Story

অন্তর্নিহিত নির্যাতন

September 13, 2026

12
View

সমাজের চোখের সামনে থাকা দৃশ্যমান ক্ষতগুলো মানুষ সহজে দেখতে পায়, কিন্তু মনের ভেতরের রক্তক্ষরণগুলো বেশিরভাগ সময়ই থেকে যায় লোকচক্ষুর আড়ালে। বিশেষ করে ভুক্তভোগী যদি একজন পুরুষ হন, তবে তার নীরব যন্ত্রণাকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই ভাবা হয় না। রিয়াদও ঠিক তেমনই একজন পুরুষ ছিল—সুস্থ, সবল, নীতিবান এবং হাসিখুশি। মধ্যবিত্ত পরিবারের শান্ত স্বভাবের এই ছেলেটি সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে একটি মাঝারি কোম্পানিতে চাকরি করছিল। বৃদ্ধ বাবা-মা আর ছোট বোনকে নিয়ে তার জীবনটা ছিল বেশ স্বাচ্ছন্দ্যের। কিন্তু সেই শান্ত দিঘিতে অশান্তির ঝড় তুলল তার বিয়ে।

অভিভাবকদের পছন্দের মেয়ে তানিয়ার সঙ্গে রিয়াদের বিয়ে হলো ধুমধাম করে। শুধু দেখতে শুনতেই নয়, তানিয়া ছিল বেশ চটপটে এবং আধুনিক। রিয়াদ ভেবেছিল তার একঘেয়ে জীবনে ভালোবাসার আলো হয়ে এসেছে তানিয়া। কিন্তু বিয়ের মাত্র কয়েকটা মাস যেতে না যেতেই ভুল ভাঙতে শুরু করল। তানিয়ার রূপের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা চরম মানসিক নির্যাতনের সাথে পরিচয় হতে লাগল রিয়াদের।

তানিয়ার মূল সমস্যা ছিল তার অপরিসীম উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সামাজিক প্রদর্শনপ্রিয়তা। বিয়ের প্রথম দিকেই সে রিয়াদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করে উচ্চবিত্তদের মতো জীবনযাপন করার জন্য। ফ্ল্যাট কিনতে হবে শহরের অভিজাত এলাকায়, গাড়ি চাই লেটেস্ট মডেলের, আর ছুটির দিনে চাই ফাইভ স্টার হোটেলের বিলাসী পরিবেশ। রিয়াদ যখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করত যে তার বর্তমান বেতন এবং সঞ্চয় দিয়ে এসব সম্ভব নয়, তখনই শুরু হতো মানসিক নির্যাতন।

তানিয়ার শারীরিক অত্যাচারের দরকার পড়ত না, তার ভাষার ধারই ছিল যেকোনো অস্ত্রের চেয়ে মারাত্মক। "তোমার মতো একটা অপদার্থকে বিয়ে করে আমার জীবনটাই বরবাদ হয়ে গেল! আমার বান্ধবীদের হাসবেন্ডরা লাখ লাখ টাকা উড়াচ্ছে, আর আমি একটা পচা ফ্ল্যাটে পড়ে মরছি। তুমি পুরুষ নাকি অন্য কিছু?"—এ ধরনের তীক্ষ্ণ কথা প্রতিদিনই রিয়াদকে শুনতে হতো। রিয়াদ কোনো প্রতিবাদ করলে তানিয়া তার বাবা-মাকে নিয়ে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করত।

