ক্যান্সার
এটি একটি সত্য ঘটনা। দোয়েল এগ্রো ইউটিউব চ্যানেলের পুরনো ভিডিওগুলোতে ঐশী নামের মেয়েটির সংগ্রাম দেখা যায়। চ্যানেলের পরিবার এবং হাজার হাজার দর্শক তাকে সাহায্য করেছিল। গল্পটি সেই বাস্তব ঘটনার ওপর ভিত্তি করে বিস্তারিতভাবে লেখা।
একটি ছোট্ট মেয়ে ছিল। তার নাম ঐশী। বাংলাদেশের এক সাধারণ গ্রামের পরিবারের সন্তান। বাবা-মায়ের প্রিয় মেয়ে। ছোটবেলায় সে অন্য সব মেয়ের মতোই খেলাধুলা করত। উঠোনে দৌড়াত, গাছে চড়ত, স্কুলে যেত, বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করত। পা দুটো সুস্থ ও শক্তিশালী ছিল। হাঁটাচলায় কোনো সমস্যা ছিল না। মাঝে মাঝে পায়ে সামান্য ব্যথা হলেও সবাই ভেবেছিল খেলাধুলার কারণে। কেউ ভাবেনি যে এই ব্যথা একদিন ভয়ংকর রূপ নেবে।
একদিন ঐশীর পায়ে ব্যথা শুরু হয়। প্রথমে হালকা। তারপর দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। পা ফুলে ওঠে। হাঁটতে কষ্ট হয়। রাতে ঘুমাতে পারে না ব্যথার কারণে। পরিবার প্রথমে স্থানীয় ওষুধ দিয়ে দেখে। তারপর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। একের পর এক পরীক্ষা। রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে, এমআরআই। অবশেষে খবর আসে—ক্যান্সার। পায়ের হাড়ে বা নরম টিস্যুতে ক্যান্সার। ছোট্ট মেয়ের শরীরে এমন খবর শুনে পরিবার যেন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। মা কাঁদে। বাবা চুপচাপ বসে থাকে। আত্মীয়-স্বজন এসেও কী বলবে বুঝতে পারে না।
চিকিৎসা শুরু হয়। হাসপাতালে ভর্তি। কেমোথেরাপি শুরু হয়। ওষুধের প্রভাবে ঐশীর চুল পড়ে যায়। শরীর দুর্বল হয়ে যায়। বমি হয়। জ্বর আসে। তবু সে সহ্য করে। মা তাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। বাবা টাকার ব্যবস্থা করে। একের পর এক ইনজেকশন। রক্ত দেওয়া। অনেক সময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে ঐশী জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে। সে ভাবে স্কুলে তার বন্ধুরা কী করছে। খেলার মাঠে দৌড়াদৌড়ি হচ্ছে কিনা।
প্রথমবার চিকিৎসায় কিছুটা সাড়া মেলে। রোগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে। চিকিৎসকরা বলেন, যেখানে ক্যান্সার হয়েছে সেই জায়গা কেটে ফেলতে হবে। নাহলে আবার ছড়িয়ে পড়বে। অপারেশনের সিদ্ধান্ত হয়। ঐশীর পা কেটে ফেলা হয়। অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার আগে মা তার কপালে চুমু খায়। বাবা হাত ধরে রাখে। অপারেশন শেষে যখন সে জেগে ওঠে, তখন দেখে এক পা আর নেই। ছোট্ট মেয়েটির মুখে আকাশ ভেঙে পড়ে। সে কাঁদে। “আমার পা কোথায়?”—এই প্রশ্ন বারবার করে। মা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদে। বাবা চোখের পানি লুকাতে পারে না।
