নেত্রী মানে আমার মেয়ে এখন প্রায় রাতেই বায়না ধরে গল্পের জন্য।
তো সেদিন তাকে আমি উলটো জিজ্ঞেস করলাম, মা তুমি কেমন গল্প শুনতে চাচ্ছো?
সে বলল, ভয়ের।
বললাম, অবশ্যই ভয়ের, কিন্তু কেমন ভয়ের?
সে কিছুক্ষন চুপ করে থেকে বলল, পর্দা মানুষের গল্প।
আমি হেসে বললাম, মা আমি গুইসাপ আর মানুষ মিলাতে পারলেও পর্দা আর মানুষ মিলাতে পারবো না। পারবো, কিন্তু গভীর ভাবে ভেবে গল্পটা বানাতে হবে। সময় লাগবে।
সে বলল, তাহলে পর্দা দিয়ে একটা ভয়ের গল্প শোনাও।
আমি বললাম, আচ্ছা, শুনো তাহলে…
আমি ভালো স্টোরি টেলার না। মেয়েকে শোনাবার সময় গল্পটা ছোটই ছিল কিন্তু লিখতে গেলে অনেক কিছু সাজিয়ে লিখতে হয়। একটু বড় হয়ে যায় (২৬১৭ শব্দ)। আর যা বলেছিলাম তার থেকে অনেক কিছুই সরে গেলো।
সম্পাদনা করিনি। তাই ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
***পর্দা***
প্রেম করে বিয়ে করলে যা হয় আরকি!
সবাই নীমরাজি।
ছেলে-মেয়ে জিদ ধরেছে তাই বিয়ে দিয়ে দিয়েছে। এখন আর ওদের ঘরে রাখতে চায় না।
উপায়ান্তর না পেয়ে নবদম্পতি ঘর ছাড়ল। ঘর ছাড়া সময় অনুভব করলো, ঘরের কেউই হয়তো ওদের ভালোবাসে না। জন্মের পর থেকে সবার এতো আদর, এতো ভালোবাসা সব এক ঘটনায় শেষ হয়ে গেলো। কেউই ওদের বাধা দিলো না। মেকি শুরেও বলল না “থাক থেকে যাও”। বুকে দুঃখের ভারী পাথর চেপে ভালোবাসার হাত ধরে বের হয়ে আসলো দুজন।
গ্রাম থেকে শহরে আসলো। এই ঝকমকে শহরের ওদের এখন জায়গা করে নিতে হবে। শুরু করলো ছোট্ট করে। শহর থেকে একটু দূরে, কিছুটা মফঃস্বলের ছোঁয়া পড়ে এমন এক জায়গায় এক রুমের একটা বাসা ভাড়া নিলো। ভাড়াও কম, এলাকাটাও গ্রামের মতন। খারাপ লাগলো না ওদের। শুরু হল জীবন যুদ্ধ।
কাছের মানুষ ওদের সরিয়ে দিলেও ভাগ্য যেন মুখ তুলে তাকাল। যতটুকু পড়াশুনার জোড় ছিল দুজনেই ছোট খাটো একটা চাকরি পেলো। জীবন যুদ্ধে নেমে দুজনেই বুঝতে পারলো, মানুষের থেকে নিজেকে বেশী বিশ্বাস করতে হবে। আর সেই নিজের উপর বিশ্বাস রেখেই ওরা চাকরিতে বেশ ভালোই করছিল। ছয় মাসের মাথায় চারকি পাক্কা হল, বেতন কিছুটা বাড়ল। দুজন মিলে পরামর্শ করলো, এবার একটু বড় বাসা নিতে পাড়ে ওরা।
একি এলাকায় একটা নতুন শেষ হওয়া একটা বিল্ডিঙয়ের ষষ্ঠতলায় ওরা বাসা নিলো। নতুন বাসা, এলাকাও এখনো বেড়ে উঠেনি, তাই ভাড়াটাও একটু কম। দুটা বেড রুম, একটা কমন বা গেস্ট রুম আর একটা মাস্টার বেড, সামনে একটা ড্রয়িং আর ডাইনিং স্পেস। রান্না ঘর আর দুটা বাথরুম। একটা বাথরুম মাস্টার বেডের সাথে আর একটা কমন। ঘরের দরজা থেকে ঢুকেই কমন স্পেস, যার কিছুটা ড্রয়িং আর কিছুটা ডাইনিং হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। কমন স্পেসের ডানে একটা রুম, গেস্ট রুম আর সোজা ঢুকে আর একটা রুম, সেটা মাস্টার বেড।
ওদের খুব ভালো লাগলো বাসাটা।
বন্ধের দিন দেখে ওরা উঠে পড়লো নতুন বাসায়। টোনাটুনির সংসার শুরু হল। ঘর সাজাতে আসবাবপত্র কিনতে হবে এখন।
মেয়েটা ছেলেটাকে বলল, দেখো এতো আসবাবপত্র তো একবারে কিনতে পারবো না। আমরা আগে প্রয়োজনিও গুলো কিনি?
