Article

পণ্যের ফটিসিজম, বায়োপলিটিক্স ও অপ্রতিমের রক্ত: রাষ্ট্র-সমাজতাত্ত্বিক পাঠ -রাফাত আহমেদ

September 20, 2026

118 views

একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বৈধতা কেবল তার ক্ষমতার দাপট বা আইন প্রয়োগের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; বরং তার প্রকৃত ভিত্তি নিহিত থাকে প্রতিটি নাগরিকের, বিশেষ করে তার সবচেয়ে অসহায় ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যটির জীবন ও সুরক্ষার নিশ্চয়তার ভেতর। কিন্তু যখন একটি সমাজ ভোগবাদ ও অন্ধ ফটিসিজমের মোহে এমন এক চরম অবক্ষয়ের প্রান্তে এসে দাঁড়ায়, যেখানে সামান্য একটি গ্যাজেটের লোভে একটি শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়, তখন সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সামাজিক চুক্তির সমস্ত বয়ান গভীর সংকটের মুখে পড়ে।

​ইশিয়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নৃশংস হত্যাকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ নয়। এটি আমাদের সমসাময়িক সামাজিক পচন, রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা এবং পুঁজিবাদী কাঠামোর নির্মম বাস্তবতার এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি। থমাস হবসের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’, কার্ল মার্ক্সের ‘কমোডিটি ফটিসিজম’, মিশেল ফুকোর ‘বায়োপলিটিক্স’ এবং আچیলে এমেম্বের ‘নেক্রোপলিটিক্স’-এর তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেও যদি আমরা অপ্রতিমের এই চলে যাওয়াকে পাঠ করি, তবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কীভাবে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আয়োজন ধীরে ধীরে মানুষের প্রাণকে পণ্যের নিচে চাপা দিয়ে চলেছে।

​এই লেখার উদ্দেশ্য কেবল কোনো শোকগাথা রচনা করা নয়; বরং অপ্রতিমের রক্তকে কেন্দ্র করে আমাদের ভেঙে পড়া রাষ্ট্র-সমাজ কাঠামোর নৈতিক দেউলিয়া অবস্থাকে উন্মোচন করা এবং প্রতিশোধের বশবর্তী না হয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত ন্যায়বিচারের দাবি জোরালো করা।

১. কমোডিটি ফটিসিজম এবং টেকনোলজিক্যাল অবজেক্টিভেশন: যন্ত্রের করাল গ্রাসে মানবতা

​কার্ল মার্ক্সের রাজনৈতিক অর্থনীতির Critique-এ ‘কমোডিটি ফটিসিজম বা পণ্য পূজাবাদের ধারণাটি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার এক নির্মম সত্যকে উন্মোচন করে। মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় মানুষ ও মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্কগুলো অদৃশ্য হয়ে গিয়ে তার স্থলাভিষিক্ত হয় বস্তু ও পণ্যের মধ্যকার সম্পর্ক। পণ্য তখন কেবল তার ব্যবহারমূল্য বা বিনিময়মূল্যের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; সে অর্জন করে এক জাদুকরি ও স্বাধীন সত্তা, যা মানুষের ওপর প্রভুত্ব বিস্তার করে। বর্তমান উত্তর-আধুনিক ও অতি-পুঁজিবাদী সমাজে এই ফটিসিজম তার চরম রূপ ধারণ করেছে, যেখানে আইফোনের মতো প্রযুক্তিগত গ্যাজেটগুলো কেবল নিছক যোগাযোগের কোনো মাধ্যম বা ইউটিলিটি অবজেক্ট হিসেবে টিকে নেই। এগুলো এখন সামাজিক মর্যাদা, শ্রেণিগত শ্রেষ্ঠত্ব, প্রতীকী ক্ষমতা এবং জাঁকজমকের মূর্ত প্রতীক। ফরাসি দার্শনিক জাঁ বোদ্রিয়ারের ভাষায় একে ‘সাইন ভ্যালু’ বলা চলে, যেখানে বস্তু নিজেই মানুষের পরিচয় ও ক্ষমতার মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। আর এই মোহাচ্ছন্ন বাস্তবতায় গণমাধ্যমের তৈরি করা ‘ডেজার্ট অব রিয়েলিটি’ যেখানে কৃত্রিম প্রতিচ্ছবি বা প্রলোভনই আসল সত্য বলে মনে হয়—মানুষের নৈতিক বিচারবুদ্ধি ও মানবতাবোধকে পুরোপুরি গ্রাস করে নেয়।

