Article

হেজিমোনির ভাঙন ও পোলারিজেশন: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বে 'পোস্ট-ওয়েস্টার্ন' বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা- রাফাত আহমেদ

September 20, 2026

52
View

​ইতিহাসের ক্যানভাসে পরাশক্তিগুলোর উত্থান-পতন এক চিরন্তন দৃশ্যকাব্য। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছাই থেকে জন্ম নেওয়া আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি দীর্ঘকাল ধরে একটি নির্দিষ্ট মেরুর বৃত্তে আবর্তিত হয়েছে—যেখানে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলস ছিল বৈশ্বিক ক্ষমতার মূল ধ্রুবক। পশ্চিমের তৈরি করা অর্থনৈতিক মাপকাঠি, সাংস্কৃতিক বয়ান এবং ভূ-রাজনৈতিক মতবাদই ছিল বিশ্ব পরিচালনার একমাত্র অনুশাসন। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই বর্তমান দশকে এসে সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের পসরা যেন ফুরিয়ে আসছে। বিশ্বব্যবস্থার সেই পুরোনো কেল্লার দেওয়ালে আজ গভীর ফাটল ধরেছে, আর তার ধ্বংসস্তূপের ওপর জন্ম নিচ্ছে এক নতুন বহুমেরু পৃথিবী।

​তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত এই রূপান্তরকে নিছক ক্ষমতার রদবদল বলা চলে না; এটি মূলত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘এপিস্টেমিক ব্রেক’ বা চিন্তার কাঠামোগত এক মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সনাতন তত্ত্বগুলো—বিশেষ করে রিয়ালিজম কিংবা উদারনৈতিক আন্তর্জাতিকতাবাদ—এতকাল বিশ্বকে একটি সরলরৈখিক দৃষ্টিতে দেখেছে। কিন্তু বর্তমানের এই ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’ বা পশ্চিম-উত্তর বাস্তবতায় এসে সেই প্রথাগত চশমা দিয়ে আর বৈশ্বিক রাজনীতি মাপা যাচ্ছে না। গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতিগুলো আজ আর কাঠামোর প্রান্তসীমায় বসে থাকা নীরব দর্শক নয়; বরং তারা নিজেদের সৃজনশীল ও ভূ-অর্থনৈতিক শক্তির জোরে মূল মঞ্চের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিতে চাইছে।

​এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতিতে ‘হেজিমোনি’ বা আধিপত্যের ধারণাটি আজ এক গভীর সংকটের মুখে। ব্রিকস-এর সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিকল্প মুদ্রা বলয়ের উত্থান এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর দাপট প্রমাণ করে যে বিশ্ব এখন আর কোনো একক অক্ষের চারপাশে ঘোরে না। এটি ক্ষমতার এক বহুমুখী বিকেন্দ্রীকরণ, যেখানে প্রতিটি উদীয়মান শক্তি নিজস্ব মহাকর্ষ বলয় তৈরি করছে। ঠিক যেমন একটি নদী তার পুরোনো গতিপথ ভেঙে নতুন মোহনার জন্ম দেয়, তেমনি বৈশ্বিক কূটনীতিও আজ এক বহুমেরু পোলারিজেশনের মধ্য দিয়ে নতুন সমুদ্রের সন্ধানে ছুটছে।

​এই প্রবন্ধের মূল অভিপ্রায় হলো তাত্ত্বিক কাঠামোর শাণিত অস্ত্র দিয়ে পশ্চিমা হেজিমোনির এই অবক্ষয় এবং বৈশ্বিক পোলারিজেশনের গভীরতম তলদেশকে উন্মেচন করা। প্রথাগত তত্ত্বের সীমারেখা পেরিয়ে কীভাবে এক নতুন ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’ বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠছে এবং উদীয়মান এই বহুমেরু বাস্তবতা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির চালচিত্রকে কীভাবে পুনর্গঠন করছে, তা এখানে তাত্ত্বিক ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গিতে খতিয়ে দেখা হবে।


আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রাজনীতি কেবল মানচিত্রের সীমানা কিংবা বারুদের হিসাব নয়; এটি মূলত ধারণার যুদ্ধ, চিন্তার আধিপত্য এবং বয়ান তৈরির এক দীর্ঘ মহাকাব্য। এই মহাকাব্যের গতিপ্রকৃতি বুঝতে হলে আমাদের প্রবেশ করতে হয় ‘তাত্ত্বিক কাঠামোর’ এক জটিল গোলকধাঁধায়। এতদিন ধরে বিশ্বরাজনীতির চশমাটি তৈরি হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট কারখানায়—যার কারিগর ছিল পশ্চিম। রিয়ালিজম (Realism) বা বাস্তববাদের কর্কশ দৃষ্টি কিংবা লিবারেল ইন্টারন্যাশনালাইজেশনের রঙিন চশমা পরে বিশ্বকে দেখা হতো একটি সরলরৈখিক ছকে, যেখানে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল কেবল ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা ব্রাসেলস। কিন্তু বর্তমানের এই ভাঙনধরা বিশ্বে সেই সনাতন তত্ত্বগুলো যেন আজ বর্মহীন এক যোদ্ধা, যে আধুনিক ভূ-রাজনীতির জটিল পসরা সামলাতে গিয়ে পুরোপুরি হাঁপিয়ে উঠেছে।

​তাত্ত্বিক পরিভাষার এই রূপান্তরকে অনুধাবন করতে হলে আমাদের শরণাপন্ন হতে হবে ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন থিওরি’ (Post-Western Theory) এবং উত্তর-উপনিবেশবাদী সমালোচনার। প্রথাগত তাত্ত্বিক কাঠামোতে ‘হেজিমোনি’ বা আধিপত্যকে একটি স্থায়ী ও স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছিল—যেখানে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে ক্ষমতার সূর্য পশ্চিম আকাশে উঠলে সারা বিশ্বে তার আলো ছড়াবেই। কিন্তু তত্ত্বের এই ইউক্লিডীয় জ্যামিতি আজ ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সমসাময়িক বিশ্বব্যবস্থায় জন্ম নিচ্ছে এক নতুন ‘এপিস্টেমিক ডিসকোর্স’ বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বয়ান, যেখানে গ্লোবাল সাউথের তাত্ত্বিকরা প্রশ্ন তুলছেন: কেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সংজ্ঞায় প্রান্তিক অঞ্চলের কণ্ঠস্বর নীরব থাকবে? কেন ক্ষমতার ভারসাম্য কেবল উত্তর গোলার্ধের ব্যালান্স অব পাওয়ার দিয়ে মাপা হবে?

​এই তাত্ত্বিক রূপরেখায় ‘পোলারিজেশন’ বা মেরুকরণ এখন আর কোনো দ্বিমেরু (Bipolar) কিংবা এককেন্দ্রিক (Unipolar) বৃত্তে আটকে নেই। এটি এক বহুমুখী ও বহুস্তরীয় পলিকেন্দ্রিক বাস্তবতা, যাকে ফরাসি দার্শনিকদের পরিভাষায় বলা চলে একধরনের ‘ডিসসেন্টার্ড নেটওয়ার্ক’ বা বিকেন্দ্রীকৃত জাল। নব্য-বাস্তববাদের (Neo-realism) কাঠামোগত কঠোরতা এবং উদারনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিকতার বয়ান ভেদ করে আজ উঠে আসছে ‘গ্লোবাল সাউথ পারস্প্টিভ’। এই নতুন তাত্ত্বিক কাঠামো আমাদের শেখায় যে, বিশ্ব রাজনীতি এখন আর কোনো নির্দিষ্ট বা মূল কেন্দ্রের অনুগত নয়; বরং এটি বহুচর্চিত ও সমান্তরাল অনেকগুলো মহাকর্ষ বলয়ের সংঘর্ষক্ষেত্র।

​অতএব, ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’ বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা বুঝতে হলে আমাদের পুরোনো তাত্ত্বিক পাঠ্যবইয়ের পাতা উল্টে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক দিগন্তে প্রবেশ করতে হবে। যেখানে হেজিমোনির ধ্রুবকগুলো ধূলিসাৎ হয়ে জন্ম নেবে এক বহুমুখী, বহুস্বরের এবং তাত্ত্বিকভাবে ঋদ্ধ নতুন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ব্যাকরণ।


​ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় পশ্চিমের হেজিমোনি বা একচ্ছত্র আধিপত্য কেবল সামরিক শক্তির জোরে টিকে ছিল না; এর পেছনে কাজ করেছিল এক সর্বব্যাপী অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থায় ওয়াশিংটন ও ইউরোপীয় রাজধানীগুলো নিজেদেরকে বিশ্ব শাসনের একচ্ছত্র নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিভাবক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ) মারপ্যাঁচ, বৈশ্বিক বাণিজ্যের অদৃশ্য চালিকাশক্তি এবং বিশ্ববাসীর মনে পশ্চিমা মূল্যবোধের অবিকল্প সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে তারা এমন এক দুর্গ গড়ে তুলেছিল, যা ভেদ করার সাহস কারও ছিল না। কিন্তু সাম্রাজ্যের সেই সুবর্ণ সূর্যের আলো আজ নিভে আসার উপক্রম হয়েছে; পশ্চিমের গড়া সেই বৈশ্বিক দুর্গ আজ ভেতর থেকে নড়ে উঠেছে এবং এর স্থপতিরাই আজ এর কাঠামোগত সংকটের মুখোমুখি।

​এই হেজিমোনির অবক্ষয় একদিনে বা কোনো আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ে ঘটেনি। এটি মূলত দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত সংকট, আত্মঘাতী নীতি এবং নিজেদের তৈরি করা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নিজেদের আস্থার চরম ঘাটতির ফল। একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশকে সংঘটিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, মহামারী এবং দীর্ঘমেয়ায়ী আঞ্চলিক সংঘাতগুলো স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে যে পশ্চিমা পুঁজিবাদী মডেল সর্বরোগের মহৌষধ নয়। বিশ্ব শাসন করার যে নৈতিক ও অর্থনৈতিক একাধিপত্য তারা দশকের পর দশক ধরে বজায় রেখেছিল, আজ সেখানে দেখা দিয়েছে গভীর ফাটল। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ এবং সংকট ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তথাকথিত 'দ্বিমুখী নীতি' বা ডাবল স্ট্যান্ডার্ড পশ্চিমা বিশ্বকে নৈতিকভাবে চরম দেউলিয়াত্বের মুখে ঠেলে দিয়েছে। যখন একই মাপকাঠি বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখন বৈশ্বিক দক্ষিণ বা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে পশ্চিমা নৈতিকতার বুলি কেবল একটি প্রহসন বলে মনে হয়।

​তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, এই অবক্ষয় হলো হেজিমোনিক স্থবিরতা (Hegemonic Stagnation) এবং ক্ষমতা স্থানান্তরের এক অবধারিত পরিণতি। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং নব্য-বাস্তববাদের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যখন কোনো আধিপত্যবাদী শক্তি তার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক সুসংহতি হারাতে থাকে, তখন সে বাধ্য হয় তার আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে বলপ্রয়োগ কিংবা কৃত্তিম আধিপত্যমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পশ্চিমের সেই দাপুটে ছবি আজ মলিন। তাদের নীতি-নির্ধারকরা আজ নিজেদের ঘরের ভেতরের তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, জাতীয়তাবাদী উগ্রতা এবং সামাজিক সংকটের জাঁতাকলে পিষ্ট। ফলে বৈশ্বিক মঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়ার যে সহজাত ও একচ্ছত্র ক্ষমতা তাদের ছিল, তা আজ এক গভীর আত্মিক ও রাজনৈতিক সংকটে পর্যবসিত হয়েছে।

​এই পতন কেবল একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভাঙন নয়; এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক মোড় ঘোরানো অধ্যায়, যেখানে পশ্চিমের এককেন্দ্রিক আলো নিভে গিয়ে জন্ম দিচ্ছে এক বহুমাত্রিক ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ বাস্তবের। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে পশ্চিমা হেজিমোনির শূন্যস্থান পূরণে উদিত হচ্ছে নতুন নতুন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তি। ফলস্বরূপ, বিশ্বব্যবস্থা আজ কেবল একটি ভাঙনের মধ্য দিয়েই যাচ্ছে না, বরং এটি এক নতুন পলিকেন্দ্রিক বা বহুমেরু ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়াচ্ছে, যার রূপরেখা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে।


