শনিবার। সকাল থেকেই তোরজোড় চলছে ঘরে-বাইরে। আমি নিজ কক্ষের বিছানায় বসে জানালা দিয়ে সেই ব্যস্ততা প্রদক্ষিণ করছি। বলাবাহুল্য চোখের দেখা দেখছি। মনোযোগ এসব আয়োজনের আশপাশেও নেই। অনুভূতিহীন হৃদয় আর স্বপ্নহীন শূন্য চোখে জগতের সবকিছুই সহজ।
তাই আমার কাছেও এখন আর কোনো ঘটনার বিশেষ ব্যাখা নেই। জটিল, সরল,সুখ, দুঃখ উপলব্ধির ঊর্ধ্বে চলে গেলে যেমনটা উপলব্ধি হয়!
বৈঠক ঘরের রঙ চকচকা সোফায় বসে আছেন কোট-ট্রাই পরা ডাক্তার পাত্র। অস্বস্তিতে কিছুক্ষণ পর পর চোখ-মুখের ঘাম মুছছেন। হাতের শক্ত বাঁধনে মুচড়ে যাওয়া ব্যবহারিত টিস্যু।
তাঁর পাশেই গুরু-গম্ভীর মুখাবয়বে বসে আছেন বয়স্ক একজন। উনার এমন বেজার মুখশ্রী র কারণ কী জানি না। বিপরীত পাশে বসেছেন বাবা,মামা আর মামি। মামার চোখে-মুখে গৌরবময় আভা। এমন সুপাত্র তিনি খোঁজে এনেছেন কিনা!
এতগুলো উৎসুক মানুষের মাঝখানে বসে আছি আমি। অসাড় অনুভূতি আর স্থির দেহ নিয়ে। দুই চোখ আর হাতের কম্পিত আঙুল ছাড়া পুরো আমি অনড়। আমার মনে হচ্ছে আমি নিজেকে নিয়ে সওদা করতে বসেছি।
আমার ভালোবাসা-মন-অনুভূতি বিসর্জন দিয়েছি আজ থেকে পাঁচ মাস আগে। সেই জোছনা রাতের ঠিক ১৪ দিন পর, এক ঘোর অমাবস্যার রাতে।
কালো মেঘে ডাকা আকাশ, ভ্যাপসা গরম, পরাণের ব্যথা আর ভয়ে জড়োসড়ো হৃদয় টেনে নিয়ে গিয়েছিলাম মুহিনের কাছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে নদীর পাড় ধরে প্রাণপণ ছুটে, অসংখ্য বার হুঁচট খেয়ে, নিজেকে ভালোবাসার কাছে সমর্পণ করতে গিয়েছিলাম। শেষ ১৪ দিন ঘরবন্দী ছিলাম আমি।
এই চৌদ্দ দিন আমার কাছে ১৪ যুগেরও বেশি। এরমধ্যে মুহিনের সাথে কোনো রকম যোগাযোগের সুযোগ হয়নি। মা আর ঈশ্বর ছাড়া জগতের কারো সাক্ষাৎ আমি পাইনি। এমনকি বাবা,ভাই,ময়ূরাক্ষী কিছুর ই না। মা আমার রুমে এসে খাবার দিয়ে যেতেন। পুরো ঘর স্তব্ধ সারাক্ষণ। যেন প্রাণহীন, জনহীন বাড়ি। বাইরের দোকানে হৈচৈ, গাড়ির শব্দ, পাড়ার ছেলে-মেয়েদের হড্ড গোল, রান্না ঘরের তালা-বাসনের শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেতাম না।
বাবা আগে ঘরে ঢুকার আগেই আমার নাম ধরে উচ্চস্বরে ডাকতেন। ভাই নিজের রুমে না গিয়ে, আগে আমার সাথে দেখা করতে আসতো। খাবার টেবিলে আমাকে ছাড়া বাবা খেতে পারতেন না। ময়ূরাক্ষী আমি ছাড়া কারো হাতে খায়না। মন্দিরে আমার গীতা পাঠ না শুনলে কাকা-কাকীদের মন শান্ত হয়না। এ-ই সকল চেনাজানা রুটিন হঠাৎ করেই বদলে গেলো।
যেন সবাই আমার অস্তিত্ব কে অস্বীকার করতে ব্যস্ত। আমি নামক জীব কে এড়িয়ে যেতে এতো ব্যস্ততা! না-কি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে চলেছে সবাই?