​এই তাত্ত্বিক কাঠামোর আলোকেই অপ্রতিমের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে পাঠ করতে হয়। তেরো বছরের একটি শিশুর হাতে থাকা মায়ের স্মার্টফোনটি ঘাতক কিশোরদের কাছে কেবল একটি প্রযুক্তিগত যন্ত্র বা যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এটি ছিল এমন এক বস্তুগত মোক্ষ ও লোভের প্রতীক, যা যেকোনো মূল্যে অর্জন করার এক অন্ধ নেশা তাদের আচ্ছন্ন করেছিল। এখানে পণ্যের ফটিসিজম এমন এক পর্যায় পৌঁছেছিল যেখানে একটি তাজা মানবজীবন, একটি শিশুর জৈবিক অস্তিত্ব এবং তার অমূল্য সম্ভাবনার চেয়ে একটি আইফোনের বস্তুগত দখল অনেক বেশি ‘বাস্তব’ ও ‘মূল্যবান’ বলে প্রতিভাত হয়েছে। ঘাতকদের অবচেতন মনে যন্ত্রের মালিকানা অর্জনের এই পৈশাচিক ক্ষুধা মানবশিশুর প্রাণকে সম্পূর্ণ তুচ্ছ করে দিয়েছে।

​এই নৃশংসতা আমাদের চোখের সামনে উন্মোচন করে দেয় এক ভয়ংকর ডিস্টোপিয়ান সত্য—কীভাবে আমাদের সমাজ পুঁজির উপাসক এমন এক অমানবিক ও আত্মস্বার্থপর যান্ত্রিকতায় পর্যবসিত হয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের মুক্তির হাতিয়ার না হয়ে মানুষের নৈতিক বিনাশ ও পৈশাচিকতার চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। বস্তুতন্ত্রের এই অন্ধ উপাসনা কেবল একটি যন্ত্রের দখল নেওয়ার লড়াই নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক মানবিক সত্তার চরম পরাজয়, যেখানে একটি শিশুর রক্তে কেনা হয় পুঁজির এক কৃত্রিম ও রক্তস্নাত ফ্যান্টাসি।

২. বায়োপলিটিক্স থেকে নেক্রোপলিটিক্স: কার জীবন মূল্যবান?

ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ‘বায়োপলিটিক্স’ ও ‘বায়োপাওয়ার’ ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক মোড় ঘোরানো তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। ফুকো বুঝিয়েছিলেন, আধুনিক রাষ্ট্র সরাসরি মানুষের ওপর শারীরিক দমনপীড়ন চালিয়েই ক্ষান্ত থাকে না; বরং সে মানুষের জন্ম, মৃত্যু, স্বাস্থ্য, শরীর, জনমিতি এবং জৈবিক অস্তিত্বকে তার শৃঙ্খলার ভেতরে রেখে শাসন পরিচালনা করে। রাষ্ট্রের প্রাথমিক ও নৈতিক দায়িত্ব হলো এই বায়োপাওয়ারের মাধ্যমে নাগরিকদের জৈবিক জীবনকে রক্ষা করা, তাদের ঝুঁকি কমানো এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু ক্যামেরুনের প্রখ্যাত রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও দার্শনিক Achille Mbembe ফুকোর এই ধারণাকে একধাপ এগিয়ে নিয়ে গিয়ে হাজির করেন আরও নির্মম ও ঘোর বাস্তবতার সামনে—যাকে তিনি নাম দিয়েছেন ‘নেক্রোপলিটিক্স’

নেক্রোপলিটিক্সের মূল প্রশ্নটি হলো: কে বাঁচার অধিকার রাখে এবং কাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়? কোন জীবনের মূল্য রাষ্ট্র বা সমাজের কাছে আছে, আর কার জীবন এতটাই প্রান্তিক ও অবহেলিত যে তার মৃত্যুতে কারও কিছু আসে যায় না?

যখন আমরা অপ্রতিমের করুণ পরিণতির দিকে তাকাই, তখন ফুকোর বায়োপলিটিক্স ও এমেম্বের নেক্রোপলিটিক্সের এই দ্বান্দ্বিক রূপটি আমাদের সামনে নগ্ন হয়ে ধরা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন পাহাড়ি জনপদ বা আমাদের শহুরে প্রান্তিকতাগুলোতে যেভাবে কিশোর গ্যাং কালচার, মাদক এবং অপরাধের ডালপালা বিস্তার লাভ করেছে, তাতে প্রমাণিত হয় রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ন্যূনতম জৈবিক নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। রাষ্ট্র যখন কেবল দর্শকের ভূমিকা পালন করে অথবা কাঠামোগত উদাসীনতার কারণে একটি তেরো বছরের শিশুর জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে পারে না, তখন সেই শাসনব্যবস্থা বায়োপলিটিক্সের খোলস ছেড়ে মূলত নেক্রোপলিটিক্যাল জাঁতাকলে পর্যবসিত হয়।

