রেডিও বা বেতার কেবল একটি প্রযুক্তি নয়, বরং মানব সভ্যতায় দূরবর্তী যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। দূরদূরান্তের তথ্য আদান-প্রদান, খবর পরিবেশন ও বিনোদনের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে একসময় রেডিওর বিকল্প কিছু ছিল না। আজও ডিজিটাল যুগে রেডিওর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। তবে রেডিওর আবিষ্কারের ইতিহাস কেবল একক কোনো ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠেনি; এটি ছিল বেশ কয়েকজন বিজ্ঞার্থীর অসাধারণ গবেষণার ফসল।
১. রেডিওর আসল ইতিহাস: কে আবিষ্কার করেছিলেন?
রেডিও আবিষ্কারের পেছনে বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানীর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রয়েছে।
- তাত্ত্বিক ভিত্তি ও তরঙ্গ প্রমাণ: ১৮৬৪ সালে স্কটিশ বিজ্ঞানী জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল তাত্ত্বিকভাবে প্রমান করেন যে মহাকাশে অদৃশ্য তড়িৎ-চৌম্বকীয় তরঙ্গ (Electromagnetic Waves) বিদ্যামান। এর ঠিক ২৩ বছর পর, ১৮৮৭ সালে জার্মান বিজ্ঞানী হেনরিখ হার্টজ পরীক্ষাগারে প্রথম রেডিও তরঙ্গের অস্তিত্ব ও এর প্রবাহ প্রমান করেন। তাঁর নামানুসারেই কম্পাঙ্কের একক 'হার্টজ' (Hz) রাখা হয়।
- স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর অসামান্য অবদান: রেডিওর ইতিহাসে বাঙালি বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা। ১৮৯৫ সালে কলকাতার টাউন হলে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের এক প্রদর্শনীতে প্রকাশ্যে তারহীন তরঙ্গের মাধ্যমে সংকেত পাঠিয়ে দূরে রাখা একটি বেল বাজান এবং গানপাউডার বিস্ফোরণ ঘটান। তবে তিনি বাণিজ্যিক লাভের উদ্দেশ্যে বিশ্বাসী না থাকায় তাঁর আবিষ্কারের কোনো পেটেন্ট (Patenting) করেননি।
- বাণিজ্যিক আবিষ্কারক (মার্কোনি): ১৮৯৫-৯৬ সালে ইতালীয় বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক গুগলিয়েলমো মার্কোনি (Guglielmo Marconi) তারহীন টেলিগ্রাফি প্রযুক্তি সফলভাবে উন্নয়ন করেন এবং ১৮৯৬ সালে যুক্তরাজ্যে এর প্রথম পেটেন্ট গ্রহণ করেন। ১৯০১ সালে তিনি আটলান্টিক মহাসাগরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রেডিও সংকেত পাঠাতে সক্ষম হন। বাণিজ্যিক রূপদান এবং যোগাযোগের জন্য একে কার্যকর করায় গুগলিয়েলমো মার্কোনিকেই রেডিওর প্রাতিষ্ঠানিক আবিষ্কারক বলা হয়। ১৯০৯ সালে তিনি পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
২. ভারতে কবে এবং কীভাবে শুরু হয় রেডিও সম্প্রচার?
ব্রিটিশ শাসনামলে শখের বেতার ক্লাবগুলোর হাত ধরে ভারতে রেডিওর সূচনা হয়েছিল:
- প্রাথমিক শুরু (১৯২৩): ভারতে প্রথম রেডিও সম্প্রচার শুরু হয় ১৯২৩ সালের জুন মাসে 'রেডিও ক্লাব অব বোম্বে'-র উদ্যোগে। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালের নভেম্বরে 'ক্যালকাটা রেডিও ক্লাব'-ও নিজস্ব সম্প্রচার শুরু করে।
- বাণিজ্যিক সম্প্রচার (১৯২৭): ১৯২৭ সালের ২৩ জুলাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান 'ইন্ডিয়ান ব্রডকাস্টিং কোম্পানি' (IBC) বোম্বে কেন্দ্র থেকে ভারতে প্রথম নিয়মমাফিক বাণিজ্যিক সম্প্রচার শুরু করে। পরবর্তীতে একই বছর আগস্টে কলকাতা কেন্দ্র চালু হয়।
- সরকারি নিয়ন্ত্রণ (১৯৩০): লোকসানের কারণে আইবিসি বন্ধ হয়ে গেলে ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার এটি নিজের নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং নাম দেয় 'ইন্ডিয়ান স্টেট ব্রডকাস্টিং সার্ভিস' (ISBS)।
- অল ইন্ডিয়া রেডিও ও আকাশবাণী (১৯৩৬ ও ১৯৫৬): ১৯৩৬ সালের ৮ জুন ব্রডকাস্টিং সার্ভিসের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় 'অল ইন্ডিয়া রেডিও' (AIR)। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি সরকারিভাবে 'আকাশবাণী' (Akashvani) নাম গ্রহণ করে।
উপসংহার
ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব, হার্টজের পরীক্ষা, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর অনন্য উদ্ভাবন এবং মার্কোনির বাণিজ্যিক প্রয়োগ—এই সবকিছুর সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে রেডিওর ইতিহাস। ভারতে ১৯২৩ সালে শখের বশে শুরু হওয়া সেই তরঙ্গ আজ কোটি মানুষের কাছে তথ্য ও বিনোদনের অন্যতম জাতীয় উৎস হিসেবে টিকে রয়েছে।
📌 রেডিওর পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে পড়ুন: রেডিওর আসল ইতিহাস ও বাংলাদেশ সম্প্রচারের গল্প