
🇧🇩(পর্ব-১) জনশূন্য সকাল ও জনসমুদ্র বিকেল
[কে আসেনি কে হাসেনি]
কাঁটাতারের ব্যারিকেড, থমথমে সকাল, জনশূন্য রাজপথ আর নিস্তব্ধ অলিগলি—২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সেই সকাল আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন। একদিকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি, অন্যদিকে সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ। সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়া অবস্থানে রাজধানী ঢাকা যেন পরিণত হয়েছিল এক অবরুদ্ধ নগরীতে।
৪ আগস্ট সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীর মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, রামপুরাসহ প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসিয়ে অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সেদিন রাত প্রায় ১০টার দিকে বনানী থেকে গুলশান–২ হয়ে গুলশান লেকপাড় হয়ে ডানে কানাডিয়ান হাইকমিশন ও মার্কিন দূতাবাস এবং বামে সৌদি ও রয়েল থাই দূতাবাস অতিক্রম করে ভাটারা থানার সামনে কুড়িল–রামপুরা সড়কের ফুটওভার ব্রিজের কাছে পৌঁছাই। তখনই বুঝতে পারি, মূল সড়কে ওঠা আর সম্ভব নয়। ততক্ষণে গুলশানের দিকে প্রবেশের সব পথ কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কিছুক্ষণ পরপর মাইকিং করে সবাইকে ঘর থেকে বের না হওয়ার অনুরোধ জানানো হচ্ছিল। চারদিকে এমন এক নীরবতা, যেন পুরো শহর শ্বাসরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষা করছে অনিশ্চিত কোনো ঘটনার।
ফুটওভার ব্রিজ পার হয়ে ভাটারা থানার সামনে থেকে মূল সড়কের দক্ষিণ পাশের ফুটপাত ধরে আমেরিকান সেন্টার অতিক্রম করতে করতে ভাবছিলাম—পরদিন সকালে কীভাবে কর্মস্থলে পৌঁছাব? নানা দুশ্চিন্তা নিয়ে বাঁশতলা জাপানি স্কুল রোডের বাসায় ফিরে টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সর্বশেষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলাম। তারপর একধরনের অনিশ্চয়তা ও হতাশা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ি।
কারফিউ চলছে। খুব ভোরে আর রাত ১০ টার পরে একটু শিথিল থাকে। ফজরের নামাজ আদায় করে তাড়াতাড়ি আবার কর্মস্থল নৌ সদরদপ্তর বনানীর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।
বাসা থেকে কিছু দূর এগিয়ে বারিধারা জে ব্লক থেকে গুলশান লেকপাড়ের ভারতীয় হাইকমিশন-সংলগ্ন সংযোগকারী ফুটওভার ব্রিজের দুই পাশে কাঁটাতারের বেড়া দেখতে পেলাম। ভাবলাম, একটু উত্তরে গেলে হয়তো যাওয়ার পথ মিলবে। কিন্তু সেখানেও একই দৃশ্য। নতুন বাজার থানার সামনের ফুটওভার ব্রিজটিও দুই দিক থেকে কাঁটাতার দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছে।
সেখানে দুইজন নারী, একটি শিশু ও তিনজন পুরুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। আমার মতো তাঁরাও গুলশানের দিকে যেতে চাচ্ছিলেন। ট্রাফিক সিগন্যালের ডিভাইডার দিয়ে পার হওয়ার চেষ্টা করেও তাঁরা ব্যর্থ হয়েছেন। কর্তব্যরত সেনাসদস্যরা তাঁদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।
মাইকে বারবার ঘোষণা করা হচ্ছিল—“অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করবেন না।”
আমি সামনে এগিয়ে গেলে কয়েকজন সেনাসদস্য ভদ্রভাবে আমার পরিচয় জানতে চান। আমি আমার পরিচয়, কর্মস্থল এবং যাওয়ার কারণ জানাই। সব শুনে তাঁরা আমেরিকান দূতাবাসের সামনের সড়ক ব্যবহার না করে ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে দিয়ে গুলশান–২ এলাকায় যাওয়ার পরামর্শ দেন।