এতসব যন্ত্রণার ভিড়ে আমার হৃদয় হন্ন হয়ে মুহিন কে খোঁজে। এই চৌদ্দ দিন আমার বেঁচে থাকার একমাত্র অনুপ্রেরণা ছিলো পুড়ে যাওয়া চিঠির অংশটা। ঐ চিঠি টা আটকে ছিলো পরাণের নিশানা হয়ে। মুহিনের অনুভূতি, অনিন্দ্য কন্ঠ, অপার মায়া, ভালোবাসা সবকিছু আমি একটা পোড়া চিঠির মাঝে পাচ্ছিলাম। যত পড়ি, তত ডুবে যাচ্ছিলাম মুহিনের ভালোবাসায়। প্রতিটি শব্দ শরৎ প্রভাতের জ্যোতির মতো আভা দিচ্ছিল আমায়।
শেষ আংশের পরাণে' শব্দ টা শীতের মিষ্টি রোদের মতো করুণ হাসি মেলে জড়িয়ে পড়ছিল আষ্টেপৃষ্টে।
অবাধ্য অশ্রু, একাকিত্ব, শুষ্ক হৃদয়,পোড়া চিঠি আমাকে পুরোপুরি ভাবে বুঁদ করে ফেলে মুহিনের পরাণে। বিরাম হীন বর্ষণ চলতে থাকে হৃদয়ে।
অতঃপর সেই অমাবস্যার রাতে, মা যখন আমাকে খাবার দিতে এলো, মায়ের ফোন বেজে ওঠে পাশের রুমে। মা আমার রুমের দরজা খুলা রেখেই কল রিসিভ করতে যায়। ঠিক সেই সুযোগটা কাজে লাগাতে, আমি একটা সেকেন্ডও অপচয় না করে ছুটে বের হয়ে যায় ঘর থেকে।
রাস্তা না ধরে, ব্রিজের নিচ দিয়ে, নদীর পাড় ধরি।
জাত-ধর্ম, পরিবার সব পেছনে ফেলে মুহিনের ঠিকানায় ছুটি।
কাঁদামাখা এলোমেলো পায়ে মুহিনদের দরজায় কড়া নাড়ি। দরজা খুলে দেন মুহিনের মা। শীতল শান্ত কন্ঠে তিনি আমায় ঘরে ঢুকতে বলেন।
লজ্জা রাঙা জবা ফুলের মতো মেয়েটি হঠাৎ অসম্ভব নির্লজ্জ হয়ে উঠে। হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ি।
মুহিন তখন পড়ার টেবিলে। আমাকে দেখে দুই ঠোঁট নেড়ে একটা শব্দ উচ্চারণ করলো, তুমি!
আমার পায়ের টাল সামলানো দায় তখন।
মুহিনের বুখে আঁচড়ে পড়তে ইচ্ছে করছে। হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। নিজের সমস্ত কষ্ট ধুয়ে দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু মুহিনকে অমন স্থির দেখে আমি নির্বাক হয়ে বসে পড়ি পাশের চেয়ারে।
আন্টি এক গ্লাস জল এগিয়ে দেন। তারপর দুই বৃদ্ধা ঘরে প্রবেশ করেন। উনারা সম্পর্কে মুহিনের কি হয় আমার জানা নেই। কিন্তু উনাদের উপস্থিতি আর কথা শুনে বুঝলাম উনারা সবটা অবগত।
এক বৃদ্ধা বললেন, তুমি মুহিনরে বিয়া করতে চাও?
আমি ঝটপট হ্যাঁ উত্তর জানায়। যেন এটাই আমার একমাত্র আশার আলো।
অপর বৃদ্ধা বললেন, তবে তোমারে ধর্মান্তরিত হতে হবে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে পারবা?
