একরাতে আমার নেত্রী, মানে আমার মেয়ে একটা গল্প শুনতে চাইলো। আমি একটা গল্প বললাম। সে কিঞ্চিৎ ভয়ও পেলো। এমনকি রাতে একটা সময় সে সাপ সাপ বলে চিৎকার করে উঠলো। হাত-পা ছুড়তে লাগলো। আমি শক্ত করে চেপে ধরে দুহাতে মাঝে কোলবালিশ ধরিয়ে দিলাম। সেটা চেপে ধরে সে ঘুমিয়ে পড়লো। দোয়া পড়ে ফু দিয়ে দিলাম।
গল্প বলা আর লেখা এক জিনিস না। বলেছিলাম ছোট্ট একটা গল্প, লিখতে গিয়ে প্রায় ৩ হাজার শব্দ (২৯০৫) হয়ে গেলো। অনুরোধ থাকবে পড়ার। আর জানাবেন কেমন লেগেছে।
সম্পাদনা করিনি। তাই ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
***গুইসাপানুষ***
গ্রামের পাশ থেকে তিরতির করে বয়ে যাচ্ছে একটা খাল। খালটা বেশ বড়। খালের একপারে আছে স্কুল, বাজার আর অন্য পারে বড় একটা মাদ্রাসা। দুপারকে বেশ বড় একটা ব্রিজ দিয়ে সংযোগ করা হয়েছে।
মাদ্রাসার সামনেই খাল, সেখানে সান বাঁধানো ঘাট। মাদ্রাসা আর এলাকার সবাই ব্যবহার করে। ওযু গোসল করে সেই ঘাটে। ঘাটের পশ্চিম দিয়ে খালটা বামে বাক নিয়েছে। ভাঁটার পানি পশ্চিম থেকে এসে ডান পাশে ঘাট ছুয়ে সোজা দক্ষিনে চলে যায়। দক্ষিনে আরো অনেক আঁকাবাঁকা পথ পারি দিয়ে নদীতে পড়ে। জোয়ারের পানি একি ভাবে দক্ষিন থেকে এসে ঘাট ছুয়ে পশ্চিম বামে বাক নিয়ে চলে যায়।
প্রতিদিনকার মতন মাগরিবের আজানের আগের দলে দলে মাদ্রাসার কোমলমতি বাচ্চারা ওযু করতে মশগুল। পড়ন্ত বিকেলে ভাঁটার পানি নামছে স্বাভাবিক গতিতে। ঘাটের ৭ নম্বর সিঁড়িটা তখন পানির নিচে। ভাঁটার পানি নামতে নামতে প্রায় ১০ নম্বর সিঁড়ি পর্যন্ত দেখা যায়। ঘাটে প্রায় ১৭ টা সিঁড়ি। শীতের সময় ১৭ নম্বর সিঁড়ি পর্যন্ত পানি নেমে যায়।
৭ নম্বর সিঁড়িতে হাঁটু ভেঙ্গে বসে ১৭ বছরের এক ছাত্র ওযু করছিল। ওযুতে এতো মনোযোগ ছিল যে, ওর সামনে একটা কাপড়ের পোটলা ভেসে এসে থেমে গেলো সেটা সে লক্ষই করলো না। শুধু হাত দিয়ে সরিয়ে দিলো। ওর পাশে ওরই এক বন্ধু। পোটলাটা ওর হাতে লেগে থেমে গেলো। সে ওযু থামিয়ে তাকিয়ে রইলো পোটলার দিকে। পড়ন্ত বিকেলের লাচলে আলোতে ওর কাছে মনে হল পোটলা থেকে একটা ছোট্ট হাত বের হয়ে আছে। কাউকে কিছু না বলে পোটলা উঠিয়ে ৬ নম্বর সিঁড়িতে রেখে খুলতে ওহ সহ আশেপাশে যারা দাঁড়ানো ছিল সবাই চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিলো। কেউ কেউ লাফ দিয়ে পানিতে পড়লো, কেউ কেউ দৌড়ে উপরে উঠে গেলো। ওদের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে বড়রা ছুটে এলো। মাদ্রাসার শিক্ষক, বড় হুজুর, এলাকার যারা নামাজে এসেছে প্রায় সবাই ছুটে এলো। পোটলা ঘিরে সবাই নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
