মায়ের এমন নির্লিপ্ত কণ্ঠে কিশোরী শুকেন্তোর বুক আরো তীব্র ভয়ে গুটিয়ে গেলো। তার মায়ের এই কন্ঠস্বর যে তার বড্ড অচেনা লাগছে।
পরের দিন ভোর হতেই শাহানা মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ধস্তাধস্তি তে মেয়েটার শরীর ব্যথায় কুকিয়ে যাচ্ছে। হাঁটার শক্তি নেই। তবুও মেয়েকে নিয়ে চললেন,,।
শাহানা আক্তার শুকেন্তো কে নিয়ে লঞ্চে উঠলেন। এই প্রথম শুকেন্তো লঞ্চে উঠেছে। এতক্ষণে তাদের যাওয়ার গন্তব্য কিছুটা আঁচ করতে পারলো শুকেন্তো। মায়ের কাছে শুনেছিলো -
মায়ের এক মামা থাকেন বরিশালের কোনো এক গ্রামে। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই।
তিন কুলে অভিভাবক বলতে এই মামা টাই আছেন। তিনি গ্রামের দফাদার। যার বিরাট দাপট ছিল তখন গ্রামে। দফাদার মানে কি সেটা ই বুঝতে পারেনি শুকেন্তো।
বরিশালের লঞ্চঘাটে মানুষের কোলাহল। ঘাটজুড়ে ছোট-বড় নৌকা, ট্রলার আর যাত্রীদের ব্যস্ত চলাফেরা।
লঞ্চ থেকে নামার পর কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে গিয়ে শুকেন্তোর পা কেঁপে উঠে। মা ধরতে চেয়েও ধরতে পারেন না। উনার এক হাতে ভারি ব্যাগ আরেক হাতে টিনের সেই ট্রাঙ্কটি। শুকেন্তো নিজের হাতে থাকা ছোট ব্যাগ টা আগলে কোনো রকম নেমে দাঁড়ালো।
ঘাটের পাশে অপেক্ষা করা ভ্যান ডেকে নিলেন শাহানা। মেয়েকে নিয়ে উঠে বসলেন।
কাঁচা-আধাপাকা রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ভ্যান।
রাস্তার দু'পাশে ধানক্ষেত, মাঝে মাঝে তালগাছ আর নারকেল গাছ মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
শহরের কোলাহল পেছনে ফেলে অনেক টা চলে এসেছে তাঁরা। বেলা দ্বিপ্রহর পেরিয়ে গেছে আগেই।
ছোট এক নদীর সামনে এসে ভ্যান দাঁড়ায়। শাহানার চিন্তিত মুখ চঞ্চল হয়ে উঠে হঠাৎ।
-শুকেন্তো দেখ,ঐ যে গ্রামখানা দেখছিস ওখানেই আমার মামার বাড়ি ।
মায়ের চিকচিক করা চোখের দিকে শুকেন্তো কে তাকিয়ে থাকতে দেখে কিছু টা অপ্রস্তুত অনুভব করলেন শাহানা। মেয়ের এমন মানসিক অবস্থায় তার এতটা খুশি দেখানো কি ঠিক হলো!
সাথে সাথে গম্ভীর হয়ে যাওয়া মায়ের হাত ধরলো শুকেন্তো। -আমরা কি তবে এখানেই থাকবো,মা?
- সেটা ই ভাবছি মা। আপাতত যাওয়ার তো আর কোনো জায়গা নেই আমাদের। মুন্সী বাড়ির ঐ রতন কি আমাদের ছেড়ে দিবে রে মা? দিবে না। তার কুকীর্তির বর্ণনাও সে কাওকে দিতে পারবেনা। তাই সুস্থ হয়ে ই আমাদের ক্ষতি করতে লেগে পড়বে।
চল দেখি,,যদি মামার এখানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই মেলে!
ঘাটে বাঁধা নৌকাটি এগিয়ে এলো। ছোট্ট নদীর ওপারে বড় অক্ষরে লেখা সাইনবোর্ড "কলাবতী" ঘাঁট।
- বর্ষাকাল বিধায় নদীর পানি একটু বেড়েছে। না-হয় হেঁটে ই নদী পার হওয়া যায়। ছোট বেলায় মামার বাড়ি বেড়াতে আসলে কতো ধোড়ঝাপ দিয়েছি এই নদীতে। ঐ যে পাঁকা রাস্তা গুলো দেখছিস সেগুলো তখন কাঁচা রাস্তা ছিলো। এই গ্রামের নাম কলাবতী। আর এই ঘাটের নাম কলাবতী ঘাট।
মায়ের কথা নিরবে শুনছে শুকেন্তো।
নৌকা র মাঝি নৌকা ভিড়াতে ভিড়াতে জিজ্ঞেস করলো -তোমাগো চিনতে পারলাম না। কোন বাড়িতে যাইবেন?
-দফাদার বাড়ি।
-অহ,দফাদারের কী হন?
