Story

শুকনো গোলাপ। দশম পর্ব।

September 21, 2026

Original Author মুক্তা ইসলাম।

Translated by নতুন গল্প।

9
View

দশম পর্ব

আজকের দিনটি রাবেয়া চৌধুরীর জন্য ভীষণ ব্যস্ততার।

তার একমাত্র মেয়েকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। আয়োজনের কোনো ত্রুটি রাখতে চাননি তিনি। সাজসজ্জা থেকে শুরু করে খাবারের টেবিল পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি বিষয়ই বাছাই করে, নিজের পছন্দমতো সাজিয়েছেন।

এখন শুধু শুভ মুহূর্তের অপেক্ষা।

এত ব্যস্ততার মাঝেও মেয়েকে একদিন বিদায় দিতে হবে—এই ভাবনাটা তাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দিচ্ছে। তবুও নিজেকে শক্ত করে ধরে রেখেছেন। মেয়ের সামনে দুর্বল হয়ে পড়তে চান না তিনি।

অবশেষে সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পরপর দুটি মাইক্রোবাস এসে বাড়ির সামনে থামল।

গাড়ির হর্নের শব্দে সবার আগে চমকে উঠল তানিশা।

তার জীবনে হয়তো শুরু হতে চলেছে এক বিরহের অধ্যায়।

মাহিমকে নিয়ে আর কোনো আশা করছে না মেয়েটি। হয়তো আজ সে অন্য কারও হয়ে যেতে চলেছে।

এই কথাটা মনে হতেই বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু পরিবারের প্রতি সে এতটাই অনুগত যে এখন তার পক্ষে কিছু করাও সম্ভব নয়।

আবীরের বাবা, চাচা, মামাসহ মোট এগারোজন মেহমান এসেছে। তাদের মধ্যে মাহিমও আছে।

ছেলেপক্ষ যথেষ্ট আয়োজন করেই এসেছে।

দুই পরিবার নতুন একটি সম্পর্কে আবদ্ধ হওয়ার আগেই যেন আনন্দে ভেসে যাচ্ছে। শুধু মাহিম ছাড়া।

সবার সামনে মুখে হাসি ফুটিয়ে রাখলেও তার মনটা ভীষণ খারাপ। কথায় আছে, মুখ হচ্ছে মনের আয়না। একবার দেখলেই যে কেউ বুঝতে পারবে, ছেলেটা কতটা বিরহ নিয়ে সময় পার করছে।

পরস্পরের আন্তরিকতায় দুই পরিবারের সবাই মুগ্ধ।

সকল আতিথেয়তা শেষে এবার মেয়ে দেখার সময় ঘনিয়ে এলো।

তানিশা আজ ইচ্ছে করেই নীল রঙের শাড়ি পরেছে। তবুও মেয়েটাকে অসম্ভব সুন্দর লাগছে।

কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মাঝেও মুখে ম্লান হাসি।

পরিবারের মুখ রাখতে যে হাসিটুকু হাসতে সে বাধ্য হচ্ছে।

তানিশাকে নিয়ে তার কাজিন তুলি বসার ঘরে এসে বসল। আবীর ও মাহিম পাশাপাশি বসে আছে।

তানিশা মাথা নিচু করে বসে আছে।

আবীরের বাবা বললেন,

— মা, তোমার এত লজ্জা পাওয়ার কী আছে? আমরা তো তোমার নিজের লোক। তোমার বাবা আর আমার মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মুখটি তোলো মা।

তানিশা ধীরে ধীরে মুখ তুলতেই হঠাৎ মাহিমের চোখে চোখ পড়ে গেল।

দুজনেই এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

তানিশা তাড়াতাড়ি নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিল।

কিন্তু সেই এক মুহূর্তই মাহিমের বুকের ভেতরের সমস্ত অনুভূতিকে যেন আবার জাগিয়ে দিল।

অন্যদিকে আবীর প্রথম দেখাতেই বেশ বুঝতে পারল, মেয়েটির মধ্যে কোনো আনন্দ নেই।

সে ভীষণ উদাস হয়ে বসে আছে।

কারণ যা-ই হোক, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে—এই বিয়েতে মেয়েটি রাজি নয়।

