মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান সুমনের বয়স তখন পঁচিশ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো সিজিপিএ নিয়ে পাস করার পর ভেবেছিল, চাকরিটা বোধহয় খুব দ্রুতই পেয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মাসের পর মাস যায়, সুমনের জুতো ক্ষয় হয়, কিন্তু একটা পিয়নের চাকরিও কপালে জোটে না।সকাল হলেই সুমন একটা ফাইল বগলদাবা করে বের হয়ে যেত। ইন্টারভিউয়ের টেবিলগুলোতে যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হতো, "আপনার কোনো অভিজ্ঞতা আছে?" সুমন মনে মনে হাসত। যে ছেলেটা মাত্র পড়াশোনা শেষ করেছে, সে অভিজ্ঞতা পাবে কোথায়? ঢাকা শহরের তীব্র জ্যাম আর চড়া রোদে ঘুরতে ঘুরতে সুমনের মনের ভেতরের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে মলিন হতে শুরু করে।বাড়ির পরিস্থিতিও দিন দিন জটিল হচ্ছিল। বাবা অবসরে গেছেন, ছোট বোনের কলেজের বেতন বাকি। চায়ের দোকানে আড্ডা দিতে গেলে বন্ধুরা যখন নিজেদের নতুন চাকরি বা প্রমোশনের গল্প করত, সুমন তখন মাটির দিকে তাকিয়ে থাকত। পকেটে মাত্র দশ টাকার একটা নোট নিয়ে পুরো দিন পার করার যে কী গ্লানি, তা কেবল সুমনই জানত। সবচেয়ে বড় আঘাতটা এলো তখন, যখন দীর্ঘ চার বছরের ভালোবাসার মানুষটি অন্য কারো সাথে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে বাধ্য হলো—কারণ সুমন "বেকার"।এক বিকেলে বুড়িগঙ্গার পাড়ে বসে সুমন যখন জীবনের সব আশা হারিয়ে ফেলার চরম মুহূর্তে, তখন তার চোখ গেল এক বৃদ্ধের দিকে। বৃদ্ধটি ভাঙা প্লাস্টিকের বোতল কুড়াচ্ছিলেন, কিন্তু তার মুখে ছিল এক অদ্ভুত প্রশান্তি। সুমন ভাবল, "আমি শিক্ষিত হয়েও কেন শুধু অন্যের অধীনে গোলামি করার জন্য বসে আছি? আমার নিজের কি কোনো যোগ্যতা নেই?"সেদিনই সুমন সিদ্ধান্ত বদলালো। সে চাকরির পেছনে ঘোরা বন্ধ করে দিল। মায়ের জমানো মাত্র কয়েক হাজার টাকা এবং নিজের একটা পুরোনো ল্যাপটপ নিয়ে সে ফ্রিল্যান্সিং এবং গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ শেখা শুরু করল। প্রথম তিন মাস কোনো আয় ছিল না, শুধু রাত জেগে চোখের জল আর কঠোর পরিশ্রম। বাড়ির মানুষও ভাবত ছেলেটা এবার পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে।কিন্তু চতুর্থ মাসে সুমনের ভাগ্যের চাকা ঘুরল। ইন্টারনেটে এক বিদেশি ক্লায়েন্টের লোগো ডিজাইন করে সে প্রথম ১০০ ডলার আয় করল। সেই শুরু। সুমনের কাজের দক্ষতা আর সততা তাকে অল্প দিনেই ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে একজন নামকরা ডিজাইনার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।আজ সুমন আর বেকার নয়। দুই বছর পর সুমনের নিজের একটি ছোট আইটি ফার্ম আছে, যেখানে তার অধীনে আরও দশজন তরুণ কাজ করছে। যারা একসময় তাকে "বেকার" বলে উপহাস করত, আজ তারাই সুমনের সাফল্যের গল্প শোনে। সুমন বুঝেছে, জীবন কখনো থামে না; একটা দরজা বন্ধ হলে, নিজের যোগ্যতায় অন্য দশটা দরজা খুলে নেওয়া যায়।