শুধু তাই নয়, রিয়াদের পরিবারকেও টার্গেট করল তানিয়া। রিয়াদের বৃদ্ধা মা অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়লে তানিয়া স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সে কোনো বুড়ো-বুড়ির খেদমত করতে এ বাড়িতে আসেনি। রিয়াদের ছোট বোন ক্লাস নাইনে পড়ে তাই তার পড়াশোনার জন্য যে খরচ হয় তা রিয়াদকেই বহন করতে হয় কিন্তু তার স্ত্রী তানিয়ার নিকট এই সামান্য খরচ যেন অত্যাধিক রকমের অর্থ ব্যয়। অথচ রিয়াদের নিকট তার বোনকে নিয়ে কত স্বপ্ন আর কত প্রত্যাশা। এসব কারণে মাঝে মাঝেই তানিয়া সংসারের রান্নাবান্না এবং কাজ কর্ম বন্ধ করে দিত। রিয়াদের বাবাকে অপমান করে কথা বলাটা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হলো। ছোট বোনের বিয়ের জন্য রিয়াদ কিছু টাকা জমিয়ে রেখেছিল। সেই জমানো টাকাগুলো নিজের শপিংয়ের জন্য দাবি করে বসে তানিয়া। কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে তানিয়া হুমকি দিত মিথ্যা যৌতুক ও নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে তাদের পুরো পরিবারকে জেলে পুরবে। সমাজ আর আইনের ভয় রিয়াদ এবং তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে একেবারে বাকরুদ্ধ করে দিল। রিয়াদের হাসিখুশি চেহারা দিন দিন ফ্যাকাশে হতে লাগল, কাজের প্রতি মনোযোগ হারিয়ে ফেলল সে, রাত্রে ঘুম আসত না। ঘরের ভেতরে এক অসহ্য যন্ত্রণার নরক তৈরি হয়েছিল।

মানসিক নির্যাতনের পারদ যখন চরমে পৌঁছাল, তখন তানিয়া তার আসল রূপ প্রকাশ করল। সে রিয়াদকে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, সততার দোহাই দিয়ে যদি সে বেশি টাকা আয় করতে না পারে, তবে অনৈতিক পথ বেছে নিতে হবে। রিয়াদ ছিল তার কোম্পানির টেন্ডার বিভাগের দায়িত্বে। সেখানে সাব-কন্ট্রাক্টরদের কাছ থেকে কোটি টাকার ঘুষ নেওয়ার সুযোগ ছিল, যা রিয়াদ এতদিন অত্যন্ত সততার সঙ্গে এড়িয়ে গেছে।

তানিয়া রিয়াদকে ভয় দেখাল, "আগামী মাসের মধ্যে তুমি যদি ফ্ল্যাটের বুকিংয়ের জন্য ৫০ লাখ টাকা না দিতে পারো, তবে আমি বিষ খেয়ে মরবো এবং নোটে লিখে যাব তুমি আর তোমার পরিবার আমাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছ। পুলিশ এসে তোমায় তো ধরবেই, তোমার বুড়ো বাবা-মাকেও কয়েদি বানিয়ে ছাড়বে।"

নিজের জীবন, বাবা-মার সম্মান এবং পরিবারকে জেল-হাজতের হাত থেকে বাঁচানোর আকুলতায় ভেঙে পড়ল রিয়াদের নীতি-নৈতিকতা। এক মধ্যরাতে তানিয়ার অব্যাহত হুমকি আর মানসিক চাপে দিশেহারা হয়ে রিয়াদ তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটি করে বসল। সে কোম্পানির একটা বড় কন্ট্রাক্ট হাতানোর জন্য এক ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করল। প্রথমবার অনৈতিক টাকা হাতে পেয়ে রিয়াদের নিজেরই নিজের প্রতি ঘৃণা হচ্ছিল, কিন্তু তানিয়ার মুখে তখন বিজয়ের হাসি।

অনৈতিক টাকার স্বাদ পেয়ে তানিয়ার চাহিদা আরও বেড়ে গেল। রিয়াদ ধীরে ধীরে একটা গভীর চক্রে জড়িয়ে পড়ল। অফিসে জালিয়াতি, ভুয়া বিল পাস করানো আর ঠিকাদারদের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন নেওয়া তার নিত্যদিনের কাজ হয়ে দাঁড়াল। যে রিয়াদ একদিন অন্য কারও এক টাকাও মেরে খাওয়ার কথা চিন্তা করতে পারত না, সে এখন একজন অপরাধী। ভেতর থেকে সে প্রতিনিয়ত মরে যাচ্ছিল। ঘুষের টাকায় তানিয়া দামি গয়না, ব্র্যান্ডের কাপড় আর নতুন গাড়ি কিনল ঠিকই, কিন্তু রিয়াদের ঘুম একেবারে হাওয়া হয়ে গেল। অনেক টাকা, বাড়ি, গাড়ি থাকার পরও এখন তার আগের মত মনের যে শান্তিটা ছিল, সেই শান্তিটা আর পাচ্ছে না। এছাড়াও যেকোনো মুহূর্তে অডিট হলেই ধরা পড়ে যাওয়ার আতঙ্ক, আর তানিয়ার প্রতিদিনের নতুন নতুন দাবির মুখে রিয়াদ এক জীবন্ত লাশে পরিণত হলো।