শুধু পরিবারের সম্মান রক্ষা করার জন্যই সে এতটা অভিনয় করছে।

আবীর মনে মনে ভাবল,

‘আমার যদি ভুল না হয়, তাহলে তার জীবনে এমন কিছু ঘটে গেছে, যা সে কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। হতে পারে সে কাউকে মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে, কিন্তু পরিবারের চাপে পড়ে নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিচ্ছে।’

আবীর মনে মনে ঠিক করে নিল, আজ কোনোভাবেই আংটি বদল করা যাবে না।

আগে বিষয়টি জানা দরকার।

দুটি মানুষের সারা জীবনের ব্যাপার এটি। শুরুতেই যদি ভুল হয়ে যায়, তাহলে সারাজীবন কেঁদেও সেই ভুলের কোনো সুরাহা করা যাবে না।

বিয়ে তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। কিন্তু ভুল মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করা তার চেয়েও বড় ভুল।

কিন্তু প্রসঙ্গে যাবে কীভাবে?

আবীরের বাবা মকবুল চৌধুরীকে বললেন,

— আমরা আর কী দেখব? যারা নতুন জীবন শুরু করবে, তারা নিজেরা দেখাদেখি করলেই তো ভালো হয়। আজকালকার ছেলেমেয়েরা আবার অন্য রকমের। কী বলেন ভাই সাহেব?

মকবুল চৌধুরীও সম্মতি জানিয়ে বললেন,

— হ্যাঁ, তা ঠিক বলেছেন।

আবীরের বাবা বললেন,

— তাহলে ওরা না হয় পাশের ঘরে গিয়ে একটু কথা বলুক। কী বলেন আপনারা?

রাবেয়া চৌধুরী পর্দার আড়াল থেকে বললেন,

— এসবের আবার কী দরকার? আমাদের পছন্দই তো ওদের পছন্দ।

আবীরের বাবা হবু বেয়ানকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,

— না না। এখন কি আর আগের যুগ আছে? ছেলেমেয়েদের মধ্যে কথা বলে নেওয়াই ভালো। ওদের আবার কোনো আপত্তি-টাপত্তি আছে কি না কে জানে?

কথাটা বলেই তিনি হেসে দিলেন।

তানিশা আর তুলি সেখান থেকে উঠে পাশের ঘরে চলে গেল।

আবীর ও মাহিমও পাশের ঘরে এসে বসল।

তানিশা ও তুলি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

আবীর গলা খাঁকারি দিয়ে তুলিকে বলল,

— আমি কি উনার সঙ্গে একটু একা কথা বলতে পারি?

কথাটা শুনেই মাহিমের মাথায় যেন বাজ পড়ল।

সে ঠিক বুঝতে পারছে না কী করবে।

একদিকে আবীরের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব, অন্যদিকে নিজের ভালোবাসা।

কাকে বলি দেবে সে?

এখন শুধু চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই।

আবীর আর দেরি করল না। সোফা ছেড়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।

বারান্দাতেও বসার ব্যবস্থা আছে।

তবে তানিশা বিমর্ষ মনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

এদিকে তুলি ঘরে এসে মাহিমের সঙ্গে কথা বলছিল। কিন্তু মাহিম তুলির কোনো কথারই ঠিকঠাক জবাব দিচ্ছিল না।

তার মন পড়ে আছে বারান্দায়—তানিশার কাছে।

আবীর তানিশার সামনে গিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,

— আপনার নাম কী?

তানিশা গোলাপি ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু একটা বলল।

কিন্তু আবীরের বোধগম্য হলো না।

স্বাভাবিকভাবেই আবীর তানিশার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু সে তা হতে পারছে না।

মেয়েটির মনের ভেতরের লুকানো বেদনা যেন তার মুখে স্পষ্ট ধরা পড়ছে।

একটি মেয়ে যখন মন থেকে কোনো ব্যাপারে খুশি থাকে, তখন তার চোখে-মুখে সেই আনন্দ ফুটে ওঠে। বিয়ের কনের বেলায় লাজুক লাজুক ভাব থাকলেও আনন্দটাও চোখে পড়ে।

