Essay

সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’ ফ্রী পিডিএফ

August 15, 2026

128 views

সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’: বিপ্লব, সমাজভাবনা ও আত্মানুসন্ধানের এক অনন্য আখ্যান

​বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী কথাসাহিত্যিক সমরেশ মজুমদারের সৃষ্টিকর্মের এক অনন্য শিখর হলো তাঁর রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ‘গর্ভধারিণী’। সত্তরের দশকের উত্তাল সময় এবং পরবর্তী প্রেক্ষাপটে তরুণ প্রজন্মের মোহভঙ্গ, সমাজ পরিবর্তনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও বাস্তবতার কঠোর ঘাত-প্রতিঘাতকে অত্যন্ত গভীরতায় ফুটিয়ে তুলেছেন তিনি এই উপন্যাসে। এটি কেবল কিছু তরুণের রোমাঞ্চকর বিপ্লব বা সংগ্রামের গল্প নয়; বরং আদর্শের পরীক্ষা, অস্তিত্বের সংকট এবং একটি নতুন সমাজের গর্ভধারণের রূপক হয়ে ওঠা এক অবিস্মরণীয় আখ্যান।

​উপন্যাসের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট

​উপন্যাসের সূচনা চারজন স্বপ্নবাজ ও প্রতিবাদী তরুণ-তরুণীকে কেন্দ্র করে—আনন্দ, কল্যাণ, সুদীপ এবং জয়িতা। তারা প্রত্যেকেই সমাজের ভিন্ন ভিন্ন অর্থনৈতিক ও পারিবারিক স্তর থেকে উঠে আসা:

  • ​সুদীপ: ধনী পরিবারের সন্তান, কিন্তু বাবার ভণ্ডামি ও পুঁজিবাদের নোংরা চেহারা দেখে শৈশব থেকেই বিদ্রোহী।
  • ​কল্যাণ: নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধি, যে পরিবারের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন থেকে মুক্তির পথ খোঁজে বিপ্লবের ভেতর।
  • ​আনন্দ: যার রক্তে মিশে ছিল আদর্শিক লড়াইয়ের তেজ।
  • ​জয়িতা: মধ্যবিত্ত থেকে হঠাৎ ধনী হওয়া পরিবারের মেয়ে, যে সমাজের কৃত্রিমতা ও একাকিত্বকে দূরে ঠেলে নিজের স্বকীয় পরিচয় নির্মাণে অটল।

​চারজনের ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সমাজকে কলুষমুক্ত ও শোষণহীন করার এক অদম্য তাগিদ তাদের একত্রিত করে।

​প্রতিরোধ থেকে আত্মগোপন: অরণ্য ও পাহাড়ে নতুন জীবন

​কলকাতার প্রচলিত দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থা, ভেজাল ওষুধ কারখানার মালিক ও সুবিধাবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়ে তারা কয়েকটি দুঃসাহসী পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু প্রশাসনিক তাড়া ও রাজনৈতিক ফাঁদের মুখে একপর্যায়ে তাদের শহর ছাড়তে হয়। আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে তারা চলে যায় হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ ‘তাপলাং’-এ।

​শহুরে বিলাসবহুল জীবন ছেড়ে পাহাড়ি জনপদের আদিম, কঠোর এবং দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের মুখোমুখি হয় চার বন্ধু। সেই জনপদে আধুনিক সভ্যতার কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিল না, কিন্তু ছিল না কৃত্রিম শোষণও। সেখানে তাদের শুরু হয় এক ভিন্নমাত্রার লড়াই—মানুষকে বাঁচানোর লড়াই, কুসংস্কার ও রোগব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই।

​উপন্যাসের বিস্তারিত সারাংশ ও গভীর বিশ্লেষণ পড়তে ভিজিট করতে পারেন গর্ভধারিণী উপন্যাসটির সম্পূর্ণ আলোচনা পাতায়।

​নামকরণের তাৎপর্য: ‘গর্ভধারিণী’ কেন?

​উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়িতা ধীরে ধীরে পাহাড়ি মানুষের কাছে ‘দ্রিমিৎ’ বা পরম মমতাময়ী এক আশ্রয় হয়ে ওঠে। সশস্ত্র বিপ্লবের চেয়েও যে সেবা, ভালোবাসা ও মানুষের আত্মিক মুক্তি অনেক বড় বিপ্লব—জয়িতার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে লেখক তা চমৎকারভাবে এঁকেছেন। একটি নতুন সমাজ, শোষণমুক্ত ভবিষ্যৎ এবং মানবিক বোধকে নিজের ভেতর ধারণ করে জন্ম দেওয়ার প্রতীকী শক্তি হিসেবে জয়িতাই হয়ে ওঠে প্রকৃত গর্ভধারিণী।

​কেন ‘গর্ভধারিণী’ বাংলা সাহিত্যে অনন্য?

​১. বাস্তবধর্মী চরিত্রায়ণ: কোনো চরিত্রকেই নিখুঁত বা অলৌকিক বীর হিসেবে দেখানো হয়নি; তাদের ভয়, দ্বিধা, ভুল ও মানবিক দুর্বলতাগুলো স্পষ্ট।

২. দর্শন ও রোমাঞ্চের মেলবন্ধন: উপন্যাসে একদিকে যেমন রয়েছে তীব্র সাসপেন্স ও অ্যাডভেঞ্চার, অন্যদিকে রয়েছে গভীর সমাজতাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক দর্শন।

৩. অনবদ্য ভাষা ও গতি: সমরেশ মজুমদারের স্বভাবসুলভ সাবলীল ভাষা ও দৃশ্যপট নির্মাণের ক্ষমতা পাঠককে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে রাখে।

​উপসংহার

​সমরেশ মজুমদারের ‘গর্ভধারিণী’ নিছক একটি উপন্যাস নয়; এটি তারুণ্যের স্বপ্নভঙ্গ, আত্মত্যাগ এবং মানবিক পুনর্জন্মের এক দলিল। সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা যে কোনো পাঠকের জন্য এই বইটির পাঠ এক গভীর চিন্তার খোরাক জোগায়। 

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login