তোমরা যারা জিন্নাহ প্রেমে বুঁদ হয়ে আছো -এবং তোমাদের ভবিষ্যত বংশধর যারা একই পথের পথিক হবে বলে নিশানা ঠিক করে রেখেছো -তারা আজ থেকে শিয়া সম্প্রদায়কে ঘৃণা করতে পারবে না। তোমরা বলতে পারবে না জরথুস্ত্রবাদ একটা মিথ্যা ধর্ম। হিন্দু সম্প্রদায়কে আজ থেকে নিচুজাত অচ্ছুত বলে তাচ্ছিল্য করতে পারবে না। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের বিরুদ্ধেও আর বলবে না। তোমরা বলতে পারবে না হুইস্কি বা মদ্যপান খারাপ কিছু। ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই ক্যাম্পেইনে আর অংশগ্রহণ করবে না। বলতে পারবে না ইউরোপীয় জীবনধারা ধর্মসম্মত না। বলবে না তোমার দেশের নাম বাংলাদেশ। এবং ফাইনালি তোমরা এখন থেকে বাংলা ভাষায় কথা বলবে না। চিরকুট লিখবে না। উর্দুই তোমাদের একমাত্র ভাষা। কেন খামোখা সালাম বরকতের আত্মাকে কষ্ট দিবে তোমরা?
কেন বলা হলো এসব কথা?
সেটা জানতে হলে পুরোটা মন দিয়ে পড়তে হবে।
পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পরিবার ছিল গুজরাটের কাঠিয়াওয়ার অঞ্চলের একটি হিন্দু লোহানা সম্প্রদায় থেকে ইসলাম গ্রহণকারী খোজা (Khoja) পরিবার। পরে তারা ইসমাইলি মুসলিম সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়।
জিন্নাহর পিতামহ পূঞ্জা মেঘজির আগের নির্ভরযোগ্য বংশতালিকা পাওয়া যায় না। কিছু লেখক দাবি করেছেন, তাঁদের আরও প্রাচীন পূর্বপুরুষরা পাঞ্জাবের সাহিওয়াল/মুলতান অঞ্চল থেকে আসা রাজপুত ছিলেন এবং পরে কাঠিয়াওয়ারে বসতি স্থাপন করেন।
জিন্নাহর পিতামহ পূঞ্জা মেঘজির সন্তানদের নামের মধ্যে Manbai, Valji, Nathoobhai, Jinnahbhai-এর মতো গুজরাটি/হিন্দু নাম ছিল, যা তাঁর পরিবারের ধর্মান্তর ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।
পারসি পরিবারে জন্ম নেয়া রতনবাই তথা রুট্টি ছিলেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর স্ত্রী। জিন্নাহকে বিয়ের সময় তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।
মায়ের মৃত্যুর পর ফুফু ফাতেমা জিন্নাহর তত্ত্বাবধানে তাদের একমাত্র কন্যা দিনা ওয়াদিয়াকে মুসলিম হিসেবে বড় করার চেষ্টা করা হয়েছিল -কোরআন ও নামাজও শেখানো হয়।
১৯৩৮ সালে দিনা নেভিল ওয়াদিয়াকে বিয়ে করেন। নেভিল ছিলেন পারসি পরিবারে জন্মানো; বিয়ের সময় তিনি খ্রিস্টান ছিলেন। পরে জীবনের শেষ দিকে তিনি জরথুস্ত্রবাদে ফিরে যান। কিন্তু দিনা নিজে পরবর্তী জীবনে নিয়মিত মুসলিম ছিলেন -এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও নেই; আবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জরথুস্ত্রবাদ গ্রহণ করেছিলেন -এমন প্রমাণও পাওয়া যায় না।
তবে এটা জানা যায় দিনার ওই বিয়েটিই বাবা-মেয়ের সম্পর্কে বড় ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছিল।
ইসমাইলি ধারা (Ismailism) হলো ইসলামের শিয়া মতবাদের একটি প্রধান শাখা। এর মূল পার্থক্যটি মূলত ইমামত বা মুসলিম সমাজের আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব কার মাধ্যমে চলবে -এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে।
সহজভাবে ধারাটি এমন: হজরত আলী (রা.) → ইমাম হুসাইন (রা.) → পরবর্তী ইমামগণ → ইমাম জাফর আস-সাদিক (রা.) → ইসমাইল ইবনে জাফর → ইসমাইলি ধারা।
অপরদিকে সুন্নিরা হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পর খোলাফায়ে রাশেদিনসহ মুসলিম নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ধারাকে অনুসরণ করে।
