
কনটেম্পোরারি অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল : বদরুদ্দিন উমর এবং তাঁর সীমাবদ্ধতা
এস. এম. শুআইব ত্বাসীন
একটি জাতির প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড নির্মিত হয় সেইসব বিরল ব্যক্তিত্বের হাতে, যারা ক্ষমতার তোষামোদ, প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা এবং চিন্তাগত আপসের তোয়াক্কা না করে আজীবন সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, সমাজ-বিশ্লেষণ এবং মেহনতি মানুষের লড়াইয়ে বদরুদ্দিন উমর ছিলেন তেমনই এক পরম প্রজ্ঞার বাতিঘর। আজ তাঁর প্রয়াণের প্রথম বার্ষিকী। গতবছর আজকের দিনে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তিনি কেবল ইতিহাসের একজন নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক ছিলেন না; বরং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস চর্চার মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথকে বিশ্লেষণ ও প্রভাবিত করার এক অনন্য স্রষ্টা।
বদরুদ্দিন উমরের বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রার প্রেক্ষাপট এবং চিন্তার বিবর্তন অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষনেতা, অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক, খেলাফতে রাব্বানী পার্টির সভাপতি এবং বর্ধমানের কাশিয়াড়ায় জমিদার পরিবারের সন্তান আবুল হাশিম ছিলেন বদরুদ্দীন উমর এর পিতা।
আবুল হাশিম এবং শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পর্ক ছিলো গুরু-শিষ্যের মতো। বদরুদ্দীন উমর এর বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের কিছু সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার জন্যই শেখ মুজিবের প্রসঙ্গ টানা।
১৯৭২ সালের ২২ জুলাই আবুল হাশিম পল্টন ময়দানে শাজাহান সিরাজ সমর্থিত ছাত্রলীগের সম্মেলনে দ্বিতীয় দিনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁর ভাষণে শেখ মুজিবের প্রতি উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন, "আজকের বাংলাদেশের জনপ্রিয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান যখন আপনাদের মতো যুবক ছিলেন তখন আমার কাছে রাজনৈতিক জীবন আরম্ভ করেন। তিন বছর আমি তাকে রাজনৈতিক কাজ শিখিয়েছি। তাকে অনেক উপদেশ দিয়েছি। এই বয়সে তাকে কয়েকটি উপদেশ দেওয়ার অধিকার আমার আছে। গত সাধারণ নির্বাচনের পর তার সঙ্গে সরাসরি আমার সাক্ষাৎ হয়নি। জীবনে অনেক দেখেছি, মানুষ যখন ক্ষমতায় আসে তখন হাজার হাজার চাটুকার ঘুরতে থাকে। তারা মানসিক উন্নতির জন্য আসে না, বৈষয়িক উন্নতির জন্য আসে। রাজনৈতিক স্বার্থ শিকারি এরা আপনাকে ও আপনার দলকে জনগণের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে।"
জীবদ্দশায় শেখ মুজিবুর রহমানও বহুবার আবুল হাশিমকে তাঁর গুরু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
একদিকে বদরুদ্দীন উমর ছিলেন প্রভাবশালী জমিদার বংশের সন্তান, অন্যদিকে শেখ মুজিবের বাবা শেখ লুৎফুর রহমান পেশায় ছিলেন একজন সেরেস্তাদার বা আদালতের সামান্য কেরানি।
মুজিবের সম্পূর্ণ উত্থান দেখেছেন উমর। মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে উমর যতটা সফল, একজন রাজনৈতিক হিসেবে তিনি ততটাই নিষ্ফল। অন্যদিকে উমরের বাবার পায়ের কাছে বসে থাকা শিষ্য শেখ মুজিব উমরের চোখের সামনেই হয়ে গিয়েছিলেন উপমহাদেশের সবচেয়ে সফলতম বুর্জোয়া রাজনৈতিক।
সম্ভবত এই সকল বিবেচনায় উমর তাঁর জীবদ্দশায় শেখ মুজিব প্রশ্নে বরাবরই সুপেরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগতেন! সেজন্যই হয়তো কারণে অকারণে সুযোগ পেলেই শেখ মুজিবকে সমালোচনা কিংবা তাচ্ছিল্য করতেন।
২৪ এর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে উমর বলেন, "এ দেশের জনগণ দু’বার তার (মুজিব) বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। একবার ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট, আরেকবার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবকে হত্যা করার পর একজন লোকও তার পক্ষে রাস্তায় নামেনি। তারপর ৫ আগস্ট সারা দেশের জনগণ শেখ মুজিবের মূর্তি ভেঙে ফেলল। তার বাড়িতে আগুন দিল। এটাও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে একটা রায়।"
৫ আগস্ট স্বৈরাচার হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিবের মুর্তি ভেঙে ফেলার ঘটনাকে উমর মুজিবের বিরুদ্ধে জনগণের রায় হিসেবে অবহিত করলেও এটি ছিল মূলত হাসিনার তৈরী করা ফ্যাসিবাদের আইকনের বিরুদ্ধে জনরায়।
২৪ এর গনঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশ বিরোধী একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল শেখ মুজিবকে নালিফাই করতে গিয়ে স্বঘোষিত নাস্তিক বদরুদ্দীন উমরকে কোট করেন। এই তথাকথিত নিরপেক্ষ মেধাবীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা শেখ মুজিব বাদে উমরের সকল আলাপ শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করবো। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বদরুদ্দীন উমরের একমাত্র সীমাবদ্ধতা।
