Article

কথার ভেতর কথা ৩

September 17, 2026

4
View

ইভান: এস্তেজা… আজ একটা গল্প শুনলাম, মাথা থেকে সরাতে পারছি না।

এস্তেজা: কী গল্প?

ইভান: একটা ছেলে… রাজশাহী থেকে ঢাকায় এসেছে। মিছিলের ভেতর দিয়ে, চেকপোস্ট এড়িয়ে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

এস্তেজা: কেন?

ইভান: কারণ তার মনে হয়েছিল—“যেভাবেই হোক, এই দিনে থাকতে হবে।”

এস্তেজা: এটা তো শুধু একটা যাত্রা না, এটা একটা সিদ্ধান্ত।

ইভান: হ্যাঁ। আর সবচেয়ে অদ্ভুত জিনিসটা জানো?

এস্তেজা: কি?

ইভান: তার মোবাইলের ওয়ালপেপারে নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা লেখা। আর গেঞ্জির ভেতরে পিন দিয়ে লাগানো আরেকটা কাগজ—একই তথ্য।

এস্তেজা: মানে… সে জানত, ফিরতে নাও পারে।

ইভান: হ্যাঁ। আর এটা তার নিজের সিদ্ধান্ত না— তার মা নিজে এই কাগজটা গেঞ্জির ভেতরে লাগিয়ে দিয়েছে।

এস্তেজা: একজন মা… নিজের সন্তানের পরিচয় লিখে দিচ্ছে— যদি লা*শ হয়ে ফিরে আসে, যেন চিনতে সুবিধা হয়…

ইভান: আমি তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিন্তু মনে হচ্ছিল… আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

এস্তেজা: এই জায়গাটায় যুক্তি থেমে যায়, ইভান।

ইভান: হয়তো এটাই সেই জায়গা, যেখানে “রাষ্ট্র” শব্দটা ছোট হয়ে যায় আর “মানুষ” বড় হয়ে যায়।

এস্তেজা: তুমি কি ভাবছো—ওরা কেন এসেছিল?

ইভান: জানি না। কেউ বলে অধিকার, কেউ বলে ক্ষোভ, কেউ বলে রাজনীতি… কিন্তু ওই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল— এটা শুধু দেশকে ভালোবাসার এক ধরনের অন্ধ আবেগ।

এস্তেজা: আবেগকে অনেকে দুর্বলতা ভাবে।

ইভান: আজ সংসদে তো এমন কথাও বলা হয়েছে— “আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র চলে না।”

এস্তেজা: কথাটা আংশিক সত্য।

ইভান: মানে?

এস্তেজা: রাষ্ট্র চালাতে লাগে নীতি, পরিকল্পনা, কাঠামো। কিন্তু রাষ্ট্র বদলাতে লাগে আবেগ।

ইভান:

মানে… যেদিন মানুষ রাস্তায় নামে, বুক সামনে নিয়ে দাঁড়ায়— সেদিন তারা যুক্তির হিসাব করে না?

এস্তেজা: না। সেদিন তারা অনুভব করে— “এখন না নামলে আর কখনো না।”

ইভান: তাহলে যারা আজকে সেই আবেগকে ছোট করে—

এস্তেজা: তারা হয়তো ভুলে যায়— এই আবেগই তাদের সেই জায়গায় বসিয়েছে, যেখান থেকে তারা কথা বলছে।

ইভান: একটা প্রশ্ন বারবার মাথায় আসছে… ওই মায়ের সাহসটা কোথা থেকে আসে?

এস্তেজা:

ভালোবাসা থেকে। কিন্তু সেই ভালোবাসা শুধু সন্তানের জন্য না— একটা বড় কিছুর জন্য।

ইভান: কিন্তু এটা কি ন্যায্য? একটা মা তার ছেলেকে এমন অনিশ্চয়তার দিকে পাঠাবে?

এস্তেজা: ন্যায্য-অন্যায্য দিয়ে সব ব্যাখ্যা করা যায় না। ইতিহাসের অনেক বড় মুহূর্তেই মানুষ নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বাইরে গিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়।

ইভান: তাহলে কি আবেগ দরকার?

এস্তেজা: দরকার। কিন্তু শুধু আবেগে রাষ্ট্র চলে না— আবার আবেগ ছাড়া রাষ্ট্রের কোনো পরিবর্তনও আসে না।

ইভান: মানে… আবেগ পথ দেখায় আর যুক্তি সেই পথে হাঁটতে শেখায়?

এস্তেজা: ঠিক তাই।

ইভান: তবুও একটা কথা মনে হয়… যেদিন হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, যেদিন মায়েরা সন্তানকে বিদায় দিয়েছিল— সেদিন কেউ মন্ত্রী হওয়ার হিসাব করেনি।

এস্তেজা: হ্যাঁ। সেদিন তারা শুধু একটা স্বপ্ন দেখেছিল।

ইভান: আর আজ?

এস্তেজা: আজ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দায়িত্ব— যারা ক্ষমতায়, তাদের।

ইভান: তাহলে শেষ প্রশ্ন— আবেগ কি ভুল?

এস্তেজা: না। আবেগ কখনো ভুল না। ভুল হয় তখন— যখন সেই আবেগকে সম্মান না করে, তাকে ভুলে যাওয়া হয়।

ইভান: যে আবেগ মানুষকে রাস্তায় নামায়—

এস্তেজা: সেই আবেগই একদিন ইতিহাস লিখে।

Comments

    Please login to post comment. Login