খোজাদের পূর্বপুরুষদের বড় অংশ ছিল গুজরাটের হিন্দু লোহানা বণিক সম্প্রদায়। মধ্যযুগে ইসলামি ধর্মপ্রচারকদের প্রভাবে লোহানাদের একটি অংশ ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁদের মধ্যে বিশেষত নিজারি ইসমাইলি ধারার অনুসারীরা ধীরে ধীরে একটি স্বতন্ত্র সামাজিক পরিচয় গড়ে তোলে -যাদের বলা হয় খোজা বা খাজা।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর জীবনযাপন ছিল তৎকালীন ভারতীয় মুসলিম সমাজের প্রচলিত রীতির তুলনায় অত্যন্ত আধুনিক, পাশ্চাত্যধাঁচের ও অভিজাত। তিনি লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ার সময় থেকেই ব্রিটিশ-ইউরোপীয় পোশাক, আচরণ ও সামাজিক রীতিতে অভ্যস্ত হন। সাধারণত সুট, টাই, পালিশ করা জুতা পরতেন, ইংরেজি ছিল তাঁর প্রধান ভাষাগুলোর একটি, এবং তাঁর কথাবার্তা ও সামাজিক আচরণে ব্রিটিশ ভদ্রলোকের ছাপ ছিল স্পষ্ট। তিনি পশ্চিমা ধাঁচের খাবার, রেস্তোরাঁ ও সামাজিক জীবন পছন্দ করতেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে খুব একটা কট্টর ছিলেন না। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী রতনবাইও ছিলেন পারসি অভিজাত পরিবারের আধুনিক, পাশ্চাত্যশিক্ষিত নারী। জিন্নাহর মতো ব্যারিস্টার তার সময়ে ভারতবর্ষে হাতেগোনা ছিল।
দৈনিক প্রায় ৫০টি বা তারও বেশি কিউবান সিগারেট খাওয়ার কথা মিস্টার জিন্নাহর বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ আছে। তাঁর যক্ষ্মাজনিত অসুস্থতার সময়ও তিনি ধূমপান ছাড়তে পারেননি। হুইস্কি ও অ্যালকোহলেও তিনি অভ্যস্ত ছিলেন।
১ মার্চ ১৯৪৮, ঢাকার রমনা রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ স্পষ্টভাবে বলেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে Urdu and no other language। ২৪ মার্চ ১৯৪৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন বক্তৃতায় তিনি আবারও Urdu and Urdu alone বলে একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন; সেখানে শিক্ষার্থীদের একাংশ সঙ্গে সঙ্গে No, No বলে প্রতিবাদ করে।
১৯৪৮ থেকে ভাষা আন্দোলন ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে এবং ১৯৫২ সালে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে চলমান ঢাকার মিছিলে পুলিশের গু'লিতে রফিকউদ্দিন আহমদ, আবুল বরকত ও আবদুল জব্বার নি'হত হন; পরে আহত আবদুস সালাম মারা যান। ২২ ফেব্রুয়ারি শফিউর রহমান পুলিশের গু'লিতে নি'হত হন।
বর্তমানে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে বৈশ্বিকভাবে পালিত হয়।
জিন্নাহ শুরু থেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনীতির নেতা ছিলেন না। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে তিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রবক্তা ছিলেন এবং ১৯১৬ সালের লখনৌ চুক্তি তার বড় উদাহরণ। কিন্তু ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, মুসলিম লীগের সাংগঠনিক বিস্তার এবং মুসলিম রাজনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্ন তাঁকে ক্রমশ মুসলিম জাতীয়তাবাদের প্রধান নেতা করে তোলে। এবং তিনি শেষ পর্যন্ত দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা ধর্মের ভিত্তিতে ভারত থেকে আলাদা হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান নামে ১২০০ মাইলের দূরবর্তী ফারাক নিয়ে একটি অদ্ভুত কিসিমের দেশ গঠন করেন। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের তরফে একপাক্ষিক স্বার্থপরতা ও বৈষম্যের খপ্পরে পড়ে মাত্র তেইশ বছরেই সে দেশটি ভেঙে গিয়ে আলাদা একটি রাষ্ট্র বাংলাদেশ জন্মলাভ করে। পাকিস্তান যে একটা অদ্ভুতুড়ে, অস্থির, অস্থিতিশীল রাষ্ট্র ছিল এটাই তার বড় প্রমাণ।
আপনি কোনদিকে থাকবেন, কার দিকে যাবেন, কার গুণকীর্তন করবেন -একান্তই আপনার ব্যাপার। তবে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে অধিক ভালোবাসতে হলে এই লেখার প্রথম প্যারাকে পাত্তা না দিলে আপনার ডাবল স্ট্যান্ডার্ড তথা দ্বিচারিতা দিবালোকের মতোই প্রতিভাত হবে।
এই তথ্যগুলো মিলিয়ে নেয়ার জন্য নিচের রেফারেন্স বইগুলোতে চোখ রাখা যেতে পারে-
১. Wolpert — Jinnah of Pakistan
২. Bolitho — Jinnah: Creator of Pakistan
৩. Ayesha Jalal — The Sole Spokesman
৪. Ishtiaq Ahmed — Jinnah: His Successes, Failures and Role in History
৫. Jaswant Singh — Jinnah: India, Partition, Independence
▪️
লেখক: সাংবাদিক
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