ছেলেটা হেসে বলল, আর কিছু কিনি বা না কিনি আগে একটা ভালো খাট কিনতে হবে। অনেকদিন ধরে নিচে শুই আমরা। তোমার অনেক কষ্ট হয়।
মেয়েটা হেসে বলল, কষ্ট আমার একার হয়? আপনার হয় না? চল আজ আগে খাট, চাঁদর, তোশক, বালিশ এগুলো কিনি।
প্লান করলো আর এক বন্ধের দিন বের হয়ে ওরা সব কিনবে।
বন্ধের দিন বের হল। সব কিনতে কিনতে মেয়েটা একটা পর্দার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়লো। ছেলেটা এটা লক্ষ করে ইশারায় ভেতরে ঢুকতে বলল। দুজনে পর্দার দোকানে ঢুকে পড়লো, কিন্তু যে পর্দা ভালো লাগে তার দাম দেখে ওদের মন একটু খারাপ হয়ে যায়।
তবুও মেয়েটা তার পছন্দের কয়েকটা পর্দার ছবি তুলে নেয়। মনে মনে ভাবে একটু সময় নিয়ে টাকা জমিয়ে কিনে ফেলবে।
এভাবে চলতে থাকে ওদের ছোট্ট সংসার। দুজন অফিস করে, সন্ধ্যায় এসে দুজন মিলে রান্না-বান্না করে। একটা সেকেন্ড হ্যান্ড ফ্রিজ কিনেছে। দুপুরে আর বাইরে খায় না। রাতে বেশী করে রান্না করে রাখে। সকালে গরম করে নিয়ে যায়। হেলে দুলে চলছে ওদের জীবন। কিন্তু মেয়েটার মাথা থেকে পর্দা কেনার ভূত নামে না। মাঝে মাঝেই বলে পর্দার এতো দাম কেন? স্বামীর সাথে একটু হা হুতাশ করে।
একদিন দুজনেই অফিসে। এমন সময় মেয়েটার ফোনে ওর স্বামীর ফোন আসলো। ওর স্বামী জানালো, তার এক কলিগ একটা জায়গায় খোঁজ দিয়েছে। সেখানে নাকি ভালো ভালো আসবাব পত্র, বিছানার চাঁদর, পর্দা পাওয়া যায় একটু কম দামে। রিজেক্টেড আর সেকেন্ডহ্যান্ড জিনিস, সে যাবে কিনা দেখতে? মেয়েটা রাজি হল। কথা হল, আজ একটু জলদি অফিস থেকে বের হয়ে ওরা সেখানে যাবে।
যেই কথা সেই কাজ।
দুই টোনাটুনি খুশি মনে একটা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে বের হয়ে রওনা দিলো সেই জায়গায়। একটা নদীর পাড়ে পুরনো একটা বাজার। এই এলাকাটা আগে বন্দর নামে পরিচিত ছিল। জাহাজের বিভিন্ন পুরনো মালামাল পাওয়া যেতো। ধীরেধীরে কালের পরিক্রমায় জায়গাটা ছোট হতে থাকে, কারন নদী ছোট হতে শুরু করেছে। এই বাজার এক সময় রমরমা ছিল, সেটাও এখন খাবি খাচ্ছে।
