কেলেঙ্কারির ঘটনাটি রাষ্ট্র হয়ে গেছে মোবাইল আর ইন্টারনেটের অকল্যাণে। অকল্যাণই বলব আমাদের অফিসের সবার জন্য। আমরা সকলে মিলে মিশে খাই—মিলে মিশে অনেক কিছুই খাওয়া যায়, আমরা ঘুষ খাই। এতে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, বেশ ভালোভাবেই দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। ঝামেলা করেছে নতুন ছেলেটা।
এ যুগের ছেলেপেলেরা খুব অস্থির স্বভাবের, সিনিয়রদের কথা শুনতে চায় না একদমই। তাকে এত করে বলা হয়েছে, “ধীরে বাছা, ধীরে,” কিন্তু বাছার কথা—সেই যুগ কি আর আছে? নাও, এবার বোঝ! ঠেলা সামলাও, চাপ সামলাও।
ভুল করেছে সে, আর মাশুল গুনতে হবে সবাইকে। আমরা সিনিয়ররা অভিজ্ঞতা দিয়ে কার কাছে চাওয়া যাবে, পাওয়া যাবে এবং খাওয়া যাবে বুঝে, চেয়ে, খাই। এসবের জন্য সময় দিতে হয়। নতুন ছেলেটা এসেই না জেনে, না বুঝে চাইতে শুরু করল। যখন বোঝাতে গেলাম, এত তাড়াহুড়া করা ঠিক না, বলে কিনা, “আসলটা উশুল করি তাড়াতাড়ি, লাভেরটা না হয় ধীরে ধীরে তুলব।”
বাহ, কী স্পষ্টভাষী! একদম কোনো রাখঢাক ছাড়াই বুঝিয়ে দিল, খরচাপাতি হয়েছে এখানে ঢুকতে। তো, এরপর তো আর কিছু বলাও যায় না।
আমাদের সকলের যুক্তি আছে ঘুষ খাওয়ার পেছনে। আজহারউদ্দীনের যুক্তি—সে দুই-তিন বছর পরপর হজ্বে যায়। বেতনের টাকা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন; তাই ঘুষ খায় সংসার চালানোর জন্য। আর বেতনের টাকা জমিয়ে হজ্বে যায়।
ননী বাবুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “ঘুষ খান কেন?”
তিনি বলেছিলেন, “আমার ডায়াবেটিস।”
—“তো, এটার সাথে ঘুষ খাওয়ার কী সম্পর্ক?”
—“আরে, বুঝতে পারলেন না। আমি তো মিষ্টি খেতে পারি না ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ার ভয়ে, তাই ঘুষ খাই। ঘুষও বেশ মিষ্টি, কিন্তু ডায়াবেটিসের কোনো সমস্যা করে না।”
জহির সাহেব তো আরও এক কাঠি সরেস। তিনি নাকি ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ঘুষ খান। মানে, ভবিষ্যতে তিনি হজে যাবেন এবং তাঁর ডায়াবেটিসও হবে।
রাজিব তালুকদার নাস্তিক মানুষ। তার ঘুষ খাওয়ার পেছনে যুক্তি হচ্ছে, পরকাল বলে কিছু নেই, তাই ইহকালে আরাম-আয়েশ করার জন্য একজন সরকারি চাকরিজীবীর ঘুষের বিকল্প কিছু হতে পারে না।
তবে দৈত্যকুলে প্রহ্লাদও আছে। আশরাফ আলী স্যার, তিনি ঘুষ খান না; এমনকি আমরা যারা খাই, তাদের সাথে ভালো করে কথা বলেন না।
এই নিয়ে আমাদের মধ্যে একটা বিশেষ ক্ষোভ আছে। জলিলের মতে, আশরাফ স্যার ঘুষ খান না, ভালো কথা; তাই বলে আমাদের সাথে এমন আচরণ করা তাঁর ঠিক না। আমরা কেউ তো আর ইচ্ছে করে ঘুষ খাওয়া শুরু করিনি। চাকরির শুরুতে মোটামুটি সকলেই “সদা সত্য কথা বলিব, সৎ পথে চলিব”—নীতি অনুসরণ করতাম। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, সেই নীতি থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরে আসতে বাধ্য করা হলো, বাধ্য হলাম।