​ঐতিহাসিক সময় পরিক্রমায় গ্লোবাল সাউথ—অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার প্রান্তিক ও উন্নয়নশীল দেশগুলো—দীর্ঘকাল ধরে বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে ছিল বহু দূরে। বিশ্ব রাজনীতির মূল মঞ্চে তারা ছিল মূলত দর্শক বা অনুসারীর ভূমিকায়, যাদের ভাগ্য নির্ধারিত হতো উত্তর গোলার্ধের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষগুলোতে বসে থাকা পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কলমের এক আঁচড়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পশ্চিমের সেই একচ্ছত্র হেজিমোনি এবং কেন্দ্রীভূত কাঠামোর দিন আজ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন আর কেবল কাঁচামাল সরবরাহকারী বা দাতাগোষ্ঠীর কৃপার ওপর নির্ভরশীল প্রান্তিক অর্থনীতি নয়; তারা আজ বৈশ্বিক উৎপাদনের প্রধান চালিকাশক্তি, উদীয়মান বাজারের প্রাণকেন্দ্র এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির নতুন নিয়মতান্ত্রিক অংশীদার। এই পুনরুত্থান নিছক কোনো সাধারণ অর্থনৈতিক উল্লম্ফন নয়; এটি বিশ্বমঞ্চে এক অভাবনীয় ক্ষমতার বহুমুখী বিকেন্দ্রীকরণ।

​এই কাঠামোগত পরিবর্তনের মূলে রয়েছে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুগুলোর পূর্ব ও দক্ষিণমুখী এক কৌশলগত স্থানান্তর। এশিয়ার অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক গতিশীলতা, আফ্রিকার ক্রমবর্ধমান তরুণ জনসংখ্যাগত সুবিধা (Demographic Dividend) এবং ল্যাটিন আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক সম্পদের প্রাচুর্য বিশ্বকে বাধ্য করেছে এককেন্দ্রিক বা দ্বিমেরু চিন্তা থেকে চিরতরে বেরিয়ে আসতে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক পরিসরে একে বলা যায় 'পাওয়ার ডি-সেন্ট্রালাইজেশন' বা ক্ষমতার বহুমুখী বিকেন্দ্রীকরণ, যেখানে পৃথিবী আর কোনো নির্দিষ্ট একটি রাজধানী বা নির্দিষ্ট অঞ্চলের মর্জির ওপর চালিত হয় না। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং যৌথ কূটনৈতিক কৌশল গড়ে তুলছে, যা পশ্চিমা আধিপত্যের সমান্তরালে এক শক্তিশালী বিকল্প বলয় তৈরি করেছে।

​এই বিশাল রূপান্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সনাতন তত্ত্বগুলোর সামনে এক নতুন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। ঐতিহ্যগত তাত্ত্বিক কাঠামোতে গ্লোবাল সাউথকে সবসময় 'সহায়তাপ্রাপ্ত' বা 'অনুন্নত' তকমা দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হতো, যেখানে ধরে নেওয়া হতো যে তাদের কোনো স্বাধীন কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি নেই। কিন্তু বর্তমান বহুমেরু বিশ্বে এই দেশগুলো নিজেদের স্বকীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার হচ্ছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জলবায়ু ন্যায্যতা, ঋণ সংকট সমাধান কিংবা ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে তারা নিজেদের জোরালো কণ্ঠস্বর তুলে ধরছে। ক্ষমতার এই নতুন সমীকরণ প্রমাণ করে যে, বিশ্বব্যবস্থা আর কোনো একক অক্ষের অনুগত থাকতে রাজি নয়; বরং এটি এখন বহুচর্চিত ও সমান্তরাল মহাকর্ষ বলয়ের এক বিশাল সমাহার, যেখানে গ্লোবাল সাউথের এই ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ বিশ্বরাজনীতির মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দিচ্ছে।


একবিংশ শতাব্দীর ভূ-রাজনীতিতে সামরিক শক্তির চেয়েও বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। এতদিন ধরে বিশ্ব বাণিজ্য, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন এবং আর্থিক লেনদেনের মূল নাড়ী নক্ষত্র নিয়ন্ত্রিত হতো পশ্চিমা বিশ্বের গড়া কিছু নির্দিষ্ট কাঠামোর মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান বহুমেরু বিশ্বে সেই একপেশে ভূ-অর্থনৈতিক বিন্যাসে গভীর ফাটল ধরেছে এবং জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন বিকল্প অক্ষ। রাষ্ট্রগুলো এখন কেবল সামরিক জোটের ওপর নির্ভর করছে না, বরং অর্থনীতি ও বাণিজ্যের অস্ত্রকে ব্যবহার করে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান পোক্ত করছে। এই বহুমাত্রিক বিভাজন ও নতুন জোটগুলোর উত্থান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চালচিত্রকে সম্পূর্ণ পাল্টে দিচ্ছে।