ওরা দুজন বাজারের ভেতর ঘুরতে লাগলো। বিকেলের সময়, এখনো বাইরে ভালো আলো আছে। কিন্তু বাজারের ভেতরটা বেশ অন্ধকার আর লালচে আলো। পুড়নো আর আঁশটে গন্ধ। মেয়েটা নাকে রুমাল চেপে আছে, ছেলেটাও মুখে হাত দিয়ে নাক চেপে আছে। ঘুরতে ঘুরতে নদীর গা ঘেঁষে একটা দোকান দেখতে পেলো। গলির মাথাতে দোকানটা আর সেখানে খোলা নদী দেখা যাচ্ছে। ওরা দুজন এসে ওখানে দাঁড়িয়ে আগে প্রান খুলে নিঃশ্বাস নিলো। দোকানের দিকে তাকিয়ে মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়লো, বেশ সুন্দর কিছু পর্দা ঝুলছে।
ওরা ভেতরে ঢুকল।
বেশ বয়স্ক এক লোক বসা। মুখে পক্সের দাগ ওনাকে ভয়ংকর লাগছে।
সেটা মনে হয় মেয়েটা লক্ষ করেনি।
সে সোজা পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, চাচা এই পর্দা গুলো দেখান তো।
দোকানদার উঠে এসে বেশ কিছু পর্দা নামাল। একটু ময়লা ময়লা দেখতে হলেও মেয়েটার কেন যেন ভালো লাগলো পর্দা গুলো। একটু লালচে কালো, ভেতরে অজানা এক ডিজাইন করা।
মেয়েটা জিজ্ঞেস করলো, চাচা এইগুলো কেমন ডিজাইন?
দোকানদার একটু খসখসে গলায় বলল, এই পর্দার ইতিহাস অনেক পুরনো। একটা চাইনিজ জাহাজ থেকে এই কাপড় গুলো নাকি কেউ একজন কিনেছিল। সে পর্দা বানায়, এরপরে এই পর্দা অনেকের বাসায় ঝুলে শেষে এসে আমার দাদার হাতে পড়ে। আমার দাদা আর বাবা বেশ কয়েকবার এই পর্দা বিক্রি করে, পড়ে আবার ঘুরেফিরে এই পর্দা আমাদের দোকানে চলে আসে।
ছেলেটা একটু অবাক হয়ে বলল, মানে কি? পর্দার কি হাত পা আছে?
দোকানদার একি ভাবে বলে, আসলে বাবা আমাদের দোকানে অনেকেই ব্যবহার করা, সেকেন্ডহ্যান্ড আর রিজেক্টেড মাল জিনিস বিক্রি করে। তারা কোথায় পায় আমি বা আমরা বলতে পারবো না। কোন এক রহস্যজনক কারনে এই পর্দাটা আমাদের দোকানে বেশ কয়েকবার ফিরে এসেছে, মানে নতুন নতুন কেউ এসে বিক্রি করে গিয়েছে। প্রতিবার আমরা ভেবেছি, এইবারি শেষ, এই পর্দা আর ফিরবে না। কিন্তু দেখা যায় কিছুদিনের মধ্যে ফিরে আসে।
মেয়েটা হেসে বলল, বাদ দেন, এবার আর ফিরবে না। আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। আমার যা পছন্দ হয় সেটা আমি সহজে ছাড়ি না। কত নিবেন বলেন?