জলিলের সাথে আমি এ বিষয়ে একমত যে, চাকরিজীবনের প্রথম দিকে আমিও ফাইলে কোনো বড় ধরনের ঝামেলা বুঝতে পারলে সেটা পাশ করতাম না; তখন আমাকে ওপর থেকে চাপ দিয়ে বাধ্য করা হতো ফাইল পাশ করতে।
তো, আমি দেখলাম, সরকার আমাকে বেতন দেয়, যেন আমি আমার দায়িত্ব ঠিকঠাক পালন করি। কিন্তু আমিতো আমার দায়িত্ব পুরোপুরি সঠিকভাবে পালন করতে পারছি না। যে ফাইলে কোনো ঝামেলা নেই, আমি পাশ করে দিচ্ছি, এজন্য সরকার আমাকে বেতন দিচ্ছে। কিন্তু যে ফাইলে বড় ধরনের ঝামেলা থাকা সত্ত্বেও চাপে পড়ে আমাকে অনিয়ম করে, অন্যায়ভাবে ছেড়ে দিতে হচ্ছে, তার জন্য সরকার আমাকে কোনো বেতন দেয় না।
তাই ভুলকে সঠিক বলে চালিয়ে দিয়ে যদি একটা অন্যায় করতে পারি, তবে তার বিনিময়ে ঘুষ নিয়ে আর একটা অন্যায় করতে ক্ষতি কীসের? তবে হ্যাঁ, বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, যাদের কাগজপত্রে কোনো ঝামেলা থাকে না, কখনো তাদের ফাইল আটকে রাখিনি, পাশ করে দিয়েছি।
তো, পাঠককুল, আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন, এটাই তো স্বাভাবিক; আমি শুধু শুধু নিজেকে মহৎ সাজানোর চেষ্টা করছি। আসলে তা নয়। আপনারা অনেকেই জানেন, আবার হয়তো অনেকেই জানেন না—ঘুষ খাওয়া একবার শুরু করলে তা নেশা হয়ে যায়; তখন ভালো ফাইল আর খারাপ ফাইল বড় কিছু না, ঘুষ খাওয়াটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
কথায় কথায় একদিন অজয় সিং বলেছিল, “জানেন দাদা, প্রথম যেদিন ঘুষ খেয়েছিলাম, বিবেকের তাড়নায় ঘুমাতে পারিনি, আর এখন ঘুষ না খেলে ঘুম আসে না।”
হেড অফিস থেকে আজ তদন্ত কমিটির লোক আসার কথা। তারা এসে পড়েছে কিনা জানতে রুম থেকে বেরিয়ে দেখি, ফজলুল হক স্যার করিডোরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছেন।
ফজলুল হক স্যার আর একজন ‘প্রহ্লাদ’। তবে তিনি নাস্তিক প্রহ্লাদ, কিন্তু রাজিব তালুকদারের ঠিক উল্টো কথা বলেন। ফজলুল হক স্যার বলেন, “যার বিবেক নেই, সততা নেই, তার নাস্তিক হওয়া উচিত না। একজন নাস্তিক জানে, তার ঈশ্বর, খোদা কিংবা ভগবান নেই; তার যা আছে, তা হলো বিবেক। তার ভালো-মন্দের সম্পূর্ণ দায় তার নিজের। পরকাল নেই জেনে যথেচ্ছাচার করা যাবে না। নিজের লাভের জন্য অন্যের ক্ষতি করা যাবে না।”
স্যারের কথা শুনলে মনে হয়, কোনো নাস্তিক ফকির-সন্ন্যাসীর কথা শুনছি।
স্যারকে সালাম দিলাম। সালামের উত্তর দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী খবর, ফিরোজ সাহেব?”
