Novel

আগুনের ছায়া

September 3, 2026

5
View
ধারাবাহিত উপন্যাস- পর্ব এক

অ্যধায়- এক

রাত তখন তিনটা ছুঁইছুঁই।

ঢাকা শহরের রাত যেন এক ঘুমন্ত দানব- সুপ্ত, কিন্তু অস্থির। নিঃশব্দতার বুকের নিচে থেমে আছে বহু গল্প, আর প্রতিটা গলির বাঁকে যেন শ্বাস নিচ্ছে সহিংসতা। পাশ ফিরলেই গর্জন করে ওঠে। পুরান ঢাকার গলি, ভেজা কুয়াশা, বেওয়ারিশ কুকুরের ডাক আর বিদ্যুৎহীন নিস্তব্ধতা — সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর শ্বাস বন্ধ করা পরিবেশ। পুরান ঢাকার সরু গলিগুলোতে অন্ধকার যেন আরও গাঢ়, আরও ভারী হয়ে ঝুলে আছে।  বাতাসে ঝুলে থাকা কুয়াশা শহরটাকে ধোঁয়ায় মোড়ানো রহস্যময় দুনিয়ায় রূপ দেয়।  ঘুমন্ত শহরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে জেগে থাকা কিছু পাপ।  আকাশে চাঁদ নেই, কিন্তু বাতাসে আছে কিছু অশুভ ইঙ্গিত—হঠাৎ ঠাণ্ডা হয়ে আসা হাওয়া, হঠাৎ থেমে যাওয়া কুকুরের ঘেউ-ঘেউ, আর দূরের গলির মাথায় দপ করে নিভে যাওয়া একমাত্র বাতিটি।  ফুটপাত ঘেঁষা একচালা চায়ের দোকান বন্ধ, রাস্তার বাতিগুলো অর্ধেক নিভে গেছে। ঘুমন্ত শহরের বুকের নিচে তখনও ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে সহিংসতার শ্বাস।

একটা পুরনো চারচাকা জীপ ধীরে ধীরে গড়িয়ে আসে গলির মাথায়, ইঞ্জিন বন্ধ করে এক অদৃশ্য সংকেতের মতো। ভেতর থেকে নামে চারজন— তারা কথা বলে না।  কেউ হাসে না।  তাদের চোখে প্রশিক্ষণের রেখা, চেহারায় পাথরের মতো নির্লিপ্ততা।  অস্ত্র তারা আনে বোঝার জন্য নয়, ব্যবহার করার জন্য।  তারা তার বন্ধু নয়, তারা তার প্রয়োজন। এই শহরে বন্ধুত্ব বিলাসিতা—বিশ্বাস মর্যাদা হারিয়েছে রক্তের নদীতে। জ্যাকেটের ভেতর থেকে একটা পিস্তল বের করে রাহুল ওজন করে হাতে। গ্লাভস পরে, মুখে মাস্ক টানে। তার বাম চোখের নিচে ছোট্ট একটা কাটা দাগ—অনেকদিন আগের। সে চোখে সানগ্লাস পরে—যদিও রাত।

পেছনের সিটে বসা এক ব্যক্তি বলে ওঠে— খবর পাকা।  লোকটা একাই আছে।  আমরা ঢুকি? 

রাহুল মাথা নাড়ায়।  না।  আমি একাই যাব। 

তিনটে শব্দ।  ঠান্ডা, ঠাণ্ডার থেকেও ঠাণ্ডা।

পাশে বসা দেহরক্ষী চুপ করে থাকে, কারণ তারা জানে রাহুল কম কথা বলে খুব বেশি হাসে না।  সে খুন করে।

রাহুল গলির ভেতর ঢোকে। একেকটা পা ফেলতেই জুতার নিচে পানির ছাঁট। দেয়ালের ভেজা পলেস্তারা রাহুলের ছায়াকে টেনে ধরে রাখতে চায়, যেন দেয়ালরাও জানে—আজ কিছু একটা ঘটবে। দেয়ালের ওপরের জংধরা লাইট জ্বলছে আর নিভছে। গলির শেষে একটা আধা-খোলা টিনশেড ঘর। হোসেন কদর ওখানেই আছে, একা। হোসেন কদর। একসময় বাবার ডানহাত ছিল। এখন বেচারা শত্রুদের খবর পাচার করে খুনের বিনিময়ে টাকা নিচ্ছে।
গ্যাংয়ের নিয়ম স্পষ্ট—বিশ্বাসঘাতকতা মানেই মৃত্যু। দরজার কাঁচে কুয়াশা জমেছে, জানালার ফাঁকে লাল আলো ফিল্টারের মতো পড়ে মুখে। হোসেন বসে আছে চুপচাপ, মদে ভেজা চোখে ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে।
শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে চেয়ে বলে, তুই… রাহুল?

