Posts

গল্প

একটি নারী সারাজীবনের হাসি

August 5, 2026

Md Josam

Original Author মোঃ জসিম

Translated by মোঃ জসিম

7
View

একটি নারী সারাজীবনের হাসি
লেখক: গল্পকারের কল্পনা
ঢাকার এক নিস্তব্ধ রাতে সাব্বির হোসেন তার ছোট্ট এক রুমের জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিল। ঘরের ভিতর শুধু একটা টেবিল ল্যাম্প জ্বলছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিল কয়েকটা ছিঁড়ে যাওয়া নোটবুক, কিছু অসমাপ্ত আবেদনপত্র আর একটা পুরনো মোবাইল ফোন যার ব্যাটারি প্রায় সবসময়ই খালি থাকত। সাব্বিরের বয়স তখন সাতাশ। কিন্তু তার চোখে যেন সত্তরের কোনো মানুষের ক্লান্তি লুকিয়ে ছিল।
সাব্বিরের জীবনে হাসি বলতে কিছু ছিল না। শৈশবে বাবা মারা গিয়েছিলেন একটা সড়ক দুর্ঘটনায়। মা দিনমজুরি করে তাকে মানুষ করেছিলেন। কলেজ শেষ করার পর চাকরির বাজারে সে হার মেনেছিল বারবার। ইন্টারভিউতে গিয়ে সে শুধু নীরব হয়ে বসে থাকত। কথা বলার সাহস হারাত। তার মুখে হাসি কখনো ফুটত না। বন্ধুরা তাকে “নীরব সাব্বির” বলে ডাকত। কেউ কেউ বলত, “ওর জীবনে আলো নেই, শুধু ছায়া।”
একদিন সকালে সাব্বির উঠে দেখল তার মা আর নেই। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাতের অন্ধকারে চলে গিয়েছিলেন। সাব্বির তখন হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়েছিল। চোখে কোনো অশ্রু নেই, মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। শুধু একটা শূন্যতা। সেদিন থেকে তার জীবন আরও নির্জন হয়ে গেল।
সে একটা ছোট্ট গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করল। বেতন কম। ঘরভাড়া দিতেই শেষ হয়ে যায়। রাতে ফিরে এসে সে শুধু বিছানায় শুয়ে থাকত। কখনো কখনো জানালার বাইরে চাঁদ দেখত। চাঁদও যেন তাকে উপহাস করত। সাব্বির ভাবত, “আমার জীবনে কি কোনোদিন হাসি আসবে? কোনোদিন কি কেউ আমাকে ভালোবাসবে?”
এভাবেই কেটে গেল আরও কয়েক মাস।
একদিন দুপুরে ফ্যাক্টরিতে নতুন একজন ডিজাইনার এলেন। নাম ঐশী। সে এসেছিল ঢাকার বাইরে থেকে, একটা ছোট শহর থেকে। ঐশীর চোখে একটা অদ্ভুত আলো ছিল। সে হাসিমুখে সবাইকে সালাম দিত। তার কণ্ঠস্বর ছিল নরম, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী। সাব্বির প্রথমবার তাকে দেখেই থমকে গেল। সে ভাবল, “এমন হাসি কি সত্যিই মানুষের মুখে থাকতে পারে?”
ঐশী প্রথমে সাব্বিরকে খেয়াল করেনি। সে ব্যস্ত ছিল তার কাজ নিয়ে। কিন্তু একদিন অফিসের ক্যান্টিনে সাব্বিরের সাথে তার দেখা হলো। সাব্বির একা একটা কোণায় বসে চা খাচ্ছিল। ঐশী এসে তার পাশে বসল।
“আপনি কি সাব্বির ভাই?” ঐশী জিজ্ঞেস করল।
সাব্বির উঠে দাঁড়িয়ে গেল। “জি… আমি।”
“আমার নাম ঐশী। নতুন এসেছি। আপনার সাথে পরিচয় হয়নি এখনো।”
সাব্বির মাথা নেড়ে শুধু “হ্যাঁ” বলল। তার মুখে কোনো হাসি নেই। ঐশী অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি কি সবসময় এমন গম্ভীর থাকেন?”
সাব্বির কোনো উত্তর দিল না। শুধু চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
ঐশী হাসল। “আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই। আমি তো হাসি নিয়ে এসেছি। হয়তো একদিন আপনার মুখেও হাসি ফোটাব।”
সেদিন থেকে ঐশী প্রায়ই সাব্বিরের কাছে আসত। কখনো কাজের হিসাব নিয়ে, কখনো শুধু গল্প করতে। সাব্বির প্রথমে বিরক্ত হতো। সে ভাবত, “এ মেয়েটা কেন আমার পিছনে লাগে? আমার জীবনে তো কিছু নেই।” কিন্তু ঐশী হার মানত না।