বললাম, “স্যার, বুঝতেই পারছেন, খবর বেশি ভালো না।”
আমার করুণ চাহনি দেখে তিনি বললেন, “তদন্ত কমিটি নিয়ে আপনার ভয় পাওয়ার কী আছে? তদন্ত কমিটি তো আপনার জন্য আসছে না।”
—“তা আসছে না। কিন্তু কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়ায়, তার কি ঠিক আছে, স্যার? আপনার কোনো সমস্যা নেই, সে আমরা সবাই জানি; কিন্তু আমাদের অবস্থা এই—এই বুঝি ধরা পড়লাম।”
—“আমার সমস্যা নেই, কিন্তু আমাকে যে কেউ সমস্যায় ফেলতে চাইবে না, তার কোনো ঠিক আছে? আমাকেও তো অনেকেই অপছন্দ করে। তবে আমি বলে দিয়েছি, ছাত্রজীবনে আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করেছি, কখনো অন্যায়ের সাথে আপস করিনি। আমাদের আদর্শের সমাজ গড়তে পারিনি, তাই বলে নিজের আদর্শ বিলিয়ে দেইনি কখনো। আমাকে যদি এর সাথে জড়ানোর চেষ্টা করে, তবে খবর করে ফেলব।”
স্যার আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি করতেন, তাই তাঁর এত সাহস। কিন্তু আমিতো স্যারের মতো সাহসী নই।
অতীতের একটা ঘটনা মনকে কেমন আর্দ্র করে দিল। অন্য সময় হলে হয়তো বলতে পারতাম না, কিন্তু আজ কেন জানি নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। বললাম,
—“স্যার, আপনার ছাত্রজীবনে আন্ডারগ্রাউন্ড ছিল; আমার তো আন্ডারগার্মেন্টসই ছিল না। তাই কাউকে জোর করে কিছু বলতেও পারি না।”
—“আপনার কথা বুঝতে পারলাম না। আন্ডারগ্রাউন্ডের সাথে আন্ডারগার্মেন্টসের কী সম্পর্ক?” স্যার বিস্মিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন।
আমিও বলতে শুরু করে দিলাম আমার অতীত—
তখন ক্লাস এইটে পড়ি। আমাদের স্কুলে মর্নিং শিফটে মেয়েরা আর ডে শিফটে ছেলেরা পড়ত। ছেলেরা দলবেঁধে মেয়েদের ছুটির সময়ে স্কুল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতাম—রথ দেখা, কলা বেচা একসাথে। মেয়েদের দল বেরিয়ে গেলেই আমরা হুড়োহুড়ি করে স্কুলে ঢুকে পড়তাম।
এমনই একদিন মর্নিং শিফটের ছুটির সময় স্কুলের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ভাবখানা এমন, যেন ক্লাসের ফার্স্ট বেঞ্চে বসার জন্য কতই না তাড়া! উত্তাল কৈশোর তখন; বিপরীতের প্রতি কী দুর্নিবার আকর্ষণ!
হঠাৎ শুনতে পেলাম, কে যেন জোরে জোরে বলছে, “দেখ, দেখ, জাঙ্গিয়া পরে নাই।”
তাকিয়ে দেখি, আমাকে দেখিয়েই কথাগুলো বলছে, আর সকলের সে কী হাসি! আসলেই সেদিন আন্ডারওয়্যার পরিনি। সত্যি বলতে, আমার তা ছিলই না।
রেগেমেগে ছুটে গেলাম যে কথাটা বলেছে তার দিকে, কিন্তু ওরা সংখ্যায় বেশি থাকায় আমাকেই অপদস্থ হতে হলো। এরপর থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীতে আমি সবসময় নিশ্চুপ থাকি।
“শৈশব-কৈশোরের কিছু কিছু নির্মম ঘটনা আমাদের জীবনে কী ভীষণ প্রভাব ফেলে,” আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন ফজলুল হক স্যার।
—“তবে স্যার, আমারও আদর্শ ছিল ‘সদা সত্য কথা বলিব, সৎ পথে চলিব’। কিন্তু জীবনযুদ্ধে নেমে দেখলাম, সদা সত্য কথা বলাটা সঠিক না; পরিস্থিতি বুঝে সত্য-মিথ্যা বলা উচিত। তবে সৎ পথে চলার বিকল্প নেই, কিন্তু তাতো পারছি না কিছু অসৎ লোকের কারণে।”
—“ফিরোজ সাহেব, আপনার বিষয়টা আমি জানি। আপনি ভালো ফাইল কখনো আটকে রাখেন না। আপনার মতো ভালো-খারাপ বিচার করে খেলে আজ এমন ঝামেলায় পড়তে হতো না মাসুদকে, সাথে আমাদেরও।”
কথা আর না বাড়িয়ে স্যারের কাছে বিদায় নিয়ে চলে আসি। সেটাই ছিল তাঁর সাথে অফিসে আমার শেষ দেখা।