এখানে কার জীবন বিপন্ন হলো আর কার জীবন টিকল, তার ওপর সমাজ ও রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অপ্রতিমের মৃত্যু তাই কেবল একটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনা নয়; এটি এমন এক নেক্রোপলিটিক্যাল ব্যবস্থার নির্মম বহিঃপ্রকাশ—যেখানে রাষ্ট্র এবং সমাজের উদাসীন নীতিমালার কারণে একটি সম্ভাবনাময় শিশুর জীবন সস্তা হয়ে ওঠে এবং অপরাধের বলি হওয়াটাই যেন এক নৈমিত্তিক নিয়তিতে পরিণত হয়।

৩. সোশ্যাল কন্ট্রাক্টের বিচ্যুতি এবং আইনি শূন্যতা: আস্থার সংকট ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে থমাস হবসের ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট’ বা সামাজিক চুক্তির তত্ত্বটি আধুনিক সভ্যতার ভিত্তিমূল হিসেবে পড়ানো হয়। হবস, জন লক কিংবা রুশোর তত্ত্বে বলা হয়েছে যে মানুষ আদিম ও হানাহানির দশা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নিজেদের স্বাধীনতা ও সুরক্ষার একটি অংশ সমর্পণ করে এক সার্বভৌম শক্তির বা রাষ্ট্রের হাতে। বিনিময়ে রাষ্ট্র অঙ্গীকার করে যে সে প্রতিটি নাগরিকের জীবন, সম্পত্তি এবং মৌলিক অধিকারের নিরঙ্কুশ নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। ম্যাক্স ওয়েবারের ভাষায়, আধুনিক রাষ্ট্র হলো সেই সত্তা যা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বৈধ বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকার (Monopoly of legitimate violence) দাবি করে। কিন্তু এই চুক্তি কেবল একপক্ষীয় কোনো হুকুমদারি নয়; এটি একটি পারস্পরিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্র যখন বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়, তখন তার সমান্তরালে নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা বিধান করা তার নৈতিক ও আইনি বাধ্যতামূলক শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

অপ্রতিমের নির্মম হত্যাকাণ্ড এই হবসীয় সামাজিক চুক্তির মৌলিক শর্তটিকে চরমভাবে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। যখন একটি তেরো বছরের কিশোরকে প্রকাশ্য দিনের আলোয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় কেবল একটি দামি গ্যাজেটের লোভে পৈশাচিক কায়দায় হত্যা করা হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে—রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ঠিক কী ধরনের নিরাপত্তা দিচ্ছে? যদি রাষ্ট্র বা তার আইনি কাঠামোগুলো সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যটির ন্যূনতম জীবনটুকু রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই সার্বভৌমত্বের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা গভীর সংকটের মুখে পড়ে।

এখানে তৈরি হয় এক ভয়ংকর আইনি শূন্যতা ও আস্থার সংকট। রাষ্ট্র কেবল কাগজে-কলমে আইন প্রণয়ন বা অপরাধের পর সাময়িক তোড়জোড় দেখিয়ে তার দায় সারতে পারে না। যখন বিচারহীনতার সংস্কৃতি, অপরাধের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রলেপ এবং কাঠামোগত দুর্বলতা আইনের শাসনকে পঙ্গু করে দেয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্রের প্রতি যে আস্থার চুক্তি ছিল তা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। অপ্রতিমের মৃত্যু তাই কেবল একটি পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি নয়; এটি আমাদের পুরো রাষ্ট্র কাঠামোর সেই অন্তর্নিহিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে সামাজিক চুক্তি আজ এক রক্তস্নাত প্রহসনে পরিণত হয়েছে।

