🌧️ বৃদ্ধ মায়ের শেষ ঠিকানা
পর্ব–১
মায়ের আঁচলের নিচে
শহরের এক ব্যস্ত রাস্তার পাশে প্রতিদিন একজন বৃদ্ধা নারী বসে থাকতেন।
বয়স প্রায় সত্তরের কাছাকাছি।
গায়ে পুরোনো একটা শাড়ি, কাঁধে মলিন চাদর, হাতে একটা ছোট কাপড়ের ব্যাগ।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি রাস্তার এক কোণে বসে থাকতেন।
কখনো কারও দিকে তাকিয়ে থাকতেন।
কখনো রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর দিকে।
আবার কখনো নিজের ব্যাগটা খুলে একটা পুরোনো ছবি বের করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকতেন।
ছবিটায় ছিল এক যুবক।
স্মার্ট পোশাক পরা, মুখে হাসি।
ছবির নিচে ছোট করে লেখা—
“আমার ছেলে রাকিব।”
বৃদ্ধার নাম ছিল রহিমা বেগম।
কিন্তু আশেপাশের কেউ তাকে নামে ডাকত না।
সবাই বলত—
“বুড়ি মা।”
কেউ দয়া করে দুই টাকা দিত।
কেউ পাঁচ টাকা।
কেউ আবার বিরক্ত হয়ে বলত,
— “এখানে বসে থাকেন কেন? অন্য কোথাও যান।”
রহিমা বেগম কিছু বলতেন না।
শুধু মাথা নিচু করে থাকতেন।
কারণ তাঁর কাছে ওই জায়গাটা শুধু রাস্তার পাশের একটা জায়গা ছিল না।
ওটা ছিল তাঁর অপেক্ষার জায়গা।
তিনি বিশ্বাস করতেন—
একদিন তাঁর ছেলে এই রাস্তা দিয়ে আসবে।
গাড়ি থামবে।
দরজা খুলবে।
তারপর বলবে—
“মা, চল। তোমাকে নিতে এসেছি।”
এই একটা কথার আশাতেই তিনি প্রতিদিন সেখানে বসে থাকতেন।
১
অনেক বছর আগে...
রহিমা বেগমের সংসার ছিল খুব ছোট।
স্বামী হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন দিনমজুর।
সকাল হলে কাজে বেরিয়ে যেতেন।
সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীর নিয়ে বাড়ি ফিরতেন।
সংসারে অভাব ছিল।
কখনো চাল থাকত না।
কখনো বাজারের টাকা থাকত না।
কিন্তু একটা জিনিসের অভাব ছিল না—
ভালোবাসার।
তাদের একমাত্র সন্তান ছিল রাকিব।
রাকিব যখন ছোট, তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে রাকিব স্কুল থেকে ভিজে বাড়ি ফিরল।
রহিমা দৌড়ে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরলেন।
— “বাবা, ছাতা নিয়ে যাসনি কেন?”
রাকিব হাসতে হাসতে বলল,
— “মা, ছাতা ছিল না তো!”
মা নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে ছেলের মাথা মুছতে লাগলেন।
— “তুই অসুস্থ হয়ে যাবি যে!”
রাকিব মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— “মা, তুমি কি আমার জন্য নতুন ছাতা কিনে দেবে?”
রহিমা একটু থেমে হাসলেন।
— “দেব বাবা। অবশ্যই দেব।”
রাকিব আনন্দে মাকে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু সে জানত না—
সেদিন ঘরে চাল কেনার টাকাটুকুও ছিল না।
আর নতুন ছাতা?
সেটা ছিল রহিমার কাছে অনেক বড় স্বপ্ন।
পরদিন সকালে রহিমা নিজের বিয়ের সময় পাওয়া পুরোনো একটি রুপার নাকফুল খুলে বাজারে নিয়ে গেলেন।
সেটা বিক্রি করে একটা ছোট ছাতা কিনলেন।
বাড়ি ফিরে ছাতাটা ছেলের হাতে দিয়ে বললেন,
— “নাও বাবা। তোমার ছাতা।”
রাকিবের চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
— “সত্যি আমার?”
