Article

কাফির-ই-আজম' থেকে রাজনৈতিক প্রতীক: সুবিধাবাদী পাঠের ব্যবচ্ছেদ

September 15, 2026

13
View
  1. মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ উপমহাদেশের ২০ শতকের ভূ-রাজনীতির অন্যতম বিতর্কিত ও জটিল চরিত্র। তাঁর রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত দর্শন এবং পরবর্তীকালে তাঁর সৃষ্টি করা রাষ্ট্রের গতিপথ লক্ষ্য করলে এক গভীর বৈপরীত্য উন্মোচিত হয়। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু ভবনে তাঁর ছবি প্রদর্শনী এবং পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে তা অপসারণের ঘটনা আমাদের আবার সেই ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। জিন্নাহ কী কেবল এক পাকিস্তান রাষ্ট্রের রূপকার, নাকি আধুনিক ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার অন্যতম চরম শত্রু, কিংবা ধর্মের রাজনীতি ব্যবহার করে একটি অসাম্প্রদায়িক জীবন কাটানো এক কূটকৌশলী রাজনীতিক? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে তাঁর জীবনধারা এবং তৎকালীন কট্টরপন্থীদের দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে।

জিন্নাহর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য লুকিয়ে আছে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনযাপন ও তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার সংমিশ্রণে। লন্ডনের বিখ্যাত ইনার টেম্পল থেকে ব্যাটারিস্টার হয়ে বের হওয়া এই রাজনীতিক জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ইংরেজি ভাষা, পশ্চিমা জীবনচর্যা ও আধুনিক আইনের কাঠামোর মধ্যেই অবস্থান করেছেন। স্যুট-টাই, সুরা, ধূমপান এবং অত্যন্ত বিলাসপ্রিয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত জিন্নাহর সাথে কোনো অর্থেও তৎকালীন ঐতিহ্যবাহী ইসলামী মূল্যবোধের মিল ছিল না। বিখ্যাত মার্কিন ঐতিহাসিক স্ট্যানলি উলপার্ট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'জিন্নাহ অব পাকিস্তান' (১৯৮৪)-এ লিখেছিলেন: "খুব কম মানুষই ইতিহাসের গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে; তার চেয়েও কম মানুষ পৃথিবীর মানচিত্র বদলে দেয়; আর একটা নতুন জাতি-রাষ্ট্র সৃষ্টি করার কৃতিত্ব তো বলতে গেলে কারোরই নেই।" কিন্তু এই অলৌকিক রূপান্তরের পেছনের মূল হাতিয়ার ছিল, কখনও কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ আইনজীবী এবং কখনও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির এক ধূর্ত অনুঘটক হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ।

যে জিন্নাহ১৯২০-এর দশকে "হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের দূত" (Ambassador of Hindu-Muslim Unity) খেতাব পেয়েছিলেন (বিশিষ্ট নেত্রী ও কবি সরোজিনী নাইডু তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন), সেই জিন্নাহই ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবে 'দ্বিজাতি তত্ত্বের' জন্ম দেন।

অথচ ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, পাকিস্তান সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম ও কট্টরপন্থী ইসলামী দলগুলোর বড় একটি অংশ জিন্নাহকে তীব্র ঘৃণা ও কুৎসার চোখে দেখত।

দেওবন্দভিত্তিক জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ, মজলিস-ই-আহরার-উল-ইসলাম এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর মতো ব্যক্তিত্বরা জিন্নাহর চরম বিরোধী ছিলেন। জিন্নাহর অ-ইসলামী জীবনধারা, পশ্চিমা পোশাক ও আচার-আচরণের কারণে মজলিস-ই-আহরার তাঁকে ব্যঙ্গ করে 'কায়েদ-ই-আজম' (মহান নেতা)-এর পরিবর্তে 'কাফির-ই-আজম' (মহান কাফের) উপাধিতে ভূষিত করে। তাঁর বিলেতি জীবনযাপনের জন্য তাঁকে বলা হতো "ফিরিঙ্গি"।

সেসময় 'পশ্চিমের প্লে-বয়' হিসেবেও তিনি পরিচিত ছিলেন। শুধু তা-ই নয়, জিন্নাহ ও তাঁর মুসলিম লীগের প্রস্তাবিত পাকিস্তান রাষ্ট্রকে এসব কট্টরপন্থী দলগুলো বলতো 'নাপাকিস্তান', অর্থাৎ অপবিত্র ভূখণ্ড। তাঁদের মূল যুক্তিশাস্ত্র ছিল, জিন্নাহর মতো একজন অ-ইসলামী ভাবধারার লোক কখনোই একটি প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারেন না। ১৯৪৬ সালের গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে জিন্নাহকে রুখতে তারা নির্বাচন বর্জনের ডাকও দিয়েছিল।