অপ্রতিমের রক্তাক্ত দেহটি যখন লালমাই পাহাড়ের বুকচিড়ে ছায়াচ্ছন্ন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো, তখন তা কেবল একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাজানো স্বপ্নভঙ্গের দীর্ঘশ্বাস ছিল না; তা ছিল আমাদের টলমলে সমাজব্যবস্থার পচনশীল বাস্তবতার সামনে দাঁড় করানো এক নির্মম ও নিষ্ঠুর আয়না। তেরো বছরের একটি শিশুর প্রাণচঞ্চল পৃথিবী থেকে এমন পৈশাচিক বিদায়ের দৃশ্য আমাদের বুঝিয়ে দেয়, আমরা এক অদ্ভুত, অন্ধ ভোগবাদের ডিস্টোপিয়ায় এসে পৌঁছেছি। যে যুগে গ্যাজেট বা পণ্যের ফটিসিজম মানুষের রক্ত ও নিঃশ্বাসের চেয়েও ভারী হয়ে ওঠে, সেই যুগে একটি আইফোনের কৃত্রিম মোক্ষ কিংবা লোলুপ লোভ যখন একটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়ার ছাড়পত্র হয়ে দাঁড়ায়, তখন মানুষের মনুষ্যত্ব কোথায় গিয়ে ঠেকেছে—তা ভেবে শিউরে উঠতে হয়। একই সঙ্গে, ফুকো কিংবা এমেম্বের তত্ত্বে প্রতিধ্বনিত ‘বায়োপলিটিক্স’ ও ‘নেক্রোপলিটিক্স’-এর কঠোর সত্য আজ আমাদের চোখ খুলে দেয়; রাষ্ট্র ও সমাজ কীভাবে নাগরিকের জৈবিক সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায় থেকে বিচ্যুত হয়ে একটি ভয়ের জনপদে পরিণত হয়েছে, তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

​কিন্তু এই হাহাকার ও গভীরতম শোকের মুহূর্তে আমাদের ক্রোধের অভিমুখ কোথায় হবে? মানুষের আদিম আবেগের জোয়ারে ভেসে গিয়ে সাময়িক জনরোষ, ভাঙচুর কিংবা অন্ধ প্রতিশোধের দাবানল জ্বেলে কি এই কাঠামোগত সামাজিক ব্যাধি কখনো সারানো সম্ভব? একজন প্রাবন্ধিক বা শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকের মনন দিয়ে যদি আমরা উপলব্ধি করি, তবে দেখব—অস্থায়ী উত্তেজনা বা রক্তের বদলে রক্ত নেওয়ার জিঘাংসা কখনো প্রকৃত ন্যায়বিচার বয়ে আনে না; বরং তা কেবল হিংসার এক অন্তহীন ও বিষাক্ত চক্রকে টিকিয়ে রাখে। অপ্রতিমের রক্ত কোনো হুজুগে বা আবেগময় প্রতিশোধের ইন্ধন খোঁজে না; তার নিরবচ্ছিন্ন দাবি হলো একটি কঠোর, নিখুঁত, প্রমাণভিত্তিক এবং কাঠামোগত বিচারব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা।

​আইনের চোখে বিত্তশালী বা প্রান্তিক—কারও অবস্থানই যেন পার পাওয়ার উসিলা না হয়ে দাঁড়ায়, সেই অটল সত্যটি আমাদের সমাজকে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিশোর অপরাধের বিষাক্ত শেকড়কে সমূলে উৎপাটন করতে হলে কেবল অপরাধীর ব্যক্তিগত শাস্তি নিশ্চিত করেই ক্ষান্ত হওয়া চলবে না; এর নেপথ্যে থাকা পারিবারিক উদাসীনতা, সামাজিক অবক্ষয়, এবং রাষ্ট্রিয় নজরদারির চরম ফাঁকফোকড়—প্রতিটি স্তরকে একসঙ্গে সংস্কারের নিপুণ অস্ত্র দিয়ে কাটতে হবে। রাষ্ট্র তখনই তার নৈতিক ঔজ্জ্বল্য ও বৈধতা ফিরে পায়, যখন সে তার সবচেয়ে অসহায় ও কোণঠাসা নাগরিকটির নিঃশ্বাসকেও পরম মূল্যবান সম্পদ বলে গণ্য করে।

​অপ্রতিম হয়তো আর কোনোদিন মায়ের আঙুল ধরে ঘরে ফিরবে না, তার খাতার পাতায় জমে থাকা অসমাপ্ত ইচ্ছেগুলোও চিরকালের মতো হারিয়ে গেছে নিস্তব্ধ পাহাড়ে। কিন্তু তার এই মর্মান্তিক বলিদান আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে এমনভাবে নাড়া দিয়ে যাক, যাতে তা চিরকালের মতো জাগিয়ে তোলে আমাদের বোধকে। রাষ্ট্র ও সমাজের সঙ্গে আমাদের যে প্রাচীন ‘সামাজিক চুক্তি’ বা সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট আজ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, তা পুনরুদ্ধার করার কঠিন লড়াই শুরু করার সময় এখনই। বিচার হোক—প্রতিশোধের তৃষ্ণা মেটানোর জন্য নয়, বরং এই রাষ্ট্রে ও আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থাকে চিরতরে পুনর্নির্মাণ করার অনন্য এক ব্রত হিসেবে।

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login