Posts

গল্প

অন্ধকারের বিষাদ

July 30, 2026

মনিম হাসান

64
View

পদ্মা এক্সপ্রেস তখন মধ্যরাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার চিড়ে রাজশাহী রুটের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটছে। কামরার ভেতরে একটানা ধাতব শব্দ আর চাকার ঝিকঝিক তাল। ‘ক’ বগির চার নম্বর কামরায় থমথমে নীরবতা।

পঁয়ষট্টি বছর বয়সী ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ফজলুর রহমান দামি শাল জড়িয়ে নিজের সিটে বসে অস্বস্তিতে হাঁসফাঁস করছিলেন। রাত তখন পৌনে দুটো। পেটের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতেই তিনি সিট ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং টলতে টলতে বগির বাথরুমের দিকে এগোতে লাগলেন।

ঠিক তখনই সরু গলিতে ফজলুর রহমানের সামনে দিয়ে পার হয়ে গেল এক ডিমওয়ালা। লোকটার গায়ে তালি দেওয়া পুরোনো সুতির চাদর, এক হাতে সেদ্ধ ডিমের ঝুড়ি আর অন্য হাতে বিট লবণের পাত্র।

"গরমাগরম ডিম... হাঁসের ডিম... গরম ডিম লবেন স্যার?"

ফজলুর রহমান চরম বিরক্তিতে লোকটার দিকে তাকালেন। গা থেকে ক্যাটক্যাটে পচা সাবান আর ডিমের গন্ধ আসছে। লোকটার মুখটা মাফলার আর ক্যাপে ঢাকা, শুধু দুটো চঞ্চল চোখ দেখা যাচ্ছে। ফজলুর রহমান তাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বললেন, "সরো সামনে থেকে! ভিড় বাড়ায় যত সব ফকির-মিসকিনের দল।"

ডিমওয়ালা নিঃশব্দে একপাশে সরে দাঁড়াল। ফজলুর রহমান গিয়ে ঢুকলেন বাথরুমে।

মিনিট পাঁচেক পর ফজলুর রহমান বাথরুম থেকে বের হয়ে নিজের সিটে ফিরে এলেন। কিন্তু সিটে বসার পরপরই তাঁর চেহারার রঙ বদলাতে শুরু করল। তিনি গলার কাছে দু হাত চেপে ধরলেন, চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আর শরীরজুড়ে শুরু হলো তীব্র খিঁচুনি। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে করতে বগির অন্য যাত্রীদের ডাকার সুযোগটুকুও পেলেন না তিনি। ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় ফজলুর রহমানের প্রকাণ্ড শরীরটা সিটের ওপর নিথর হয়ে হেলে পড়ল।

পরের স্টেশনে ট্রেন থামিয়ে পুরো বগিটি সিলগালা করে দিল রেলওয়ে পুলিশ। তদন্তে এলেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের ইনস্পেক্টর তারিক। ‘ক’ বগির ওই অংশটিতে থাকা যাত্রীদের আটক করে শুরু হলো তল্লাশি।

জিজ্ঞাসাবাদের সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক প্রফেসর শওকত জামানের পুরোনো চামড়ার ব্রিফকেসটা খুলতেই চমকে উঠলেন ইনস্পেক্টর তারিক। ব্যাগের ভেতরে একটি সিলগালা করা কাচের পাত্র, যার গায়ে লেখা: ‘Azo-Paradoxin (AP-9)’

এদিকে ফরেনসিকের প্রাথমিক রিপোর্টে দেখা গেল, ফজলুর রহমানের ফুসফুসে এই বিষাক্ত কেমিক্যালের তীব্র উপস্থিতি রয়েছে। এটি মূলত একটি বর্ণহীন ও গন্ধহীন বাষ্পীভূত যৌগ, যা ফুসফুসে প্রবেশ করলে মুহূর্তের মধ্যে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ স্তব্ধ করে দেয়। মানুষটি যে শ্বাসকষ্টে মারা গেছেন, তার মূল কারণ এই কেমিক্যাল!