অপারেশনের পর হাসপাতালে দীর্ঘদিন কাটে। ক্ষত শুকাতে সময় লাগে। ব্যথা অসহ্য। তারপর কৃত্রিম পা বা প্রস্থেটিক লেগ ফিট করা হয়। নতুন পা পেয়ে ঐশী প্রথমে ভয় পায়। তারপর ধীরে ধীরে হাঁটার চেষ্টা করে। প্রথমবার যখন নতুন পা নিয়ে কয়েক পা হাঁটে, তখন তার চোখে আনন্দ দেখা যায়। দোয়েল এগ্রোর ভিডিওতে সেই মুহূর্ত ধরা আছে। সে হাসছে। পরিবারও হাসছে। মনে হচ্ছে এবার জীবন স্বাভাবিক হবে। স্কুলে ফিরবে। খেলবে। বড় হবে।
দোয়েল এগ্রো চ্যানেলের পরিবার ঐশীকে সাহায্য করতে থাকে। তারা হাসপাতালে যায়। টাকা-পয়সা সংগ্রহ করে। ওষুধ কিনে দেয়। খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যায়। চ্যানেলের দর্শকরাও সাহায্যের হাত বাড়ায়। কেউ একশ টাকা, কেউ পাঁচশ, কেউ হাজার হাজার টাকা পাঠায়। কমেন্ট সেকশনে হাজার হাজার দোয়া জমে। অনেকে লেখে, “ঐশী আমার মেয়ের মতো। আল্লাহ তাকে সুস্থ করুক।” কেউ কেউ নিজে গিয়ে দেখে আসে।
নতুন পা পেয়ে ঐশী কিছুদিন ভালোই ছিল। হাঁটার অভ্যাস করছিল। বাড়িতে ঘুরে বেড়াত। মাঝে মাঝে বাইরে যেত। কিন্তু ক্যান্সার যেন ছাড়ে না। অনেকদিন পর আবার সমস্যা দেখা দেয়। এবার পিঠে। পিঠে তীব্র ব্যথা। দাঁড়াতে কষ্ট। শুয়ে থাকতে হয়। আবার পরীক্ষা। আবার খবর—ক্যান্সার ফিরে এসেছে। এবার মেরুদণ্ড বা পিঠের অংশে। আগের অপারেশন, কেমো, কৃত্রিম পা—সবকিছুর পরও রোগ আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এই খবর শুনে পরিবার আবার ভেঙে পড়ে। ঐশী নিজেও বুঝতে পারে। সে চুপচাপ থাকে। মাঝে মাঝে বলে, “আমি আর ভালো হব না?” মা তাকে জড়িয়ে ধরে বলে, “হবে। আল্লাহ সুস্থ করবে।” বাবা হাসপাতালে ছুটে যায়। দোয়েল এগ্রোর লোকজন আবার পাশে দাঁড়ায়। আবার টাকা সংগ্রহ। আবার চিকিৎসা।
এই সময়ে করসল ফলের কথা উঠে আসে। অনেকে বলে এই ফল ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে। দোয়েল এগ্রো ঐশীর জন্য করসল ফল এবং পাতা এনে দেয়। ঐশী সেই ফল খায়। পাতার চা পান করে। ভিডিওতে দেখা যায় সে কেমন আছে। মুখে হাসি। শরীর দুর্বল হলেও সে চেষ্টা করে কথা বলে। দর্শকরা জিজ্ঞেস করে, “ঐশী কেমন আছে?” জবাবে বলা হয়, সে করসল খাচ্ছে, আশা করছি ভালো হবে।
হাঁসপাতালের দিনগুলো খুব কঠিন। এক ভিডিওতে বলা হয়েছিল হাসপাতাল জেলখানার চেয়েও খারাপ। গরম। ভিড়। দুর্গন্ধ। ইনজেকশনের ব্যথা। রাতভর জেগে থাকা। মা একপাশে বসে থাকে। বাবা অন্য পাশে। কখনো কখনো ঐশী ব্যথায় চিৎকার করে। কখনো চুপচাপ অশ্রু ফেলে। নার্সরা ওষুধ দেয়। ডাক্তাররা রাউন্ডে আসে। প্রতিবারই একই কথা—অবস্থা পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
কৃত্রিম পা নিয়েও চলাফেরা কঠিন হয়ে যায় পিঠের ব্যথার কারণে। সে বেশিরভাগ সময় শুয়ে থাকে। মাঝে মাঝে উঠে বসে। মোবাইলে কার্টুন দেখে। গান শোনে। মা তাকে গল্প বলে। বাবা তাকে কোলে নিয়ে বসে। পরিবারের অন্য সদস্যরা এসে দেখে যায়। আত্মীয়-স্বজন দোয়া করে। গ্রামের মানুষও খোঁজ নেয়।
