রাতের শেষ প্রহরে যখন গোটা গ্রাম নিঝুম অন্ধকারে ডুবে থাকে, তখন জয়নবদের বাঁশের চটা আর কাদা-মাটির ঘরটায় প্রথম জীবনের স্পন্দন জাগে।
বাঁশের বেড়ার ফাঁক গলে হু হু করে হিমেল হাওয়া ঢুকছিল। কাঁথার ভেতর জড়াসড় হয়ে ঘুমিয়ে আছে জয়নবের দুই সন্তান—নয়ন আর টিয়া। জয়নব হালকা হাত বুলিয়ে দেয় ওদের মাথায়। বিছানা ছেড়ে ওঠার আগেই জয়নবের স্বামী মোশাররফ তার পরনের খাটো গামছাটা কষে কোমর বাঁধছিল। জয়নব উঠে কুপিটা জ্বালাতেই আলো-আঁধারির খেলায় ভেসে ওঠে মোশাররফের ক্লান্ত, তামাটে শরীর। টানা শারীরিক পরিশ্রমে তার বুক আর পিঠের তাগড়া পেশিগুলো চাবুকের মতো টেনে উঠেছে, অথচ পেটে এক ফোঁটা বাড়তি মেদ নেই। উপোস আর কামলা দেওয়ার দাগ স্পষ্ট তার শরীরে।
"আমি চললাম,"
মোশাররফ ফিসফিস করে বলে, যাতে ছেলেমেয়েগুলোর ঘুম না ভাঙে।
"আজকে রহম আলীর বর্গাটায় আগে কুপিয়ে সমান করতে হবে। বৃষ্টির পানি থাকতেই শ্যাষ করা লাগবে। সূর্য ওঠার আগেই আধ-বিঘা জমি শেষ না করলে পরেশের জমিতে হাজিরা দেওয়া যাবে না।"
"এত রাতে বের হবা? টিপটিপ বৃষ্টি কিন্তু এখনো পড়তেছে,"
জয়নব শাড়ির আঁচলটা গায়ে পেঁচিয়ে উনুনের দিকে এগোতে এগোতে বলে।
"বৃষ্টির দিনেই তো মাটির জোর থাকে জয়নব। তুমি সকালে একটু ফেন-ভাত রেঁধে রাখবা, পরেশের জমিতে যাওয়ার আগে একঝলক এসে খেয়ে যাব।"
মোশাররফ কাস্তে আর বাঁশের লাঠিটা হাতে তুলে নিয়ে দরজার খিল খোলে। বাইরে তখনো কুয়াশা আর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির এক মায়াবী, থমথমে অন্ধকার। ফজর হতে এখনো ঢের বাকি। মোশাররফ পা বাড়ায় নদীর ধারের কাঁচা রাস্তাটার দিকে।
ওই পথটাই গ্রামের একমাত্র সংযোগ। একদিকে ফুঁসে ওঠা প্রমত্তা নদী, আর অন্যপাশে খাড়া ঢাল—মাঝখান দিয়ে সাপের মতো পেঁচিয়ে গেছে সরু, পিচ্ছিল কাদার রাস্তা। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে কাদামাটি একাকার হয়ে আছে। সাবধানে পা টিপে টিপে যত দ্রুত সম্ভব হাঁটা শুরু করে মোশাররফ।
গ্রাম থেকে প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার দূরে, হাইওয়ে ধরে ছুটছিল একটা কালো রঙের দামী গাড়ি। স্টিয়ারিংয়ে শিহাব উদ্দিন।
পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী শিহাব উদ্দিন শহরের নামজাদা কাপড়ের ব্যবসায়ী। চোখেমুখে চরম ক্লান্তি, চোখের পাতা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে আসছে। গতকাল দুপুর থেকে জেলা শহরে টানা মিটিং, তারপর রাত বারোটার দিকে যখন ঝড় বাদল মাথায় নিয়ে রওনা হলেন, তখন থেকেই কপাল খারাপ। কালবৈশাখীর ঝড়ে প্রধান সড়কের বড় এক গাছ উপড়ে পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পথ ঘুরিয়ে শর্টকাট মারতে গিয়ে তিনি ঢুকে পড়েছেন এই অচেনা গ্রাম্য আঁকাবাঁকা রাস্তায়।
