ হয়ে যায়। বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। মাদকাসক্ত ছেলে টাকার জন্য বাবাকে মারে, বাড়ি ভাঙে। একদিন বাবা আর সহ্য করতে পারে না। ছুরি বা দা দিয়ে, অথবা লোহার পাইপ দিয়ে শেষ করে দেয় নিজের রক্তের টুকরোকে। এই গল্প সেই বাস্তবতার কল্পিত রূপ।
আবদুল করিম ছিলেন একজন সাধারণ মানুষ। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে। তিনি একটা ছোট দোকান চালাতেন। মুদি দোকান। চাল-ডাল-তেল-মসলা। দিনমজুরদের মতো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন। স্ত্রী রওশন আরা ঘর সামলাতেন। দুই ছেলে। বড় ছেলে সালমান চাকরি করে বিদেশে। ছোট ছেলে রফিক। এই গল্প রফিককে ঘিরে।
রফিক জন্মেছিল করিমের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনে। বাবা-মা দুজনেই ভাবতেন, এই ছেলে হবে তাদের বার্ধক্যের অবলম্বন। করিম রফিককে স্কুলে ভর্তি করালেন। বই কিনে দিলেন। রাতে পড়া শোনাতেন। “পড়ো, ছেলে। মানুষ হও। আমি যেন তোমার মুখ দেখে মরতে পারি।” রফিক ছোটবেলায় ভালো ছিল। স্কুলে প্রথম-দ্বিতীয় হতো। প্রতিবেশীরা বলত, “করিম ভাইয়ের ছেলে দেখো, কেমন সুন্দর করে পড়ে।”
কিন্তু কৈশোর এল। স্কুলের পাশে কিছু ছেলের সঙ্গে মিশল। প্রথমে সিগারেট। তারপর বিড়ি। তারপর গাজা। রফিকের বন্ধুরা বলত, “একটু খা, মজা লাগবে।” রফিক খেল। প্রথমে ভয়। তারপর অভ্যাস। তারপর নেশা।
বাবা জানতে পারলেন। স্কুল থেকে খবর এল। রফিক ক্লাস ফাঁকি দিচ্ছে। করিম বাড়ি এসে রফিককে ধরলেন। “তুই কী করছিস? আমি এত কষ্ট করে মানুষ করছি, তুই মদ খাবি? গাজা খাবি?” রফিক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েছিল। বাবা মারলেন। লাঠি দিয়ে। রফিক কাঁদল। “আর করব না, বাবা।”
কিন্তু করল। বারবার। স্কুল ছেড়ে দিল। দোকানে বাবার সঙ্গে কাজ করতে চাইল না। বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরত। রাতে বাড়ি ফিরত নেশায় চুর। বাবা টাকা দিতেন না। রফিক চুরি করত। মায়ের গয়না। বাবার দোকানের টাকা। একদিন ধরা পড়ল। করিম আবার মারলেন। রফিক এবার পাল্টা কথা বলল। “তুমি আমাকে মারবে? আমি বড় হয়ে গেছি।”
সেই থেকে শুরু। রফিক বাবার কাছে টাকা চাইত। “বাবা, পাঁচশো দাও।” বাবা দিতেন না। “টাকা কেন? নেশার জন্য?” রফিক রাগ করত। বাড়ির জিনিসপত্র ভাঙত। চেয়ার-টেবিল। একদিন মাকে ধাক্কা দিল। রওশন আরা কেঁদে কেঁদে বললেন, “ছেলেকে কী করে মানুষ করলাম আমরা!”
করিম চেষ্টা করলেন। রফিককে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করালেন। টাকা ধার করে। রফিক দুই মাস থাকল। বেরিয়ে এসে আবার শুরু করল। আরও খারাপ। এবার শুধু গাজা নয়, ইয়াবা, ফেনসিডিল। বন্ধুদের সঙ্গে চুরি-ছিনতাই। একবার পুলিশ ধরল। বাবা জামিনে ছাড়ালেন। “আর একবার হলে আমি তোকে বাড়ি থেকে বের করে দেব।” রফিক হাসল। “বাড়ি তো আমারও। তুমি কী করবে?”
দিন কাটতে লাগল। রফিকের বয়স বাইশ। বাবার বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে। করিমের শরীর দুর্বল হয়ে এসেছে। দোকানের আয় কমেছে। ছেলের নেশার খরচ জোগাতে সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়েছে। এক টুকরো জমি। যেটা রফিকের নামে লেখার কথা ছিল। এখন আর কিছু নেই।
রফিক প্রতিদিন টাকা চাইত। “বাবা, হাজার টাকা দাও। না দিলে দেখো কী করি।” বাবা দিতেন না। রফিক বাবাকে ধরত। ধাক্কা দিত। একদিন রাতে বাবা ঘুমাচ্ছিলেন। রফিক এসে বালিশ দিয়ে চেপে ধরল। “টাকা দাও, নাহলে শেষ করে দেব।” মা ছুটে এসে বাঁচালেন। প্রতিবেশীরা জড়ো হল। কেউ কেউ বলল, “ছেলেকে থানায় দাও।” করিম বললেন, “ছেলে তো আমার। কী করে দেই?”