-দফাদার আমার মামা।
নৌকা থেকে নেমে গ্রামের মধ্যের সরু পথ দিয়ে ঢুকে খানিকটা দূরেই একটা বসতি।
পূর্বদিকে যতদূর চোখ যায়, সবুজে ভরা ধানক্ষেত। পশ্চিম পাশে ঘন জঙ্গল, তার পেছনেই মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের সারি। উত্তর ও দক্ষিণ দিক জুড়ে বয়ে চলেছে নদী। নদীর ধারে ধারে ছড়িয়ে আছে গাছপালা, ঝোপঝাড়।
এই প্রাকৃতিক বেষ্টনী যেন একটা বসতি কে আলাদা করে রেখেছে কলাবতী গ্রাম থেকে।
যে-ই বসতির নাম সকলের পরিচিত -
" দফাদার বাড়ি।"
শুকেন্তো মায়ের বলা বর্ণনা অনুযায়ী দফাদার বাড়ির একটা নকশা অবচেতন মনে অংকন করেছে। বিশাল বড় কোনো বাড়ি,বিশাল উঠোন, ভদ্র -মার্জিত মানুষ, তাদের পরণে সুন্দর সুন্দর কাপড়,,!
বসতির ভেতরে পা রেখেই শুকেন্তো নাক কুঁচকালো।
একটা বাজে পঁচা গন্ধ নাকে এসেছে বাতাসের ছুটে। ধীর পায়ে এগোতে এগোতে চারপাশে চোখ বোলালো শুকেন্তো।
প্রায় ২৫-৩০ টি মতো ছোট ছোট ঘর, একে অপরের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। ঘরগুলো আলাদা আলাদা, কিন্তু প্রায় কাছাকাছি। যেগুলোর ফাঁকে ফাঁকে ছোট্ট সরু পথ এঁকেবেঁকে গেছে। শাহানা মেয়েকে নিয়ে কয়েকটি ঘর পেরিয়ে একটা বড় উঠানে এসে দাঁড়ালো। কয়েকটা শিশুরা খেলা করছে, যাদের পরণে খুবই নোংরা কিছু জামা।
কারো গায়ে পুরো জামা নেই। কারো নিচের টা আছে,উপরের টা নেই। আবার কারো শুধু উপরের টা আছে । কিছু ঘর থেকে রান্নার ধোঁয়া উড়ছে, কয়েক ঘর পরে একজায়গা থেকে চেচামেচি শুনা যাচ্ছে। কয়েকজন মহিলার একত্রিত আওয়াজ,বিশ্রী শব্দে গালাগালি,,। সম্ভবত ঝগড়া লেগেছে।
ততক্ষণে ছেলে-মেয়ে গুলো তাদের খেলা বন্ধ করে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে।
৭-৮ বছরের এক ছেলে তার সমবয়সী এক মেয়ের ঝাগড়া চুলে টান দিয়ে বলল-" ঐ বাইট্টা বুড়ি,এরা কারা দেহ না?"
সেই হাতে ধাক্কা দিয়ে মেয়েটি তাকে জবাব দেয় -" মনে অয়,আব্বার কাছে চিকিৎসা করাইতে আইছে। আব্বার কাছে লইয়া চল।"
শাহানা র দিকে চেয়ে সেই বাইট্টা বুড়ি নামের মেয়েটি বলল-" আব্বার কাছে যাইবেন?চলেন আমাগো লগে।"
এই এতো ছোট একটা মেয়ের নাম বাইট্টা বুড়ি হয় কীভাবে শুকেন্তোর মাথায় আসছে না।
শাহানা কেন যেন,এই বসতি তে ঢুকার পর থেকে একেবারে নীরব হয়ে গেছে। কুঞ্চিত কপাল। কিছু একটার হিসাব মেলাতে পারছেন না বোধহয়।
চুপচাপ মেয়েকে নিয়ে বাচ্চা গুলো কে অনুসরণ করলেন।
টিনের চাউনি দেওয়া একটা ঘর। অন্য ঘরগুলো থেকে কিছু টা ভালো অবস্থা বলা যায় । ঘরের সামনে বেশ কয়েকজন মহিলা জড়ো হয়ে আছে।
ঘরের সামনে লম্বা বারান্দা। সেই বারান্দার একপাশে এক বৃদ্ধ উল্টো দিকে বসে আছে। তার সামনে আয়না আর ফুলের স্তূপ। একটা গ্লাসে জবা ফুল,বেতের কুলোয় কিছু চাল। চালের উপর ডিম।
চারপাশে আগেরবাতি জ্বালানো। লোকটি নিজের দুই হাত জড়ো করে কাঁপতে কাঁপতে কি সব জপ করছে।
আগেরবাতির তীব্র ঘ্রাণ নাকে ঢুকতেই শুকেন্তো কেশে উঠলো।
বৃদ্ধ লোকটি হাত উঠিয়ে সরে যেতে বললো।
-এহন উনি আসনে বইছেন। আপনারা বাইরে আইয়া দাঁড়ান।
"আসন আবার কি? মা কোথায় নিয়ে এলো আমাকে,তাছাড়া আমাদের ওদিকে তো মানুষ মারা গেলে আগেরবাতি জ্বালাই। আর এখানে?"
পেটের খোদাই,ক্লান্তি তে এসব আজব কাজ কারবার আর নিতে পারছে না শুকেন্তো। কোনো কিছু না ভেবে বারান্দার দাওয়ায় ধপাস করে বসে পড়লো শুকেন্তো।
পরবর্তী পর্বে,,,
লেখক :কুলচুমা ইয়াছমিন কনা