রাহুল কিছু বলে না। তার মুখে মাস্ক, চোখে সানগ্লাস, পায়ের নিচে ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ। হোসেন উঠে দাঁড়ায়, আধা মাতাল কণ্ঠে বলে, শোন… আমি তোর আব্বার কোনো ক্ষতি করিনি। তুই জানিস, আমি তোকে কোলে খেলাইছি… রাহুল… আমি তোর চাচা…রাহুলের চোখে একটুও কাঁপুনি নেই। কিন্তু তার ভেতরে কাঁপে কিছু একটা পুরনো দৃশ্য ভেসে ওঠে হঠাৎ। ছোটবেলার এক দুপুর। মায়ের কোলে সে কাঁদছে। হোসেন তাকে একটা খেলনা দেয়, সে হাসে। তারপর আবার সে ফিরে আসে এই ঘরে। গন্ধটা আবার চেনা—মদের, স্যাঁতস্যাঁতে ঘামের, আর একটা অদ্ভুত পুরোনো রক্তের।

“তুই জানিস, আমি ভুল করসি। কিন্তু তোরা তো ভাই ভাই… যদি জুবায়ের ভাই টাকাই চায়, আমি… আমি ম্যানেজ কইরা দিব…”

রাহুলের আঙুল ট্রিগারে।

ঠাস!
একটা গুলি।

হোসেনের কণ্ঠ থেমে যায় মাঝপথে। দেয়ালে লেগে রক্ত ছিটকে পড়ে, একটা চুপচাপ জলীয় গন্ধ ভেসে আসে বাতাসে। হোসেনের দেহটা আস্তে ধসে পড়ে মেঝেতে। ঘরের নিঃশব্দতা এত ঘন হয়ে ওঠে যে, রাহুল নিজের নিঃশ্বাস শুনতে পায়। সে পিস্তল নামায় না। হাতটা ভিজে গেছে ঘামে। মেঝেতে রক্তের ছিটে। হোসেনের মুখ খোলা, চোখ অর্ধেক, ঠোঁটে ধরা আতঙ্ক। রাহুল কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে। তারপর হঠাৎ করেই তার মনে হয়, রক্তের গন্ধটা খুব চেনা। ঘর থেকে বেরিয়ে সে গলির বাতি পেরিয়ে আবার গাড়ির কাছে আসে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না।
নাভিদ শুধু বলে, হয়েছে?

রাহুল মাথা নাড়ে।

এই শহর তাকে একাধিক নামে চেনে। অগ্নিস্বপ্ন-এর উত্তরাধিকারী, জুবায়ের খানের ছেলে, বা কিছু মানুষের চোখে,
রক্তের কাব্যকার। গলির ভেতরে যে থাকবে, তার নাম আজ আর কেউ উচ্চারণ করে না। সে একজন ঘৃণিত বিশ্বাসঘাতক—অন্তত গ্যাংয়ের নিয়মে। একজন দেহরক্ষী ফিসফিস করে, স্যার, দরকার হলে আমরা ঢুকে ক্লিন করে ফেলি। রাহুল মাথা নাড়ে, না। একা যাব। সে হাঁটতে শুরু করে। প্রতিটি পা ফেলায় যেন মাটি চেপে রাখে বিস্ফোরণের শব্দ। তার চোখে নেই আতঙ্ক, কিন্তু ভেতরে একটা অদৃশ্য দহন। তার চোখে কোনো আফসোস নেই, কেবল একটা বিরক্তি। 

রাহুল কারও সন্তান, কারও বন্ধু, আবার কারও দুঃস্বপ্ন।  তাঁর বাবা জুবায়ের খান, এই শহরের অন্ধকার রাজনীতির মুকুটধারী এক কিংবদন্তি অপরাধপতি। কিন্তু রাহুল ঠিক তার বাবার মতো না— সে খুন করে, কিন্তু কবিতাও লেখে। সে মানুষ মারে, কিন্তু চাঁদের আলোয় একা ছাদে দাঁড়িয়ে নিঃশ্বাস ফেলে। সে জানে, এই দুনিয়ার মানুষ কেউ পবিত্র নয়। সে নিজেও না।