তবে জিন্নাহর সবচেয়ে বড় দ্বিমুখী রাজনৈতিক চাল প্রকাশ পায় ১৯৪৭ সালের আগস্টে। পাকিস্তান সৃষ্টির চূড়ান্ত মুহূর্তে, ১৯৪৭ সালের ১১ আগস্ট, পাকিস্তান গণপরিষদে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা ছিল কট্টর ধর্মনিরপেক্ষ এক রাষ্ট্রভাবনার প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছিলেন, "আপনারা স্বাধীন; আপনারা আপনাদের মসজিদে যাবেন, মন্দিরে যাবেন কিংবা এই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্য যেকোনো উপাসনালয়ে যাবেন। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সাথে ব্যক্তির ধর্মের কোনো সম্পর্ক থাকবে না... সময়ের পরিক্রমায় হিন্দুরা আর হিন্দু থাকবে না, মুসলিমরা আর মুসলিম থাকবে না।ধর্মীয় অর্থে নয়, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে।"

যিনি দীর্ঘ এক দশক ধরে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ করলেন, রক্তক্ষয়ী দেশভাগের বীজ বপন করলেন, তিনি দেশ অর্জনের পরদিন ঘোষণা করলেন যে ধর্মনিরপেক্ষতাই নতুন রাষ্ট্রের মূলভিত্তি হবে! এই স্ববিরোধিতা ও রাজনৈতিক চাতুর্য ইতিহাসের এক চরম নাটকীয়তা। কিন্তু তাঁর এই শুভবুদ্ধির ঘোষণা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। জিন্নাহর এই ভাষণের পর তৎকালীন গোঁড়া আমলা ও রাজনৈতিক কট্টরপন্থীরা চরম ক্ষুব্ধ হয় এবং এই ভাষণটি যাতে রেডিও বা মিডিয়ায় প্রচারিত না হয়, সে জন্য আমলাতান্ত্রিক সেন্সরশিপ আরোপ করেছিল।

বাঙালি জাতির জন্য জিন্নাহর ইতিহাস আরও বেশি তিক্ত। ১৯৪৮ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এবং রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে তিনি যখন দম্ভের সাথে ঘোষণা করেন, "উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা", তখন তিনি বাংলা ভাষী বিপুল জনগোষ্ঠীর ভৌগোলিক ও আত্মপরিচয়ের অধিকারকে সরাসরি অস্বীকার করেছিলেন। বাঙালি জাতি জিন্নাহর এই একনায়কত্বকে গ্রহণ করেনি এবং কার্জন হলের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তেই শিক্ষার্থীরা 'নো নো' ধ্বনিতে প্রতিবাদ জানিয়েছিল। সেই প্রতিবাদই বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বকে বঙ্গোপসাগরে বিসর্জন দিয়েছিল।

জিন্নাহর জীবনের শেষ অধ্যায়ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডিতে ভরা। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায় কোয়েটা থেকে করাচি নিয়ে আসার পর করাচির তীব্র গরমে রাস্তায় অ্যাম্বুলেন্স বিকল হয়ে পড়ে থাকে। আমলাতান্ত্রিক অবহেলা ও দীর্ঘ অপেক্ষার পর জিন্নাহকে হাসপাতালে আনা হলেও তিনি সেদিনই মারা যান। পরবর্তীতে তাঁর বোন ফাতেমা জিন্নাহকেও পাকিস্তানের সামরিক-আমলাতান্ত্রিক চক্রান্তের শিকার হয়ে রাজনীতিতে কোণঠাসা হতে হয়। পরবর্তীতে জেনারেল আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ালে, তৎকালীন ধর্মভিত্তিক দলগুলো রাজনৈতিক স্বার্থে ফাতেমা জিন্নাহর বিরুদ্ধে "নারী নেতৃত্ব ইসলামে হারাম" বলে ফতোয়া জারি করেছিল।

আজকের বাংলাদেশে যে গোষ্ঠীগুলো জিন্নাহকে পুনর্মূল্যায়ন বা পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। যেমন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বা কট্টরপন্থী দলসমূহ তাদের এই অবস্থান চরম এক রাজনৈতিক ছদ্মবেশ ও সুবিধাবাদ। যে জিন্নাহর ব্যক্তিগত জীবনযাপন, ধূমপান, বিলেতি খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক সংস্কৃতিকে তারা ঘৃণার চোখে দেখে, কেবল 'ভারত-বিরোধিতা' বা ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের সুবিধার্থে সেই তাঁকে প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করা ঐতিহাসিকভাবে এক মহাভণ্ডামি। তিনি কোনো ইসলামী ভাবাদর্শের মহান পুরুষ বা আধ্যাত্মিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা কূটকৌশলী রাজনীতিক, যিনি ক্ষমতা ও লক্ষ্য অর্জনে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করেছিলেন।

ইতিহাসকে অন্ধ আবেগ কিংবা সুবিধাবাদী চশমা দিয়ে দেখা উচিত নয়। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে জানতে হবে তাঁর সব স্ববিরোধিতা, সফলতা, ভুল এবং তাঁর কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে। ঘৃণা কিংবা অন্ধ ভক্তির উর্ধ্বে উঠে ইতিহাসকে নিরাবেগভাবে পাঠ করা জরুরি।

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

লাভ রোড, তেজগাঁও

Comments

    Please login to post comment. Login