Posts

প্রবন্ধ

আল্লাহর স্মরণে মনে প্রশান্তি

August 13, 2026

মাহমুদুর রহমান

Original Author A. K. M. Mahmadur Rahman

9
View

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাহিদা হলো মানসিক শান্তি। আধুনিক যুগে প্রযুক্তির উন্নতি, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং ভোগ-বিলাস বৃদ্ধি পেলেও মানুষের উদ্বেগ, হতাশা ও অস্থিরতা কমেনি। বরং দিন দিন তা আরো বেড়ে যাচ্ছে। ইসলাম মানুষের এই মানসিক অশান্তির স্থায়ী সমাধান হিসেবে আল্লাহর স্মরণ (যিকির)-কে সর্বোত্তম উপায় হিসেবে উপস্থাপন করেছে। আল্লাহর স্মরণ মানুষের অন্তরকে প্রশান্ত করে, ঈমানকে দৃঢ় করে এবং জীবনের সকল প্রতিকূলতার মধ্যে ধৈর্য ও আশা জাগিয়ে তোলে।

আল্লাহর স্মরণের অর্থ

'যিকির' (ذِكْر) শব্দের অর্থ হলো স্মরণ করা, মনে রাখা, আলোচনা করা এবং আল্লাহর প্রশংসা করা। ইসলামে আল্লাহর স্মরণ বলতে শুধু তাসবিহ ("সুবহানাল্লাহ"), তাহমিদ ("আলহামদুলিল্লাহ"), তাকবির ("আল্লাহু আকবার") বা তাহলিল ("লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ") পাঠ করাকেই বোঝায় না; বরং কুরআন তিলাওয়াত, সালাত, দোয়া, ইস্তিগফার, আল্লাহর আদেশ পালন এবং তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকাও আল্লাহর স্মরণের অন্তর্ভুক্ত।

কুরআনের আলোকে আল্লাহর স্মরণ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

"যারা ঈমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।"
(সূরা আর-রা'দ, ১৩:২৮)

এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে প্রকৃত মানসিক প্রশান্তি ধন-সম্পদ, খ্যাতি বা পার্থিব সাফল্যে নয়; বরং আল্লাহর স্মরণেই নিহিত।

আল্লাহ আরও বলেন—

"অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।"
(সূরা আল-বাকারা, ২:১৫২)

এটি একজন মুমিনের জন্য বিরাট সৌভাগ্যের বিষয় যে, সে যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন আল্লাহও তাকে তাঁর রহমতের মাধ্যমে স্মরণ করেন।

হাদিসের আলোকে আল্লাহর স্মরণ

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

"যে ব্যক্তি তার রবকে স্মরণ করে এবং যে ব্যক্তি স্মরণ করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃত ব্যক্তির ন্যায়।"
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৬৪০৭)

অন্য একটি হাদিসে এসেছে—

"কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে পবিত্র আমল হলো আল্লাহর যিকির।"
(জামে আত-তিরমিজি, হাদিস নং ৩৩৭৭; হাদিসটি হাসান হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।)

আল্লাহর স্মরণে মানসিক প্রশান্তি লাভের কারণ:

১. অন্তরের অস্থিরতা দূর হয়

যখন মানুষ আল্লাহর উপর ভরসা করে এবং তাঁর যিকির করে, তখন ভবিষ্যতের ভয়, অতীতের আফসোস এবং বর্তমানের উদ্বেগ অনেকাংশে কমে যায়।

২. ঈমান দৃঢ় হয়

নিয়মিত যিকির মানুষের অন্তরে আল্লাহর মহত্ত্বের অনুভূতি সৃষ্টি করে এবং গুনাহ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে।

৩. বিপদে ধৈর্য বৃদ্ধি পায়

যে ব্যক্তি আল্লাহকে স্মরণ করে, সে জানে যে প্রতিটি কষ্ট আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা এবং প্রতিটি পরীক্ষার পর রয়েছে সহজতা।

৪. শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে সুরক্ষা

আল্লাহর স্মরণ শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে মানুষকে রক্ষা করে এবং হৃদয়কে পবিত্র রাখে।

৫. জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়

যিকির মানুষকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী এবং আখিরাতই প্রকৃত সফলতার স্থান।

দৈনন্দিন জীবনে আল্লাহর স্মরণ

একজন মুসলিম সহজেই প্রতিদিন আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত হতে পারেন। যেমন—

  • পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করা।
  • প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করা।
  • সকাল-সন্ধ্যার মাসনূন যিকির পাঠ করা।
  • বেশি বেশি "সুবহানাল্লাহ", "আলহামদুলিল্লাহ", "আল্লাহু আকবার" ও "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" পাঠ করা।
  • নিয়মিত ইস্তিগফার করা।
  • কাজের শুরুতে "বিসমিল্লাহ" এবং শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা।
  • প্রতিটি নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
  •  

আজকের বিশ্বে উদ্বেগ, হতাশা, মানসিক চাপ এবং আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি আসে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাধ্যমে। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে আল্লাহর স্মরণের পরিবেশ গড়ে তুললে নৈতিকতা, ধৈর্য, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে।

আল্লাহর স্মরণ একজন মুমিনের জীবনের প্রাণশক্তি। এটি শুধু ইবাদত নয়; বরং মানসিক প্রশান্তি, আত্মিক উন্নতি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। পৃথিবীর সকল প্রকার সাময়িক সুখ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর স্মরণ থেকে অর্জিত প্রশান্তি দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতেই কল্যাণ বয়ে আনে। তাই প্রত্যেক মুসলিমের উচিত প্রতিদিন নিয়মিত আল্লাহর যিকির করা এবং নিজের জীবনকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে অধিক পরিমাণে তাঁর স্মরণকারী বানিয়ে দিন। আমীন।

Comments

    Please login to post comment. Login