— “হ্যাঁ।”
— “মা, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মা!”
রহিমা হেসে ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
কিন্তু তাঁর চোখের কোণে পানি জমেছিল।
কারণ রাকিব জানত না—
সেই ছাতার বিনিময়ে মা তাঁর নিজের একটা স্মৃতি বিক্রি করেছেন।
২
সময় চলে যেতে লাগল।
রাকিব বড় হতে লাগল।
স্কুলের পড়াশোনায় সে খুব ভালো ছিল।
একদিন শিক্ষক রহিমাকে ডেকে বললেন,
— “আপনার ছেলে খুব মেধাবী। ওকে ভালোভাবে পড়াতে পারলে অনেক দূর যেতে পারবে।”
রহিমা বাড়ি ফিরে স্বামীকে বললেন,
— “ওকে আমরা যত কষ্টই হোক পড়াব।”
হাবিবুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— “কিন্তু টাকা কোথায়?”
রহিমা চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
— “আমি কাজ করব।”
সেই দিন থেকে রহিমা বাড়ির কাজের পাশাপাশি অন্যের বাসায় কাজ করা শুরু করলেন।
সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মানুষের বাড়িতে বাসন মাজতেন।
দুপুরে নিজের সংসারের কাজ করতেন।
বিকেলে আবার সেলাই করতেন।
রাতে রাকিব পড়তে বসলে তিনি পাশে বসে থাকতেন।
রাকিব বলত,
— “মা, তুমি ঘুমাও না কেন?”
— “তুই পড়, বাবা। তুই বড় হ।”
— “তুমি কী চাও আমি হই?”
রহিমা হেসে বলতেন,
— “আমি কিছু চাই না। শুধু চাই, তুই একজন ভালো মানুষ হ।”
রাকিব বলত,
— “আমি বড় হয়ে তোমাকে অনেক বড় বাড়ি কিনে দেব।”
মা হাসতেন।
— “আমার বড় বাড়ি লাগবে না বাবা।”
— “তাহলে কী লাগবে?”
রহিমা ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন,
— “তুই পাশে থাকলেই হবে।”
৩
কয়েক বছর পর রাকিব শহরে কলেজে ভর্তি হলো।
গ্রামের ছোট্ট বাড়ি থেকে শহরের কলেজ।
নতুন জীবন।
নতুন বন্ধু।
নতুন স্বপ্ন।
রাকিবের মনে তখন বড় কিছু করার ইচ্ছা।
সে মাকে বলল,
— “মা, আমি শহরে গিয়ে কাজ করব। টাকা উপার্জন করব।”
মা বললেন,
— “পড়াশোনাটা আগে শেষ কর বাবা।”
— “হ্যাঁ মা।”
রহিমা নিজের জমানো সামান্য টাকা ছেলের হাতে দিলেন।
রাকিব অবাক হয়ে বলল,
— “এত টাকা কোথায় পেলে?”
মা হেসে বললেন,
— “জমানো ছিল।”
আসলে সেই টাকা জমানোর জন্য তিনি কয়েক মাস নিজের নতুন কাপড় কেনেননি।
পুরোনো শাড়িটাই সেলাই করে পরেছিলেন।
রাকিব কিছুই জানত না।
সে শুধু মায়ের হাত থেকে টাকা নিয়ে বলেছিল,
— “মা, তুমি দেখো। আমি একদিন অনেক বড় হব।”
মা বলেছিলেন,
— “আমি শুধু চাই, বড় হয়ে আমাকে ভুলে যাস না।”
রাকিব হেসে বলেছিল,
— “তোমাকে কি কেউ ভুলতে পারে?”
