আঠারো শতকের মধ্যভাগে বাংলা যখন ধন-সম্পদে উপচে পড়ছিল, তখন পর্দার আড়াল থেকে তৎকালীন রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন এক প্রভাবশালী বণিক পরিবার—জগৎশেঠ। প্রকৃতপক্ষে "জগৎশেঠ" কোনো ব্যক্তির নাম নয়; এটি ছিল একটি বংশানুক্রমিক উপাধি, যার অর্থ "বিশ্বের ব্যাংক" বা "জগতের শেঠ"। দিল্লির মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ শাহ ১৭২৪ সালে ব্যবসায়ী ফাতেহ চাঁদকে এই মর্যাদাপূর্ণ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
জগৎশেঠ পরিবারের উত্থান
এই পরিবারের ভিত্তিস্থাপন করেছিলেন মানিক চাঁদ, যিনি রাজস্থান থেকে তৎকালীন বাংলার রাজধানী ঢাকায় এসে ব্যবসা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদে স্থানাস্তরিত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকিং হাউস সমগ্র ভারতবর্ষে বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
তৎকালীন সময়ে জগৎশেঠদের ব্যাংক যেসব সুবিধা প্রদান করত:
- মুদ্রা বিনিময় ও ঋণদান: নবাব থেকে শুরু করে সাধারণ ব্যবসায়ী—সবাইকে বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রদান করা।
- রাজস্ব সংগ্রহ: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে কাজ করা।
- টাকশাল নিয়ন্ত্রণ: মুর্শিদাবাদের সরকারি টাকশাল বা 'মিন্ট' তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা, যেখানে তারা নিজস্ব মুদ্রা তৈরি করত।
ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের মতে, এক সময় জগৎশেঠ পরিবারের কাছে যে পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত ছিল, তা তৎকালীন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের মোট মূলধনের চেয়েও বেশি ছিল।
রাজনীতি ও পলাশীর যুদ্ধ
কেবল ব্যবসাতেই জগৎশেঠদের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল না। নবাব আলীবর্দী খানের আমলে তারা সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন। কিন্তু পরবর্তী নবাব সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে তাদের সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি হয়। সিরাজউদ্দৌলার কিছু সিদ্ধান্ত এবং জগৎশেঠদের ওপর ক্রমবর্ধমান মনস্তাত্ত্বিক চাপ তাদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘনিষ্ঠ করে তোলে।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পেছনে রবার্ট ক্লাইভ, মির্জাফর এবং শেঠ মাহতাব চাঁদের সমন্বয়ে গঠিত ষড়যন্ত্রকে মূল অনুঘটক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শেঠরা ভেবেছিলেন ব্রিটিশদের সাহায্য নিয়ে তারা নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রাখবেন, কিন্তু ইতিহাস তাদের জন্য ভিন্ন পরিণতি লিখে রেখেছিল।
পতন ও শেষ পরিণতি
পলাশীর যুদ্ধের পর বাংলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকে। মির্জাফরের পর নবাব হওয়া মীর কাশিম জগৎশেঠদের বিশ্বাসঘাতকতা মেনে নিতে পারেননি। ১৭৬৩ সালে মীর কাশিমের নির্দেশে শেঠ মাহতাব চাঁদ এবং তার ভাই স্বরুপ চাঁদকে হত্যা করা হয়।
পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পুরো বাংলার রাজস্ব ব্যবস্থা সরাসরি নিজেদের হাতে নিলে জগৎশেঠদের ব্যাংকিং সাম্রাজ্য ধসে পড়ে এবং ধনকুবের থেকে তারা শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের পেনশনে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন: জগৎশেঠদের উত্থান-পতন ও ব্রিটিশদের পেনশনভোগী হওয়ার পুরো ইতিহাস নিয়ে বিস্তারিত জানতে পড়ুন: জগৎশেঠ: বাংলার ধনকুবের থেকে ব্রিটিশদের পেনশনভোগী