🌧️ ঝালমুড়িওয়ালা
পর্ব–৫ | শেষ পর্ব
“যে স্বপ্ন বাবা রেখে গিয়েছিল”
মোস্তফা সাহেবের ঘরে সেদিন অদ্ভুত নীরবতা।
রহিম চুপ করে বসে ছিল। বাবার পুরোনো ঘড়িটা তার হাতের মুঠোয়।
মোস্তফা সাহেব ধীরে ধীরে বললেন,
— “রহিম, তোমার বাবা খারাপ মানুষ ছিল না। বরং অনেক মানুষের বিপদে সে নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে সাহায্য করত।”
রহিম নিচু গলায় বলল,
— “তাহলে আব্বার সঙ্গে আসলে কী হয়েছিল?”
মোস্তফা সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
— “সব সত্য হয়তো কোনোদিন পুরোপুরি জানা যাবে না। দুর্ঘটনাটা নিয়ে সন্দেহ ছিল, কিন্তু নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তোমার বাবা চাইত না তার পরিবার ভয় নিয়ে বাঁচুক।”
রহিমের চোখ ভিজে উঠল।
— “তাহলে আম্মু আমাকে এতদিন কিছু বলেনি কেন?”
— “কারণ সে তোমাকে হারানোর ভয় পেয়েছিল।”
কথাটা শুনে রহিম আর কিছু বলতে পারল না।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে মায়ের পাশে বসে বাবার পুরোনো ঘড়িটা দেখাল।
মা অনেকক্ষণ ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আস্তে করে বললেন,
— “তোর আব্বা তোকে একটা কথা বলতে বলেছিল।”
রহিম অবাক হয়ে তাকাল।
— “কী কথা?”
মা চোখ মুছে বললেন,
— “সে বলেছিল, ‘রহিম যেন শুধু সংসার টানতে টানতে নিজের জীবনটা হারিয়ে না ফেলে।’”
রহিমের বুকটা কেঁপে উঠল।
মা আবার বললেন,
— “তোর আব্বার একটা স্বপ্ন ছিল। ছোট্ট একটা দোকান করবে। দোকানের সামনে তোর নাম লেখা থাকবে। আর আমার জন্য একটা চেয়ার থাকবে।”
রহিম মৃদু হেসে কাঁদতে লাগল।
— “আব্বা সত্যিই এসব ভাবত?”
— “হ্যাঁ। অনেক রাত পর্যন্ত বসে সে সেই দোকানের কথা বলত।”
সেই রাতেই রহিম একটা সিদ্ধান্ত নিল।
সে আর শুধু বেঁচে থাকার জন্য কাজ করবে না।
সে বাবার স্বপ্নটাকে বাঁচাবে।
কয়েক মাস পর...
রাস্তার পাশে ছোট্ট একটা দোকান দেখা গেল।
দোকানের সামনে বড় করে লেখা—
“আমেনার ঝালমুড়ি”
নিচে ছোট্ট করে—
“করিম মিয়ার স্মৃতিতে”
দোকানের এক পাশে রাখা একটা পুরোনো চেয়ার।
সেখানে বসে আছেন আমেনা বেগম।
আর দোকানের ভেতরে ব্যস্ত রহিম।
মুড়ি, চানাচুর, পেঁয়াজ, মরিচ, ধনেপাতা—সবকিছু মিশিয়ে সে ঝালমুড়ি তৈরি করছে।
একজন ছোট ছেলে এসে বলল,
— “ভাইয়া, আমার কাছে পুরো টাকা নেই।”
রহিম হেসে বলল,
— “কোনো সমস্যা নেই। আজকে তোর জন্য আমি বানিয়ে দিচ্ছি।”
ছেলেটা হাসল।
দূর থেকে মা তাকিয়ে রইলেন।
তার চোখে পানি।
কিন্তু এবার সেই পানি শুধু কষ্টের ছিল না।
সেখানে ছিল গর্ব।
সময় চলে গেল।
মায়া পড়াশোনা চালিয়ে গেল।
রহিম নিজের কষ্টের টাকা থেকে তার পড়ার খরচ জোগাড় করত।
একদিন মায়া বই হাতে দোকানে এসে বলল,
— “ভাইয়া, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হব।”
রহিম হেসে বলল,
— “হবি। তুই অবশ্যই হবি।”
মায়া বলল,
— “আর তুমি?”
রহিম একটু থেমে বলল,
— “আমি?”
— “তুমি কী হবে?”
রহিম দোকানের সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল।
তারপর বলল,
— “আমি? আমি তো ঝালমুড়িওয়ালাই থাকব।”
মায়া হেসে বলল,
— “না ভাইয়া। তুমি শুধু ঝালমুড়িওয়ালা না।”
রহিম অবাক হয়ে তাকাল।
মায়া বলল,
— “তুমি আমাদের স্বপ্নওয়ালা ভাইয়া।”
রহিম কিছু বলতে পারল না।
কয়েক বছর পর...
মায়া সত্যিই ডাক্তার হলো।
প্রথমবার সাদা পোশাক পরে সে যখন দোকানের সামনে দাঁড়াল, রহিম অনেকক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— “তোর আব্বা আজ থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশি হতো।”
মায়া চোখের পানি মুছে বলল,
— “ভাইয়া, আব্বা আমাদের ছেড়ে যায়নি।”
রহিম চুপ করে রইল।
মায়া দোকানের ভেতরের দেয়ালের দিকে তাকাল।
সেখানে বাবার পুরোনো ঘড়িটা ঝুলছে।
ঘড়িটা আর চলে না।
তবুও রহিম সেটাকে ঠিক সেখানেই রেখেছে।
কারণ কিছু জিনিস সময় দেখানোর জন্য থাকে না।
মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য থাকে।
সন্ধ্যা নামল।
দোকানের সামনে বাতি জ্বলল।
আমেনা বেগম তার পুরোনো চেয়ারে বসে আছেন।
মায়া পাশেই দাঁড়িয়ে।
আর রহিম একজন বৃদ্ধ মানুষকে এক প্যাকেট ঝালমুড়ি এগিয়ে দিল।
বৃদ্ধ টাকা দিতে চাইলে রহিম বলল,
— “থাক, চাচা। আজ আমার পক্ষ থেকে।”
বৃদ্ধ হাসলেন।
রহিম আকাশের দিকে তাকাল।
মনে হলো, কোথাও একজন বাবা হয়তো দাঁড়িয়ে আছেন।
হয়তো বলছেন—
“আমার ছেলে হেরে যায়নি।”
রহিম চোখ বন্ধ করল।
তারপর ধীরে ধীরে হাসল।
একদিন সে ছিল অভাবের কাছে হারতে বসা এক ছেলে।
আজ সে নিজের পরিবারের স্বপ্নের পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
তার হাতে এখনো ঝালমুড়ির কাগজের ঠোঙা।
কিন্তু সেই ঠোঙার ভেতর শুধু মুড়ি, চানাচুর আর মশলা নেই।
এর ভেতরে আছে—
এক বাবার স্বপ্ন,
এক মায়ের ত্যাগ,
এক বোনের ভবিষ্যৎ,
আর একজন ছেলের না-হারা লড়াই।
শেষ কথা
জীবন কখনো কখনো আমাদের কাছ থেকে অনেক কিছু নিয়ে নেয়।
কিন্তু ভালোবাসা যদি পাশে থাকে, মানুষ আবারও দাঁড়াতে পারে।
কারণ কিছু মানুষ চলে যায়,
কিন্তু তাদের স্বপ্ন থেকে যায়।
আর সেই স্বপ্নই একদিন একটা ছোট্ট দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা হয়ে যায়—