৪
শহরে যাওয়ার পর রাকিবের জীবন বদলে গেল।
প্রথমদিকে প্রতিদিন মাকে ফোন করত।
— “মা, খেয়েছ?”
— “হ্যাঁ বাবা।”
— “ওষুধ খেয়েছ?”
— “হ্যাঁ।”
— “আমাকে নিয়ে চিন্তা করো না।”
কিন্তু কয়েক মাস পর ফোনের সংখ্যা কমতে লাগল।
প্রতিদিন থেকে সপ্তাহে।
সপ্তাহ থেকে মাসে।
রহিমা অপেক্ষা করতেন।
পুরোনো মোবাইলটা হাতে নিয়ে বসে থাকতেন।
ফোন বাজলেই তাঁর মুখে হাসি ফুটত।
কিন্তু বেশিরভাগ সময় সেটা অন্য কারও ফোন হতো।
একদিন রাতে রাকিব ফোন করল।
— “মা।”
— “বাবা!”
মায়ের কণ্ঠে আনন্দ।
— “কেমন আছিস?”
— “ভালো।”
— “খেয়েছিস?”
— “হ্যাঁ।”
কিছুক্ষণ চুপ।
তারপর রাকিব বলল,
— “মা, একটা কথা বলব?”
— “বল বাবা।”
— “আমি চাকরি পেয়েছি।”
রহিমার চোখে পানি চলে এল।
— “সত্যি?”
— “হ্যাঁ। ভালো চাকরি।”
— “আলহামদুলিল্লাহ!”
রহিমা এত খুশি হলেন যে সেদিন প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে সবাইকে বললেন,
— “আমার ছেলে চাকরি পেয়েছে!”
তিনি ছেলের জন্য মিষ্টি কিনতে চাইলেন।
কিন্তু ঘরে টাকা ছিল না।
শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য রাখা ওষুধের টাকা থেকে কিছু টাকা নিয়ে মিষ্টি কিনলেন।
নিজে না খেয়ে প্রতিবেশীদের খাওয়ালেন।
সবার কাছে শুধু একটাই কথা বললেন—
“আমার ছেলে মানুষ হয়েছে।”
৫
তারপর রাকিব শহরে নিজের জীবন গুছিয়ে নিল।
ভালো চাকরি।
ভালো বেতন।
নতুন বন্ধু।
নতুন পরিচয়।
একসময় সে বিয়েও করল।
বিয়ের খবর মাকে ফোন করে জানাল।
রহিমা কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
— “বাবা, তুই আমাকে বউমাকে কবে দেখাবি?”
রাকিব বলল,
— “সময় হলে নিয়ে আসব।”
— “আমি কি তোদের বিয়েতে যেতে পারব না?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাকিব বলল,
— “মা, অনুষ্ঠানটা শহরে। তোমার আসতে কষ্ট হবে।”
রহিমা কিছু বললেন না।
শুধু বললেন,
— “ঠিক আছে বাবা।”
ফোন কেটে যাওয়ার পর তিনি অনেকক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে বসে রইলেন।
তারপর আলমারি খুলে একটা পুরোনো শাড়ি বের করলেন।
নিজের বিয়ের শাড়ি।
ধীরে ধীরে সেটার ভাঁজ ঠিক করতে করতে বললেন,
— “একদিন তো বউমাকে এটা দেখাব।”
৬
বিয়ের পর রাকিবের জীবন আরও ব্যস্ত হয়ে গেল।
মায়ের ফোন ধরার সময়ও কমে গেল।
রহিমা মাঝেমধ্যে ফোন করতেন।
— “বাবা, কেমন আছিস?”