উল্লেখ্য, আগে থেকেই যাঁদের কাছে কারফিউ পাস ছিল, তাঁরাও সেদিন নানা ভোগান্তির শিকার হন। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে অনেককেই ফিরে যেতে হয়। ঢাকার প্রবেশমুখ—যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, আব্দুল্লাহপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ছিল নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাবলয়। এমনকি আবাসিক এলাকার ছোট ছোট গলির মুখও কাঁটাতার দিয়ে বন্ধ করে রাখা হয়েছিল।
সকালের ঢাকা তখন এক ভীতিকর নীরবতার নগরী। মানুষের কোলাহল নেই, যানবাহনের শব্দ নেই—শুধু মাঝে মাঝে ভেসে আসছে মাইকের সতর্কবার্তা আর দূরে টহলরত নিরাপত্তা বাহিনীর গাড়ির শব্দ।
🇧🇩[পর্ব-২] জনশূন্য রাজধানী থেকে জনসমুদ্রের পথে
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিরও ধীরে ধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। শুরুতে পুরো রাজধানী ছিল প্রায় জনশূন্য। পুলিশ ও সেনাবাহিনী মাইকিং করে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানাচ্ছিল। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, ততই সেই নীরবতার ভেতর অন্য এক বাস্তবতার আবির্ভাব ঘটতে শুরু করে।
কোটা সংস্কারের দাবিতে টানা ৩৩ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পর ৩ আগস্ট ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। প্রথমে সিদ্ধান্ত ছিল, ৫ আগস্ট সারাদেশে বিক্ষোভ ও গণঅবস্থান এবং ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হবে। কিন্তু ৪ আগস্ট বিকেলে সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ ঘোষিত এক বিবৃতিতে কর্মসূচি এক দিন এগিয়ে এনে ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ পালনের আহ্বান জানানো হয়। সেই আহ্বানের পরই সারাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সরকার ৪ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ ঘোষণা করে। ঢাকায় বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে রাজধানীর প্রবেশমুখ, গণভবন, বঙ্গভবন, শাহবাগ, বিজয় সরণি, ফার্মগেট, মহাখালী, উত্তরা, গুলশান, বনানী, রামপুরাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসানো হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে কঠোর অবস্থান নেন।
ভোর থেকে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো কার্যত ফাঁকা ছিল। অল্প কিছু অ্যাম্বুলেন্স ও গণমাধ্যমের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনো যানবাহন চোখে পড়েনি। প্রতিটি মোড়ে চেকপোস্ট, প্রতিটি পথেই জিজ্ঞাসাবাদ—ঢাকা যেন এক অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছিল।
কিন্তু সকাল ১০টার পর দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করে।
ছোট ছোট দলে তরুণেরা রাস্তায় বের হতে শুরু করেন। তাঁদের বেশির ভাগই ছিলেন শিক্ষার্থী। কেউ হেঁটে, কেউ অলিগলি পেরিয়ে, আবার কেউ বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ভেতরের রাস্তা ব্যবহার করে প্রধান সড়কের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। ধীরে ধীরে সেই ছোট ছোট দলগুলো বড় মিছিলে রূপ নিতে থাকে।
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল উত্তরা। সকাল ১১টার দিকে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা জড়ো হন। উত্তরা থেকে বিমানবন্দরমুখী প্রধান সড়কে একাধিক স্তরে কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনী। তবু পাশের গলি দিয়ে বিক্ষোভকারীরা মূল সড়কে উঠে আসতে থাকেন।
