আদর্শ কাকে বলে বা বিষয়টি কি? আদর্শ এমন একটি বিষয় বা বিষয়ের সমষ্টি বা মুল নীতি যা সাধারণত আমরা আমাদের নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনে বা রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক জীবনে অনুসরণ করে থাকি। আর আমরা সাধারণত আদর্শ এজন্যই অনুসরণ করে থাকি যেন তা আমাদের ব্যক্তিগত, রাষ্ট্রীয়, পারিবারিক জীবনে শান্তি শৃঙ্খলা, উন্নতি বয়ে আনে। আদর্শের অনুসরণ অনেক ভাবে হতে পারে। যেমন রাষ্ট্রীয় ভাবে কাউকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করা আবার ব্যক্তিগত ভাবে মানুষ তার নিজ নিজ আদর্শকে খুঁজে নেয়। একটি আদর্শ নিজে থেকে তৈরি হয় না এই আদর্শ তৈরির পিছনে অবশ্যই একজন ব্যক্তি থাকে যার কথা এবং কর্মকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যার আদর্শ মানুষকে পথ দেখায় অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, একটি সুন্দর পৃথিবীর পথ দেখায়। একজন মানুষ বা রাষ্ট্র বিভিন্ন জিনিসের উপর ভিত্তি করে তার আদর্শ মানুষ নির্ধারণ করে। অনেককে আবার খুব কষ্ট করে তার আদর্শ মানুষের খুঁজে নিতে হয়।
কিন্তু একজন মুসলিম কাকে আর্দশ হিসেবে নিবে? আর আমাদের মুসলিমদের জন্য আল্লাহ সুবহানাতায়ালা এই বিষয়টিকে খুব সহজ করে দিয়েছেন।
কারণ আল্লাহ সুবহানাতায়ালা পবিত্র কোরআন এ বলেঃ
لَقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِىۡ رَسُوۡلِ اللّٰهِ اُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَنۡ كَانَ يَرۡجُوا اللّٰهَ وَالۡيَوۡمَ الۡاٰخِرَ وَذَكَرَ اللّٰهَ كَثِيۡرًا ؕ ٢١
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। সূরা আহযাব (৩৩:২১)
এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানা তায়ালা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে মানবজাতির জন্য অনুসরণে আদর্শ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। কারণ আল্লাহ তাআলা তাকে দিয়েছেন সুমহান চরিত্র এবং অনুপম শিষ্টাচারে পরিপূর্ণ এক জীবন। তিনি ছিলেন শিশু থেকে শুরু করে যুবক, সৈনিক, সেনাপতি, স্বামী, পিতা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও রাষ্ট্রনায়ক পর্যন্ত সকলের জন্য আদর্শ। আল্লাহ তাআলা তাকে প্রেরণ করেছেন পুরো জগৎবাসীর জন্য রহমত ও হেদায়েত করে। যারা আল্লাহ এবং শেষ বিচারের আশা রাখে তাদের জন্য তিনি একটি উত্তম এবং অনুকরণীয় আদর্শ। তাই প্রত্যেক মুসলমানের জন্য রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর আদর্শ অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা প্রবিত্র কোরআন বলেঃ
وَاَطِيۡعُوا اللّٰهَ وَالرَّسُوۡلَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُوۡنَۚ ١٣٢
আর আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য স্বীকার কর যেন তোমরা করুণা প্রাপ্ত হও। সূরা আল-ইমরান (৩:১৩২)
এই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন যাতে করে আমরা তাদের রহমত পেতে পারি।
অন্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেনঃ
تِلۡكَ حُدُوۡدُ اللّٰهِ ؕ وَمَنۡ يُّطِعِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ يُدۡخِلۡهُ جَنّٰتٍ تَجۡرِىۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُ خٰلِدِيۡنَ فِيۡهَا ؕ وَذٰ لِكَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِيۡمُ ١٣
এগুলো আল্লাহর সীমারেখা। আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতসমূহে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা । সূরা নিসা (৪:১৩)
অন্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন
يُّصۡلِحۡ لَـكُمۡ اَعۡمَالَـكُمۡ وَيَغۡفِرۡ لَـكُمۡ ذُنُوۡبَكُمۡؕ وَمَنۡ يُّطِعِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ فَقَدۡ فَازَ فَوۡزًا عَظِيۡمًا ٧١
তাহলে তিনি তোমাদের কাজকে ক্রটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন। যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে। সূরা আহযাব (৩৩:৭১)
উপরোক্ত প্রতিটি আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদেরকে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা সাথে সাথে তাঁর রাসূলকে অনুসরণ করতে বলেছেন। কিন্তু পরের আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা রাসূলুল্লাহ (সঃ) কে সরাসরি অনুসরণ করতে বলেছেন।
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন
مَنۡ يُّطِعِ الرَّسُوۡلَ فَقَدۡ اَطَاعَ اللّٰهَ ۚ وَمَنۡ تَوَلّٰى فَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيۡظًا ؕ ٨٠
কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল, আর কেউ মুখ ফিরিয়ে নিলে আপনাকে তো আমরা তাদের উপর তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠাই নি। আন নিসা (৪:৮০)
তাফসীরে ইবনে কাসির এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি মুহাম্মদ (সঃ) কে অনুসরণ করে চলে সে আল্লাহর অনুসরণ করে আর যে ব্যক্তি তাঁর অবাধ্য হয়ে চলে সে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে চলে কারণ মুহাম্মদ (সঃ) নিজের ইচ্ছায় কোন কিছু বলেন না, তিনি যা বলেন তা আল্লাহর তরফ থেকে আগত ওহী ছাড়া আর কিছুই নয়।
আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে অনুসরণ আমাদের লাভ কি?