গাড়ির এসি বন্ধ। কাঁচ নামানো থাকলে বৃষ্টির ঝাপটা আসে, কাঁচ তোলা থাকলে বিষণ্ণ নীরবতা আর ক্লান্তি চেপে বসে। স্টিয়ারিংয়ে হাত দুটো শিহাব উদ্দিনের অবশ হয়ে আসছে। গত ২৪ ঘণ্টায় এক ফোঁটা ঘুম নেই। কতবার ভেবেছেন রাস্তার পাশে গাড়ি থামিয়ে একটু জিরিয়ে নেবেন, কিন্তু নির্জন এই নিঝুম অন্ধকার রাতে ছিনতাইয়ের ভয়ে সাহস পাননি।
ঝড় থেমে গেছে একটু আগে, কিন্তু চারপাশ এখনো থমথমে। গুটগুটে অন্ধকারে গাড়ির দুটো হেডলাইটের আলো যেন অন্ধকারকে চিড়ে উঠতে পারছে না।
"আর মাত্র আধঘণ্টা..." শিহাব উদ্দিন বিড়বিড় করে নিজেকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু চোখের পাতা দুটো বারে বারে নেমে আসছে।
নদীর পাড়ের রাস্তাটা যেখানে এসে হঠাৎ ডানদিকে ঘুরে গেছে, সেখানে মোশাররফ হাঁটছিল একপাশে চেপে। হাতুড়ির মতো বৃষ্টিটা থামলেও চারপাশের মাটির সোঁদা গন্ধ আর নদীর জলের গর্জন বাতাসকে ভারী করে রেখেছে।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা হেডলাইটের তীব্র আলো এসে পড়ে মোশাররফের পিঠে।
হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে মোশাররফ থমকে দাঁড়ায়, পেছনে তাকাতে যাবে—এমন সময় শিহাব উদ্দিনের চোখের পাতা দুটো সেকেন্ডের জন্য একেবারে বুজে আসে। তন্দ্রার ঘোর, ভিজে পিচ্ছিল রাস্তা, আর গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারানো—সব ঘটে যায় এক নিমেষে।
ধাম করে একটা চাপা শব্দ হয়। জনমানবহীন নদীর পাড়ে রাস্তায় কেউ সে শব্দ শুনতে পায় না।
গাড়ির বাম পাশের বাম্পার সজোরে গিয়ে আঘাত করে মোশাররফের কপালে আর বুকে। মোশাররফের আর্তনাদ করার সুযোগও ছিল না। বাতাসের বেগে তার দেহটা ছিটকে গিয়ে পড়ে ফুঁসে ওঠা প্রমত্তা নদীর মাঝে।
আর ধাক্কার ঝাঁকুনিতে চোখ মেলেই শিহাব উদ্দিন আতঙ্কে স্টিয়ারিং উল্টো দিকে ঘুরাতে যান। ভিজে কাদায় চাকা স্কিড করে। নিয়ন্ত্রণহীন গাড়িটি সোজা রাস্তার ঢাল গড়িয়ে, গাছের সাথে ধাক্কা খেতে খেতে গিয়ে পড়ে সেই একই নদীতে।
পরের কয়েক সেকেন্ড কেবল জল আর বাতাসের তোড়। থোকা থোকা বুদ্বুদ উঠল, তারপর সব শান্ত। গাড়ির হেডলাইটের আলো জলের নিচে কিছুক্ষণ টিমটিম করে জ্বলে হঠাৎ নিভে গেল। প্রমত্তা নদী নিজের অতল পেটে টেনে নিল দুটো জীবনকে। দুজন মানুষ, দুটো সম্পূর্ণ আলাদা জগৎ, এক অমোঘ পরিণতিতে মিশে গেল একাকার হয়ে।
