২৩ বছর বয়সী সন্তান সালমানকে উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে এসেছেন বাবা আনিস রহমান। মিস্টার রহমানের বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার রশিদপুর গ্রামে।
মাদকাসক্ত ছেলের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বাবা নিজেই এসেছেন তার প্রিয় সন্তানকে আইনের হাতে সোপর্দ করতে। বাবা তার দুঃখের কথা বলতে বলতে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন, তার অন্যকোনো উপায় নাই। ছেলেটি ভাবলেশহীনভাবে বলছিল, সে নেশা করে, বাবা খায়!
বিজ্ঞ আদালত ছেলেটিকে জেরা করে রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পাওয়ায় ছেলেটিকে তিনমাসের জেল ও একশ টাকা শাস্তি ধার্য করেন। ছেলেটি চলে যায় পুলিশের মাধ্যমে কারাগারে। অসহায় মনমরা বাপ বাড়ির পথ ধরেন। নিশ্চিত আজ রাতে তিনি ঘুমাতে পারবেন না, রাতের খাবারও তার গলা দিয়ে নামবে না।
উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম ফখরুল হোসাইন গণমাধ্যমকে জানালেন গেল ৬ মাসে শতাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন।
এই শাস্তি কি সমাজ থেকে আদৌ মাদক নির্মূল করতে পারছে। সম্ভবত না। এই যে চার এত অপরাধ, চুরি, ছিনতাই, খু'ন, জ'খম, ধ'র্ষণ -সব অপকর্মের পেছনেই মাদকের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। মোটাদাগে গ্রাম বা শহরের অন্তত ৬০/৭০ শিশু, কিশোর, তরুণ, মাঝবয়সী ও বয়স্করা ইয়াবা সেবন করে।
আমার গ্রামের উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, সেখানকার বাজারে নির্দিষ্ট পয়েন্টে সন্ধ্যার পরে রীতিমতো ইয়াবার হাট বসে। সেখান থেকে কিনে নিয়ে যার যার আস্তানায় গিয়ে এই বিষ সেবন করে চুরিচামারি ও বিচিত্র অপরাধে নেমে যায় ইয়াবাখোররা। দুঃখজনক সত্য হলো এর পেছনে আছে চেনা সমাজপতিরা। সামান্য কয়টা অর্থের কাছে তাদের বিবেক, নৈতিকতা, শ্রেয়বোধ সবটাই বর্গা দিয়ে বসে আছে। যে সমাজে পঞ্চায়েতের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা মাদক কারবারের সাথে জড়িয়ে যায় -সেখানকার তরুণ সমাজের বিপথগামিতা কেউ ঠেকাতে পারবে না।
যেনতেনভাবে উপার্জিত অর্থ এখানকার মানুষের একমাত্র আরাধ্য বস্তু। যেই অবৈধ অর্থই সকল অনর্থের মূল। সরকার পারে ইয়াবা সরবরাহের শেকড় কেটে দিতে। কিন্তু ক্ষমতায় থাকা লোকেদেরই যখন বিপুল অর্থের দরকার কমছে না -সেখানে ইয়াবার চালানও কোনোদিন থামবে না।
২৩ বছরের যুবক সালমানের চেহারার দিকে তাকানো যায় না। স্বাভাবিকত্ব হারিয়ে ফেলেছে। কথা বলছে অসংলগ্নভাবে। দেশের আনাচকানাচে এখন এমন বহু সালমানে ভরা।
খুব অন্তজ মানুষ কৃষক আনিস রহমানের মুখটি মনে পড়ছে। তার চোখের কোণায় পুত্রশোকের জল ভীষণ বিচলিত করছে। তিনি ও তার স্ত্রী নিশ্চয়ই রাতভর দুঃখের কান্নায় বালিশ ভেজাবেন।
বাংলাদেশের এই বেহাল সমাজ কোনোদিন ভালো হবে না? অর্থের অনর্থ ঝেড়ে ফেলে একবেলা কম খেয়ে আমরা কোনোদিন সুখী হবো না? মানুষ নাম রোশনাই করব না?
আমাদের পরিণতি কেন এমন হলো?
কার অভিশাপে পুড়ে যাচ্ছে আমাদের মন, মনন, মগজ ও সংস্কৃতি? আমরা কবে সত্য ও সুন্দরকে ভালোবাসতে শিখব?🪶
লেখক: সাংবাদিক
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