আমি মুহিনের দিকে তাকালাম। নিরুত্তর, স্থির চোখ দু’টি বইয়ের দিকে চেয়ে আছে। চোয়াল শক্ত।
আমি বেশিক্ষণ সময় নিলাম না। মুহিনকে হারানোর ভয়ে আমি ধর্ম বিসর্জনের উত্তর জানালাম।
"আমি বিয়ে করতে চাই। ধর্ম ত্যাগেও রাজি।"
আমি পরিবার, জাত,ধর্ম সব বিসর্জনে যখন প্রস্তুত। যখন নিজের অস্তিত্বের কারাবাস দিয়ে লুটিয়ে পড়ে অন্যকে চাইলাম। ভালোবাসা কে বেছে নিতে চাইলাম
ঠিক তখনি মুহিন বলল, আমি বিয়ে করবো না।
আমি বিশ্বাস করলাম না। অসংখ্য বার ভিক্ষা চাইলাম, ভাবার সুযোগ দিলাম, ধর্ম ছাড়ার আশ্বাস দিলাম। আমাদের ভালোবাসার সুন্দর মূহুর্তগুলো বারবার মনে করিয়ে দিলাম। ভালোবাসা নিয়ে চরম বেহায়াপনা করলাম। আমাদের একসাথে দেখা স্বপ্নগুলোর কথা বললাম।
কিন্তু মুহিনের এক কথা সে বিয়ে করবে না।
যে ভুলে যায়, তাকে মনে করিয়ে দেওয়া সহজ। কিন্তু যে সব মনে রেখে, নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকে,তাকে কিছুই মনে করানো যায় না। মুহিন আমাকে বিয়ে করতে অপারগতা জানায়। কিন্তু কোনো কারণ সে ব্যাখা করলো না। আমিও ব্যাখ্যা চাওয়ার মতো শব্দ খুঁজে পেলাম না।
আমার চোখ তখন অন্ধকার দেখছে। ঘূর্ণিত ঝাপ্সা দেওয়ালের চারপাশে শুধু দেখছিলাম অস্পষ্ট মুহিনের মুখ ছায়া আর বিয়ে করবো না শব্দের প্রতিধ্বনি। তারপর আমি কিছু জানি না।
পর দিন সকাল দশটায় ঘুম ভাঙলে নিজেকে আবিষ্কার করি নিজের ঘরে। আমি কীভাবে বাড়ি এলাম,কে আনলো,কি ঘটেছিলো কিছুই জানি না। জানতেও চাইলাম না।
শুধু সকাল টা অন্যরকম ভাবে শুরু করলাম। স্নান সেরে মন্দিরে গেলাম, খাবার টেবিলে চুপচাপ খেলাম,বারান্দার গাছের যত্ন নিলাম,পড়তে বসলাম।
নিজের রুমটা মনের মতো করে গোছালাম অনেক দিন পর। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে ভালো ভাবে দেখলাম। তারপর একটা নতুন জামা পড়ে, হালকা সেজে ভাইকে বললাম, আজ আমাকে বাইরে খাওয়াতে নিয়ে যাবে? ভাইয়া সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলো।
তারপর চঞ্চল আমি অন্য আমি তে রুপান্তরিত হতে শুরু করি ধীরে ধীরে। কাজ,পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশন শুরু করি। মানে পুরোপুরি ব্যস্ত একটা জীবন। প্রয়োজনের বাইরে না সময় থাকে,না কারো সাথে কথা থাকে।
আর আজ এখন বসে আছি পাত্র পক্ষের সামনে। সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে নিয়েছি। বিয়ে টা আমি করেই নিব। যত দ্রুত সম্ভব।
পাত্র পক্ষেরও আমাকে পছন্দ হয়েছে। সব ঠিকঠাক।
দুর্গাপূজার পরে বিয়ে।
---------------------------------
বিয়ের পাঁচ বছর পর গ্রামে এসেছি। আমার বিয়ের পর পর আমার পুরো পরিবার ঢাকায় চলে আসে। গ্রামে বাড়ির সবার যাতায়াত থাকলেও, আমি কোনো যোগাযোগ রাখিনি কারো সাথে। গত সোমবার আমার ঠাকুমা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছে। তাই বাধ্য হয়ে আসা। একদিন বিকেলে হাঁটতে বের হলে, রাজীব ভাইয়ার সাথে দেখা হয়। রাজীব ভাই মুহিনের খুব কাছের বন্ধু। এতো বছর পরে রাজীব ভাই কে পেয়ে মুহিনের কথা জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
মুহিনের কি খবর রাজীব ভাই? কি করছে এখন?