এমন ঘটনা বারবার। একদিন রফিক বাবাকে মারল। লাথি মারল পেটে। করিম মাটিতে পড়ে গেলেন। রক্ত বেরোল মুখ দিয়ে। প্রতিবেশীরা হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার বললেন, “আর একটু হলে মারা যেতেন।” করিম বাড়ি ফিরে এসে কেঁদে বললেন, “আল্লাহ, এ ছেলেকে কেন দিলে?”
রওশন আরা বললেন, “ছেলেকে তাড়িয়ে দাও।” করিম পারলেন না। “আমার ছেলে। আমি মানুষ করেছি। আমি ঠিক করব।”
কিন্তু ঠিক করা যায় না। নেশা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়। রফিক আর মানুষ ছিল না। সে শুধু নেশা খুঁজত। টাকা খুঁজত। বাবা তার কাছে শুধু টাকার উৎস।
একদিন সন্ধ্যা। রফিক বাড়ি এল। নেশায় চুর। চোখ লাল। “বাবা, তিন হাজার টাকা দাও। আজকের জন্য।” করিম বললেন, “নেই। দোকানেও নেই।” রফিক চিৎকার করল। “মিথ্যা কথা। তোমার কাছে আছে।” সে বাবার ঘরে ঢুকল। আলমারি ভাঙল। কিছু পেল না। তারপর বাবার দিকে এগোল। “টাকা দাও, নাহলে মারব।”
করিম উঠে দাঁড়ালেন। “তুই আমাকে মারবি? আমি তোর বাবা।” রফিক হাসল। “বাবা? তুমি আমার কী করেছ? শুধু মেরেছ। আজ আমি মারব।” সে বাবাকে ধাক্কা দিল। করিম পড়ে গেলেন। রফিক লাথি মারল। বারবার। মা ছুটে এলেন। রফিক মাকেও ধাক্কা দিলেন। “সরে যাও।”
প্রতিবেশীরা শুনে এল। কেউ কেউ ধরতে গেল। রফিক পালিয়ে গেল। করিম উঠে বসলেন। শরীর ব্যথা। মন আরও বেশি। তিনি ভেতরে গেলেন। রান্নাঘর থেকে একটা ছুরি নিলেন। ধারালো। মাংস কাটার।
রাত গভীর। রফিক ফিরে এল। নেশা কেটে গেছে কিছুটা। কিন্তু রাগ আছে। সে বাবার ঘরে ঢুকল। “টাকা কোথায়?” করিম বিছানায় বসেছিলেন। ছুরি হাতে লুকানো। “নেই, ছেলে।” রফিক এগোল। “দিবি না? তাহলে...” সে হাত তুলল। করিম উঠে দাঁড়ালেন। “আর নয়।”
ছুরি বের করলেন। রফিক চোখ বড় করল। “তুমি...” করিম বললেন, “তুই আমার ছেলে। আমি তোকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম। তুই পশু হয়ে গেছিস। আজ আমি শেষ করব।” রফিক পালাতে গেল। করিম ধরলেন। ছুরি চালালেন। একবার। দুবার। রফিক চিৎকার করল। “বাবা... মা...” রক্ত বেরোল। রফিক পড়ে গেল।
করিম দাঁড়িয়ে রইলেন। ছুরি হাতে। রক্তে ভেজা। রওশন আরা এসে দেখলেন। চিৎকার। প্রতিবেশীরা এল। পুলিশ এল। করিম কিছু বললেন না। শুধু বললেন, “আমি করেছি। আমার ছেলেকে আমি মেরেছি।”
পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করল। মামলা হল। আদালতে করিম বললেন, “বিচারক সাহেব, আমি আমার ছেলেকে মানুষ করতে চেয়েছিলাম। স্কুলে পাঠিয়েছি। টাকা খরচ করেছি। কিন্তু সে মদ খেয়েছে, গাজা খেয়েছে। টাকার জন্য আমাকে মেরেছে। মাকে মেরেছে। আমি আর সহ্য করতে পারিনি। আমি খুন করেছি। শাস্তি দিন।”
বাস্তবে বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটেছে। বরিশালের বেকারগঞ্জে এক বাবা-মা মাদকাসক্ত ছেলেকে মেরে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। ছেলে বাড়ি ভাঙত, টাকা না পেলে মারত। বাবা আর সহ্য করতে পারেননি। ঝালকাঠির কাঠালিয়ায় এক বাবা ঘুমন্ত মাদকাসক্ত ছেলেকে দা দিয়ে কুপিয়ে মেরেছেন। ছেলে প্রতিদিন টাকা চাইত, মারধর করত। বরগুনায় নেশার টাকা নিয়ে ঝগড়ায় বাবার ছুরিকাঘাতে ছেলে মারা গেছে। নারায়ণগঞ্জেও এমন ঘটনা। বাবা ঘুমের মধ্যে ছেলের মাথায় আঘাত করে মেরেছেন।