​এই ভূ-অর্থনৈতিক রূপান্তরের সবচেয়ে বড় ও দৃশ্যমান রূপকার হলো ব্রিকস (BRICS) জোটের সম্প্রসারণ। ঐতিহাসিকভাবে উদীয়মান অর্থনীতির কয়েকটি দেশের মোর্চা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই জোট বিশ্ব অর্থনীতির এক শক্তিশালী বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশেষ করে, তেলের বাজার থেকে শুরু করে বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রগুলোতে ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান অংশীদারিত্ব পশ্চিমা আধিপত্যের মুখোমুখি এক সমান্তরাল অর্থনৈতিক অক্ষ তৈরি করেছে। এর পাশাপাশি গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA), আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং সাপ্লাই চেইনের বহুমুখীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়েছে। অতীতে বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি ছিল এককেন্দ্রিক—যেখানে পণ্য ও পুঁজির প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হতো পশ্চিমের মর্জিতে। বর্তমানের ভূ-অর্থনৈতিক বিভাজন সেই কেন্দ্রিকতাকে ভেঙে দিয়ে আঞ্চলিক ও বহুস্তরীয় বাণিজ্যের নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে।

​করোনা মহামারী এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত (যেমন: ইউক্রেন সংকট বা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা) বিশ্ববাসীকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে একক বা নির্দিষ্ট কিছু দেশের ওপর নির্ভর করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। ফলে দেশগুলো এখন 'নিয়ারশোরিং' (Nearshoring), 'ফ্রেন্ডশোরিং' (Friendshoring) কিংবা সম্পূর্ণ নিজস্ব বিকল্প সাপ্লাই চেইন গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এর ফলশ্রুতিতে বিশ্ব অর্থনীতি আজ আর একটি অখণ্ড বিশ্ববাজারের নিয়মে চলছে না; বরং এটি খণ্ডিত হয়ে বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী ও সহযোগী অর্থনৈতিক ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ছে।

​তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ভূ-অর্থনৈতিক বিভাজন হলো বিশ্বায়নের এক নতুন রূপ—যাকে অনেক সময় 'ফ্র্যাগমেটেড গ্লোবালাইজেশন' বা খণ্ডিত বিশ্বায়ন বলা চলে। মুক্ত বাজার অর্থনীতির সার্বজনীন বয়ান আজ আঞ্চলিক ও জাতীয় স্বার্থের কঠোর বেড়াজালে অবরুদ্ধ। বিকল্প অর্থনৈতিক জোটগুলোর এই উত্থান কেবল বাণিজ্যের সমীকরণ বদলাচ্ছে না, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুকে পশ্চিম থেকে পূর্ব ও দক্ষিণের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তিটাকে আরও বেশি স্থায়ী ও দৃশ্যমান করে তুলছে।


​দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিষয়টি সবচেয়ে শক্ত স্তম্ভ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা হলো মার্কিন ডলারের একচ্ছত্র আধিপত্য। ব্রেটন উডস চুক্তির উত্তরাধিকার হিসেবে ডলার কেবল আমেরিকার জাতীয় মুদ্রা নয়, এটি হয়ে উঠেছিল বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম, আন্তর্জাতিক রিজার্ভের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং বিশ্ব অর্থনীতির রক্তাল্পতা নিরাময়ের অদৃশ্য চালিকাশক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই 'ডলার হেজিমোনি' বা মুদ্রার একাধিপত্যকে কাজে লাগিয়ে দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে তাদের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার—সবখানেই ডলারের উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। কিন্তু বর্তমান বহুমেরু বিশ্বে এসে সেই মুদ্রার ভূ-রাজনীতিতে এক গভীর ও নজিরবিহীন ফাটল ধরেছে, যা পরিচিতি পেয়েছে 'ডি-ডলারাইজেশন' বা ডলারমুক্তকরণের প্রক্রিয়া হিসেবে।

​এই ডি-ডলারাইজেশন বা মুদ্রার ভূ-রাজনীতির পরিবর্তনের পেছনে কাজ করছে সুনির্দিষ্ট কিছু ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা (Economic Sanctions) এবং সুইফট (SWIFT) এর মতো আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেমকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা অনেক দেশকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। বিশেষ করে রাশিয়া, চীন এবং গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান অর্থনীতিগুলো অনুধাবন করতে পেরেছে যে, মার্কিন ডলারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা তাদের জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকিতে ফেলছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলারের একাধিপত্য ভেঙে নিজেদের স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন (Local Currency Settlement), বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তোলা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনার প্রবণতা পাগলা ঘোড়ার মতো বেড়ে গেছে।