রাজীব ভাই কিছুটা অবাক হয়ে বলল, মুহিনকে কোথায় পাবো? মুহিনের খবর জানো না?
না তো। আমার কারো সাথেই যোগাযোগ ছিলো না। কেন কি হয়েছে? আমি সত্যি ই কিছু জানি না রাজীব ভাই।
তোমার বিয়ের এক সপ্তাহ পরেই মুহিন দেশ ছাড়ে। বলেছিল কুয়েত যাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার পর কারো সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি। মুহিনের খোঁজ বলতে এতটুকুই জানে সবাই।
ফেসবুক, টুইটার সবখানে কতভাবে চেষ্টা করলাম সবাই। কিন্তু মুহিনের কোনো হদিস মিলেনি। মুহিনের মা তো প্রায় পাগল হয়ে গেছে। পাঁচ বছর ধরে একইভাবে ছেলের জন্য আহাজারি আর অপেক্ষা করে যাচ্ছে।
সেদিন আমি রাজীব ভাই কে সাথে নিয়ে আন্টির সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। জীর্ণ শীর্ণ অবস্থায় আন্টি পথের দিকে চেয়ে বসে ছিলেন। আমাকে দেখে ম্লান হেঁসে বলেন, তুমি এসেছো ঋধি? মুহিন কই?
আমার নিরব নির্গত অশ্রু দেখে আন্টি আশাহত হন। তারপর ঘরে ছুটে যান।
একইভাবে ছুটে এসে আমার হাতে একটা ডাইরি দেন। এই ডাইরি আমার পরিচিত। আমাদের সম্পর্কের শুরু থেকে প্রতিটি ঘটনা মুহিন এখানে লিখে রাখতো। আমি মাঝে মাঝে নিয়ে পড়তাম। এত নিঁখুত ভালোবাসার বর্ণনা পড়ে বারবার মুগ্ধ হতাম।
ডাইরির একদম শেষ পাতায় লেখা,
১৪ দিন পর আজ তোমায় দেখলাম। তোমার উপস্থিতি অনুভব করলাম। অথচ না দেখার ভান করে বইয়ের দিকে চেয়ে থাকতে হলো। তোমায় এতটা কাছে পেয়েও চোখে চোখ রাখতে না পারার যন্ত্রণা যে কি ভয়াবহ ঋধি। মৃত্যু কে অসংখ্য বার আলিঙ্গন করলেও এতটা কষ্ট হবে না। তখন আমার হৃদয়ের রক্তক্ষরণ যদি দেখতে পেতে তুমি মূর্ছা যেতে। জ্ঞান হারাতে। জ্ঞান তুমি ঠিকই হারিয়েছিলে ঋধি। আমার হৃদয়ের রক্তকরণ দেখে নয়,আমার প্রত্যাখান দেখে।
ঋধি, সেদিন তুমি যখন বললে ধর্ম ছেড়ে দেবে, তখন আমার সবচেয়ে বেশি ভয় হয়েছিল। আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য তোমার ঈশ্বর, তোমার বাবা-মা, তোমার ঘর কিছুই চাইনি। আমি শুধু তোমাকে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে পাওয়ার বিনিময়ে যদি তোমাকে তোমার নিজের জীবন থেকে সরিয়ে দিতে হয়, নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিতে হয়, তাহলে সারাজীবন আমি তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারতাম না। নিজের কাছে তোমার সর্বস্ব বিনাশকারী হয়ে কি করে বাঁচতাম বলো? সেভাবে তোমাকে পেলে, সেই পাওয়া আমার কাছে হারার চেয়েও ভয়ংকর।