ইনস্পেক্টর তারিক ইন্টারোগেশন রুমে প্রফেসর শওকত জামানকে বসালেন।

তারিক: "প্রফেসর, আপনার ব্যাগে পাওয়া ‘AP-9’ কেমিক্যাল আর মৃতের ফুসফুসে পাওয়া বিষ একই। আপনি চলন্ত ট্রেনের বগিতে সুযোগ বুঝে ফজলুর রহমানকে হত্যা করেছেন, তাই না?"

প্রফেসর শওকত: (চশমাটা খুলে ধীরকণ্ঠে) "অফিসার, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রির শিক্ষক। ল্যাবের গবেষণার কাজে আমি এটি ঢাকা থেকে অফিশিয়ালি কিনে নিয়ে যাচ্ছিলাম। এর পাকা রসিদ আমার ব্যাগে আছে।"

তারিক: "রসিদ তো বানানোও যায়! আপনার অতীত ইতিহাস আমাদের জানা হয়ে গেছে প্রফেসর। ত্রিশ বছর আগে আপনার ছোট বোন নীলুফারের মৃত্যুর কথা মনে আছে?"

প্রফেসরের হাত দুটো সামান্য কেঁপে উঠল। থমকে গেলেন তিনি।

ইনস্পেক্টর তারিক ফাইলের পুরোনো পাতা উল্টে বলতে লাগলেন, "ত্রিশ বছর আগে নব্য ধনী ফজলুর রহমানের সাথে আপনার ছোট বোন নীলুফারের বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের পর থেকেই ফজলুর রহমান জানতে পারেন নীলুফার মা হতে পারবেন না। নিঃসন্তান থাকার সমস্ত দোষ চাপানো হতো নীলুফারের ওপর। সন্তানের জন্য ফজলুর রহমান প্রায়ই মদ্যপ অবস্থায় বাড়িতে এসে নীলুফারকে নির্মমভাবে মারধর করতেন, বেল্ট দিয়ে পেটাতেন।"

প্রফেসর শওকত চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না।

তারিক বলতে লাগলেন, "১৯৯৬ সালের এক রাতে মাতাল ফজলুর রহমান সন্তান না হওয়ার তাচ্ছিল্য করতে করতে নীলুফারকে তিন তলার ছাদ থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। রাতে রক্তে ভেসে যায় আপনার বোনের দেহ। অথচ সেদিন ফজলুর রহমান অঢেল টাকা আর ক্ষমতার জোরে পুরো ঘটনাকে 'মানসিক বিষণ্ণতায় আত্মহত্যা' বানিয়ে পার পেয়ে যান। আদালতে দাঁড়িয়ে আপনি বিচার পাননি। সেই ক্ষোভ কি আজ এত বছর পর উগড়ে দিলেন চলন্ত বগিতে?"

প্রফেসর শওকত চশমা মুছে বললেন, "বোনকে হারানো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি অফিসার। কিন্তু আমি কোনো খুন করিনি। কিছুদিন আগে আমাদের ল্যাব থেকে এই কেমিক্যালটি চুরি হয়েছিল। আমি মতিহার থানায় জিডিও করেছিলাম। সেই চুরি যাওয়া কেমিক্যাল ল্যাবে পূরণ করতেই আমি ঢাকার মার্কেট থেকে নতুন স্যাম্পল কিনে আনছিলাম।"

প্রফেসরকে মূল আসামি করে যখন মামলার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই ফজলুর রহমানের মৃত্যুর সপ্তম দিনে নতুন এক ঘটনা ঘটে গেল।

সংবাদপত্রে খবর এল, ফজলুর রহমানের অঢেল সম্পত্তি—দুটো বড় টেক্সটাইল মিল আর রিয়েল এস্টেট কোম্পানি—খুব তাড়াহুড়ো করে পানির দামে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ফজলুর রহমান যেহেতু নিসন্তান ছিলেন, তাই আইনগতভাবে তাঁর সমস্ত সম্পত্তির একমাত্র ওয়ারিশ তাঁর ভাইয়ের ছেলে ফাহিম রহমান।

ইনস্পেক্টর তারিক খবর পেয়ে চমকে উঠলেন। লাশ এখনো ঠিকমতো সৎকার হলো না, আর এর মধ্যেই সম্পত্তি বিক্রি করে চম্পট দেওয়ার এত তাড়া কিসের?