কারও হাতে ছিল লাঠি, কারও হাতে ছোট একটি লাঠির মাথায় বাঁধা জাতীয় পতাকা। সেনাবাহিনী মাইকে বারবার অনুরোধ করছিলেন, মিছিল যেন আর সামনে না এগোয়। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা ধীরে ধীরে ব্যারিকেডের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।
একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ফাঁকা গুলি ছোড়া হয়। কিছুক্ষণের জন্য মিছিলের সামনের সারির মানুষ সড়কে বসে পড়েন। তবে সেই বিরতি ছিল অল্প সময়ের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁরা আবার উঠে দাঁড়ান এবং ব্যারিকেড অতিক্রম করে গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেন।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও মানুষ রাস্তায় নামতে শুরু করেন। অলিগলি পেরিয়ে হাজার হাজার মানুষ প্রধান সড়কে এসে একত্রিত হতে থাকেন। যে শহর কয়েক ঘণ্টা আগেও ছিল নীরব, সেই শহর ধীরে ধীরে মানুষের পদচারণা, স্লোগান আর প্রত্যাশার শব্দে মুখর হয়ে উঠতে থাকে।
ঠিক সকাল ১১টার দিকে ব্রডব্যান্ড ও মোবাইল ইন্টারনেট সেবাও বন্ধ হয়ে যায়। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও মানুষের স্রোত থামেনি। বরং খবর ছড়িয়ে পড়ছিল মুখে মুখে। প্রত্যেকে যেন জানতেন, সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হয়ে উঠতে পারে।
🇧🇩[পর্ব-৩] দুপুরের ঢাকা: ব্যারিকেড ভেঙে জনতার অগ্রযাত্রা
দুপুরের দিকে ঢাকার পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। সকালের সেই ভীতিকর নীরবতা আর কাঁটাতারে ঘেরা রাজপথে ধীরে ধীরে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নারী-পুরুষ—সবাই একসঙ্গে রাজপথে এসে মিলিত হতে থাকেন।
উত্তরার বিএনএস সেন্টার থেকে গণভবনমুখী মিছিল ক্রমেই বড় হতে থাকে। পথে পথে অসংখ্য মানুষ সেই মিছিলে যোগ দেন। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ লাঠি, কেউ শুধু স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে চলেছেন। তাঁদের কণ্ঠে ছিল একটাই দাবি—“দফা এক, দাবি এক—শেখ হাসিনার পদত্যাগ।”
দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে উত্তরা এলাকায় দেখা যায়, ছাত্র-জনতার বিশাল মিছিল একের পর এক নিরাপত্তা ব্যারিকেড অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বাধা উপেক্ষা করে মানুষের স্রোত ছুটে চলেছে গণভবনের দিকে।
শুধু তরুণরাই নন, তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ। অনেক মা ও গৃহবধূকেও দেখা যায় লাঠি হাতে মিছিলে অংশ নিতে। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, প্রত্যাশা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা যেন সেদিন মানুষকে ঘর থেকে রাজপথে নিয়ে আসে।
এরপর বড় বড় কয়েকটি মিছিল রামপুরা ব্রিজের দিকে অগ্রসর হয়। তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর ১টা। চারদিকে মানুষের ঢল। রাজপথে আর কোনো শূন্যতা নেই; বরং মানুষের উপস্থিতিতে ঢাকা যেন এক বিশাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
এরই মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, দুপুর ২টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। রামপুরা ব্রিজে অবস্থানরত সেনাসদস্যরা মিছিলকারীদের সেখানেই অবস্থান করার অনুরোধ জানান।
মিছিলে থাকা পঞ্চাশোর্ধ্ব বেসরকারি চাকরিজীবী মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “যখন সেনাসদস্যরা বলছিলেন—‘আপনাদের আর সামনে যেতে হবে না। আপনাদের জন্য সুখবর অপেক্ষা করছে’, তখনই আমরা ধারণা করেছিলাম, শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিশ্চিত।”