— “ভালো মা। এখন একটু ব্যস্ত। পরে কথা বলব।”
“পরে” কথাটা ধীরে ধীরে রহিমার জীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ অপেক্ষা হয়ে গেল।
একদিন রহিমা অসুস্থ হয়ে পড়লেন।
জ্বর।
শরীর দুর্বল।
তবুও রান্না করে নিজের জন্য একটু ভাত রাখলেন।
খেতে বসে হঠাৎ তাঁর মনে হলো—
ছোটবেলায় রাকিব ভাত খেতে চাইত না।
তখন তিনি বলতেন,
— “আরেকটু খা বাবা।”
রাকিব বলত,
— “মা, তুমি আগে খাও।”
রহিমা হাসতেন।
— “মা তো খেয়েই নিয়েছে।”
অথচ মা তখনও কিছু খাননি।
স্মৃতিটা মনে পড়তেই তাঁর চোখ ভিজে গেল।
তিনি ফোনটা হাতে নিলেন।
ছেলের নম্বরে কল করলেন।
একবার।
দুইবার।
তিনবার।
কেউ ধরল না।
রহিমা ফোনটা বুকে চেপে ধরলেন।
তারপর আস্তে বললেন,
— “ব্যস্ত আছে বোধহয়।”
৭
কয়েক দিন পর রাকিবের ফোন এল।
— “মা, তুমি কেমন আছ?”
রহিমা যেন পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দের খবর পেলেন।
— “আমি ভালো বাবা।”
— “শোনো মা, আমি একটা কথা বলব।”
— “বল।”
— “তুমি কি কিছুদিনের জন্য শহরে আসতে পারবে?”
মায়ের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
— “আমি তোকে দেখতে যাব?”
— “হ্যাঁ।”
— “বউমা কি আমাকে দেখতে চায়?”
— “হ্যাঁ মা।”
রহিমা তাড়াতাড়ি তাঁর পুরোনো ব্যাগটা বের করলেন।
একটা শাড়ি।
একটা চাদর।
কিছু ওষুধ।
আর একটা ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলি।
পুঁটলির মধ্যে ছিল রাকিবের ছোটবেলার সেই ছাতা থেকে খুলে রাখা একটি পুরোনো কাপড়ের টুকরো।
তিনি সেটা কখনো ফেলে দেননি।
পরদিন সকালে রহিমা বাসে উঠলেন।
মুখে হাসি।
চোখে স্বপ্ন।
তিনি ভাবছিলেন—
“এবার হয়তো আমার ছেলে আমাকে নিজের কাছে রাখবে।”
৮
শহরে পৌঁছে তিনি রাকিবকে ফোন করলেন।
— “বাবা, আমি এসে গেছি।”
ওপাশে রাকিব বলল,
— “মা, তুমি কোথায়?”
— “বাসস্ট্যান্ডে।”
— “ওখানে থাকো। আমি আসছি।”
রহিমা অপেক্ষা করতে লাগলেন।
এক ঘণ্টা গেল।
দুই ঘণ্টা গেল।
তিন ঘণ্টা গেল।
সন্ধ্যা হয়ে গেল।
রাকিব এল না।
মা বারবার ফোন করলেন।
শেষ পর্যন্ত ফোন ধরল রাকিব।
— “মা, আজকে আসতে পারব না।”
রহিমা অবাক হয়ে বললেন,
— “কেন বাবা?”
— “কাজ আছে।”
— “তাহলে আমি কোথায় যাব?”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর রাকিব বলল,
— “মা, তুমি আজকে একটা হোটেলে থাকো। কাল আমি তোমাকে নিয়ে যাব।”
রহিমা চারপাশে তাকালেন।
অচেনা শহর।
অচেনা মানুষ।
হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ।
তিনি ধীরে বললেন,
— “ঠিক আছে বাবা।”
ফোন কেটে গেল।
রহিমা একটা বেঞ্চে বসে রইলেন।
আকাশে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার।
রাস্তার বাতিগুলো একে একে জ্বলছে।
তিনি ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
আর খুব আস্তে বললেন—
“আমার ছেলে আসবে...”