পুলিশকে খবর দেয়া হয়েছে। পোটলাটা একটা ঝুড়ি দিয়ে ঢেকে, ইট দিয়ে চেপে রাখা হয়েছে। নামাজের পড়ে বাচ্চাদের মাদ্রাসার ভেতরে চলে যেতে বলা হয়েছে। পুলিশ আসার আগ পর্যন্ত কেউ আর ঝুড়ি উঠায়নি বা পোটলা ধরতে যায়নি। খবর দেয়ার ৩৭ মিনিটের মাথায় পুলিশ এসে আসলো, সাথে ফরেসনিক আর মেডিকেল টিম।
ফরেনসিক টিমের হেড ইন্সপেক্টর সিদ্দিক এসে চাপা দেয়া ঝুড়ির সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, পুলিশে কে ফোন দিয়েছে কে আর এটা কে বা কারা আগে দেখেছে তারা এদিকে আসেন।
ফোন দিয়েছিল গ্রামের মেম্বার সাহেব। মাগরিবের নামাজে এসেছিল। অন্যদের মতন উনিও দেখে সবার অনুরোধে পুলিশকে ফোন দেন। মেম্বার সাহেব, মাদ্রাসার বড় হুজুর, ইমাম সাহেব, আরো দুজন গণ্যমান্য ব্যাক্তি আর যে ছেলেটা পোটলা তুলেছিল সে এসে দাঁড়ালো ইন্সপেক্টর সিদ্দিকের পিছনে।
সে সবার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সাথে আসা পুলিশের দিকে তাকাল। পুলিশ ইন্সপেক্টর মুত্তাকিম এসেছে, সাথে সাব-ইন্সপেক্টর হামিদ আর দুজন কনস্টেবল।
সে পুলিশ ইন্সপেক্টর মুত্তাকিমের দিকে তাকিয়ে বলল, মুত্তাকিম ভাই, এদের সাথে কথা বলা মনে হয় আপনাদের কাজ?
ইন্সপেক্টর মুত্তাকিম কিছু বলার আগে সাব-ইন্সপেক্টর হামিদ পান চিবুতে চিবুতে বলল, শ্যার আমি আসি না? আমি বুলতাসি।
ইন্সপেক্টর সিদ্দিক বলল, তুমি বলতে গেলে সবাই পানের পিকে লাল হয়ে যাবে। মুত্তাকিম সাহেব বলুক।
কথা শেষ করে সে ঝুড়ির উপর থেকে ইট সরিয়ে ঝুড়িটা উচু করল। সবাই পোটলার দিকে তাকিয়ে উফ করে উঠলো। পোটলায় কোনমতে পেঁচানো ছিন্নভিন্ন একটা মৃত বাচ্চার দেহ। বুক পেট খুবলে তোলা, মাথা দু ভাগ করা, শরীরের ভেতরে ভাইটাল অর্গান গুলো নেই, ভেতরটা ফাঁকা। হার্ট, কিডনি কিচ্ছু নেই। নাড়িভুঁড়ি কোন মতে পেচিয়ে আছে। হাত পা খুলে খুলে পড়ছে। দেখে মনে হচ্ছে কোন বন্য প্রাণী খুবলে খুবলে খেয়েছে। হয়তো সবাই সেটাই ভাবতো যদি না এটা এভাবে কাপড়ে পেঁচানো থাকতো। বন্য প্রাণী খেয়ে নিশ্চয়ই কাপড়ে পেঁচিয়ে পানিতে ভাসিয়ে দিবে না?
সাব-ইন্সপেক্টর হামিদ ওয়াক করে উঠে, মুখ চেপে দৌড়ে গেলো এক পাশে। গলগল করে বমি করতে লাগলো। ইন্সপেক্টর মুত্তাকিম নিজেকে সামলে প্রত্যক্ষদর্শীদের এক পাশে নিয়ে কথা বলা শুরু করলো। ফরেনসিক আর মেডিকেল টিম ধরে সুস্থে ছিন্নভিন্ন দেহটা সারাতে শুরু করলো। পুলিশের জবানবন্দির নেবার আগে দেহ সরানোর কাজ শেষ। ইন্সপেক্টর সিদ্দিক পুলিশকে বলল সে থানায় আছে। ওখানে সব কথা হবে।
ঘটনা স্থানের সব কাজ শেষ করে ইন্সপেক্টর মুত্তাকিম প্রায় রাত ৮ টা ৪৭ মিনিট নাগাদ থানায় এসে ঢুকল। সাব-ইন্সপেক্টর হামিদের চোখমুখ কপালে উঠে গেছে। মাথা নিচু করে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসল। ইন্সপেক্টর মুত্তাকিম নিজের চেম্বারে ঢুকে দেখে ফরেনসিক ইন্সপেক্টর সিদ্দিক বসে আছে।
মুত্তাকিম সাহেব চেয়ারে বসতে বসতে জিজ্ঞেস করলো, এমন বীভৎস কাজ কীভাবে সম্ভব?