দুপুর পৌনে ২টার দিকে সেনাসদস্যদের ঘিরে মানুষের মধ্যে উল্লাস দেখা যায়। অনেকেই রাস্তায় সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। কেউ কেউ দুই হাত তুলে অশ্রুসিক্ত চোখে মোনাজাত করেন। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা, ভয় ও অনিশ্চয়তার পর মানুষের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি ও আবেগের প্রকাশ দেখা যায়।
তবে তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত কোনো ঘোষণা আসেনি যে, শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে সেই খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। যে শহর সকালে ছিল কাঁটাতারের বেড়ায় আবদ্ধ, দুপুরের পর সেই শহরই পরিণত হয় মানুষের এক বিশাল সমাবেশে।
রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, মোড় ও অলিগলিতে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। স্লোগান, উল্লাস, কান্না, দোয়া ও আবেগ—সব মিলিয়ে ঢাকার রাজপথ হয়ে ওঠে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী।
সেদিনের ঢাকা যেন দুই রূপ ধারণ করেছিল। সকালের ঢাকা ছিল নীরব, ভীত ও অনিশ্চয়তায় ঘেরা; আর দুপুরের পরের ঢাকা ছিল উত্তাল, আবেগময় এবং পরিবর্তনের প্রত্যাশায় পূর্ণ।
🇧🇩[পর্ব-৪] বিকেলে বাসাবাড়ি ছিলো ফাঁকা, প্রতিটি বাড়ির ছাদ, অলিগলি রাজপথ ছিলো উল্লসিত মানুষে ঢাকা
৫ আগস্ট ২০২৪—আমার জীবনের এক অবিস্মরণীয় দিন। সেই দিনের সকাল ও বিকেল যেন একই শহরের দুটি ভিন্ন চিত্র হয়ে আমার স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
সকালের ঢাকা ছিল এক অচেনা নগরী। কাঁটাতারের ব্যারিকেড, সুনসান রাজপথ, বন্ধ থাকা রাস্তা, নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থান এবং মানুষের মনে এক ধরনের অজানা শঙ্কা—সব মিলিয়ে রাজধানী যেন ছিল নিস্তব্ধ ও অবরুদ্ধ।
যে শহর প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকে, সেদিন ভোরে সেই শহরের রাস্তায় ছিল না মানুষের স্বাভাবিক চলাচল, ছিল না যানবাহনের কোলাহল। শুধু দেখা যাচ্ছিল নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এবং শোনা যাচ্ছিল মাইকের সতর্কবার্তা।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সেই একই শহরের চেহারা পাল্টে যায়। রাজপথে নামে মানুষের ঢল। ছাত্র-জনতার মিছিল, স্লোগান, উচ্ছ্বাস, আবেগ আর প্রত্যাশায় মুখর হয়ে ওঠে রাজধানী।
যে রাজপথ সকালে ছিল জনশূন্য, বিকেলে সেই রাজপথই পরিণত হয় জনসমুদ্রে।
সেদিন আমি দেখেছি মানুষের মনোবল, প্রত্যাশা এবং ইতিহাসের পরিবর্তনকে খুব কাছ থেকে। দেখেছি, কীভাবে একটি শহর কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে নীরবতা থেকে সরবতায়, ভয় থেকে উচ্ছ্বাসে এবং অপেক্ষা থেকে নতুন বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; কখনো কখনো তা মানুষের চোখের সামনে, রাজপথের ধুলোর মধ্যে, মানুষের কণ্ঠের স্লোগানে এবং স্মৃতির গভীরে তৈরি হয়।
আমার দেখা ৫ আগস্টও তেমনই একটি দিন। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনার দিন নয়; এটি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার একটি অধ্যায়, যেখানে একই দিনে আমি দেখেছি—একটি জনশূন্য সকাল কীভাবে একটি জনসমুদ্র বিকেলে রূপান্তরিত হতে পারে।
স্মৃতির পাতায় তাই ৫ আগস্ট ২০২৪ থাকবে এক অনন্য দিন হিসেবে—যে দিন ঢাকা শহর আমাকে দেখিয়েছিল নীরবতা থেকে জাগরণের, অপেক্ষা থেকে পরিবর্তনের এক অভূতপূর্ব যাত্রা।
লেখক: ড. এস এম শাহনূর
সাহিত্য সম্পাদক, দৈনিক ঐশী বাংলা