কিন্তু তানিশার চোখে আনন্দের ছিটেফোঁটাও নেই।

মেয়েটির মনে অনেক কথা জমে আছে।

হয়তো বলতে ভয় পাচ্ছে।

অথবা সে আমার সঙ্গে নিজের বিষয় ভাগ করে নিতে রাজি নয়।

মাত্র কয়েক মিনিট হলো আবীর বারান্দায় এসেছে।

এর মধ্যেই মাহিম দূর থেকে বলল,

— কিরে আবীর? সব গল্প কি এখানেও শেষ করবি নাকি বাসর রাতের জন্য কিছু রাখবি?

আবীর কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল,

— গল্প আর করলাম কোথায়?

তারপর একটু থেমে বলল,

— এখন পর্যন্ত কণ্ঠ শোনার সৌভাগ্যই হয়ে উঠল না। নাম জানতে চাইলাম, কিন্তু কী নাম বলল কিছুই বুঝলাম না।

মাহিম আর চুপ থাকতে পারল না।

সে বলে ফেলল,

— ওর নাম তো তানিশা।

কথাটা বলা মাত্র তানিশা ও মাহিম দুজনেই আঁতকে উঠল।

আবীর অবাক হয়ে মাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল,

— তুই জানলি কী করে রে মাহিম?

মাহিম নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,

— আরে, তুই তো সেদিন আমায় বলেছিলি। তোর মনে নেই বুঝি?

আবীর কিছুক্ষণ মাহিমের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

— হয়তো বলেছিলাম। কিন্তু যার নাম, তার কাছ থেকেই জানতে খুব ইচ্ছে করছে।

মাহিম মনে মনে রাগে ফেটে পড়ছে।

কিন্তু আবীরকে কিছুই বলতে পারছে না।

আবীর আবার তানিশার দিকে ফিরে গেল।

সে এবার জানতে চাইল,

— আপনি কোন রং পছন্দ করেন, জানতে পারি?

তানিশা মুখে কিছু বলল না।

শুধু হাতের ইশারায় নিজের পরনের শাড়ির রং দেখিয়ে দিল।

নীল।

আবীর এবার একেবারে নিশ্চিত হয়ে গেল।

এখানে কোনো একটা সমস্যা আছে।

সে মনে মনে ভাবল,

‘আমি তাকে পাত্রপক্ষ হয়ে দেখতে এসেছি। আমার সঙ্গে কথা না বলার মতো ভুল আমি করিনি। কিন্তু তার এই নীরবতার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে।’

যেভাবেই হোক আজকের এই অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে।

যদি কারও জীবন সাজিয়ে দিতে না পারি, তাহলে কারও জীবন দুর্বিষহ করার কোনো অধিকারও আমার নেই।

আবীর এবার একটু নরম স্বরে বলল,

— আপনি মনে হয় খুব চিন্তিত।

তানিশা নীরব।

— আমাকে হয়তো আপনার পছন্দ হয়নি।

তানিশা এবারও কোনো উত্তর দিল না।

আবীর বলল,

— আপনার যদি কিছু বলার থাকে, তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলতে পারেন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার কোনো সমস্যা থাকলে সমাধানের চেষ্টা করব। ইনশাআল্লাহ।

কথাগুলো যেন তানিশার হৃদয়ে গিয়ে আঘাত করল।

চাঁদকে আড়াল করা মেঘের টুকরো যখন বাতাসে ভেসে সরে যায়, তখন চাঁদের জ্যোৎস্নায় যেমন পৃথিবী আবার আলোকিত হয়ে ওঠে, আবীরের কথাগুলোও যেন তানিশার মনের জমে থাকা মেঘকে কিছুটা সরিয়ে দিল।

অনেকক্ষণ পর প্রথমবারের মতো মেয়েটি কথা বলল।

কণ্ঠটা খুবই নিচু।

— আমি বাবা-মাকে অনেক ভালোবাসি।

আবীর গভীর মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর খুব শান্তভাবে বলল,

— আর আপনাকে যে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, তাকে আপনি ভালোবাসেন না…?

Comments

    Please login to post comment. Login