দোকানদার খুবই সামান্য একটা দাম চাইলো।
ওরা একটু অবাক হলেও কোন কথা না বাড়িয়ে নিয়ে নিলো।
ব্যাগে ভোরে বের হবে তখন পিছন থেকে দোকানদার ডাক দিলো।
ডাক দিয়ে বলল, মা অবশ্যই ধুয়ে নিবেন। আর ধোয়ার সময় যদি দেখেন বেশী রং বের হচ্ছে অবাক হবে না বা কষ্ট করে বেশী ধুতে যাবেন না। একটু ধুয়ে শুকিয়ে ফেলবেন। দেখবেন কেমন চকচক করছে।
খুশি মনে ওরা বাসায় ফিরে এলো।
বাসায় এসে মেয়েটা ভেজাতে যাবে তখন ছেলেটা ওকে মানা করলো। যেহেতু কাল অফিস আছে, সে ধুতে পারবে না। বন্ধের আগের দিন ভেজাতে বলল।
তাই করা হল।
বন্ধের আগের দিন মোট ছয়টা পর্দা ভেজানো হল। সকালে মেয়েটা ধুতে ঢুকল। পানি ছেড়ে ধুয়ে যাচ্ছে কিন্তু লাল রং বের হওয়া বন্ধ হচ্ছে না। একবার ভাবল তার স্বামীকে জানায়, পড়ে সেই দোকানদারের কথা মনে পড়তে আর ব্যাপারটা গায়ে মাখলো না। পানি ঝাড়িয়ে ছাদে শুকাতে দিয়ে আসলো।
সন্ধ্যার একটু আগে ছাদ থেকে নামানোর জন্য বের হবে, তখন তার স্বামীকে ডাক দিয়ে বলল, এই সাথে একটু আসবে?
ছেলেটা হেসে বলল, এতো বড় ঢেংরি মেয়ে, দুইতলা উপরে ছাদের যেতে ভয় পাচ্ছো?
মেয়েটা মুখ ঝামটা দিয়ে বের হয়ে গেলো। আটতলা বাড়ির, ছয়তলায় ওরা থাকে। নতুন বিল্ডিং কিন্তু সব ফ্লাটেই এখন মানুষ থাকে। এই সময়ে হয়তো কেউ ছাদে থাকতেও পাড়ে। তাই বুকে অনেক সাহস নিয়ে মেয়েটা ছাদে চলে গেলো।
ছাদে উঠে পর্দা গুলো দেখে সে তো অবাক। একেবারে নতুনের মতন চকচক করছে। পুরো লালচে কালো। মেয়েটার ভেতরে ভেতরে খুশি হয়ে গেলো। পর্দা গুলো বেশ বড় আর ভারী। একটা একটা করে পর্দা উঠিয়ে সে কাঁধে রাখছিল। চারনম্বরটা উঠিয়ে যখন পাঁচনম্বরটায় হাত দিলো, ওর মনে হল ছয়নম্বর পর্দার ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। পা দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু পর্দার ওপাশে একটা অবয়ব আছে বলে মনে হচ্ছে।
প্রথমেই মেয়েটার বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠলো।
পড়ে ভাবল হয়তো তার স্বামী দুষ্টমি করছে।
তখন সে একটু মুচকি হেসে বলল, আমি গ্রামের মেয়ে, আমাকে এতো সহজে ভয় পারবে তুমি?
বলেই পাঁচনম্বর পর্দার আগে ছয়নম্বর পর্দা ধরে টান দিলো। ওপাশে কেউ নেই। সন্ধ্যার অন্ধকার নামা শুরু করেছে তখন। মেয়েটার পুরো শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। ভয়ের একটা শীতল স্রোত শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেলো। পা এমন ভাবে কেঁপে উঠলো, একটু হলেই পড়ে যেতো। পাঁচনম্বর পর্দাটা ধরে নিজেকে সামলে নিলো। আর একটু হলে চিৎকার করে উঠত।
ওমনি কানে এলো, কে যেন পিছন থেকে বলল, ভাবী স্লামালাইকুম।
মেয়েটা পেছনে ফিরে তাকাল। টলমলে অবস্থা।
পিছনে বাড়ির দারোয়ান দাঁড়িয়ে। ওর অবস্থা দেখে সেও একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো।
নরম গলায় বলল, সরি ভাবী, ভয় পাইছেন নাকি?
