ইভান: এস্তেজা, আজ সংসদের একটা আলোচনা শুনে একটু অস্বস্তি লাগলো।
এস্তেজা: কি নিয়ে?
ইভান: প্রাথমিকে ভর্তি থেকে লটারি বাদ দিয়ে আবার পরীক্ষার মাধ্যমে “মেধা যাচাই” চালুর কথা বলা হচ্ছে।
এস্তেজা: হুম… এই বিতর্কটা পুরোনো, কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। তোমার আপত্তিটা কোথায়?
ইভান: সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— একটা ৫-৬ বছরের বাচ্চার “মেধা” আমরা কীভাবে মাপবো?
এস্তেজা: এটা আসলেই একটা জটিল প্রশ্ন। কারণ ওই বয়সে শিশুরা এখনও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার শুরুতেই পৌঁছায়নি।
ইভান: মানে স্কুলে যাওয়ার আগেই তাকে পরীক্ষা দিতে বলা হচ্ছে?
এস্তেজা: ঠিক তাই। যে জায়গায় সে শিখতে যাবে, তার আগেই তাকে যাচাই করা—এটা একটা স্ববিরোধী ধারণা।
ইভান: আরেকটা ব্যাপার আমাকে ভাবায়। যদি স্কুল শুরুতেই শুধু “ভালো” শিক্ষার্থী বেছে নেয়, তাহলে সেই স্কুলের আসল কাজটা কোথায়?
এস্তেজা: তুমি বলতে চাও— স্কুলের কাজ কি শুধু ভালো শিক্ষার্থী বেছে নেওয়া, নাকি দুর্বল শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলা?
ইভান: একদম। যদি শুরুতেই ফিল্টার করে নেয়, তাহলে তো সে শুধু একটা “ব্র্যান্ড” হয়ে দাঁড়ায়।
এস্তেজা: এটা অনেক দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দেখা যায়। যেখানে কিছু প্রতিষ্ঠান “মেধাবী শিক্ষার্থী” নিয়ে কাজ করে, আর বাকিরা পিছিয়ে পড়ে।
ইভান: তাহলে কি আমরা একটা বৈষম্যমূলক শুরু তৈরি করছি?
এস্তেজা: সম্ভাবনা আছে। কারণ ছোটবেলায় যদি একটা শিশু বুঝে যায়—“আমি ভালো না”, তাহলে সেটা তার আত্মবিশ্বাসে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
ইভান: আর একটা বাস্তবতা তো আছেই— এই পরীক্ষার কারণে কোচিং বাণিজ্য শুরু হবে।
এস্তেজা: এটা প্রায় নিশ্চিত।
ইভান: কারণ সব পরিবার তো বাসায় বসে প্রস্তুতি দিতে পারবে না।
এস্তেজা: ঠিক তাই। ফলে যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য বেশি, তারা এগিয়ে যাবে।
ইভান: মানে শুরুতেই অসম প্রতিযোগিতা।
এস্তেজা: হ্যাঁ। একটা শিশুর শিক্ষাজীবনের শুরুতেই একটা অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়।
ইভান: তাহলে লটারির ধারণাটা কি পুরোপুরি ভুল ছিল?
এস্তেজা: লটারিরও সীমাবদ্ধতা আছে, কিন্তু একটা বড় সুবিধা ছিল— এটা অন্তত শুরুতে সবাইকে সমান সুযোগ দিত।
ইভান: মানে এটা কোটা না, বরং একটা নিরপেক্ষ পদ্ধতি?
এস্তেজা: ঠিক তাই।
ইভান: আরেকটা বিষয় খেয়াল করেছো? অনেক “ভালো” স্কুল আসলে নিজেরাই আগে পরীক্ষা নিয়ে নেয়, তারপর লটারি দেখায়।
এস্তেজা: এটা একটা বড় সমস্যা। এতে পুরো প্রক্রিয়াটাই প্রহসনে পরিণত হয়।
ইভান: তাহলে আসল সমস্যা কি ভর্তি পদ্ধতিতে, নাকি পুরো শিক্ষাব্যবস্থায়?
এস্তেজা: দুটোই জড়িত। আমাদের দেশে “ভালো স্কুল” আর “মন্দ স্কুল”—এই বিভাজনটাই বড় সমস্যা।
ইভান: মানে সব স্কুল যদি মানসম্মত হতো, তাহলে এই দৌড়টাই থাকতো না?
এস্তেজা: একদম।
ইভান: তাহলে সমাধান কি?
এস্তেজা: শুরুর দিকে বাছাই না করে, সব স্কুলের মান উন্নয়ন করা।
ইভান: মানে প্রতিটা শিশুকে সুযোগ দেওয়া?
এস্তেজা: হ্যাঁ।শিক্ষা শুরু হওয়া উচিত সমান জায়গা থেকে, শেষে গিয়ে পার্থক্য তৈরি হতে পারে—শুরুতেই না।
ইভান: তাহলে একটা শিশুর প্রথম পরিচয় কি হওয়া উচিত?
এস্তেজা: “তুমি পারবে”—এই বিশ্বাস। “তুমি ফেল”—এই তকমা না।
ইভান: কারণ শিক্ষা যদি শুরুতেই বাছাই হয়ে যায়—
এস্তেজা: তাহলে শিক্ষা আর বিকাশ না, এটা হয়ে যায় বর্জনের প্রক্রিয়া।
ইভান: আর আমরা যদি সত্যিই একটা সুস্থ সমাজ চাই—
এস্তেজা: তাহলে প্রথম দরকার— শিশুর হাতে বই দেওয়ার আগে, তার ওপর থেকে ভয়টা সরানো।