এরপর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো, আমাদের সেই ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনায় মাসুদের সাথে ফজলুল হক স্যারকেও বরখাস্ত করা হয়।
স্যারের কারণে যারা এতদিন সুবিধা করতে পারছিল না, তারা বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। আজহর উদ্দীনের আবার হজে যাওয়ার সময় হয়েছে, ননী বাবুর ডায়াবেটিস বেড়ে যাওয়ায় তিনি ঘুষ খাওয়ার পরিমাণও বাড়িয়ে দিয়েছেন, জহির সাহেব ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বেশি বেশি সঞ্চয় করছেন, আমিও আগের মতন আছি।
কেবল আশরাফ আলী স্যার বলেন যে, ফজলুল হকের সাথে যে অন্যায় করা হয়েছে, খোদা তা সহ্য করবেন না; অবশ্যই এর বিচার করবেন।
তবে আমার মনে হয়, খোদা এই ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নন।
একদিন পথে হঠাৎ ফজলুল হক স্যারের সাথে দেখা হলে সালাম দিলাম।
তিনি বিষণ্ন মুখে বললেন, “আমাকে স্যার বলছেন? আমিতো ঘুষ চাওয়ার অপরাধে শাস্তিপ্রাপ্ত আসামি।”
—“স্যার, আমাকে অন্তত লজ্জা দিবেন না। আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে, এটা কি কারও অজানা? কিন্তু স্যার, আপনি যে বলছিলেন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন, সেটা কাজে লাগানো যেত না?”
আমার কথা শুনে তিনি বিষণ্ন মুখখানায় বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বললেন,
—“ফিরোজ সাহেব, বর্তমানে দুর্নীতিবাজরা সবসময় নীতির কথা বলে, আর অধর্মের কাজ করে যারা, তারাই সবসময় ধর্মের কথা বলে। একসময় যাদের সাথে রাজপথ কাঁপাতাম, শোষণমুক্ত, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ব বলে, তাদের একদল শাসকের অত্যাচারে প্রাণ দিয়েছে, আরেক দল জীবনযুদ্ধে পরাজিত দলছুট সৈনিকের মতো উদ্দেশ্যহীন ছুটোছুটি করছে, আর একদল নিজেরা শাসকের সাথে আঁতাত করে নিজেদের দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে ফেলেছে।
“শেষের দল আমাকেও তাদের পথের অনুসারী হতে বলছিল। অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম, তাই আমার পাশে এসে দাঁড়ানোর কেউ নেই।”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, “আমি জানতাম, বিপদের সময় কাউকে কাছে পাব না। তাই কেউ যেন বিপদে না ফেলে, সবসময় বলতাম আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির কথা। কিন্তু কিভাবে যেন অনেক আগেই অফিসের অনেকে জেনে গেছে ব্যাপারটা যে, দলের লোকদের সাথে আমার সম্পর্ক ভালো না।”
বুঝতে পারছিলাম না, বলব কি বলব না। শেষে বলেই ফেললাম,
—“স্যার, যদি আপনার কোনো কাজে আসতে পারি, নিজেকে ভাগ্যবান মনে করব। যদি টাকা-পয়সার কোনো প্রয়োজন হয়...”
“না, না, টাকা-পয়সার কোনো প্রয়োজন নেই,” আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই তিনি বলতে লাগলেন, “আর আপনার মোবাইল নম্বর তো আমার কাছে আছেই। প্রয়োজন পড়লে আমি ফোন করে চেয়ে নেব। আজ তবে আসি, ভালো থাকবেন, ফিরোজ সাহেব।”
—“স্যার, যদি ফোন করেন, খুব ভালো লাগবে।”
স্যারকে বিদায় জানিয়ে তাঁর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। জানি, তিনি কখনো সাহায্য চেয়ে ফোন করবেন না।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসছে। ধীরে ধীরে স্যারের মূর্তিটি ঝাপসা হতে হতে অদৃশ্য হয়ে গেল।