অন্যদিকে, ঢাকার একটা ফ্ল্যাটের ছাদে চুপচাপ বসে আছে আরেকজন—সায়রা আলতাফ। তার হাতে ধরা একটা পুরনো ক্যামেরা, চোখে গাঢ় কাজল, আর ঠোঁটে এক নিঃশব্দ অভিমান। পেছনে তাকিয়ে থাকে বিশাল অন্ধকার শহর— এ শহর তার বাবার তৈরি রাজ্য, ডন আলতাফ ভাই—কালো চক্র-এর একচ্ছত্র অধিপতি।

কিন্তু সায়রা শুধু তার মেয়ে না, সে নিজেই এক আগুন। নিজের গ্যাংকে সে ভয় পায় না, বরং গ্যাং যেন ভয় পায় তাকে। মেয়েরা এই জগতে শুধু সাজসজ্জার বস্তু—এই ধারণাকে সে দিনে দিনে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। সেদিন ছাদে বসে থেকে সে এক জিনিস লক্ষ্য করে—পুরান ঢাকার উত্তরে আজ একটু বেশিই টহল, অন্ধকার গলিতে ছায়ামূর্তি, আর টুকরো গুলির শব্দ।  পাশের ঘর থেকে ভেসে আসছে রেডিওর শব্দ—

“...পুরান ঢাকার গলি থেকে গুলিবিদ্ধ এক পুরুষের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রাত প্রায় ১২টার দিকে...”

সে এক মুহূর্ত থেমে শোনে। কিন্তু তার মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। এসব সংবাদের প্রতি সায়রার অনুভূতি শুষ্ক। কারণ, সে জানে, এই শহরে মানুষ মরে, কিন্তু মৃত্যু কখনো থামে না।

সায়রা আজকাল রাতে ঘুমায় না। না, তার ঘুম আসে না বলেই নয়, সে নিজে জেগে থাকতে চায়। তার ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা ঘড়িটা ধীরে ধীরে কাঁপতে থাকা নিঃশব্দে সময় ফুরিয়ে যাওয়ার মতো। সে জানে, সময় তাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আর কিছুদিন পরেই তার বিদেশ যাওয়ার কথা—স্কলারশিপ নিশ্চিত, প্যারিস ইউনিভার্সিটিতে। সে জানে, এখানে তার থাকার কিছু নেই। তবু মন কেমন করে।

সে জানালা খুলে দেয়। রাতের বাতাস মুখে লাগে ঠান্ডা ফোঁটার মতো। তেজগাঁওয়ের আকাশে অদ্ভুত এক রঙ—না পুরো কালো, না ধূসর, আলো আর অন্ধকারের মাঝামাঝি। তিনতলার ছাদে কিছু বিড়াল লাফাচ্ছে, নিচে বেওয়ারিশ কুকুর ডাকছে দূরে। তার চোখ আচমকা আটকে যায় একটা দৃশ্যপটে— সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলেকে দেখে। ছেলেটি সিগারেট ধরাচ্ছে। তার মুখ দেখা যাচ্ছে না ভালো করে, শুধু আগুন জ্বলার সঙ্গে তার চোখ একবার ঝিলিক দিল। সায়রা কুঁচকে তাকায়, যেন ছেলেটাকে চেনে।

সায়রা জানে না—সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে যে আগন্তুককে দেখছে, সে কিছুক্ষণ আগেই কারো বুক চিরে পিস্তল গুঁজে এসেছে। সে জানে না, এই ছেলেটার নাম রাহুল। সে কেবল ভাবে— এই চোখ আমি আগে কোথাও দেখেছি। কোথায়? হয়তো কোনো বাসে, হয়তো কোনো কফিশপে, হয়তো কোনো স্বপ্নে। অথবা কোনো মৃত্যুতে। সে জানালা বন্ধ করে দেয়। তার মাথায় আবার সেই থিসিস, আবার সেই প্যারিস, কিন্তু বুকের ভেতরে জমে থাকা একটা অনামা ভয়ের রেখা— যা এই শহরের মতো, জটিল, ছায়ায় ভরা।

তখন সে জানে না, এই রাতই সে রাত— যখন দুইটি জগৎ ধীরে ধীরে ছেদবিন্দুতে পৌঁছাতে শুরু করেছে। রাহুল খুন করেছে তার আত্মাকে, আর সায়রা হারাতে যাচ্ছে তার নির্ভরতা। দুইজনই ভাঙছে, দুইজনই জানে না—এই ভাঙনেই শুরু হবে এক গল্প। একটা প্রেম, যার ভিতরে আছে রক্ত আর আগুন।
(চলবে)…

Comments

    Please login to post comment. Login