ইন্সপেক্টর সিদ্দিক বলল, আচ্ছা মুত্তাকিম ছোট্ট একটা অপরাধ করে ফেলছি।
দুজিনের র্যাংকে সমান হলেও সিদ্দিক সাহেব মুত্তাকিমের বয়সে বড়। তাই মাঝে মাঝে তুমি করে বলে। মুত্তাকিমও কিছু মনে করে না।
মুত্তাকিম সাহেব বলল, কি ভাই?
সিদ্দিক সাহেব উত্তর দিলো, আসলে এই মফস্বলে এমন ঘটনা প্রথম। মানে এমন বীভৎস আর রহস্যময় ঘটনা। তাই আমি জেলা শহর থেকে সিআইডির খাইরুলকে আসতে বলেছি। যদিও ওর হাতে কেস আছে।
মুত্তাকিম হেসে বলল, আরে কি যে বলেন না ভাই? দেখলেন তো আমার টিমের অবস্থা। আরামের থাকতে থাকতে চর্বি জমে জমিদার হয়ে গেছে। বমি করে অস্থির। কনস্টেবল দুজনের মুখও লাল হয়ে আছে। যাইহোক, স্যার আসবেন বলছে?
সিদ্দিক সাহেব বলল, না, এখনি না। রিপোর্ট আসলে দেখে জানাতে বলেছে। আর আর ওর হাতের কাজটা শেষ হতে দু-চারদিন সময় লাগবে। তুমিও সাথে থাকবে। তোমার এলাকা, তোমার দায়িত্ব বেশী।
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো, বলল, রিপোর্ট আসার পড়ে কাজ শুরু করতে হবে। কিন্তু আমি ভয়ে আছি, এমন না আবার কিছু ঘটে। আসি তাহলে।
বলে ইন্সপেক্টর সিদ্দিক বের হয়ে গেলো।
দ্বিতীয় দিন রিপোর্ট আসলো। রিপোর্টে বলা হয়েছে ধারালো দাঁতওয়ালা কোন প্রাণী এভাবে বাচ্চাটার শরীর ক্ষতবিক্ষত করেছে। কিন্তু বাচ্চাটার শরীর অন্যান্য জায়গায় আবার কিছু হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। এখন পুলিশ হাতের ছাপের মালিক খুজতে লাগলো।
তৃতীয় দিন সন্ধ্যার দিকে আবার ফোন আসলো থানায়। আবারও একটা পোটলা পাওয়া গেছে। খালে ভাসতে ভাসতে এসে পাড়ে আটকে গেছে। আগের পোটলার কথা গ্রামের ছড়িয়ে যাওয়ায় কেউ আর তুলে দেখতে যায়নি। একি ভাবে পুলিশ, ফরেনসিক আর মেডিকেল টিম চলে গেলো সেখানে। খালের যে জায়গায় আটকে ছিল তার আগেই মাদ্রাসার ঘাট ছিল। মানে এবার আর মাদ্রাসার ঘাটে বাঁধেনি। ঘাট ছাড়িয়ে এসে ব্রিজের নিচ থেকে একটু সামনে দিয়ে খালের পাড়ে উঠে কাদায় আটকে গেছে। পুলিশের লোকজন নেমে উঠিয়ে দেখল একি জিনিস। ছিন্নভিন্ন একটা বাচ্চার দেহ। ওখানে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টর সিদ্দিক সিআইডির খাইরুলকে ফোন দিয়ে সব জানালো। সিআইডির খাইরুল জানালো সে পরের দিন আসবে। এবার মাঠ পর্যায়ে তদন্ত শুরু করবে তারা।
চতুর্থ দিন দুপুরের পড়ে সিআইডি খাইরুল তার একজন সহকারী আফারাত সাথে ফরেনসিকের সিদ্দিক সাহেব আর পুলিশের মুত্তাকিম সাহেব ঘটনা স্থানে হাজির হল। প্রথমে মাদ্রাসা এবং পড়ে ব্রিজের পাশের জায়গা দাঁড়ালো।
খাইরুল সাহেব জিজ্ঞেস করলো, পোটলা গুলো কোন দিক থেকে এসেছে?