একদিন বিকেলে ঐশী সাব্বিরকে বলল, “চলুন, আজ একটু বাইরে যাই। নদীর পাড়ে।”
সাব্বির প্রথমে রাজি হয়নি। কিন্তু ঐশীর জেদের কাছে হার মানল। তারা দুজনে বুড়িগঙ্গার পাড়ে গেল। সূর্যাস্তের সময়। আকাশ লাল হয়ে উঠেছিল। ঐশী নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখুন, সূর্য ডুবছে। কিন্তু আগামীকাল আবার উঠবে। জীবনও তেমনই।”
সাব্বির চুপচাপ শুনছিল।
ঐশী তখন তার দিকে ফিরে বলল, “আপনার চোখে এত ক্লান্তি কেন? আপনি কি কখনো হেসেছেন?”
সাব্বির প্রথমবার মুখ খুলল। “হাসি আমার জীবনে নেই। আমার বাবা নেই, মা নেই, সফলতা নেই, কিছুই নেই।”
ঐশী তার হাত ধরল। “আছে। আমি আছি। আর আমি বিশ্বাস করি, আপনার ভিতরেও হাসি লুকিয়ে আছে। শুধু বের করে আনতে হবে।”
সেদিন রাতে সাব্বির ঘরে ফিরে প্রথমবার নিজের মুখের দিকে আয়নায় তাকাল। সে চেষ্টা করল হাসতে। কিন্তু পারল না। মুখ শক্ত হয়ে আছে।
দিন যেতে লাগল। ঐশী ধীরে ধীরে সাব্বিরের জীবনে ঢুকে পড়ল। সে সাব্বিরকে বলত, “আপনি চুপচাপ থাকবেন না। কথা বলবেন। আপনার মনের কথা শেয়ার করবেন।” সাব্বির প্রথমে দ্বিধা করত। কিন্তু একদিন রাতে ঐশীর সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে সে তার সব দুঃখের কথা বলে ফেলল। বাবার মৃত্যু, মায়ের সংগ্রাম, চাকরির ব্যর্থতা, একা একা কাটানো রাতগুলো।
ঐশী শুধু শুনল। শেষে বলল, “সাব্বির, আপনি একা নন। আমি আছি। আর আমি চাই আপনি হাসুন।”
সেদিন প্রথমবার সাব্বিরের চোখ দিয়ে অশ্রু গড়াল। কিন্তু অশ্রুর সাথে সাথে তার বুকের ভিতর একটা হালকা অনুভূতি জাগল। যেন কেউ তার হৃদয়ে হাত রেখেছে।
মাসখানেক পর ঐশী সাব্বিরকে একটা প্রস্তাব দিল। “আপনি হিসাবরক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু আপনার হাতের লেখা খুব সুন্দর। আপনি কি ডিজাইনের কাজ শিখতে চান? আমি শেখাব।”
সাব্বির প্রথমে অস্বীকার করল। “আমার পারব না।”
ঐশী হাসল। “পারবেন। কারণ আমি বিশ্বাস করি।”
তারা সন্ধ্যায় অফিসের পর একসাথে বসত। ঐশী সাব্বিরকে ডিজাইনের মৌলিক বিষয় শেখাত। সাব্বির প্রথমে ভুল করত। কিন্তু ঐশী ধৈর্য ধরে বলত, “আবার চেষ্টা করুন। হাল ছেড়ে দেবেন না।”
একদিন সাব্বির একটা ডিজাইন করে ঐশীকে দেখাল। ঐশী চোখ বড় করে বলল, “এটা অসাধারণ! আপনি পারবেন।”
সেদিন প্রথমবার সাব্বিরের মুখে একটা হালকা হাসি ফুটল। খুব ছোট্ট একটা হাসি। কিন্তু ঐশী সেটা লক্ষ্য করল। সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “দেখুন! আপনি হাসলেন!”
সাব্বির নিজেও অবাক হয়ে গেল। সে আয়নায় তাকিয়ে দেখল তার মুখ। সেই মুখটা যেন অন্য কারো।
ধীরে ধীরে সাব্বিরের জীবন বদলাতে শুরু করল। সে কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে লাগল। তার ডিজাইনগুলো ফ্যাক্টরিতে প্রশংসা পেতে শুরু করল। ম্যানেজার তাকে প্রমোশন দিল। বেতন বাড়ল। সাব্বির প্রথমবার নিজের জন্য একটা নতুন শার্ট কিনল।
ঐশী তখন বলল, “এখন আপনার মুখে হাসি আছে। কিন্তু আমি চাই এই হাসি সারাজীবন থাকুক।”
তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হলো। তারা একসাথে সিনেমা দেখত, একসাথে খাবার খেত, একসাথে নদীর পাড়ে বসত। সাব্বির এখন কথা বলত। সে ঐশীকে তার স্বপ্নের কথা বলত। “আমি একদিন নিজের একটা ছোট্ট ডিজাইন স্টুডিও খুলব। আর আপনি থাকবেন আমার পাশে।”
ঐশী হাসত। “অবশ্যই থাকব।”