​তাত্ত্বিক দিক থেকে বিচার করলে, এই মুদ্রার ভূ-রাজনীতি কেবল হিসাব-নিকাশের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু স্থানান্তরের একটি চূড়ান্ত অর্থনৈতিক রূপ। যখন উদীয়মান অর্থনৈতিক জোটগুলো (যেমন ব্রিকস) মার্কিন ডলারের বাইরে গিয়ে নিজস্ব বা পারস্পরিক মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার রূপরেখা তৈরি করে, তখন তা পশ্চিমা আর্থিক সাম্রাজ্যবাদের ভিত্তিমূলে সরাসরি আঘাত হানে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তত্ত্বে একে 'জিও-ইকোনমিক কাউন্টার-ব্যালান্সিং' বা ভূ-অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা বলা চলে। বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের একক রাজত্বে এই ফাটল কেবল মুদ্রাবাজারে বৈচিত্র্য আনছে না, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার মেরুকরণকে আরও তীব্র করে তুলছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণকে স্থায়ীভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।



​এককেন্দ্রিক বা দ্বিমেরু বিশ্বব্যবস্থার সরল সমীকরণ পেরিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আজ এক অত্যন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক বহুমেরু বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। অতীতে বৈশ্বিক সম্পর্ক পরিচালিত হতো একটি সুনির্দিষ্ট মেরু বা ঠান্ডা লড়াইয়ের কাঠামোর ভেতর, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান ছিল হয় ‘এর পক্ষে’ কিংবা ‘তার বিপক্ষে’। কিন্তু বর্তমানের পলিকেন্দ্রিক বা বহুমেরু বিশ্বে সেই দ্বিভাজিত রেখাগুলো আজ মুছে গেছে। এর পরিবর্তে বিশ্বমঞ্চে জন্ম নিয়েছে এক অভিনব ভূ-রাজনৈতিক জটিলতা, যেখানে একই সাথে সংঘাত এবং সহযোগিতার নজিরবিহীন যুগপৎ উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। রাষ্ট্রগুলো এখন আর কোনো নির্দিষ্ট একটি পরাশক্তির লেজুড়বৃত্তি করছে না, বরং তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে অবলম্বন করছে এক বহুমুখী কূটনীতি বা 'মাল্টি-অ্যালাইনমেন্টের' কৌশল।

​এই নতুন সমীকরণের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো—রাষ্ট্রগুলো একই সাথে অর্থনৈতিকভাবে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল, আবার ভূ-রাজনৈতিকভাবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিত লিপ্ত। উদাহরণস্বরূপ, উদীয়মান শক্তিগুলো একদিকে কোনো একটি পশ্চিমা জোটের সাথে বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব বজায় রাখছে, অন্যদিকে ঠিক একই সময়ে বিকল্প কোনো অর্থনৈতিক ব্লকে বা জোটেও জোরালো ভূমিকা পালন করছে। শীতল লড়াইয়ের আমলের মতো চিরশত্রু বা চিরমিত্রের প্রথাগত ধারণা আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। কূটনীতির এই পরিবর্তনশীল মাঠে এখন অংশীদারিত্ব নির্ধারিত হয় সম্পূর্ণ ভূ-অর্থনৈতিক প্রয়োজন, প্রযুক্তিগত হিসেব-নিকেশ এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের ওপর ভিত্তি করে। সংঘাতগুলোও এখন আর কেবল সামরিক রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই; সাইবার স্পেস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাপ্লাই চেইন এবং মুদ্রা বাজারের নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠেছে আধুনিক সংঘাতের প্রধান ময়দান।

​তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পরিবর্তনটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রথাগত তত্ত্বগুলোকে এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ক্লাসিক্যাল রিয়ালিজম বা ক্ষমতার ভারসাম্য (Balance of Power) তত্ত্ব দিয়ে বর্তমান বহুমেরু বিশ্বের এই তরল সমীকরণ পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ, আধুনিক রাষ্ট্রগুলো কেবল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি বা রক্ষার খেলায় মত্ত নয়; তারা একই সাথে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক জোটে অন্তর্ভুক্তি এবং বহুমুখী কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের কৌশলগত স্পেস টিকিয়ে রাখার লড়াই চালাচ্ছে। সহযোগিতার ছদ্মবেশে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং প্রতিযোগিতার ভেতরেও প্রয়োজনের খাতিরে সহযোগিতার এই অদ্ভুত মেলবন্ধনই হলো বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার সবথেকে বড় বাস্তবতা, যা আগামী দিনের আন্তর্জাতিক কূটনীতির চালচিত্রকে এক নতুন ও অভাবনীয় পরিণতির দিকে চালিত করছে।



ইতিহাসের ক্যানভাসে পরাশক্তিগুলোর উত্থান-পতন কখনো সরলরেখায় চলে না; এটি এক অবিরাম বৃত্তাকার ঘূর্ণন ও রূপান্তরের মহাকাব্য, যেখানে প্রতিটি সাম্রাজ্যের অস্তাচলের গর্ভেই জন্ম নেয় এক নতুন সূচনার ভোর। দীর্ঘ শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক রাজনীতির আসমান যে নির্দিষ্ট একটি পশ্চিমা ধ্রুবতারার আলোয় উদ্ভাসিত ছিল, আজ সেই এককেন্দ্রিক হেজিমোনির আকাশ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ থেকে পরিচালিত নিয়ন্ত্রণের সুতোগুলো আজ চিরতরে আলগা হয়ে গেছে। এর পরিবর্তে জন্ম নিয়েছে এক বহুমুখী, বহুস্তরযুক্ত এবং পলিকেন্দ্রিক মহাশূন্যের—যেখানে গ্লোবাল সাউথের উদীয়মান কণ্ঠস্বর, ভূ-অর্থনৈতিক বিভাজন, মুদ্রার ভূ-রাজনীতি এবং বিকল্প অক্ষগুলোর সমান্তরাল উপস্থিতি বিশ্ব রাজনীতিকে এক অচেনা কিন্তু রোমাঞ্চকর বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

​তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত এই রূপান্তর কোনো আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক ঝড়ের আকস্মিক ফল নয়; এটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সনাতন তত্ত্বগুলোর তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব এবং দীর্ঘায়িত কৃত্রিম স্থিতাবস্থার একটি অনিবার্য পরিণতি। প্রথাগত তাত্ত্বিক কাঠামোর একচ্ছত্র ছড়ি ঘোরানোর দিন শেষ হয়ে এখন উন্মোচিত হচ্ছে বহুস্বরের এক গোলকধাঁধা, যেখানে প্রতিটি উদীয়মান শক্তি নিজস্ব মহাকর্ষ বলয় ও নিজস্ব কক্ষপথ তৈরি করে বৈশ্বিক কূটনীতির মানচিত্রকে নতুন করে এঁকে চলেছে। ঠিক যেমন রুক্ষ বসন্তের তীব্র দাবদাহ পেরিয়ে প্রকৃতির শুষ্ক জমিতে নতুন জীবনের অঙ্কুরোদগম হয়, তেমনি পশ্চিমের এককেন্দ্রিক সাম্রাজ্যের ধূসর ধ্বংসস্তূপের ওপর মাথা তুলেছে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অথচ প্রাণবন্ত বহুমেরু পৃথিবী।

​পরিশেষে বলা যায়, এই ‘পোস্ট-ওয়েস্টার্ন’ বিশ্বব্যবস্থা কেবল ক্ষমতার রদবদল কিংবা নিছক কিছু বাণিজ্যিক জোটের পুনর্বিন্যাস নয়; এটি বিশ্ব ইতিহাসের এমন এক রূপান্তরমূলক সন্ধিক্ষণ, যেখানে সমতা, বহুত্ববাদ এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের নতুন মন্ত্রে দীক্ষিত হচ্ছে পুরো গ্রহটি। আগামী দিনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি হয়তো আরও বেশি তরল, প্রতিযোগিতাপূর্ণ এবং জটিল হবে; কিন্তু সেই জটিলতার চাদর ভেদ করেই রচিত হবে এক নতুন, সুষম ও বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থার অমর উপাখ্যান—যেখানে কোনো একক শক্তির মর্জিতে নয়, বরং পারস্পরিক সমঝোতা ও ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করেই নির্ধারিত হবে মানব সভ্যতার আগামী দিনের গন্তব্য।

Comments

    Please login to post comment. Login