মুত্তাকিম সাহেব বলল, স্যার, এইযে এখন ভাঁটা শুরু হয়েছে মাদ্রাসার পাশ থেকে বাক কেটে গেছে খাল পশ্চিম দিকে। ওদিক থেকেই এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা এমনটাই বলেছে।
খাইরুল সাহেব তার সহকারীর দিকে তাকিয়ে বলল, আরাফাত দেখো তো ভাঁটার যে টান এটা কত স্পিড হতে পাড়ে।
এরপরে সিদ্দিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, সিদ্দিক ভাই আপনার ফরেনসিক রিপোর্টে মৃত্যুর সময় কত ছিল?
সিদ্দিক সাহেব মোবাইল বের করলো, মোবাইলের ফটো গ্যালারি থেকে একটা রিপোর্ট বের করে দেখে বলল, আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ ঘণ্টা আগে।
খাইরুল সাহেব আবার ওনার সহকারীর দিকে তাকালেন। উনার সহকারী আরাফাত সাথে আনা ব্যাগ থেকে একটা যন্ত্র বের করে খালের পানির স্রোতের গতি মেপে উঠে পাশে দাঁড়িয়েছে।
খাইরুল সাহেব জিজ্ঞেস করলো, কত?
আরাফাত বলল, স্যার এখন আছে প্রায় দুই কিলোমিটার।
খাইরুল সাহেব বলল, ১ নটের একটু বেশী।
এবার খাইরুল সাহেব সিদ্দিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, সিদ্দিক ভাই আমাদের এখন একটা লম্বা সার্ভে করতে হবে।
সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করলো, কেমন?
খালের পাড় থেকে সরে গিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ালো। সিগারেট জ্বালাল তিনজন। আরাফাত ওদের মধ্যে জুনিয়র তাই সে আর ধরাল না।
সিগারেটে লম্বা এক টান দিয়ে খাইরুল সাহেব বলল, ভাই সোজা হিসেব। ১৬ বা ১৭ ঘণ্টা আগে যদি বাচ্চা গুলো মারা গিয়ে থাকে তার মানে এখান থেকে প্রায় ৩৪ থেকে ৩৭ কিলোমিটার ভেতরে এই ঘটনা ঘটেছে। আমার ধারনা এই ঘটনা হয়তো খালের পাড়েই ঘটানো হয়েছে।
মুত্তাকিম সাহেব বলল, কিন্তু দাঁতের কামড় সাথে মানুষের হাতে ছাপ, মিলাতে পারছি না তো।
খাইরুল সাহেব উদাস ভাবে অন্য দিকে তাকিয়ে বলল, ঘটনার জায়গা খুঁজে পেলে হয়তো এটার উত্তর পাওয়া যাবে।
সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করলো, তোমার প্লানটা কি?
খাইরুল সাহেব মুত্তাকুম সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, ভাই আপনি একটা ট্রালারের ব্যবস্থা করেন। এই খাল ধরে আমরা ভাঁটার উলটো দিকে যেতে থাকবো। সন্দেহজনক কোন জায়গা পেলে আমরা নেমে পরবো। আর ফোর্স নামিয়ে দিন। খালের দুই পাড়ে তল্লাশি অভিযান শুরু করতে বলুন। আমি কি বোঝাতে পেরেছি?
মুত্তাকিম সাহেব বলল, আপনি বলতে চাচ্ছেন, খালের দু ধার ধরে ভাঁটার দিকে আমরা খুঁজতে থাকবো, তাই তো?
খাইরুল সাহেব হ্যাঁ সূচক মাথা ঝাঁকাল, সাথে যোগ করলো, আর আমি, আপনি, সিদ্দিক ভাই, আরাফাত একটা ট্রালার নিয়ে খাল ধরে সামনে আগাবো। মোটামুটি সামনে চল্লিশ কিলোমিটার আমরা খুঁজবো।
সিদ্দিক সাহেব মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, খাইরুল চল্লিশ কিলোমিটার অনেক জায়গা?
খাইরুল সাহেব হেসে বলল, কেস কি সমাধান করতে চান?
সিদ্দিক সাহেব কোন উত্তর দিলো না। এদিকে মুত্তাকিম সাহেব শুরু করে দিলো কাজ। ওইদিন মোটামুটি আলো যতক্ষণ ছিল ওরা খুঁজতে লাগলো। এদিকে গ্রামের খবর ছড়িয়ে পড়লো। গ্রামবাসী ব্যাপারটা বুঝতে পেরে তারাও নিজ উদ্যোগে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে খুঁজতে শুরু করে দিলো।
ষষ্ঠ দিনের মাথায় প্রায় ৩০ থেকে ৩১ কিলোমিটার ওরা খুঁজে ফেলল। খাইরুল সাহেব একি ভাবে বাকিদের নিয়ে তখনো খালে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এই ৩০ কিলোমিটারের মধ্যে খাল সোজাই ছিল। মানে আঁকাবাঁকা হয়ে বয়ে গেছে কিন্তু কোন শাখা ছিল না। ৩২ কিলোমিটার মাথায় এসে খাল ভাগ হয়ে গেছে। ডানে একটা, বামে একটা। ট্রালারের ইঞ্জিন বন্ধ করে একপাশে থামল ওরা।
সিদ্দিক সাহেব জিজ্ঞেস করলো, এখন কি করবা?
খাইরুল সাহেব বলল, সিদ্দিক ভাই গতপরশু আর গতকাল কিন্তু কিছুই ঘটেনি। আমার ষষ্ঠইন্দ্রিয় বলছে আজ ঘটবে কিছু।
সিদ্দিক সাহেব হেসে বলল, জনাব ফেলুমিত্তার এই হিসেব তো আরাফাতও করতে পারবে মনে হয়। কিন্তু এখন যাবে কোন দিকে আর কীভাবে?
খাইরুল সাহেব খোঁচাটা গায়ে মাখল না।
হেসে বলল, খুব সহজ আমি মুত্তাকিমকে নিয়ে ডানে যাবো। আর আপনি জনাব জটায়ু, সারাজীবন বামপন্থি ছিলেন। আপনি আমার তোপসেকে নিয়ে বামে যান।
সবাই হোহো করে হেসে উঠলো। কিন্তু ট্রালারের ড্রাইভার কিছুই বুঝল না। শুধু বুঝল, মনে হয় আর একটা ট্রালার লাগবে।
তাই লাগলো। মুত্তাকিম সাহেব ফোন করে কাছে পিঠে থেকে আর একটা ট্রালার পাঠাতে বলল। ট্রালার আসতে আসতে জোহরের আজান পরে গেলো। এদিকে খালের পাড় ধরে যারা খুজচ্ছে তাঁদের সাথে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। ট্রালার দুটো দুদিকে চলে গেলো।
ঘণ্টাখানেক চলার পড়ে খাইরুল সাহেবের ফোনে সিদ্দিক সাহেবের কল আসলো। কথা শেষ করে খাইরুল সাহেব ট্রালার ঘুরাতে বলল। তাঁদের এখন বাম দিকে যেতে হবে। বামপন্থিদের কাছে কোন উত্তর আছে।
এবার মোটামুটি খুব দ্রুত চালিয়ে ওরা পৌঁছল সিদ্দিক সাহেবদের কাছে। ওর গিয়ে দেখল খালের পাড়ে ভাঙ্গা একটা মন্দির, সাথে শ্মশান। ঘাট আছে একটা। প্রায় ভেঙ্গে খালে পড়ে যাবার মতন অবস্থা। সিদ্দিক সাহেবদের সাথে আরো কয়েকজন দাঁড়িয়ে আছে। তারাও পুলিশের লোক। পাড় ধরে এদিকে খুঁজছিল তারা। সিদ্দিক সাহেব ইশারা করলো, ঘাট ছেড়ে পাশে নামতে। ওরা তাই নামলো। নেমে এসে সিদ্দিক সাহেবের পাশে দাঁড়ালো। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, ইশারায় খালের পাড়ে ঘাটের দিকে দেখতে বলল।
খাইরুল সাহেব একটু এগিয়ে ঘাটের পাশে বসে পড়লো। দিব্বি বোঝা যাচ্ছে রক্তের ছোপছোপ দাগ। থাকতেই পাড়ে, কেউ হয়তো এখানে কিছু জবাই করেছে। খাইরুল সাহেব সন্দেহের চোখে উলটো ঘুরে সিদ্দিক সাহেবের দিকে তাকাল।
সিদ্দিক সাহেব বলল, তুমি মিয়া কিসের ফেলু? ভালো করে দেখো।
খাইরুল সাহেব আর একটু কাছে এগিয়ে গেলো। সেখানে শুরু রক্তের ছোপছোপ দাগ না, ঘাটের সাথে মাংস শুকীয়ে লেগে আছে, হাড্ডির গুড়ো মনে হচ্ছে, সব থেকে যেটা শিউড়ে ওঠার মতন ছিল, একফাকে একটা চোখ দেখতে পেলো। দ্বিতীয় বাচ্চাটার একটা চোখ মিসিং ছিল। আশেপাশে কিছু কাপড়ের ছেড়া অংশ পাওয়া গেলো।
খাইরুল সাহেব সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, দেখলেন, পেয়ে গেলাম আমরা ঘটনা ঘটাবার জায়গা।
মুত্তাকিম সাহেব বলল, আরো শিওর হবার জন্য এগুলো ল্যাবে পাঠাতে হবে।
খাইরুল সাহেব হেসে বলল, এটা এখন জটায়ুর কাজ।
খাইরুল সাহেব আরাফাতকে ইশারা করে সাথে আসতে বলল। ওরা মন্দিরের চারপাশটা একবার চক্কর দিয়ে এসে খালের পাড়ে ঘাটের কাছে এসে দাঁড়ালো।
খাইরুল সাহেব সিদ্দিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল, সিদ্দিক ভাই, নমুনা পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। আপনিও চলে যান।
সিদ্দিক সাহেব বলল, কি করতে চাচ্ছ তুমি?
খাইরুল সাহেব উত্তর দিলো, যদি নমুনা মিলে যায় তবে আমরা এখানে রাতে পাহারায় থাকবো। আপনার আসতে হবে না। আপনি শুধু জানাবেন হ্যাঁ বা না। আর নমুনা না মিললে আমরা আগের মতন রাতে পাহারায় মানুষ রেখে চলে আসবো।
সিদ্দিক সাহেব আচ্ছা বলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে ওনার টিমকে ফোন করলো। মোটামুটি মাগরিবের আজানের আগে সব গুছিয়ে ফেলল ওরা। খাইরুল সাহেব সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে লুকাতে বলল। তারা এখনো যানে না কি ধরনের জিনিসের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে। কিছু গ্রামবাসী ভিড় করেছিল, তাঁদেরকেও চলে যেতে বলা হল।
মন্দিরটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেক পুরনো। চারপাশে দেয়াল তোলা কিন্তু তাও ভেঙ্গে যাচ্ছে। খাল পাড় ধরে কোন দেয়াল নেই। বাকি তিন পাশে দেয়াল, তাও ভেঙ্গে পড়ে যায় যায়। মন্দিরের দক্ষিন দিক থেকে বয়ে গেছে খাল আর উত্তর দিকে দেয়াল লাগোয়া মেটে রাস্তা। রাস্তা ওপাশে ধান খেত। এখন ধান নেই, ধূধূ মাঠ। যতদূর চোখ যায় পুরো ফাঁকা। পশ্চিম দিকে কিছুদুর এগিয়ে বাগানবাড়ি। ওদিক থেকেই মেঠো গিয়ে উঠেছে ইট ছলিং করা রাস্তায়, সে রাস্তা চলে গিয়েছে পিচ ঢালা বড় রাস্তায়। মন্দিরের পূর্ব দিকের রাস্তা ধরে কিছুদুর এগুলেই গ্রামের সবুজ বাগান শুরু। কিছুটা বাগানের পড়ে গৃহস্থ বাড়ি।
খাইরুল সাহেবের নির্দেশনায় সবাই মোটামুটি ছড়িয়ে গেলো। নজর রাখবে মন্দিরের দিকে, মেঠো রাস্তার দিকে। পশ্চিমের বাগানবাড়িতে কেউ থাকে না। নিচু করে পাচিল দেয়া। ভেতরে ফল আর ফুলের গাছ। মন্দির থেকে ওটাই বেশ কাছে।
রাত যখন ৯টা ৫৭ মিনিট, তখন খাইরুল সাহেবের ফোনে মেসেজ এলো। নমুনা মিলে গেছে। ওর যে চোখ পেয়েছে সেটা ওই দ্বিতীয় মৃত বাচ্চার চোখ। রক্ত দুই বাচ্চারই। এক চিমটি যে চামড়া পেয়েছে সেটা প্রথম বাচ্চার। মেসেজ পেয়ে সবাইকে নির্দেশনা দিলো আজ এখানেই পাহারায় থাকবে ওরা।
রাতে অন্ধকারে বসে বসে ওরা মশার কামড় খাচ্ছিল। হঠাৎ ক্ষীণ খুনখুন কান্নার শব্দে সবাই নড়েচড়ে বসলো। যারা পাহারায় তাঁদের নেতাদের কাছে ওয়াকিটকি।
খাইরুল সাহেব তার ওয়াকিটকিতে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো, এনি ভিজুয়াল?
পূর্ব দিকে একটা টিম থেকে একিভাবে ফিসফিস করে জবাব এলো, স্যার আমার সামনে থেকে কেউ একজন যাচ্ছে। পুরো চাঁদরে মোড়া। থামাবো?
খাইরুল সাহেব একিভাবে জবাব দিলো, নাহ, দূর থেকে পিছু নাও। হাতে নাতে ধরবো।
হঠাৎ অন্য একটা দল থেকে কথা বলে উঠলো, কিন্তু স্যার জিনিসটা কি বোঝা যাচ্ছে না। পা দেখা যাচ্ছে না। আমার খুব সামনে থেকে গেলো। মনে হচ্ছে ভাবছে। স্যার কি দেখতে পাচ্ছেন?
মিশমিশে অন্ধকার রাত না। আর এতক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকায় চোখেও সয়ে গেছে। খাইরুল সাহেবের সাথে আরাফাত আর মুত্তাকিম সাহেব, আর একজন সাব-ইন্সপেক্টর। সবাই দেখতে পেলো। বাতাসে ভেসে যেন কি একটা গুটিসুটি মেরে সামনে এগিয়ে আসছে। দূর থেকে উচ্চতা খুব লাগছে। কিন্তু সেটা সোজা হয়ে হেটে আসছে। মন্দিরের ভাঙ্গা গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো। আবছা আলোআঁধারিতে খাইরুল সাহেব স্পষ্ট দেখতে পেলো। সাথের ওরাও দেখতে পেলো।
আরাফাত কাঁপা গলায় বলল, স্যার কি এটা?
খাইরুল সাহেব উত্তর না দিয়ে বলল, আমার পিছনে আসো।
এক পা সামনে এগুতেই বাচ্চার জোরাল কান্নার শব্দ শুনতে পেলো। সাথে সাথে সেই বস্তুটা দৌড়ে ভাঙ্গা গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকল। একি ভাবে ফুড়ুৎ করে ভাঙ্গা মন্দিরের ভেতর ঢুকে গেলো। খাইরুল সাহেব ওয়াকিটকি মন্দির ঘিরে ফেলতে বলে নিজে সামনে দৌড়ে গেলো। গেট পর্যন্ত গেলো না, নিচু একটা দেয়াল এক লাফে টপকাল। সাথে সবাইকে মন্দিরের পূর্ব দিক থেকে যেতে বলে সে পশ্চিম দিকে থেকে মন্দিরের পিছনের দিকে চলে গেলো। মন্দিরটা ভাঙ্গা, বাইরে থেকেই দেখা যাচ্ছে ভেতরে কেউ নেই। আর সেই ছোট খাটো অবয়বটা বাতাসে ভাসতে ভাসতে খালের পাড়ে ঘাটের কাছে চলে এলো। হয়তো সেও কিছু আঁচ করতে পেরেছে। আজ খুব তাড়াহুড়ো করছে।
খাইরুল সাহেব এক পাশ থেকে আর অন্য পাশ থেকে আরাফাত, মুত্তাকিম সাহেব আর সেই সাব-ইন্সপেক্টর এসে দাঁড়ালো। সবার হাতে পিস্তল, তাক করা সেই বস্তুটার দিকে। সেই বস্তুটা তখন বাচ্চাটাকে ঘাটের উপর রেখেছে। বাচ্চাটা প্রচণ্ড জোরে কান্না জুড়ে দিয়েছে। শুনশান রাতের সেই আঁধার ভেদ করে সবার কলিজা কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আঁধারে লুকানো ভয় সবাইকে চেপে বসেছে। কিন্তু ওরা তো পেশাজীবী মানুষ, ওদের পেশাই মানুষের নিরাপত্তা দেয়া। তাই জীবনের ঝুকি নিয়ে আজ এমন রাতে এক অজানা বস্তুর দিকে ওরা পিস্তল তাক করে আছে।
বস্তুটা যখনই বাচ্চাটাকে কিছু করার জন্য নিচু হতে লাগলো তখনই ওরা সবাই প্রায় একসাথে চিৎকার করে উঠলো, আর এক পা নড়লে একটা গুলিও মিস হবে না।
ওদের চিৎকার শুনে বস্তটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। গায়ে পেঁচানো কাপড়টা পড়ে গেলো।
সাব-ইন্সপেক্টরের হাত থেকে পিস্তল পড়ে গেলো আর মুখ থেকে বের হল, ইন্না-নিল্লাহ।
মুত্তাকিম সাহেব বলল, এটা কি?
মাথাটা গুইসাপের মতন, গুইসাপের মতন জিহ্বা বের করে আছে। লিকলিক করে নাড়াচ্ছে। গলার কাছ থেকে নিচ পর্যন্ত মানুষের মতন। হাত দুটো গুইসাপের মতন কিন্তু পা আবার মানুষের মতন। আবার মোটা একটা লেজ আছে।
খাইরুল সাহেব তার প্রথম রিফ্লেক্সে গুলি করে বসল। দক্ষ শুটারের মতন এটাও বুঝতে অসুবিধে হল না, গুলিটা বস্তুটার গায়ে লেগেছে। অন্যপাশ থেকে মুত্তাকিম সাহেব আর আরাফাত গুলি করতে লাগলো। শুনশান রাতে গ্রাম রণক্ষেত্র হয়ে উঠলো। বস্তুটা খাইরুল সাহেবকে লক্ষ করে লাফ দিলো। খাইরুল সাহেব সরে গেলো কিন্তু পুরোপুরি সংঘর্ষ এড়াতে পারলো না। বস্তুটা তার ডান পা আর লেজ দিয়ে খাইরুল সাহেবকে বাড়ি মেরে মাটিতে ফেলে দিলো। ওপাশ থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আরাফাত আর বাকিরা এগিয়ে আসতে লাগলো। খাইরুল সাহেব মাটিতে পড়ে একটা ডিগবাজী খেয়ে উঠে বসে আবার গুলি ছুড়ল। কিন্তু এবার আর কিছু দুপায়ে দৌড়চ্ছে না। ওরা চারজন স্পষ্ট দেখল সেই বস্তুটা হঠাৎ করে পুরোপুরি গুইসাপে পরিণত হয়ে চার পায়ে দৌড় শুরু করেছে।
মন্দিরের পশ্চিম দেয়ালের সব থেকে নিচু জায়গাটা সেই গুইসাপ পাড় করে ফেলল। ওরা সবাই দেখতে পেলো ওটা খালের দিকে যাচ্ছে।
খাইরুল সাহেব চিৎকার করে বলল, ওটা যেন খালে না নামে।
সবাই গুইসাপটাকে ধাওয়া শুরু করলো।
খাইরুল সাহেব দৌড় অবস্থা পিছনে তাকিয়ে বলল, বাচ্চাটাকে কেউ দেখেন।
সাব-ইন্সপেক্টর মাথা ঝাঁকিয়ে সাথে আর একজনকে নিয়ে বাচ্চাটার দিকে দৌড় দিলো।
এদিকে গোলাগুলি আর হইহুল্লোড়ে গ্রামবাসী জড়ো হয়ে গেলো। সবাই যেনে গেলো, পুলিশ দেখেছে গুইসাপ বাচ্চা এনে মন্দিরের ঘাটে ফেলে খেতে যাচ্ছিল। সেটা এখন ধাওয়া করা হয়েছে। গ্রামবাসী নেমে পড়লো পুলিশের সাথে। সবাই শেষমেশ ধাওয়া করে ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলল। মেরে শান্ত হল না, লেজ আর মাথা কেটে মন্দিরের পশ্চিম পাশের দেয়াল ঘেঁষে খাল পাড়ে মাটি চাপা দিয়ে রাখল।
গ্রামবাসীর চাপে কেস ক্লোজ হল, গুইসাপের কাজ ছিল এগুলো। বেঁচে যাওয়া বাচ্চা ফেরত দেয়া হল। কিন্তু খাইরুল সাহেব, মুত্তাকিম সাহেব, আরাফাত আর সেই সাব-ইন্সপেক্টরের মনে শান্তি হচ্ছিলো না।
এই ঘটনার তিনদিন পড়ে খাইরুল সাহেব বাকি তিনজনকে নিয়ে সন্ধ্যার দিকে সেই জায়গায় উপস্থিত হল। সাথে কোদাল আর সাবল নিয়ে এসেছে। যেখানে মাটি চাপা দিয়েছে সেখানে লক্ষ করলো একপাশে একটা গর্ত।
আরাফাত বলল, স্যার সাপে বাসা করেছে নাকি?
ওরা কোদাল বের করে মাটি সরাতে লাগলো। মাটি সরিয়ে দেখে শুধু মানুষের একটা শরীর পড়ে আছে। আধ পচা হয়ে। কিন্তু মাথা নেই। মনে হচ্ছে সেই গর্ত থেকে শুরু মাথাটা বের হয়ে গিয়েছে।
আরাফাত জিজ্ঞেস করলো, গেলো কোথায়?
মুত্তাকিম সাহেব জিজ্ঞেস করলো, তার থেকে বড় কথা, জিনিসটা কি ছিল?
খাইরুল সাহেব বিড়বিড় করে বলল, গুইসাপানুষ!