সময় গড়ায়। চিকিৎসা চলতে থাকে। কিন্তু রোগ বাড়তে থাকে। শরীর আরও দুর্বল হয়। খাওয়া-দাওয়া কমে যায়। ওজন কমে যায়। চোখ গর্তে বসে যায়। তবু ঐশী হার মানতে চায় না। সে মাঝে মাঝে বলে, “আমি ভালো হয়ে উঠব। আবার স্কুলে যাব।” এই কথা শুনে মা-বাবার চোখে পানি এসে যায়।
দোয়েল এগ্রোর ভিডিওগুলোতে ঐশীর বিভিন্ন সময়ের অবস্থা ধরা আছে। অপারেশনের আগে। পরে। নতুন পা পাওয়ার আনন্দ। করসল খাওয়ার পর। প্রতিটি ভিডিওতে মানুষের সহানুভূতি দেখা যায়। কমেন্ট সেকশনে হাজার হাজার মানুষ দোয়া করে। কেউ লেখে, “ঐশী আমার বোনের মতো।” কেউ বলে, “আল্লাহ তাকে সুস্থ করুক।” কেউ টাকা পাঠায়। কেউ নিজে গিয়ে দেখে আসে।
শেষের দিকে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। শরীর আর সাড়া দেয় না। ব্যথা অসহ্য। ওষুধও তেমন কাজ করে না। পরিবার রাত জাগে। দোয়েল এগ্রোর সদস্যরাও পাশে থাকে। অনেকে দোয়া করে। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা অন্যরকম। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির দিকে ঐশী আর নেই। ক্যান্সারের কাছে হেরে যায় সে। আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলে যায়।
দোয়েল এগ্রোর ভিডিওতে সেই শোকের কথা বলা হয়েছে। “আমাদের সবার চেষ্টা বিফল করে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলে গেল ঐশী। সবাই ওর জন্য দোয়া করবেন আল্লাহ যেন ওকে জান্নাতবাসী করেন।” ভিডিও দেখে হাজার হাজার মানুষ কাঁদে। কমেন্টে শুধু দোয়া আর অশ্রু।
ঐশীর গল্প শুধু একটা মেয়ের ক্যান্সারের গল্প নয়। এটা সংগ্রামের গল্প। এক পা হারিয়েও হাঁটার চেষ্টা করার গল্প। কৃত্রিম পা নিয়ে নতুন জীবন শুরু করার আনন্দের গল্প। আবার রোগ ফিরে আসার যন্ত্রণার গল্প। পরিবারের অসীম ভালোবাসা। অপরিচিত মানুষের সাহায্য। দোয়া। আশা। হতাশা। সব মিলেমিশে একটা মানবিক গল্প।
ছোট্ট ঐশী যখন নতুন পা পেয়েছিল, তখন তার চোখে যে আনন্দ দেখা গিয়েছিল, সেটা অনেকের মনে এখনও আছে। সে হাঁটার চেষ্টা করছিল। হয়তো ভাবত এবার সব ঠিক হয়ে যাবে। স্কুলে যাবে। খেলবে। বড় হয়ে ডাক্তার হবে বা শিক্ষক হবে। কিন্তু ক্যান্সার আবার এলো। পিঠে। ব্যথা বাড়ল। চলাফেরা আরও কষ্টকর হলো। ওষুধের প্রভাব। কেমোর কষ্ট। সব মিলিয়ে শরীর দুর্বল হয়ে গেল।
যারা তাকে দেখেছিল তারা বলে, ঐশী খুব সাহসী ছিল। কষ্টের মধ্যেও হাসি মুখে থাকত। অভিযোগ কম করত। পরিবারকে কষ্ট দিতে চাইত না। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েও সে অন্যদের কথা জিজ্ঞেস করত। “মা কেমন আছো?” “বাবা ক্লান্ত?”—এই প্রশ্নগুলো করত। ছোট্ট মেয়েটির এই মানসিক শক্তি অনেককে অনুপ্রাণিত করেছিল।
দোয়েল এগ্রোর ভিডিওগুলো এখনও ইউটিউবে আছে। কেউ কেউ এখনও দেখে কাঁদে। কেউ বলে, “ঐশীকে ভুলতে পারছি না।” কেউ বলে, “আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করুক।” তার পরিবার এখনও সেই কষ্ট বহন করে চলেছে। কিন্তু তারা জানে, ঐশী এখন আর ব্যথা পাচ্ছে না। সে শান্তিতে আছে।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় জীবনের অনিশ্চয়তা। ক্যান্সারের মতো রোগ কতটা ভয়ংকর হতে পারে। পরিবার কতটা কষ্ট পায়। অপরিচিত মানুষও কতটা সাহায্য করতে পারে। দোয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট্ট একটা মেয়ে কীভাবে লড়াই করেছিল যতদিন সম্ভব।