মেয়েটা ভাঙ্গা গলায় বলল, না না ভাই। ভয় পাবো কেন? ওয়ালাইকুম আসসালাম।
এতোটুকু বলে সে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে গেলো।
বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিলো কিছুক্ষন। বাসায় হাসি মুখে ঢুকল। দুজনে মিলে পর্দা লাগাল দুই ঘরে। গেস্ট রুমে পর্দা লাগাতে গিয়ে একটা পর্দার নিচের দিয়ে কোনায় একটা কালো ছোপ দাগ দেখতে পেলো ছেলেটা। কিছু বলল না। ভাবল, পুড়নো জিনিস কিনেছে, একটু আধটু দাগ থাকতেই পাড়ে।
নিরিবিলি চলছে ওদের জীবন। সেই ছাদের ঘটনা মেয়েটা ভুলে গেছে।
একরাতে মেয়েটা স্বপ্ন দেখল, ওই পর্দার একটা ছোট্ট বাচ্চা ঝুলে আছে উলটো হয়ে। মোটেও ভয়ের স্বপ্ন না, স্বাভাবিক ভাবে। কিন্তু স্বপ্নের এক পর্যায়ে মেয়েটা দেখল সেই বাচ্চার চোখ আর মুখ থেকে রক্ত পড়ছে। পর্দা বেয়ে নিচে ফোটাফোটা পড়ছে সেই রক্ত। মেয়েটা ধড়ফড় করে উঠে গেলো ঘুম থেকে। মাথার কাছে ওরা পানি রেখে ঘুমায়, সেখান থেকে পানি খেলো। কিন্তু স্বামীকে আর জাগালো না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে সে প্রথমে নিজের ঘরের পর্দার গুলো দেখতে লাগলো। ঠিক আছে সব। এরপরে গেলো গেস্ট রুমের পর্দা দেখতে। সব গুলো দেখে একটা পর্দার নিচের দিকে একটু ছোপছোপ দাগ দেখতে পেলো, কালচে দাগ। সে ধরতে মনে হল ভেজা। পর্দা থেকে হাত সড়াতেই দেখে হাতে রক্তের দাগ। বুক ফেটে চিৎকার করতে যাবে অমনি পিছন থেকে ছেলেটা ডাক দিলো, অফিসের যাবার জন্য দেড়ি হয়ে যাচ্ছে। সে পিছনে তাকিয়ে বলল, আসছি। বলে হাতে তাকিয়ে দেখে রক্ত আর নেই। পর্দার ছোপ দাগ আছে, কিন্তু সেটা ভেজা না। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা অফিসে জন্য বের হয়ে গেলো।
মেয়েটা আবারো স্বপ্নের কথা বলতে ভুলে গেলো ছেলেটাকে।
কিন্তু যেন স্বপ্ন মেয়েটাকে ভুলেনি। অন্য এক রাতে মেয়েটা আবার স্বপ্ন দেখল। এবার সে দেখল, একটা মেয়ে এই পর্দা গলায় পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু হাসি মুখে। স্বপ্নের মধ্যে যেন সে ওই পর্দা গলায় পেঁচানো মেয়েটার শরীরে ঢুকে গেলো। দেখল তার সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে ছুড়ি নিয়ে। কিন্তু বুঝে ওঠার আগে ছেলেটা দৌড়ে এসে ছুরিটা মেয়েটার গলায় চালিয়ে দিলো। পর্দার একটা পাশ কেটে গেলো সাথে মেয়েটার গলা। গলা থেকে রক্ত বের হয়ে পর্দা বেয়ে নেমে গেলো নিচে। স্বপ্নের মেয়েটা গলা চেপে ধরে নিচে পড়ে গেলো আর এই মেয়েটা গলা চেপে ধরে ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে গেলো। আজকে ছেলেটাও উঠে গেলো। ওকে জড়িয়ে ধরল, জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?