ফাহিম রহমানের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে গিয়ে গোয়েন্দাদের চোখ কপালে উঠল। ফাহিম রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র!

তারিকের মাথায় পুরো ছকটা একমুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল।

মালয়েশিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে আটক করা হলো ফাহিমকে। একটানা দীর্ঘ জেরার মুখে ফাহিম ভেঙে পড়ে এবং স্বীকার করে নিজের নিখুঁত ষড়যন্ত্রের কথা।

ফাহিম ছিল চরম উশৃঙ্খল ও দেনায় ডুবে থাকা এক যুবক। চাচা ফজলুর রহমানের কাছে কোটি টাকার দেনা মেটানোর সাহায্য চাইতে গেলে ফজলুর রহমান তাঁকে তাড়িয়ে দেন এবং সাফ জানান—নিঃসন্তান হলেও সম্পত্তিতে ফাহিমকে এক আনাও দেবেন না।

তখনই ফাহিম চাচাকে সরিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করে। সে জানত চাচা আর প্রফেসরের পুরানো শত্রুতার কথা। সে ছক কষে এমনভাবে যাতে সব দোষ প্রফেসরের ওপর গিয়ে পড়ে:

 ফাহিম ফলিত রসায়নের ছাত্র হওয়ায় কেমিস্ট্রি ল্যাবের সিকিউরিটি লক ভেঙে শওকত জামানের নামে বরাদ্দ থাকা ‘AP-9’ কেমিকেল  চুরি করে। 

ফাহিম জানতে পারে তার কাকতালীয় ভাবে তার চাচা ও প্রফেসর একই রাতে একই ট্রেনে রাজশাহী ফিরবেন। ফাহিম চাদর ও মাফলার জড়িয়ে একদম হুবহু ট্রেনের ডিমওয়ালা সেজে সেই বগিতে ওঠে।

আসল ঘটনা ঘটেছিল ফজলুর রহমান বাথরুমে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে। বাথরুমের দরজা খোলার বাহানায় ফাহিম তার সুতির চাদরের আড়ালে লুকানো একটি অতি-সূক্ষ্ম স্প্রে-ক্যাপসুল থেকে ‘AP-9’ বাষ্পাকারে বাথরুমের ভেন্টিলেশন আর হ্যান্ডেলের কাছে ছড়িয়ে দেয়। বন্ধ বাথরুমে ফজলুর রহমান অজান্তেই সেই বাষ্প নিঃশ্বাসে টেনে নেন। বিষটি রক্তে মিশে কাজ শুরু করতে মিনিট দশেক সময় নেয়—ততক্ষণে ফজলুর রহমান নিশ্চিন্তে নিজ সিটে ফিরে এসেছেন।

ফাহিম ভেবেছিল, প্রফেসরের ব্যাগে থাকা কেমিক্যাল আর ৩০ বছর আগের বোনের খুনের মোটিভের কারণে পুলিশ প্রফেসরকেই আসল খুনি ভাববে। কিন্তু প্রফেসরের কাছে থাকা কেনাকাটার পাকা রসিদ, থানায় করা চুরির জিডি আর ফাহিমের তাড়াহুড়ো করে সম্পত্তি বিক্রির লোভে সব ভেস্তে গেল।

মতিহার সেন্ট্রাল জেলের অন্ধকূপে বসে ফাহিম যখন নিজের স্বীকারোক্তি সই করছিল, তখন প্রফেসর শওকত জামান থানা থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন।

পদ্মা এক্সপ্রেসের সেই অভিশপ্ত বগির কথা মনে করে তিনি পুবের লালচে আকাশের দিকে তাকালেন। ত্রিশ বছর আগে বোনের ওপর হওয়া নির্যাতনের বিচার আজ হলো, তবে অন্য এক অলিখিত নিয়মে।

Comments

    Please login to post comment. Login