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন
وَمَنۡ يُّطِعِ اللّٰهَ وَالرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓٮِٕكَ مَعَ الَّذِيۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰهُ عَلَيۡهِمۡ مِّنَ النَّبِيّٖنَ وَالصِّدِّيۡقِيۡنَ وَالشُّهَدَآءِ وَالصّٰلِحِيۡنَ ۚ وَحَسُنَ اُولٰٓٮِٕكَ رَفِيۡقًا ؕ ٦٩
যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করে, তারা নাবী, সিদ্দীক, শহীদ এবং নেককার লোকদের সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ নি‘মাত দান করেছেন, তারা কতই না উত্তম সঙ্গী! আন নিসা(৪:৬৯)
সুবাহানআল্লাহ, আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
لَيۡسَ عَلَى الۡاَعۡمٰى حَرَجٌ وَّلَا عَلَى الۡاَعۡرَجِ حَرَجٌ وَّلَا عَلَى الۡمَرِيۡضِ حَرَجٌ ؕ وَمَنۡ يُّطِعِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ يُدۡخِلۡهُ جَنّٰتٍ تَجۡرِىۡ مِنۡ تَحۡتِهَا الۡاَنۡهٰرُۚ وَمَنۡ يَّتَوَلَّ يُعَذِّبۡهُ عَذَابًا اَلِيۡمًا
অন্ধের উপর কোন দোষ নেই, খোঁড়ার উপর কোন দোষ নেই, রোগীর উপর কোন দোষ নেই। আর যে কেউই আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতে দাখিল করবেন, যার নীচ দিয়ে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত। আর যে ব্যক্তি পিঠ ফিরিয়ে নিবে, তিনি তাকে কষ্টদায়ক শাস্তি দিবেন। আল ফাত্হ (৪৮:১৭)
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَنۡ يُّطِعِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ وَيَخۡشَ اللّٰهَ وَيَتَّقۡهِ فَاُولٰٓٮِٕكَ هُمُ الۡفَآٮِٕزُوۡنَ ٥٢
যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে, আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর অবাধ্যতা পরিহার করে চলে তারাই কৃতকার্য। আন নূর (২৪:৫২)
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَنۡ يَّتَوَلَّ اللّٰهَ وَ رَسُوۡلَهٗ وَالَّذِيۡنَ اٰمَنُوۡا فَاِنَّ حِزۡبَ اللّٰهِ هُمُ الۡغٰلِبُوۡنَ
আর যে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও মুমিনগণকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তবে নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী। আল মায়িদাহ (৫:৫৬)
এতক্ষন আমার জানলাম যারা আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে অনুসরন করবে তাদের মর্যাদা বা পুরস্কার সম্পর্কে আর এখন আমরা যানবো যারা আল্লাহ ও রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে অনুসরন না করে ভিন্ন পথ অনুসরণ করবে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা তাদের জন্য কি বলেছেন।
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আয়াতে বলেন,
وَمَنۡ يُّشَاقِقِ الرَّسُوۡلَ مِنۡۢ بَعۡدِ مَا تَبَيَّنَ لَـهُ الۡهُدٰى وَ يَـتَّبِعۡ غَيۡرَ سَبِيۡلِ الۡمُؤۡمِنِيۡنَ نُوَلِّهٖ مَا تَوَلّٰى وَنُصۡلِهٖ جَهَـنَّمَ ؕ وَسَآءَتۡ مَصِيۡرًا
যে ব্যক্তি সত্য পথ প্রকাশিত হওয়ার পরও রসূলের বিরোধিতা করে এবং মু’মিনদের পথ বাদ দিয়ে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে, আমি তাকে সে পথেই ফিরাব যে পথে সে ফিরে যায়, আর তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করব, কত মন্দই না সে আবাস! আন নিসা (৪:১১৫)
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
ذٰ لِكَ بِاَنَّهُمۡ شَآ قُّوا اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ ۚ وَمَنۡ يُّشَاقِقِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ فَاِنَّ اللّٰهَ شَدِيۡدُ الۡعِقَابِ ١٣
এটা এ কারণে যে, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতা করে তার জেনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ শাস্তি দানে খুবই কঠোর। আল আনফাল (৮:১৩)
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা অন্য আয়াতে বলেন,
وَمَنۡ يَّعۡصِ اللّٰهَ وَرَسُوۡلَهٗ وَيَتَعَدَّ حُدُوۡدَهٗ يُدۡخِلۡهُ نَارًا خَالِدًا فِيۡهَا وَلَهٗ عَذَابٌ مُّهِيۡنٌ
আর যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের নাফরমানী করবে এবং তাঁর নির্ধারিত সীমালঙ্ঘন করবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে দাখিল করবেন, সে তাতে চিরবাসী হবে এবং সে অবমাননাকর শাস্তি ভোগ করবে। আন নিসা (৪:১৪)
এ পর্যন্ত বর্ণীত কোরআনের আয়াত গুলো থেকে আমরা খুব সহজে জানতে পারছি যে আমাদেরকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের অনুসরণ করতে হবে। আমরা যদি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ) অনুসুরন করি তাহলে আমাদের জন্য আছে জান্নাত আর আমরা যদি তা না করি তাহলে আমাদের জন্য আছে অপমানজনক শাস্তি জাহান্নাম।
রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে অনুসরন করতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে তিনি আমাদেরকে কি শিক্ষা দিয়েছেন। আমাদের কে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর জীবন বিশেষ করে তার শিক্ষাকে বিশদভাবে অধ্যায়ন করতে হবে যাতে সঠিকভাবে আমরা তাকে অনুসরণ করতে পারি। আর তাঁকে অনুসরনের মাধ্যমে জান্নাত হাসিল করতে পারি এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেতে পারি।