মেয়েটা আজ সব খুলে বলল প্রথম থেকে। সেই সন্ধ্যায় ছাদের ঘটনা থেকে। ছেলেটা ওকে উঠতে বলল। পর্দা চেক করবে। দুজন মিলে সব গুলো পর্দা চেক করলো। সব ঠিক আছে। ওরা শুয়ে পড়লো।
সকালে মেয়েটার আগে ঘুম ভাঙ্গল। সে ঘুম থেকে উঠে আবার প্রথমে নিজের ঘরের পর্দার গুলো দেখতে লাগলো। ঠিক আছে সব। এরপরে গেলো গেস্ট রুমের পর্দা দেখতে। সব গুলো দেখে একটা পর্দার নিচের দিকে একটু ছোপছোপ দাগ দেখতে পেলো, কালচে দাগ। সে এবার আগে পর্দা ধরল না। যেখানে সেই স্বপ্নের ছেলেটা ছুড়ি দিয়ে পোঁচ দিয়েছিল সেই জায়গাটা খুঁজতে লাগলো। এবং সে পেয়ে গেলো। খুব শুক্ষ ভাবে এমব্রয়ডারি করা লাল সুতো দিয়ে। খেয়াল করে না খুজলে পাবে না কেউ। সে তখন সেই নিচে ছোপ দাগের জায়গায় হাত দিলো। সে ধরতে মনে হল ভেজা। পর্দা থেকে হাত সড়াতেই দেখে হাতে রক্তের দাগ। বুক ফেটে চিৎকার করতে যাবে অমনি পিছন থেকে ছেলেটা ডাক দিলো, অফিসের যাবার জন্য দেড়ি হয়ে যাচ্ছে।
সে পিছনে তাকিয়ে বলল, এদিকে আসো।
ছেলেটা কাছে এগিয়ে গেলো।
মেয়েটা ছোপ দাগ দেখিয়ে বলল, এইটা দেখো।
ছেলেটা দেখে বলল, এটা আমি আগেই দেখেছি। পুরনো জিনিস কিনলে এমন তো হবে?
মেয়েটা তুলে ধরে বলল, ধরে দেখো।
ছেলেটা ধরল, বলল, কি?
মেয়েটা আবার ধরল, দেখল শুকনো এবার।
মেয়েটা এবার সেই এমব্রয়ডারি করা জায়গা দেখাল।
ছেলেটা দেখে বলল, হয়তো ছিঁড়ে গেছিল।
মেয়েটা বলল, আমার স্বপ্নে ঠিক এই জায়গায় মেয়েটার গলায় পোঁচ দেয়া হয়েছে।
ছেলেটা বলল, আচ্ছা, আমরা পর্দা গুলো ফেরত দিয়ে আসি। হয়তো এই সব কারনেই ওই লোকের দোকানে বার বার এই পর্দা ফিরে যায়। হতে পাড়ে কোন সমস্যা আছে। আবার তোমার মনের কল্পনাও হতে পাড়ে। শুধু শুধু আমরা প্যাড়া কেন নিচ্ছি।
মেয়েটা ছেলেটার সাথে একমত হল। ওরা সিধান্ত নিলো সামনের বন্ধের দিনে ওরা গিয়ে পর্দা ফেরত দিয়ে আসবে।
পরের দিন রাতে মেয়েটার ঘুম ভাঙ্গল ঘরে কিছু একটা শব্দ পেয়ে। সে ছেলেটাকে না ডেকে একা উঠে গেলো। ধীর পায়ে অন্ধকারের মধ্যে গিয়ে দাঁড়ালো খাবার টেবিলের পাশে। গলা পুরো শুকীয়ে গেছে, এক ঢোক পানি খেলে জগ উচু করে ঢেলে। আবার কেমন একটু খসখস শব্দ হল। শব্দ আসছে গেস্ট রুম থেকে। ধীর পায়ে সে গেস্ট রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল সেই সেলাই করা পর্দার ওপাশে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ঘর একেবারে অন্ধকার না, বাইরে থেকে অল্প আলো ঢুকছে ঘরে। সে কিচ্ছু বলল না, করলো না। ওখানে দেখে সে ধীর পায়ে রান্না ঘরে চলে গেলো। রান্না ঘর থেকে তাঁদের সব থেকে ধারালো