Story

নেশাতুর রাত (ছোট গল্প)

October 19, 2026

32 views

ফিলিংসটা অনেক উপভোগ করে রাজা। নেশাটা সে অনেক আগে থেকেই করে। একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এখন একটু জাতে উঠেছে, তাই হাবিজাবি খায় না—দাম দিয়ে মদ কিনে খায়। মাঝে মাঝে বড়ি খায়। সে অবশ্য একা খায় না। তার খুব কাছের বন্ধু আছে বাদশা। দুজনে একসাথে খায়। রাজা আর বাদশার বন্ধুত্ব সেই স্কুল জীবন থেকে। আর এই রাজা-বাদশা নামের কারণেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল। জীবনের অনেক চড়াই-উতরাইতে দুজনেই একসাথে ছিল, এখনো আছে। রাজার দুনিয়ায় কেউ নেই আর বাদশার সবাই আছে। তাই বাদশার বাসার লোকেরা রাজাকে নিজেদের ছেলের মতই আদর করে।

যাইহোক, আজ বাদশা কী এক কাজের জন্য আসতে পারেনি। কিন্তু রাতে বাসায় আসবে বলেছিল বিকেলে, তাও নিশ্চিত না। রাজা মোটামুটি গলা পর্যন্ত খেয়েছে। একটা বোতল ব্যাগে ভরেছে—বারের সবসময়ের কাস্টমার।

তাই আজকে ওকে একা দেখে আর খেয়ে অবস্থা যে খারাপ হয়েছে, সেটা দেখে বারের লোকেরা জিজ্ঞেস করল, “স্যার, সাথে কি লোক দেব?”

বার থেকে ওর বাসা ৮–১০ মিনিটের রাস্তা। অনেকদিনের নেশার অভিজ্ঞতা, আর সে কখনো মাতলামি করে না। নেশা এখন ওর কাছে ডাল-ভাত। তাই এই প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলল।

ঢুলুঢুলু চোখে হাসিমাখা মুখে হাত উঁচু করে বলল, “স্যার, আপনি আমাকে অপমান করলেন? সাথে বন্ধু নেই তাই ভেবেছেন রাস্তা হারিয়ে ফেলব? আজ্ঞে না, আমি সব দেখতে এবং শুনতে পাচ্ছি।”

বলতে বলতে এলোমেলো পা ফেলে বার থেকে বের হয়ে গেল।

বাসায় ঢুকল তখন পৌনে ১২টা বাজে। একাই দুই রুমের একটা বাসা নিয়ে থাকে। রাজা জানে কিভাবে নেশা ধরে রাখতে হয়। সে ফ্রেশ হবে, হাত-মুখ ধুবে—কিন্তু নেশা কাটবে না। এগুলো করতে করতে রাজা হেসে দিল। বাদশা আজও শিখতে পারল না কিভাবে নেশা ধরে রাখতে হয়। বাদশার কথা মনে পড়তেই ফোনটা তুলে নিল। ভাবল একটা কল দেবে, কিভাবে যেন আর দিল না। রাজা আবার রাত ১২টার পরে ফোন সাইলেন্ট করে ঘুমায়। দুনিয়াতে কেউ নেই ওকে ফোন দেওয়ার মত। আজ অবশ্য বাদশা আছে। ফোন দিলে দিক—ফোন ধরব না। শালা কই গিয়া মরছে, আল্লাহ জানে!

কাপড় ছেড়ে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। এমন মুহূর্তে সে তার মা-বাবাকে দেখে—কল্পনায় আসেন ওনারা। হাসেন, মাথা নাড়েন, মুখ গোমড়া করেন, ওর নেশার জন্য বকা দেন। অন্য দিন হলে সে বাদশাকে সব বলত। আজ একা-একা কাউকে কিছু বলার নেই। তাই চোখ বুজল।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছে জানে না। দরজা ধাক্কানোর শব্দে উঠে গেল। শুধু যে দরজা ধাক্কার শব্দ তা নয়, মনে হল কেউ একজন ওর কানে জোরে ফুঁ দিল। অনেক বছর ধরেই সে একা থাকে, তাই ভয়ডর কম। তার উপর বেশিরভাগ রাতে মাতাল থাকে—ভয় পাওয়ার তো সুযোগ নেই। তাই আর ৫–৭ জন সাধারণ মানুষের মত ধরফর করে লাফিয়ে না উঠে ধীরে-সুস্থে উঠল। মনে হচ্ছে তার নেশাটা কেটে যাবে—সেটা সে চাইছে না। তাই ধীর পায়ে আগে গিয়ে ফ্রিজ খুলে মদের বোতল বের করে কয়েক ঢোঁক মেরে দিল। এবার টলতে টলতে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে অন্ধকার। কেন অন্ধকার? সে তো সামনের লাইট জ্বালিয়েই ঢুকেছিল। কারেন্ট নাই নাকি? কিন্তু ফ্রিজের লাইট তো জ্বলেছিল! এবার সে হেসে দিল, মনে মনে ভাবল, কে বলবে শালা আমি মাতাল! সব মনে আছে, সব ঠিক আছে। আমি তো অন্য লেভেলে চলে যাচ্ছি। কাল বাদশা আসুক—আমার মাতলামির লেভেল সম্পর্কে ওকে একটা ধারণা দিতে হবে।

