একটি দেশের ভবিষ্যৎ কোনো বিদেশি শক্তি, প্রতিবেশী রাষ্ট্র কিংবা আন্তর্জাতিক মহল এককভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। একটি দেশের ভাগ্য মূলত নির্ধারিত হয় সেই দেশের জনগণ, নেতৃত্ব, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, শিক্ষা এবং জাতীয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। তাই দৃঢ়ভাবে বলা যায়—বাংলাদেশের ভাগ্য বাংলাদেশই নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার মূল চেতনা হলো—নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়া। কোনো দেশের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়বে, কোথায় সহযোগিতা করা হবে কিংবা কোন বিষয়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এসব সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের নিজস্ব বিবেচনায় হওয়া উচিত।
বর্তমান বিশ্বে একটি দেশ একা চলতে পারে না। বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হবে। কিন্তু বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা কখনোই জাতীয় স্বার্থ বিসর্জনের অর্থ হতে পারে না। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব, সমতা এবং বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনগণ। কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা, প্রবাসী, শিক্ষক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, তরুণ প্রজন্ম—প্রত্যেকের অবদান দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ জনশক্তি, মানসম্মত শিক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ এবং উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
তবে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে অভ্যন্তরীণ বিভাজন বড় বাধা হতে পারে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু মতের পার্থক্য যেন জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে বিভাজনে পরিণত না হয়। একটি দেশের মানুষ যখন নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাস, হিংসা ও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তখন বাইরের শক্তির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়। তাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো—জাতীয় স্বার্থে ঐক্য, আইনের শাসন, জবাবদিহি এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে না। একজন সাধারণ নাগরিকও দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখেন। সৎভাবে কর প্রদান, আইন মেনে চলা, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করা, শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, পরিবেশ রক্ষা করা এবং যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচনে সচেতন থাকা—এসব নাগরিক দায়িত্বও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনের অংশ।
বাংলাদেশকে কারও বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নয়, নিজের সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে হবে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকবে, বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে; কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ।
শেষ পর্যন্ত কোনো বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের হয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করবে না। তারা বন্ধু হতে পারে, অংশীদার হতে পারে, সহযোগিতা করতে পারে—কিন্তু পথ বেছে নিতে হবে বাংলাদেশকেই।
বাংলাদেশের মাটি, মানুষ, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ—সবকিছুর মালিক বাংলাদেশের জনগণ। তাই বাংলাদেশের ভাগ্যও বাংলাদেশই নির্ধারণ করবে।