কিন্তু জীবন সবসময় মসৃণ থাকে না। একদিন ঐশীর পরিবার তাকে ডেকে পাঠাল। তারা চাইছিল ঐশী অন্য কোথাও চাকরি করুক, অন্য কারো সাথে বিয়ে হোক। ঐশী সাব্বিরকে বলল, “আমার পরিবার আপনাকে মেনে নেবে না। কারণ আপনার পটভূমি দুর্বল।”
সাব্বিরের মুখ থেকে হাসি উধাও হয়ে গেল। সে ভাবল, “আবার সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।”
ঐশী তার হাত ধরে বলল, “না। আমি লড়ব। কারণ আপনি আমার সারাজীবনের হাসি।”
ঐশী তার পরিবারের সাথে কথা বলল। প্রথমে তারা রাজি হয়নি। কিন্তু ঐশী জেদ ধরল। সে বলল, “আমি সাব্বিরকে ভালোবাসি। সে আমার জীবনে আলো এনেছে। আমি তাকে ছাড়ব না।”
অবশেষে পরিবার রাজি হলো। শর্ত ছিল সাব্বিরকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
সাব্বির সেই চ্যালেঞ্জ নিল। সে আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করল। তার ডিজাইনগুলো বাজারে জনপ্রিয় হয়ে উঠল। একদিন একটা বড় কোম্পানি তাকে অফার দিল। সাব্বির সেটা গ্রহণ করল। তার আয় বাড়ল। সে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট ভাড়া নিল।
এক সন্ধ্যায় সাব্বির ঐশীকে নিয়ে সেই ফ্ল্যাটে গেল। সে হাঁটু গেড়ে বসে একটা ছোট্ট আংটি বের করল।
“ঐশী, তুমি আমার জীবনে হাসি এনেছ। তুমি আমার সবকিছু। তুমি কি আমার সারাজীবনের সঙ্গী হবে?”
ঐশী কেঁদে ফেলল। কিন্তু তার চোখে হাসি ছিল। “হ্যাঁ। আমি হব।”
তাদের বিয়ে হলো একটা ছোট্ট অনুষ্ঠানে। সাব্বিরের মুখে সেদিন যে হাসি ছিল, তা দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। সেই নীরব সাব্বির এখন হাসছে, কথা বলছে, জীবন উপভোগ করছে।
বিয়ের পর তাদের জীবন আরও সুন্দর হয়ে উঠল। সাব্বির তার নিজের স্টুডিও খুলল। ঐশী তার পাশে কাজ করত। তারা একসাথে নতুন ডিজাইন তৈরি করত। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একসাথে রান্না করত, গল্প করত, হাসত।
একদিন সাব্বির ঐশীকে বলল, “তুমি জানো, আমি আগে ভাবতাম আমার জীবনে কিছুই নেই। কিন্তু তুমি এসে সবকিছু দিয়েছ। হাসি, ভালোবাসা, সফলতা। এখন আমি সারাজীবন খুশি থাকব।”
ঐশী তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “আমি শুধু তোমার ভিতরের হাসিকে জাগিয়েছি। সেটা তোমারই ছিল।”
বছর চলে গেল। সাব্বিরের স্টুডিও বড় হলো। তারা একটা সন্তানের বাবা-মা হলো। ছেলেটির নাম রাখা হলো আরিয়ান। সাব্বির এখন সকালে উঠে ঐশীকে চুমু দিত, ছেলেকে কোলে নিত, আর হাসত। সেই হাসি আর কখনো হারাত না।
একদিন বৃদ্ধ বয়সে সাব্বির তার নাতনির সাথে বসে ছিল। নাতনি জিজ্ঞেস করল, “দাদু, আপনি সবসময় কেন হাসেন?”
সাব্বির হাসতে হাসতে বলল, “কারণ আমার জীবনে একজন নারী এসেছিল। সে আমার সারাজীবনের হাসি হয়ে গিয়েছিল। তার নাম ঐশী।”
ঐশী পাশে বসে শুনছিল। তার চোখেও হাসি ছিল। সে সাব্বিরের হাত ধরে বলল, “আর তুমি আমার সারাজীবনের শান্তি।”
সাব্বিরের চোখ দিয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়াল। কিন্তু সেটা দুঃখের অশ্রু নয়। সেটা কৃতজ্ঞতার অশ্রু। সে জানত, তার জীবনের সব শূন্যতা একদিন একজন নারী ভরে দিয়েছিল। আর সেই নারীর হাসি এখন তার সারাজীবনের সম্পদ।
সন্ধ্যা নেমে এল। আকাশের তারারা জ্বলছিল। সাব্বির ঐশীর দিকে তাকিয়ে হাসল। সেই হাসি আর কখনো মুছে যায়নি।

১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!

আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:

🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt

ধন্যবাদ ❤️

Comments

    Please login to post comment. Login