রাত বাড়তে লাগল।
কিন্তু রাকিব এল না।
পরদিনও না।
তৃতীয় দিনও না।
রহিমা বারবার ফোন করলেন।
কখনো ফোন বন্ধ।
কখনো রিং হয়ে কেটে যায়।
শেষ পর্যন্ত একদিন ফোন ধরল রাকিব।
মায়ের কণ্ঠ কাঁপছিল।
— “বাবা, আমি কোথায় যাব?”
রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— “মা... তুমি গ্রামের বাড়িতে ফিরে যাও।”
— “কিন্তু আমি তোকে দেখতে এসেছিলাম।”
— “আমি এখন খুব ব্যস্ত।”
— “আমি কি তোর কাছে থাকতে পারি না?”
ওপাশে আবার নীরবতা।
তারপর রাকিব বলল,
— “মা, আমার সংসারে অনেক ঝামেলা। তুমি বুঝবে।”
রহিমা আর কিছু বললেন না।
শুধু বললেন,
— “ঠিক আছে বাবা।”
ফোন কেটে গেল।
তিনি অনেকক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইলেন।
তারপর ব্যাগ খুললেন।
ছোট্ট কাপড়ের পুঁটলিটা বের করলেন।
রাকিবের শৈশবের সেই স্মৃতিটা হাতে নিয়ে চোখের পানি মুছে বললেন,
“তুই তো বলেছিলি, আমাকে কখনো ভুলবি না...”
সেদিন রাতে রহিমা আর গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেলেন না।
কারণ যাওয়ার মতো সেই বাড়িটাও আর ছিল না।
স্বামী বহু বছর আগে মারা গেছেন।
পুরোনো বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেছে।
আত্মীয়রা যার যার সংসারে।
তাঁর কাছে ছিল শুধু একটা ব্যাগ...
আর একটা ফোন নম্বর।
রাকিবের নম্বর।
সেই রাত থেকেই শহরের সেই রাস্তার পাশে তিনি বসতে শুরু করলেন।
কারণ তিনি জানতেন না—
কোথায় গেলে তাঁর ছেলে তাঁকে খুঁজে পাবে।
তাই তিনি ঠিক করলেন—
যে রাস্তা দিয়ে একদিন তাঁর ছেলে তাকে শহরে নিয়ে এসেছিল,
সেই রাস্তার পাশেই তিনি অপেক্ষা করবেন।
হয়তো একদিন গাড়ি থামবে।
হয়তো দরজা খুলবে।
হয়তো রাকিব দৌড়ে এসে বলবে—
“মা, এতদিন কোথায় ছিলে?”
আর রহিমা তখন কিছুই বলবেন না।
শুধু ছেলেকে জড়িয়ে ধরবেন।
সন্ধ্যা নামল।
রহিমা ব্যাগ থেকে ছেলের ছবিটা বের করলেন।
ছবির দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
এক পথচারী জিজ্ঞেস করল,
— “মা, কার ছবি?”
রহিমা ছবিটা বুকে চেপে ধরে বললেন,
— “আমার ছেলের।”
— “ছেলে কোথায়?”
বৃদ্ধা একটু চুপ করে রইলেন।
তারপর রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“আসবে... আমার ছেলে আসবে।”
দূরে একটা গাড়ি থামল।
রহিমা হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন।
চোখে আশার আলো।
তিনি ব্যাগটা হাতে নিলেন।
কিন্তু গাড়ি থেকে নামল অন্য একজন।
রহিমা ধীরে ধীরে আবার বসে পড়লেন।
ছবিটা বুকে চেপে ধরে ফিসফিস করে বললেন—
“আজ না হয় আসেনি... কাল আসবে।”
ক্যামেরা যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যায়।
রাস্তার আলোয় একা বসে থাকে বৃদ্ধ মা।
আর তাঁর সামনে পড়ে থাকে একটা ছোট্ট কাগজ।
তাতে কাঁপা হাতে লেখা—
“রাকিব — আমার ছেলে”
চলবে...