Story

দীপান্বিতার ছোঁয়া

September 18, 2026

15
View

দীপান্বিতা ওর ফেসবুক আইডি তে গাঢ় হলুদ শাড়ি পরিহিত ছবি পোস্ট করে নিচে ক্যাপশন দিয়েছে, 'মাসকাটার তীরে দাঁড়িয়ে।শেষ বিকেলে।'

বিকেলে দিনের শেষ আলো দীপান্বিতার চোখমুখে চিকচিক করছে।নদীর উতালা বাতাসে ওর দিঘল চুল কপালের একপাশ ছুঁয়ে চোখ ঢেকে দিয়েছে।তাতে যেন সৌন্দর্য আরো বেড়েছে।

শাহীন ফেইসবুকে ছবিটা দেখে শোয়া থেকে উঠে বসে।দ্রুত নেভি ব্লু শার্ট গায়ে চড়িয়ে,জিন্সের প্যান্ট পড়ে বাড়ী থেকে বেরিয়ে যায়।তাকে এখনি মাসকাটা নদীর তীরে যেতে হবে।দীপান্বিতা নিশ্চিত এখনো আছে।বিকেলে অনেকে ওদিকটায় যায় নদীর ফ্রেশ বাতাস খেতে। সাথে টং দোকানের চা,পিয়াজু,সিঙ্গারা।মেয়েরা চটপটি ফুচকা ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে হা করে গিলে।শাহীন বড় রাস্তায় উঠে অটো রিকসা পেয়েও যায়।সোজা নদীর পাড়ে ছুটে।

খুব বেশি সময় নেয় নি। অটোর ভাড়া মিটিয়ে শাহীন একটা টং দোকানে বসে চায়ের অর্ডার দেয়।ও বেছে নেয় দোকানের নিরিবিলি এক কোণ।যেখান থেকে নদী ও নদীর পাশ ঘেষে চলা রাস্তা পুরোটা দেখা যায়।রাস্তার একপাশে ফুসকার দোকানে উঠতি ছেলে মেয়েদের ভিড়।একটু দূর বলে ফেস স্পষ্ট দেখা যায় না। শাহীন চা খেতে খেতে নিজেকে প্রশ্ন করে ,কেনো এই শেষ বিকেলে দৌড়ে নদীর পাড়ে এসেছে। কিসের টানে এসেছে।ওদের বাড়ি থেকে এখানটা দূর তো কম নয়।গ্রামের রাস্তা শেষে বাজার।এরপর উপজেলা চত্বর পেড়িয়ে নদীর পাড়, সব মিলিয়ে তিন চার মাইল।কিন্তু এই দূরত্ব ওর কাছে মনে হয়েছে পনেরো বিশ মিনিটের পথ।সেটা কি দীপান্বিতার জন্য?ও ভেবে পায় না। পঁচিশ বছর আগে দীপান্বিতা কে একনজর দেখার জন্য স্কুল আওয়ারে ছুটে যেতো।শিমুল তলা, রহিম সিকদারের দোকানে বা পথে আনমনে হেঁটে এদিক ওদিক তাকাতো।দীপান্বিতার একটু দেখা পেতে। এক দু বার দীপা সোজামুখে ওর দিকে তাকিয়ে হেসেছে,তাতেই ও ফিদা।কিন্তু আজ এত বছর পরে ফেইসবুকে একটা পোস্ট দেখে কোন অন্ধ আবেগে ছুটে এসেছে।এমন ইচ্ছা শক্তি বা পেলো কোথা থেকে!

চা শেষ করে শাহীন সিগারেট ধরিয়ে সামনে তাকায়।ও দেখে সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিস্ময়।হুর মুড়িয়ে ছোটো বড়ো মিলিয়ে চার পাঁচজন টং দোকানের বেঞ্চিতে আসন পেতে বসেছে।সবার মাঝখানে ওর কাঙ্ক্ষিত জন।শাহীন মনে মনে ভাবে এতো দেখছি মেঘ না চাইতে বৃষ্টিজল।দীপান্বিতাদের পুরো দল বসার পর একজন চায়ের অর্ডার দেয়।অল্পবয়সী ছেলে, বয়স পনের ষোলো হবে।সে দোকানদার কে বলে,মামু মাথা গুণে চা দেন।ওর কথায় দীপান্বিতা সহ দলের অন্য সবাই হেঁসে ফেলে।শাহীন খুব কাছ থেকে দীপার সুন্দর দন্ত বিকশিত হাসি দেখতে পায়।

'অসাধারণ সুন্দর।'

অস্পষ্ট ভাবে শাহিনের মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে।ছেলেটি জিজ্ঞেস করে,কি অসাধারণ আংকেল?

শাহীন থতমত খেয়ে বলে,এই বিকেল,নদী, নদীর পাড়।

শাহিনের কাব্যিক কথায় আবার হাসির রোল পড়ে। শাহীন ও হাসে দীপান্বিতার চোখে চোখ রেখে। দীপা একপলক তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়।চিনে ও না চেনার ভান করে।চা পর্ব শেষ হলে ওরা সামনে নদীর পাড়ে কিছুক্ষন দাঁড়ায়। কেউ সেলফি তুলে।শাহীন দোকানে বসে দিপান্বিতার উড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল দেখে। ম্রিয়মাণ সন্ধায় দীপার কোমল মুখখানি স্পষ্ট দেখে। পাশে দাঁড়ানো ওর ছোটো বোন বলে, দিদি চল বাসায় যাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।দীপা সদলবলে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।

