Article

শাপলা চত্বরে একদিন

September 14, 2026

11
View

গতকাল একজনকে ট্রেনে উঠিয়ে দেওয়ার জন্য কমলাপুর রেলস্টেশনে যাই৷ স্টেশন থেকে ফেরার পথে ভাবলাম মতিঝিল থেকে মেট্রোতে চলে যাই৷ তাই কমলাপুর থেকে হাঁটতে হাঁটতে মতিঝিলে প্রবেশ করি৷ মতিঝিলে ঢুকতেই চোখে পড়লো শাপলা চত্বর৷ অতি পরিচিত, কিন্তু বাস্তবে দেখা হয়নি৷ বায়তুল মুকাররমে অনেকবার গেলেও মতিঝিলে যাওয়া হয়নি কখনো৷ যাওয়ার জন্য আগ্রহও মনে পয়দা হয়নি কোনোদিন৷ জানি না কেনো!

২০১৩ তে শাপলা ট্র্যাজেডির সময় আমি হেফজ পড়ি৷ তখন বুঝি না দেশে কী চলছে৷ তবে এতোটুকু অনুধাবন করেছিলাম, আলেমদের উপরে কোনো বড় আঘাত এসেছে৷ যা চারিদেকের আওয়াজে মনে মনে ভেবে নিয়েছিলাম৷ বয়স যতো বাড়তে থাকে সেই ট্র্যাজেডির করুণ ইতিহাস আমি জানতে থাকি৷ জানতে থাকি তার বাস্তবতা৷ বাস্তবতা যখন সামনে আসে, প্রথমেই সরকার এবং তরুণ কিছু জযবাওয়ালা আলেমের প্রতি শ্রদ্ধা কমে যায়৷ ভক্তি হারিয়ে যায় অনেক আলেমের প্রতি৷ তবে আলেমদের প্রতি বিদ্বেষ তৈরি হয়নি৷ এই ট্র্যাজিডি আমার মনে এতোই আঘাত করে যে, সরকার হয়ে যায় আমার দুচোখের বিষ৷ আমার এমনও হয় সরকারের প্রশংসা কেও করলে—যদি আলেমও হয় তার প্রতি ঘৃনা চলে আসে৷ তার প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলি৷ ভক্তি কমে যায়, যতো যোগ্য আলেমই হোক না কেন৷

মতিঝিলে ঢুকতেই আমার চোখের সামনে শাপলার ছবি ভেসে উঠে, আমার চোখ মুহুর্তেই ঝাপসা হয়ে যায় ৷ আমার পা কাঁপতে শুরু করে৷ আমি রাস্তায় পা ফেলতে ভয় পাচ্ছিলাম— না জানি এখানে আমার ভাইয়ের পবিত্র রক্তের ছিটা পড়ে আছে৷ আমার নাপাক পা তার স্বচ্ছ রক্তকে নোংরা করে দিবে৷ আমার মনে ভয়ের জোয়ার শুরু হলো৷ চারিদিক অন্ধকার নেমে আসে৷ সব আলো দুরে সরে যায়৷ কিছু রক্তাক্ত দেহ হাসতে হাসতে আমার সামনে এগিয়ে আসে৷ আমি ভয় পেয়ে যাই৷ ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলি৷ কানে বাঁজা শুরু করে হাজারো মানুষের কান্নার আহাজারি৷ আঘাত করে বিক্ষিপ্ত গুলি আর টিয়ারগ্যাসের বিশ্রী শব্দ৷ নাক বন্ধ হয়ে আসে জমে থাকা রক্তের গন্ধে৷ যা অদ্যবধি কোনো পদধূলি মুছতে পারেনি, ধুয়ে ফেলতে পারেনি বৃষ্টির পানিও৷

আমি মূর্তির মতো দাড়িয়ে থাকি কিছু সময়৷ আমার মাথা কোনো কাজ করছিলোনা৷ তখন শুনতে পাই কেও আমাকে ডাকছে৷ তাকিয়ে দেখি, কেও নাই৷ আমি চোখ বন্ধ করে ফেলি—শুনতে পাই একটি করুণ শব্দ৷ ধীরে ধীরে শব্দ উচ্চ হতে থাকে৷ যেনো কানের কাছে হাতুড়ি পেটা হচ্ছে৷ আর কে যেনো বিড়বিড় করে কী বলছে৷ অস্পষ্ট শব্দ৷ কিছুই বুঝা যাচ্ছে না৷ আস্তে আস্তে শব্দ ক্ষীণ হয়ে আসে৷ যেনো শব্দের বাহন দুরে কোথাও চলে যাচ্ছে৷ গাড়ির আওয়াজ যেমন ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়৷

আমার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম৷ আমি চোখ খুলেই এদিক ওদিক তাকাই৷ নাহ! কেও নেই৷ তবে কিষের এতো আওয়াজ শুনছি৷ আমি আর সেখানে থাকতে পারছিলাম না৷ দ্রুত শাপলা চত্বর থেকে বেরিয়ে আসি৷ ভয়ে আর পিছনে তাকাতে ইচ্ছে হয়নি৷ মনে হচ্ছিলো কিছু মুখ উপহাসের দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে৷ আর বলছে,কী আমাদের আওয়াজ পাচ্ছো! বলছি, আমাদের রক্ত কী বৃথায় নষ্ট হলো? আমাদের স্লোগান কী আর বাঁজবেনা শাপলার বুকে?

আমার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসে৷ আমি চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে যাই মেট্রো স্টেশনে৷

শাপলাকে আমার কিছুই দেওয়ার ছিলোনা৷ শুধু শাপলার বুকে ছেড়ে আসা প্রতিশোধের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া।

Comments

    Please login to post comment. Login