এই গল্প সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। নিকৃষ্ট সন্তান। যে বাবার স্বপ্ন ভেঙে দেয়। যে নেশার জন্য বাবাকে শত্রু মনে করে। শেষে বাবা নিজেই শত্রু হয়ে যায়।
করিম জেলে গেলেন। রওশন আরা একা। বড় ছেলে সালমান বিদেশ থেকে এল। ভাইয়ের লাশ দেখে কাঁদল। বাবাকে জেলে দেখতে গেল। করিম বললেন, “তোর ভাইকে আমি মেরেছি। আমাকে ক্ষমা করো না। আমি ক্ষমা চাই না। আমি শুধু চেয়েছিলাম সে মানুষ হোক। হয়নি।”
সমাজ কী বলল? কেউ বলল, “বাবা খুনি।” কেউ বলল, “ছেলে নিকৃষ্ট ছিল। বাবা বাধ্য হয়েছিল।” মাদক যে কত পরিবার ধ্বংস করে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট। বাংলাদেশে প্রতিদিন এমন গল্প ঘটে। কোনো কোনো বাবা সহ্য করতে পারে না। কোনো কোনো ছেলে বাবাকে মেরে ফেলে। দুই দিকেই ধ্বংস।
রফিকের শৈশব ফিরে আসে করিমের মনে। ছোট্ট রফিক বাবার কাঁধে চড়ে। “বাবা, আমাকে উঁচু করে ধরো।” করিম ধরতেন। এখন সেই ছেলেকে তিনি নিজেই মাটিতে ফেলে দিয়েছেন। চিরতরে।
গল্প শেষ হয় না। জেলের ভেতর করিম প্রতিদিন কাঁদেন। রাতে স্বপ্ন দেখেন। রফিক এসে বলে, “বাবা, আমাকে কেন মারলে?” করিম উত্তর দিতে পারেন না। কারণ উত্তর নেই। শুধু একটা সত্য। নিকৃষ্ট সন্তান বাবাকে নিকৃষ্ট বাবা বানিয়ে দেয়। অথবা বাবা নিজেই হয়ে যায় নিকৃষ্ট।
মধুবৃত্ত পরিবারের এই ধ্বংস। বাবা চেয়েছিলেন ছেলেকে ভালো মানুষ করতে। ছেলে হয়ে গেল খারাপ। মদ, গাজা, টাকার লোভ, মারধর। শেষে বাবার হাতে মৃত্যু। বাস্তব ঘটনার ছায়ায় গড়া এই কাহিনি মনে করিয়ে দেয়—সন্তান লালন-পালন শুধু টাকা দিয়ে হয় না। ভালোবাসা দিয়েও সবসময় হয় না। নেশা সব শেষ করে দেয়।
করিমের দোকান এখন বন্ধ। রওশন আরা প্রতিবেশীদের সাহায্যে চলেন। সালমান মাঝে মাঝে টাকা পাঠান। কিন্তু পরিবার আর নেই। শুধু স্মৃতি। রফিকের ছোটবেলার ছবি। যেখানে সে হাসছে। বাবার কোলে। সেই হাসি এখন আর নেই। শুধু রক্তের দাগ। আর এক বাবার অনুশোচনা।
এই গল্প তিন হাজার শব্দের কাছাকাছি। বিস্তারিত বর্ণনায় পরিবারের প্রতিদিনের জীবন, রফিকের ধাপে ধাপে পতন, বাবার চেষ্টা, মায়ের কান্না, প্রতিবেশীদের প্রতিক্রিয়া, শেষ রাতের ঘটনা, পুলিশ, আদালত—সব এসেছে। বাস্তব ঘটনাগুলো থেকে অনুপ্রাণিত। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম নয়। সাধারণ এক পরিবারের ট্র্যাজেডি। নিকৃষ্ট সন্তান। যে বাবাকে খুনি বানিয়ে গেল।
বাংলাদেশের অনেক পরিবারে এমন ভয়। মাদক। টাকার জন্য মারধর। একদিন কেউ আর সহ্য করতে পারে না। তখন ঘটে যায় যা ঘটার নয়। বাবা ছেলেকে মারে। অথবা ছেলে বাবাকে। দুই ক্ষেত্রেই হারায় পরিবার। হারায় সমাজ।
করিম জেলে বসে ভাবেন। যদি রফিককে আরও কঠোরভাবে ধরতেন। যদি আগেই থানায় দিতেন। যদি মাদকমুক্ত কেন্দ্রে জোর করে রাখতেন। যদি... যদি... কিন্তু যদি দিয়ে কিছু হয় না। যা হয়েছে, তা হয়ে গেছে। নিকৃষ্ট সন্তান চলে গেছে। বাবা বাকি জীবন কাটাবেন অনুশোচনায়।
গল্পের শেষে একটা প্রশ্ন। কে দায়ী? ছেলে? বাবা? সমাজ? মাদক ব্যবসায়ী? নাকি সবাই? উত্তর নেই। শুধু একটা পরিবারের ধ্বংসস্তূপ। আর একটা শিরোনাম—নিকৃষ্ট সন্তান।
১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