আবুল হাসিম এর সন্তান হিসেবে পারিবারিক সূত্রে রাজনীতি ও রব্বানী মতাদর্শের ছোঁয়া নিয়ে তাঁর পথচলা শুরু হয়েছিল। দেশভাগের পর পরিবার বর্ধমান থেকে ঢাকায় চলে এলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি পড়ার সময়ে তাঁর ভাবাদর্শে এক মৌলিক রূপান্তর ঘটে। অক্সফোর্ডের মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক আবহ ও জ্ঞানচর্চার দিনগুলোতেই তাঁর মার্ক্সবাদী চিন্তাভাবনা পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। অক্সফোর্ডে আন্তর্জাতিক বামধারার ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পড়াশোনা তার মধ্যে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দায়বোধ তৈরি করে।
অক্সফোর্ড থেকে ফিরে তিনি কিছুদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন এবং পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে সেখানে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। সেসময় তিনি দেশের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বহু লেখা লেখেন। কিন্তু তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শোষকনীতি, গভর্নর আবদুল মোনেম খানের চরম রাজনৈতিক নিপীড়ন এবং একাডেমিক কাঠামোর অভ্যন্তরীণ বুর্জোয়া সীমাবদ্ধতার সামনে নতি স্বীকার না করে ১৯৬৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনার মতো সম্মানজনক পেশা থেকে পদ ত্যাগ করেন। পেশাগত জীবনের এই পদত্যাগ ছিল একজন প্রখ্যাত চিন্তাবিদের সুশীল সমাজের মোহ কাটিয়ে রাজপথে ও মেহনতি মানুষের বৈপ্লবিক লড়াইয়ে পূর্ণকালীন আত্মনিয়োগের এক বিরল ও নির্ভীক দৃষ্টান্ত।
উমরের বুদ্ধিবৃত্তিক অনুসন্ধানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ইতিহাসকে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ দিয়ে বিশ্লেষণ করার অতুলনীয় সক্ষমতা। ষাট ও সত্তরের দশকে যখন পূর্ব বাংলার জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কেবল একমুখী ভাবাবেগে চালিত হচ্ছিল, তখন তিনি 'সাম্প্রদায়িকতা' (১৯৬৬), 'সংস্কৃতির সংকট' (১৯৬৭) এবং 'সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা' (১৯৬৯), এই কালজয়ী ট্রিলজির মাধ্যমে জাতীয়তাবাদের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শ্রেণিবৈষম্য ও সামাজিক অসাম্যকে ব্যবচ্ছেদ করেন। পরবর্তীতে তাঁর মহাকাব্যিক তিন খণ্ডের গবেষণা পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি' ভাষা আন্দোলনের তথাকথিত মিথগুলোকে ভেঙে একে কৃষক-শ্রমিক-ছাত্রদের এক পূর্ণাঙ্গ আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এই কাজটি ছিল সমগ্র উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসচর্চার ধারায় এক যুগান্তকারী সংযোজন।
ইতালীয় চিন্তাবিদ সেই আন্তোনিও গ্রামশির পরিভাষায় যাকে 'অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল' বা 'জৈব বুদ্ধিজীবী' বলা হয়, বদরুদ্দিন উমর ছিলেন তাঁর এক প্রামাণ্য রূপ। তিনি এমন এক প্রাতিষ্ঠানিকতাহীন বুদ্ধিজীবী ছিলেন, যিনি বাস্তব গণআন্দোলন ও গণমানুষ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন ছিলেন না (জীবনের শেষভাগে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন)। তিনি 'বাংলাদেশ কৃষক ফেডারেশন' এবং 'বাংলাদেশ লেখক শিবির'-এর সভাপতি হিসেবে তৃণমূলের মেহনতি মানুষ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংগঠিত করেছেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে 'সংস্কৃতি' নামক রাজনৈতিক সাময়িকী সম্পাদনা এবং পরবর্তীতে ‘জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল’-এর সভাপতি হিসেবে সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কলম চালিয়ে গেছেন।
রাষ্ট্রীয় পদক ও ক্ষমতার প্রতি তাঁর নির্মোহ উদাসীনতা ইতিহাসে এক অনন্য নজির। ১৯৭৩ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৭৪ সালে ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার কিংবা রাষ্ট্র কর্তৃক দেওয়া একাধিক সর্বোচ্চ সম্মাননা, সবই তিনি নীতির প্রশ্নে নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যান করেছেন। পুরস্কার গ্রহণকে তিনি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার ও বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব হিসেবে দেখতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, জনগণের প্রকৃত বুদ্ধিজীবী কখনো রাষ্ট্রীয় তোষামোদ বা শাসকশ্রেণির অনুষঙ্গ হতে পারেন না।
আজ বদরুদ্দিন উমরের প্রয়াণের এক বছর পর বাংলাদেশের পরিবর্তিত ও অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাঁর অনুপস্থিতি আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। ক্ষমতার রাজনীতি যখন আদর্শিক জায়গা হারিয়ে কেবল ক্ষমতার অদলবদলে রূপ নেয়, তখন উমরের মতো নির্ভীক, স্পষ্টভাষী ও মেহনতি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবীই আমাদের সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখান। তিনি কায়িক অবয়বে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি, তাঁর চিন্তার সাহস এবং আপসহীন বৈপ্লবিক চেতনা আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলামোটর