Story

গোলকধাধা

October 10, 2026

11 views

NGO এর কাজে এদিক সেদিক অনেক ঘুরাঘুরি করা হয়। তেমনি এক কাজে গিয়েছিলাম ওই গ্রামে। খুবই প্রত্যন্ত এলাকা। যোগাযোগ ব্যবস্থাও বেশ করুন। শহর থেকে মফস্বল, এরপর ভ্যানে করে নদীর পাড়, তারপর নৌকায় ওপারে। নদী ওপারের গ্রামেই কাজ। সাথে ওই গ্রামেরই কিছু লোক ছিল যারা NGO এর স্থানীয়, মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। কাজ শেষ করতে করতে বিকেল হয়ে গেলো। নদীর পাড়ে ছোট একটা হাঁটের মতো বসে। আমরা এসে বসলাম হাঁটের কোনার দিকের এক চায়ের দোকানে। উদ্দেশ্য একটু কাজ নিয়ে আলাপ করে উঠে পরবো। কথা বলতে বলতে সন্ধ্যা। আমার সাথের লোকেরা বাড়ি চলে গেলো। আমি ভাবলাম শেষ এক কাঁপ চা খেয়ে উঠে পরি। রাত হবার আগেই শহরে পৌছাতে হবে নাহলে বাস পাবো না। চা খাচ্ছিলাম, হঠাৎ পাশের জটলায় আলোচনায় কান গেলো।

এক বৃদ্ধ কাপাকাপা গলায় বলছেন, কইছিলাম ওরে। ওদিকটায় জাইস না। অহন? ওর বাপ মায়ে কি কয়?
পাশের এক মাঝ বয়সী লোক বলল, কি আর কইবে? মায়ে কান্দে আর বাপ চাচায় মিল্লা খুঁজে। কাইল সারা রাইত খুজচ্ছে।
আমি কানটা আর একটু উচু করে দিলাম। ঘটনার সারমর্ম যা বুঝলাম, এই নদীর দক্ষিন দিকে পাড় ধরে একটা পুড়নো বাড়ি আছে। আর ওই বাড়িতে এক মেয়ে বা মহিলা থাকে যে কিনা ডাইনী। এলাকার যে ছেলে বা পুরুষের দিকে চোখ যায়, সে তাকে যাদু টোনা করে নিয়ে যায়।
নিয়ে গিয়ে কি করে? সেটা আর জানতে পারলাম না।
ধীরে ধীরে রাত হল। আমি কৌতূহল নিয়ে বসে আছি। সবাই চলে যাচ্ছে বাড়ির দিকে। হয়তো কিছুক্ষণ পরে আমি শেষ নৌকাটা পাবো না। কিন্তু মাথার মধ্যে ঘুরছে ওই ডাইনীর কথা। আমার আবার এই একটা দোষ কোন কিছুর শেষ না দেখলে শান্তি পাই না। আল্লাহ্‌ যানে আজ কি হবে?
আসে পাশে তাকালাম। দেখেই ওই বৃদ্ধ উঠবে উঠবে ভাব। আমি গিয়ে ধপ করে পাশে বসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা বাড়িটা কোন দিকে?
বৃদ্ধ অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, কার বাড়ি বাবা?
আমি হেসে দিয়ে বললাম, ঐযে আপনাদের সুন্দরী ডাইনী।
বৃদ্ধ একটু খেপে গেলেন মনে হয়। ভাবলেন মজা করছি, একটু করা গলায় বললেন, বাবা আপনে কি মজা করতেছেন? এইটা কিন্তু মজা করার বিষয় না। আপনি কই থেইকা আইছেন? চইলা যান। এই গেরামে তাহনের জায়গা পাইবেন না।
আমি উনার হাত চেপে ধরে বললাম, চাচা আমি মজা করছি না। এসেছিলাম একটা কাজে। এখানে বসে আপনাদের কথা শুনে খুব ইচ্ছে হল দেখতে। সারা জীবন শুনেছি, দেখিনি কখনো। ভুল বুঝবেন না। সে ছেলেদের যাদু করে কি করে? আর বাড়িটা কোন দিকে একটু বলেন দয়া করে।
চা দোকানদার বলে উঠলো, ভাই মরনের শখ লাগছে? হুনেন আমার চাচারে হেয় নিয়া গেছিলো। দশ দিন পরে চাচার চামড়া ছিলা, গায়ে জায়গায় জায়গায় মাংস খোবলানো লাশ নদীতে ভাসা পাইছি। আর এইযে আমার দোকানের পিছন দিয়ে নদী ধইরা ১৫-২০ মিনিট হাঁটলেই দেখবেন বাড়িটা। যান গিয়া মরেন।