ঐশীর জন্য দোয়া করি। আল্লাহ তাকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। তার পরিবারকে ধৈর্য দিন। যারা তাকে সাহায্য করেছিল তাদেরও নেকি দিন। যারা এখনও ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে তাদের সাহায্য করুন। সচেতনতা বাড়ান। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে অনেক জীবন বাঁচে।
গল্পটি এখানেই শেষ নয়। কারণ ঐশীর মতো আরও অনেক শিশু ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। তাদের সাহায্য করা, সচেতনতা বাড়ানো, দোয়া করা—এগুলোই হয়তো এই গল্পের আসল শিক্ষা। ঐশী চলে গেছে। কিন্তু তার সংগ্রামের স্মৃতি রয়ে গেছে। দোয়েল এগ্রোর ভিডিওগুলোতে সেই স্মৃতি এখনও জীবন্ত।
যখনই কেউ সেই ভিডিওগুলো দেখে, তখন ঐশীর হাসি মনে পড়ে। নতুন পা নিয়ে হাঁটার চেষ্টা মনে পড়ে। করসল খাওয়ার মুহূর্ত মনে পড়ে। শেষের দিনগুলোর কষ্ট মনে পড়ে। আর সবার মনে একটাই দোয়া জাগে—আল্লাহ ঐশীকে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।
এই সত্য গল্পটি আমাদের শেখায় যে জীবন খুব ছোট। সময় খুব মূল্যবান। ভালোবাসা খুব জরুরি। সাহায্যের হাত বাড়ানো খুব দরকার। আর দোয়া সবসময় কর্তব্য। ঐশী চলে গেছে। কিন্তু তার গল্প থাকবে। যতদিন দোয়েল এগ্রোর ভিডিও থাকবে, ততদিন ঐশীর সংগ্রামের কথা মানুষ মনে রাখবে।
পরিবারের প্রতিটি সদস্য যে কষ্ট সহ্য করেছে, তা বলে শেষ করা যায় না। মা যে রাত জেগেছে। বাবা যে টাকার জন্য দৌড়েছে। ভাই-বোন যে পাশে থেকেছে। আত্মীয়-স্বজন যে সাহায্য করেছে। সব মিলিয়ে একটা পরিবারের অসীম ত্যাগের গল্প। আর সেই সঙ্গে অপরিচিত মানুষের সহানুভূতির গল্প।
ঐশী যখন নতুন পা পেয়েছিল, তখন সে খুব খুশি হয়েছিল। সে ভেবেছিল এবার সে আবার দৌড়াতে পারবে। কিন্তু পিঠের ক্যান্সার সব আনন্দ কেড়ে নেয়। তবু সে হার মানেনি যতদিন সম্ভব। এই সংগ্রামই তাকে অমর করে রেখেছে অনেকের হৃদয়ে।
আজও যখন কেউ ক্যান্সারের কথা শোনে, তখন ঐশীর কথা মনে পড়ে। ছোট্ট মেয়েটির সাহস মনে পড়ে। আর সবাই দোয়া করে—যেন আর কোনো শিশুকে এমন কষ্ট না পেতে হয়। যেন সবাই সুস্থ থাকে। যেন পরিবারগুলো এমন যন্ত্রণা না ভোগ করে।
গল্পের শেষে শুধু একটাই কথা। ঐশী চলে গেছে। কিন্তু তার স্মৃতি বেঁচে আছে। দোয়া করি আল্লাহ তাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তার পরিবারকে শান্তি দিন। আর আমাদের সবাইকে সচেতন করুন। আমিন।
১ লাখ টাকা পুরস্কার জেতার সুযোগ!
আমার চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন। তারপর যেকোনো ভিডিওতে এই কমেন্টটি করুন:
🔗 https://youtube.com/@jaminatvmt
📝 @jaminatvmt
ধন্যবাদ ❤️
