Posts

নন ফিকশন

একনায়কদের এত প্রিয় বই: গুস্তাভ ল্য বঁ-এর ‘দ্য ক্রাউড’ (The Crowd)

August 18, 2026

md jahidul islam

2
View

 

​ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়—এডলফ হিটলার, বেনিতো মুসোলিনি কিংবা জোসেফ স্তালিনের মতো স্বৈরশাসকদের কর্মপদ্ধতি বা শাসনশৈলী একে অপরের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও একটি জায়গায় তাদের অদ্ভুত মিল ছিল। তারা প্রত্যেকেই খুব ভালো করে জানতেন—কীভাবে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং লাখ লাখ মানুষের একটি উন্মত্ত জনতাকে নিজের ইচ্ছামতো পরিচালিত করতে হয়।

​কিন্তু তারা এই গণমনস্তত্ত্ব বা ‘মব সাইকোলজি’র গোপন রহস্য শিখলেন কোথা থেকে?

​উত্তর লুকিয়ে আছে ১৮৯৫ সালে ফরাসি বহুবিদ্যাবিশারদ গুস্তাভ ল্য বঁ (Gustave Le Bon)-এর লেখা একটি কালজয়ী বইয়ে—যার নাম ‘The Crowd: A Study of the Popular Mind’

​১৩০ বছরেরও বেশি পুরোনো এই ক্লাসিক বইটি আজও রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানী এবং একনায়কদের কাছে এক অন্যতম প্রভাবশালী মনস্তাত্ত্বিক গাইড হিসেবে বিবেচিত। বিস্তারিত রিভিউ ও বিশ্লেষণ জানতে পড়ে নিতে পারেন The Crowd Book Review

​কেন ‘দ্য ক্রাউড’ বইটি একনায়কদের কাছে এত প্রিয় ছিল?

​গুস্তাভ ল্য বঁ তাঁর বইয়ে দাবি করেছেন, কোনো ব্যক্তি যখন একা থাকে, তখন সে যুক্তি, নীতিবোধ এবং বুদ্ধিমত্তা দিয়ে চিন্তা করে। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি যখন কোনো বৃহৎ জনতার (Crowd) অংশ হয়ে যায়, তখন তার ব্যক্তিগত বুদ্ধিমত্তা ও নৈতিক চেতনা লোপ পায়। তখন সে কেবল আবেগ, উত্তেজনা এবং অন্ধ অনুকরণ দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে।

​একনায়কেরা এই মনস্তাত্ত্বিক সূত্রগুলোকে কাজে লাগিয়েই কোটি কোটি মানুষকে তাদের পক্ষে খেপিয়ে তুলতেন:

​১. যৌথ মন বা 'কলেক্টিভ মাইন্ড' (The Collective Mind)

​ল্য বঁ-এর মতে, একটি জনতার ভেতরে মানুষ তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় ভুলে যায় এবং সবাই মিলে একটি একক ‘যৌথ মন’ তৈরি করে। জনতা কোনো যুক্তি খোঁজে না; তারা শুধু নাটকীয়তা ও চরম আবেগ চায়। একনায়কেরা জনসভায় এমন পরিবেশ তৈরি করতেন, যেখানে একক যুক্তির চেয়ে সম্মিলিত উন্মাদনা বেশি প্রাধান্য পেত।

​২. নেতার ওপর অন্ধ নির্ভরতা (Prestige and Leadership)

​জনতা মূলত এমন এক দল, যারা একজন শক্তিশালী নির্দেশকের অপেক্ষায় থাকে। গুস্তাভ ল্য বঁ দেখিয়েছেন, মানুষ এমন নেতাকে পছন্দ করে যিনি আত্মবিশ্বাসী এবং যিনি স্পষ্ট অথচ চরম আবেগপূর্ণ বক্তব্য দিতে পারেন। হিটলারের প্রোপাগান্ডা মাস্টার জোসেফ গোয়েবলস এই তত্ত্বকে ব্যবহার করে নাৎসি জার্মানিকে অন্ধ আনুগত্যে বাধ্য করেছিলেন।

​৩. পুনরাবৃত্তি এবং সংক্রামক উন্মাদনা (Repetition and Contagion)

​জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার অন্যতম উপায় হলো একটি সহজ ধারণাকে বারবার প্রচার করা। ল্য বঁ উল্লেখ করেন—কোনো মিথ্যাকেও যদি বারবার উচ্চকণ্ঠে বলা হয়, তবে জনতা সেটিকে ধ্রুব সত্য বলে মেনে নেয়। এই সূত্র মেনেই আধুনিক বিজ্ঞাপনের মতোই রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা কাজ করে।

​আধুনিক যুগে বইটির প্রাসঙ্গিকতা

​১৮৯৫ সালে যখন বইটি প্রকাশিত হয়, তখন হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া, অ্যালগরিদম বা ইন্টারনেটের কোনো অস্তিত্ব ছিল না। কিন্তু ল্য বঁ-এর বিশ্লেষণ বর্তমানের ডিজিটাল যুগের ক্ষেত্রেও নিখুঁতভাবে মিলে যায়। আজকের দিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের 'অনলাইন মব' (Online Mob), রাজনৈতিক মেরুকরণ, ট্রোলিং কালচার কিংবা ফেক নিউজের প্রতি মানুষের অন্ধ বিশ্বাস—সবকিছুর পেছনেই কাজ করছে ‘দ্য ক্রাউড’ বইটিতে বর্ণিত সাইকোলজি।

​জনতার শক্তি যেমন কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লব ঘটাতে পারে, তেমনি ভুল নেতৃত্বের কারণে তা হয়ে উঠতে পারে ধ্বংসাত্মক এক অস্ত্র।

​গুস্তাভ ল্য বঁ-এর ‘দ্য ক্রাউড’ কেবল ইতিহাসের স্বৈরশাসকদের বোঝার চাবিকাঠি নয়, বরং আধুনিক সময়ের নাগরিক হিসেবে আমাদের নিজেদের আবেগ ও ভাবনা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে, তা বোঝার এক দুর্দান্ত দলিল। বইটি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা পড়তে ঘুরে আসতে পারেন Jahid Notes-এর বুক রিভিউ পেইজে

Comments

    Please login to post comment. Login