আমি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দোকানদার কে ধন্যবাদ দিয়ে টাকা পয়সা মিটিয়ে হাটা শুরু করলাম।
২০ মিনিটের বেশি হেঁটেছি কিছুই চোখে পরছে না। জোস্না রাত হওয়ায় সব ফকফকে লাগছে। আমার বাম পাশে নদী। খুবই নিরব নদীর। স্রোতের শব্দ শুনা যাচ্ছে না। ডানে ঝোপ ঝার আর বেশ ঘন বাগান। হঠাৎ শিউলি ফুলের গন্ধ পেলাম। আমার পরিচিত, আমাদের বাড়ীতেও ছিল। তার মানে বাড়িটা আসে পাশে আছে। বাড়ির সাথে শিউলি ফুলের গাছ থেকে অস্বাভাবিক কিছু না।   
গন্ধ অনুসরণ করে একটু এগোতেই চোখে পরল। খুবই পুড়নো একটা বাড়ি। নদীর দিকের ঘর গুলো ভালো মনে হচ্ছে। কারন পিছনের ঘরগুলোর বাইরে দেওয়ালের সাথে ঝোপ ঝাড় পরগাছা। বাড়ির দ্বিতীয় তলায় একটু একটু আলো জ্বলছে। আমি প্রথমেই ঝোপ ঝাড় বাগান পেরিয়ে পুরো বাড়ির চার পাসটা ঘুরে যখন সদর দরজায় দাঁড়ালাম, একটু হলেই প্যান্ট নষ্ট করে ফেলতাম।
প্রচণ্ড সুন্দরী একটা মেয়ে হাঁসি মুখে দাড়িয়ে আছে সদর দরজার ওপাশে। চোখে প্রচণ্ড মায়া। একভাবে তাকিয়ে থাকলে মাথা ঘুরিয়ে উঠে। ডাইনী এতো সুন্দর হয় নাকি? আমার এলোমেলো ভাবনায় ফাটল ধরল তার রিনিঝিনি হাঁসিতে।
আপনি নিশ্চয় কাউকে খুজচ্ছেন না? বলতে বলতে মেয়েটা pocket gate টা খুলতে লাগলো।
আমি বোকার মতো জিজ্ঞেস করলাম, কয়টা বাজে?
সে হেসে উঠে বলল, এটা জানার জন্য আপনি ঘুর ঘুর করছেন?
আমি তাড়াতাড়ি ঘড়ি দেখলাম। রাত ৯.১৫ গ্রামে এটা গভীর রাত।
কাচুমাচু মুখে বললাম, না মানে পথ খুঁজে পাচ্ছি না।
সেটা বুঝতে আমাকে মহা জ্ঞানী হতে হবে না। আসুন, ভেতরে আসুন একটু বিশ্রাম করবেন। আমি লোক দিয়ে আপনাকে পৌঁছে দিবো। আসুন আমার সাথে, বলে মেয়েটি হাঁটতে শুরু করলো ভেতরের দিকে।

আমিও পিছনে পিছনে হেটে ঢুকে গেলাম।
হাঁটছি তো হাঁটছি। এতো দূর মনে হচ্ছে কেন? জানিনা কতক্ষণ হাঁটলাম। হঠাৎ সব অন্ধকার। ছিল জোস্না রাত হয়ে গেলো ঘুট ঘুটে অমাবস্যা। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি আবার সেই সদর দরজা।

দরজার ওপাশে সেই মেয়েটা দাঁড়ানো। আমাকে দেখে হেসে বলল, কি হল দাড়িয়ে আছেন যে? চলুন?

দরজা খুলে দিয়ে হাটা শুরু করলো। আমি তার পিছনে হেটে ঢুকে গেলাম।
হাঁটছি তো হাঁটছি। এতো দূর মনে হচ্ছে কেন? জানিনা কতক্ষণ হাঁটলাম। হঠাৎ সব অন্ধকার। ছিল জোস্না রাত হয়ে গেলো ঘুট ঘুটে অমাবস্যা। কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখি আবার সেই সদর দরজা। দরজার ওপাশে সেই মেয়েটা দাঁড়ানো। কিন্তু এবার পিছনে ফিরে আছে। কিছু বলছে না। দরজা খুলে গেলো। আমি ভেতরে ঢুকলাম। চারিদকে শুনসান নীরবতা।

কেমন একটা পুরুষ আর নারী কণ্ঠ মিশানো গর্গরে গলায় বলে উঠলো, তোকে এতো বলছি আমার সাথে বাড়ির ভিতরে আয়। আসছিস না কেন? এতো কিসের দেমাগ তোর?
গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছে কি পরিমানে রেগে আছে। বলতে বলতে বাতাসে ভেসে উঠলো। আর আমিও যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম। প্রচণ্ড ভয়ে কাঁপতে লাগলাম। কোথায় সুন্দরী মেয়ে? বাতাসে ভাসছে এক কুৎসিত মানুষের শরীর। কাপড়ের বাইরে শরীর যে অংশ বের হয়ে আছে, সব দগদগে ঘা পুরে যাওয়া মনে হচ্ছে। চোখ কোঠরের বাইরে বের হয়ে আসছে। আমার গালে খুব জোরে একটা চর মেরে বলল, যা বললাম শুনিস নি। এখন তোকে মরতে হবে।

আমার গলা ধরে উচু করে ছুরে ফেলে দিলো। আমি মাটিতে পরে জ্ঞান হারালাম।
তারপর চোখ খুলে দেখি আমি এখানে। নদীর পারে সেই দোকানের বেঞ্চে শুয়ে আছি।
আসে পাশের লোকজন আমার দিকে কৌতুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
পুলিশ ইন্সপেক্টর আমার হাতে হাত রেখে বললেন, আপনি সুস্থ হয়ে শহরে গিয়ে ভালো একজন মানুষিক ডাক্তার দেখাবেন। এখন ঘুমান। এই যান যান ওনাকে ঘুমাতে দেন।
সবাইকে বের করে দিয়ে আমাকে একা রেখে সবাই চলে গেলো। আর আমি ভাবনার সাগরে হারিয়ে গেলাম। কি হল আমার সাথে? কোথায় ছিলাম? কোন গোলকধাঁধায় পরেছিলাম?

সমাপ্ত 

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Borhan mahmud 10 hours ago

    রহস্য আর ভৌতিক আবহের এক চমৎকার সংমিশ্রণ! গল্পটির প্রতিটি বাঁকে উত্তেজনা ও থ্রিল বজায় ছিল, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। শুভেচ্ছা জানবেন।

    • Md. Aftab Hossen 9 hours ago

      ধন্যবাদ পড়ার জন্য।