তোমার ধর্ম তোমার বিশ্বাস। আমার ধর্ম আমার বিশ্বাস। কিন্তু ত্যাগ টা কেন একা তুমি করবে। আমার জন্য তুমি কেন সব হারাবে? তাই সেদিন নিজেকে চরম নিষ্ঠুর ভাবে তোমার সামনে উপস্থাপন করেছিলাম। আমার পরিবার তোমাকে চেয়েছিল। তাঁরা তখন আমার ভালোবাসার চেয়ে বেশি চেয়েছিল একজন ধর্মের মানুষ বাড়াতে। লোক সমাজে ছড়াতে চেয়েছিল, তাদের ছেলের জন্য এক হিন্দু মেয়ে মুসলমান হয়েছে। তোমার বিশ্বাস মুসলিম ধর্মের প্রতি কতটা খাঁটি তাঁরা সেটা বুঝতে চাইনি। তুমি তো ইসলাম ধর্মের টানে মুসলমান হতে চাওনি, তুমি ভালোবাসার টানে কিছু পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছিলে। প্রয়োজনে আমরা যেভাবে পোশাক পাল্টায়, তুমিও আমায় পেতে ধর্ম পাল্টাতে রাজি হয়েছিলে। তাতে করে ধর্ম বদলালেও তোমার মন,বিশ্বাস কখনো বদলাতো না। বরং তুমি কষ্ট পেতে,নিজের পরিবার-ধর্ম হারাতে। আমি তাই তোমায় বিয়ে করতে অমত করি। কিন্তু আমার সেই অমত কে তুমি প্রত্যাখান মনে করলে। সেই কষ্টে তুমি আমার সামনে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলে। পাগলপ্রায় আমি তোমাকে কোলে নিয়ে ছুটে গিয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে। তখন আমার হিতাহিত জ্ঞান ছিলো না ঋধি। তোমার পালিয়ে আসা,মানুষের চোখ, সমাজ,ধর্ম কিছুই আমার মাথায় ছিলো না। তোমাকে অজ্ঞান দেখে আমি কীভাবে ঠিক থাকবো বলো?
সেদিন হাসপাতালে তোমার পরিবার এক গভীর ষড়যন্ত্র করে। যে-ই মেয়ে ধর্ম বিসর্জন দিতে প্রস্তুত, জাত-কুলের সম্মান রক্ষা করে না, সেই মেয়েকে তাঁরা জীবন্ত আগুনে পুড়িয়ে ধর্মকে পরিশুষ্ক করবে।
তোমাদের এক পুরোহিত এতে আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করে। উৎসাহিত করে। যেন এ কোনো পাপাচার নয়,বরং পরম পুণ্যের কাজ। তোমার বাবাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার হুমকি দেয়।
তোমার বাবা সমাজের উচ্চবর্গের মানুষ হয়ে নিজের আত্মসম্মান হারিয়ে এক ঘরে হওয়ার ভয় পেলেন। তিনি মেয়ের চেয়ে বেশি প্রাধান্য ধর্ম কে দিলেন। ধর্মের আড়ালে তিনি মূলত নিজের আভিজাত্য আর গৌরব কে বাঁচাতে প্রস্তুত হলেন। ধর্ম,সম্মান তখন মেয়ের চেয়ে বেশি উনার কাছে।
উনারা গভীর রাতে তোমাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়িয়ে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। তুমি তখন ঘুমের ওষুধের ডোজে গভীর ঘুমে মগ্ন।
তাঁরা এমন ভাবে সব প্রস্তুতি নিচ্ছিল,যেন আমার হৃদয় ছিঁড়ে তোমাকে কেড়ে নিবে। তোমার জীবনের বিনিময়ে হলেও তোমাকে তাঁরা ছাড়িয়ে নিবে ই।
আমি ততক্ষণে সব জানতে পারি। প্রচন্ড ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরলো। যদি সত্যি সত্যি তোমায় আগুনে পুড়িয়ে মারে। আমি তোমার বাবার কাছে ছুটে গিয়ে তোমার প্রাণ ভিক্ষা চাই। তোমার জীবন থেকে সরে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করি। বিনিময়ে শুধু তোমার বেঁচে থাকা। তাঁরা আমাকে কুরআন ধরে শপথ করতে বললেন। যারা কুরআন বিশ্বাস করে না, তাঁরা কুরআনের শপথ কে মানতে প্রস্তুত। অদ্ভুত মানব জাতি! আমি ওজু করে মসজিদ থেকে কুরআন নিয়ে তাদের সামনে গিয়ে শপথ করলাম।