অবশেষে সেই দিনটি এলো। অফিসে গোপনে অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হলো রিয়াদের জালিয়াতি নিয়ে। রিয়াদ বুঝতে পারল তার ধরা পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। জেলখানা, সামাজিক অপমান, আর নিজের নীতি হারানোর গ্লানি তাকে গ্রাস করে ফেলল। সেই রাতে সে ঘরে ফিরে দেখল তানিয়া একটা পার্টিতে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে এবং তাকে আবারও হুমকি দিচ্ছে একটা ক্লাবের মেম্বারশিপের টাকার জন্য। তানিয়ার চেহারায় রিয়াদের জন্য কোনো ভালোবাসা বা সহমর্মিতা ছিল না, ছিল শুধু নির্মম শোষণ আর লোভ।

রিয়াদ বুঝতে পারল, এই নারীর লোভের কোনো শেষ নেই। সে তাকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করেছে, এখন মানসিকভাবে পুরো পরিবারকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। এই বিষাক্ত সম্পর্কের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসা ছাড়া বাঁচবার আর কোনো পথ নেই।

পরদিন ভোরে, যখন চারদিক অন্ধকার আর তানিয়া গভীর ঘুমে মগ্ন, রিয়াদ উঠে দাঁড়াল। সে নিজের জীবনের জমানো কিছু বৈধ টাকা আর একটা ছোট ব্যাগে কয়েক জোড়া সাধারণ পোশাক গুছিয়ে নিল। তানিয়ার জন্য ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে গেল তার ব্যাংকের ডেবিট কার্ড, অনৈতিকভাবে অর্জিত সম্পত্তির কাগজপত্র এবং একটা সংক্ষিপ্ত চিঠি।

চিঠিতে লেখা ছিল: "তুমি যা চেয়েছিলে—টাকা, গাড়ি, বাড়ি—সব তোমাকে দিয়ে গেলাম। তুমি আমাকে সততা থেকে বিচ্যুত করে অপরাধী বানিয়েছ, আমার ও আমার পরিবারের জীবনকে নরক বানিয়েছ। কিন্তু আর নয়। আমি আমার অপরাধের শাস্তি পেতে রাজি আছি, কিন্তু তোমার দেওয়া এই মানসিক নির্যাতনের দাস হয়ে বেঁচে থাকতে রাজি নই। আমি চললাম এমন এক জায়গায় যেখানে টাকা হয়তো থাকবে না, কিন্তু অন্তত শান্তিতে শ্বাস নেওয়া যাবে। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করো না।"

বাড়ি থেকে বের হয়ে রিয়াদ শেষবারের মতো তার ঘুমন্ত বৃদ্ধ বাবা-মা এবং বোনের ঘরের দরজার দিকে তাকাল। তাদের নিরাপত্তার জন্য সে আইনিভাবে নিজের অর্জিত মূল সম্পত্তি তাদের নামে লিখে দিয়েছিল। রিয়াদ বাড়ির সীমানা পার হয়ে রাজপথে নামল। ভোরের কুয়াশাচ্ছন্ন বাতাসে পা বাড়াল সে। তার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই, নেই কোনো জানা পথ। তানিয়া ও তার অত্যাচারী জীবনকে চিরদিনের জন্য পেছনে ফেলে, একটু শান্তির আশায় এক অজ্ঞাত অসীমের উদ্দেশ্যে হারিয়ে গেল রিয়াদ।

Comments

    Please login to post comment. Login