দরজা বন্ধ করে আবার টলতে টলতে গিয়ে বিছানার এক পাশে শুয়ে পড়ল। শুয়ে শুয়ে ভাবছে, টলতে এত মজা লাগে কেন? সারাজীবন যদি এভাবে টলতে টলতে হাঁটতে পারতাম! সবাই যদি এভাবে টলতে টলতে হাঁটত! অফিসের মোটামুটি মানুষগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। তারা টলতে টলতে হাঁটলে দেখতে কেমন লাগবে—সেটা ভেবে সে আবার হেসে দিল। হাসিমুখে ঘুমিয়ে পড়ল।

মনে হল, ডান হাতের উপর কেউ চাপ দিয়ে রেখেছে। সাথে সাথে ডান ঘাড়ে নিঃশ্বাস পড়ছে মনে হচ্ছে। চোখ খুলে আধো আলো-আধো ছায়ায় বুঝতে অসুবিধে হল না—বাদশা পাশে শুয়ে আছে। রাত কটা বাজে বুঝতে পারল না। জানারও ইচ্ছে হল না। চোখ কচলাতে কচলাতে রাজা উঠে বসলো। ভাবতে লাগল ঢুকল কখন আর কিভাবে! রাতে যখন সে দরজা খুলেছে, তখন হয়তো তার মাতলামির সুযোগে ঢুকে গেছে। যাহ শালা, একটু আগেই নিজেকে নিয়ে গর্ব করছিল রাজা—কিন্তু সে এমন বেহুঁশ টাইপের মাতাল হয়েছিল যে একটা জলজ্যান্ত মানুষ ঘরে ঢুকে গেল, টেরই পেল না।

সে ধীরে ধীরে উঠে আবার ফ্রিজের কাছে গিয়ে দরজা খুলে মদের বোতল বের করে দুই ঢোঁক মেরে দিল। ভাবল এবার বাদশাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দুজনে মিলে বাকিটা খাবে। সে ঘুরে দাঁড়াতেই মনে হল, ড্রইংরুমের কমন বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ হচ্ছে। ড্রইংরুমের লাইট জ্বালাল রাজা। বাথরুমের দরজা খোলা—সেটা ধাক্কা দিয়ে সরাতেই দেখল বাদশা কমোডে বসে আছে। রাজা হাহা করে হেসে বলল, “খবিশ ব্যাটা, দরজা লাগাইয়া হাগতে পারো না???” বাদশাও হাহা করে হেসে দিল। দরজা টেনে দিয়ে আবার ফ্রিজের সামনে দাঁড়াল রাজা। ফ্রিজ খুলে বোতল বের করে টেবিলে রাখল। ভাবল, রান্নাঘর থেকে চানাচুর বা চিপস আছে কিনা নিয়ে আসা যাক। রান্নাঘরে ঢুকে লাইট জ্বালাল। শেল্ফের দরজা খুলে চানাচুরের কৌটা বের করে দরজা লাগাতেই মনে হল শেল্ফের পাশে অন্ধকারে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে দেখে বাদশা। রাজা বিরক্ত হয়ে বলল, “তুই কি লুকোচুরি খেলা শুরু করলি? চল বারান্দায়, মাল খাবো। বালের নেশা কাঁটাই দিস না—মাইর খাবি।” লাইট অফ করে বের হয়ে বোতল, গ্লাস, চানাচুর নিয়ে বারান্দার দিকে গেল রাজা।

বারান্দার দরজা খুলে হাতের জিনিস সব নিচে রেখে সিগারেট আর মোবাইল আনতে গেল। বারান্দায় বসে খেলে ওরা মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে নেয়। মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে বারান্দায় গিয়ে দরজা চাপিয়ে গ্রিলের দিকে আলো ফেলতেই আঁতকে উঠল রাজা। গ্রিলের বাইরে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাদশা—মাথার খুলি ভেঙে ঘিলু বেয়ে পড়ছে, সারা গা রক্তাক্ত। রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে দিয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে নিচে পড়তে লাগল। রাজার নেশা কেটে গেল আর সেও জ্ঞান হারাল।

মোবাইলের ভাইব্রেশনে জেগে উঠল রাজা। রাতে যে সাইলেন্ট করেছিল সেটা আর বন্ধ করা হয়নি। বারান্দায় শুয়ে আছে। মোবাইলটা পেটের নিচে বেজেই চলেছে। বারান্দায় মদের বোতল, চানাচুর, সিগারেট, গ্লাস পড়ে আছে। কিছুই খাওয়া হয়নি আর রাজাও তেমন কিছু মনে করতে পারছে না। রাতভর উল্টাপাল্টা স্বপ্ন দেখে কেটেছে। বারান্দায় কিভাবে এলো সেটাও মাথায় আসছে না।

ফোনে তাকিয়ে সে ভিমড়ি খেল। শ’খানেক মিস কল—বাদশার ফোন থেকে, ওর মা-বাবা-বোনের ফোন থেকে, ওদের আরো কিছু কমন বন্ধুদের ফোন থেকে। কাহিনী কী! সে কি এমন ঘোরে ছিল যে কারো ফোনই টের পেল না?

হাতে ফোন থাকা অবস্থায় আবার বেজে উঠল। বাদশার বাবা। কাঁপা হাতে ফোনের রিসিভ বাটন চেপে ধরল আর মাথায় কাল রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা ভাসতে লাগল। রিসিভ করে কানে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে হাউমাউ করে কান্নার শব্দ। বাদশার বোন, কাঁদতে কাঁদতে বলল, “রাজা, তুই কই ভাই? বাদশা তো আর দুনিয়ায় নাইরে। কাল রাতে…”—আবার হুহু করে কান্না—“…কাল রাতে এক্সিডেন্ট করেছে। ওর মাথার উপর দিয়ে ট্রাকের চাকা চলে গেছে…”

সমাপ্ত

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login