তোমাকে সারাজীবনের জন্য ত্যাগ করলাম। তোমার জীবনের বিনিময়ে তোমার অধিকার ছেড়ে দিলাম। তোমার পৃথিবীর বিনিময়ে নিজেকে একা করে নিলাম।
আজকের পর তোমাকে ছাড়া বাঁচবো। তোমাকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাবো। তুমি আমার জীবনে থাকবে না, কিন্তু পরাণে জড়িয়ে থাকবে সবসময়।
------------------শেষ অংশ টা পড়তে অসংখ্য বার চোখ মুছতে হয়েছে। ঝাপসা অক্ষর খোঁজে খোঁজে পড়তে বেগ পেতে হয়েছে অনেক।
নিজের বাবার প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা চলে আসে। যাদের কাছে মেয়ের চেয়ে,মানুষের জীবনের চেয়ে ধর্মের মান বড় সেটা কখনো প্রকৃত ধর্মপ্রাণ হতে পারে না। পরিবার, সমাজ সবার প্রতি প্রচন্ড আক্রোশ জন্মায় মনে। কাওকে না জানিয়ে সেদিন ই ঢাকায় ফিরে আসি।
সেদিন বাসায় ফিরে আলমারির ভেতর থেকে পোড়া চিঠিটা বের করি।
বহু বছর আগের সেই তিনটি অক্ষর এখনো অক্ষত-
'পরাণে।'
আঙুল দিয়ে শব্দটার ওপর হাত রাখলাম।
চোখের সামনে মুহিনের মুখ ভেসে উঠলো।
মনে হলো, এত বছর পরও সে বুঝি ঠিক এই শব্দটার ভেতরেই কোথাও লুকিয়ে আছে।
আমার জীবনে এখন অনেক কিছু আছে।
সংসার আছে,দায়িত্ব আছে, ধর্ম নামক কালচার আছে, সন্তানের ছোট ছোট হাত আছে।
সকাল আছে, দুপুর আছে, সন্ধ্যা আছে।
শুধু সেই মানুষটা নেই, যার সঙ্গে আমি একদিন আমার জীবনের প্রতিটি সকাল-সন্ধ্যার হিসাব করে রেখেছিলাম।
আমার সন্তানের নাম শুভ। মুহিন আর আমার ঠিক করা নাম। কিন্তু তাঁর বাবা মুহিন নয়।
মুহিনকে আমি আর ফিরে পাবো না। ফিরে পাওয়ার ইচ্ছেটাও নেই। কিছু মানুষকে ফিরে পেতে নেই।
কিছু ভালোবাসার পূর্ণতা কখনো চাইতে নেই।
শুধু ভালোবেসে যেতে হয়-নিঃশব্দে, গোপনে, নিজের পরাণের এমন এক ঘরে, যেখানে কারো প্রবেশাধিকার নেই।
জানালার বাইরে শিউলি ঝরা স্তুপ। আগের মতোই ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। কিন্তু মোহ নেই সেই ঘ্রাণে। মাদকতা নেই।
আমি পোড়া চিঠিটা ভাঁজ করে আগের জায়গায় রেখে দিলাম।
তারপর অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম।
মুহিন আমার জীবনে কখনো ই ফিরে আসবে না। কিন্তু অনুভূতি আজও সেই প্রথম দিনের মতোই আছে। অতৃপ্ত। অপূর্ণ। বিষাদ মাখা ভালোবাসা।
ভালোবাসা মানে আমার কাছে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। মুহিন মানে নিত্য নিয়মের আড়ালে গোপন কুঠুরিতে বন্ধি করে রাখা একান্ত সম্পদ।
বাকি সব.. নিয়ম মেনে চলছে।
✍️কুলচুমা ইয়াছমিন কনা