কুয়াশা আর অন্ধকারের চাদর ঢাকা সেই নিঝুম ভোরে কেউ কিচ্ছু জানতে পারল না। সাক্ষী রইল কেবল পাড়ের উপড়ে পড়া কিছু বাঁশ আর নদীর অবিরাম স্রোত।
ফজরের আজান ভেসে আসছে দূরের মসজিদ থেকে। আছছালাতু খাইরুম মিনান নাওম-----
ফজরের নামাজ শেষ করে। জয়নব উনুনে চাল চাপিয়েছে। মাটির হাঁড়িতে ভাতের চাল ফুটছে, টগবগ শব্দ হচ্ছে। জয়নব ধোঁয়া ওঠা উনুনের পাশে বসে কাঠ ঠেলে দিচ্ছে। নয়ন আর টিয়া জেগে উঠেছে। নয়ন বই খুলে সুর করে পড়া মুখস্থ করছে, আর টিয়া উনুনের আঁচ। পোহাতে পোহাতে মায়ের শাড়ির খুঁট ধরে বসে আছে।
"মা, আব্বা তো এখনো আইলো না? আইজকা কি কামলা জমিতে যাইব না?" নয়ন পড়া থামিয়ে জিজ্ঞেস করে।
জয়নব বাইরের দিকে তাকায়। পুব আকাশে আলো ফুটছে। হালকা লালচে ভাব কুয়াশার পর্দা চিরে বেরিয়ে আসছে।
"আসবে রে বাবা, তোদের বাপের তো আবার কাজের ধান্দা উঠলে পেটের কথা মনে থাকে না। বর্গাজমিটুকু শেষ না কইরা তো ফিরব না।"
জয়নব হাঁড়ি নামায়। তিনটা থালায় মাড় ঝরানো গরম ভাত বেড়ে রাখে। মোশাররফের থালাটায় একটু বেশি করে ভাত, আর ওপর দিয়ে একটু পোড়া মরিচ ডলে তেল ছড়িয়ে দেয়। মোশাররফ কাজ থেকে ফিরে এই পোড়া মরিচ আর গরম ভাত বড় তৃপ্তি করে খায়।
ঘড়ির কাঁটা এগোয়। সকাল গড়িয়ে রোদ ওঠে। কিন্তু দরজার কড়া নাড়ার সেই পরিচিত আওয়াজটা আর হয় না।
জয়নব দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়। কাঁচা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে। গ্রামের দু-একজন কামলা পরেশের জমির দিকে কাজ করতে যাচ্ছে।
জয়নব গলা চড়িয়ে ডাক দেয়, "ও করিমের বাপ! আমাগো নয়নের বাপ কে দেখছো নাকি গো? হেই শেষ রাতে বের হইছে..."
লোকটা মাথা নেড়ে বলে, "না তো ভাবি, মোশাররফরে তো পরেশের জমিতেও দেখলাম না। আমি ভাবলাম আজ হয়তো শরীর খারাপ, কাজে যায় নাই।"
জয়নবের বুকের ভিতরটা কেমন খালি হয়ে ওঠে। এক অজানা আশঙ্কায় তার হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসে। সে থালা ঢাকা দেওয়া ভাতগুলোর দিকে তাকায়। ভাতগুলো আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
সূর্য মাথার ওপর ওঠে, আবার পশ্চিমে ঢলে পড়ে। গ্রামের বাতাস আগের মতোই বইতে থাকে, নদীও তার আপন গতিতে বয়ে চলে। জয়নব উঠানে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে—এক পা, দু পা করে এগোয়, আবার ফিরে আসে।
সে জানে না, এবং কোনো দিন জানবেও না যে, যে মানুষটা শেষ রাতে তার থেকে কুপির আলোয় বিদায় নিয়েছিল, সে আর কোনো দিন এই মাটির ঘরে ফিরবে না। জয়নবের অপেক্ষার প্রহর আর কখনো শেষ হবে না।