দীপান্বিতা চলে গেছে।শাহিনের বুকটা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আচ্ছা আর কিছুক্ষণ থাকতে পারত।আর একটু দেখতো দীপাকে।শাহীন উঠে গিয়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়ায়। যেখানটায় কিছুক্ষণ আগে দীপান্বিতা দাঁড়িয়ে ছিল।একটা জেলের ডিঙি নৌকা তীরে এসে ভিড়েছে। বুড়ো জেলের খাচিতে সাত আটটা ছোট মাঝারি ইলিশ।বুড়ো মাছের খাচী মাথায় নিয়ে নদী থেকে উপরে উঠছে।শাহীন বেশ মনোযোগ দিয়ে দৃশ্য টা দেখছে।অন্য সময় হলে চোখ এড়িয়ে যেতো। আজ দেখছে । হঠাৎ শাহিনের মনে হলো কে একজন তার খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছে। ইলিশের গন্ধের পরিবর্তে পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। সে পাশ ফিরে তাকায়।তার চোখ কপালে।চমকে উঠে বলে,দীপা তুমি! যাও নি?

হ্যাঁ আমি।

তুমি একা,অন্যরা কোথায়?

চলে গেছে।

তাহলে।

আপনি এখানে কেনো এসেছেন?

তুমি কি এটা জানতে আবার ফিরে এসেছ।

হুম।দীপা মাথা নাড়িয়ে বলে।

ফেইসবুকে তোমার ছবি ও স্ট্যাটাস দেখে আমার যে কি হলো। শুধু তোমাকে একনজর চোখে দেখার জন্য ছুটে এসেছি। শাহীন অকপটে বলে।

দীপা শাহিনের মুখের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ।বলে,আমি এটাই আন্দাজ করেছি।

তারপর আবার বলে,আপনি এসে আমাকে না ও দেখতে পেতেন।তখন?

কিছুক্ষণ থেকে চলে যেতাম।

শাহীন আপনি সেই পঁচিশ বছর আগেই রয়ে গেছেন।শুধু একটু দেখার জন্য এভাবে কেও ছুটে আসে!তা ও আপনার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক বা স্মৃতি থাকলে কথা ছিলো।

স্মৃতি কি সব।তাহলে তুমি সবাইকে বাসায় পাঠিয়ে একা থেকে গেলে কেনো, কিসের টানে।

শাহিনের এ কথায় দীপা তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর খুঁজে পায় না। আঙুল তুলে দূরে দেখায়, ঐ দেখেন আমার ছেলে দাঁড়িয়ে।মা ছেলে নদীর ধারে আরও কিছুক্ষণ থাকতে ফিরে এসেছি।

শাহীন হাসে। জিজ্ঞেস করে কি খাবে। দীপা মাথা নেড়ে বলে,চা ।

ওরা দুজন টং দোকানে গিয়ে বসে। দীপার ছেলেটা নদীর পাড়ে দুষ্টমিতে ব্যস্ত।

দীপা বলে,আমার ছেলেটা আপনাকে চিনতে পেরেছে। আমাকে বলে আম্মু লঞ্চের সেই আঁঙ্কেলটা।তোমার বন্ধু।

শাহীন স্মিত হাসে।দীপা আবার বলে,আমি কি আপনার বন্ধু? কখনও ছিলাম, না আছি।

কখনও ছিলে না। এখন হবে।

একজন বিবাহিত মেয়ে একজন অবিবাহিত পুরুষের বন্ধু হয়!

কেনো হয়না?

তাতে তো জটিলতা বাড়ে। বিশেষ করে মেয়েটার।দীপা চা খেতে খেতে বলে।

শাহীন বলে,তোমার অবজার্ভেশন একশো পার্সেন্ট সত্যি।কিন্তু আমার তো তোমার সাথে দেখা হওয়ার চান্স কম। হয়তো ফেসবুক বা মোবাইলে কথা হবে।সেটা ও তোমার উপর ডিপেন্ড করে।

আমার আপত্তি নেই। তাছাড়া ওর বাবা এসব বিষয়ে বেশ লিবারেল।ছেলে কে দেখিয়ে দীপান্বিতা বলে।

এরপর প্রসঙ্গ পাল্টাতে দীপা আবার বলে, আন্টি এখন কেমন।

শাহিনের মনে পড়ে, লঞ্চে দীপাকে বলেছিল মায়ের অসুস্থতা শুনে ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে বাড়ি যাচ্ছে। দীপা সেটা মনে রেখেছে।শাহীন বলে,মা কিছুটা অসুস্থ।

আপনার বিয়ের পাত্রী দেখিয়েছে?

একজন অলরেডি দেখানো শেষ

তারপর।

তারপর আর কি।মেয়ে আমার পছন্দ হয়নি।

আপনার কেমন মেয়ে পছন্দ?

তোমার মতো। যে বৃষ্টির মতো সুন্দর।

ফাজলামো রাখেন। আমি বৃষ্টির মতো সুন্দর!বৃষ্টির মতো সুন্দর,সেটা কেমন।

মানে চিরকালীন সুন্দর।এর সৌন্দর্য শেষ হবার নয়।

দীপার চেহরা উজ্জ্বল হয়ে উঠে, শাহিনের মুখে নিজের সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে।স্মিত হেসে বলে,আপনি ভালো মেয়ে পটাতে পারেন। কিন্তু এখন তো আমাকে উঠতে হবে।ঐযে ছেলে ইশারা দিচ্ছে বাসায় যাবার জন্য।

দীপা ওর গাঢ় হলুদ শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।শাহীন বলে,যাবার আগে কিছু বলো।

দীপা শাহিনের কানের কাছাকাছি মুখ এনে ফিশ ফিশ করে বলে, "আপনি একটা আস্ত পাগল।তবে বিশ্বাস করা যায়।"

(চলবে)

Comments

    Please login to post comment. Login