ছুরিটা নিয়ে ধীর পায়ে আবার এসে দাঁড়ালো গেস্ট রুমের দরজার সামনে। একি ভাবে দেখল পর্দার ওপাশে কিছু একটা দাঁড়িয়ে আছে। এতদূর যখন সে সাহস করে এসেছে তো বাকিটা কেন বাকি রাখবে। সে চিৎকার করে ছুরিটা উচু করে ঝাপিয়ে পড়লো সেই পর্দাটার উপরে। ঝাপিয়ে পড়ে কিছুই পেলো না, উলটো পর্দার ওপাশের জানালার সাথে সজোরে ধাক্কা খেলো। হাত থেকে ছুরিটা ফসকে নিচে পড়ে দরজার কাছে চলে গেলো। আর মেয়েটা পর্দায় পেঁচিয়ে ফেলল নিজেকে।
মেয়েটার চিৎকার শুনে ছেলেটা ধড়ফড় করে লাফিয়ে উঠলো। মশারী থেকে বের হয়ে সে আগে নিজেদের ঘরে লাইট জ্বালল। এরপরে ডাইনিং, ড্রয়িংএর লাইট জ্বেলে গেস্ট রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। গেস্ট রুমের লাইট তখনো জ্বালেনি, কিন্তু দেখতে পেলো পর্দার ওপাশ থেকে ওর স্ত্রীকে কে যেন চেপে ধরে আছে। সেই ঘরে ঢুকতে গিয়ে পায়ের কাছে ছুরিটা বাধল। ছেলেটা ছুরি বাগিয়ে চিৎকার করে ছুটে আসলো মেয়েটার দিকে।
মেয়েটার গলা পর্দায় পেঁচানো। সে কিছু বলতে পারছে না। তার সামনে সেইদিনের স্বপ্নের মতন লাগছে। সে মনেমনে ভাবছে হয়তো এটা স্বপ্নই। সেদিন স্বপ্নে সে ছুরি হাতে ছেলেটার চেহারা দেখেনি। কিন্তু আজ দেখতে পাচ্ছে, যে তার স্বামী ছুরি উচিয়ে তার দিকে ছুটে আসছে। সে বুঝতে পারছে তার স্বামী ছুরি চালিয়ে দিবে। যদি স্বপ্ন হয় সে বেঁচে যাবে কিন্তু বাস্তব হলে তাকে কিছু একটা বলে স্বামীকে থামাতে হবে। তবে কোন ভাবেই সে কিছু বলতে পারছে না। মনে মনে ভাবতে লাগলো, এটা যেন স্বপ্ন হয়। কিছুক্ষন পড়ে তার সব ভাবনা মিলিয়ে গেলো। যখন ধারালো ছুরির পোঁচ সে নিজের গলায় অনুভব করলো। গলায় হাত দিতেও তার দুই হাত বেয়ে তড়তড় করে রক্ত পড়তে শুরু করলো।
ছেলেটা পর্দা থেকে মেয়েটাকে রক্ষা করতে ছুরি চালিয়ে দিলো। রাতে বেলায়, এমন ভয়াবহ পরিবেশে সে মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলো না। সে আগে যদি পর্দা ধরে ছুরি চালাত হয় ছুরি অন্য জায়গায় পড়ত। কিন্তু সে সেটা বুঝে ওঠার আগেই ছুরি তার স্ত্রীর গলায় চালিয়ে দিলো। রক্তাক্ত, ফাঁকা হওয়া গলা চেপে ধরে মেয়েটা নিচে এলিয়ে পড়লো। পর্দা তাকে ছেড়ে দিলো। ছেলেটা ছুরি পাশে রেখে মেয়েটাকে ঝাপটে ধরল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেড়ি হয়ে গিয়েছে। রক্তে ভেবে গেছে পুরো মেঝে। পর্দার এক পাশ থেকেও একটু কেটে গেছে। পর্দা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। ছেলেটা এই দৃশ্য নিতে পারলো না। পাশে পড়ে থাকা ছুরিটা তুলে নিয়ে নিজের গলায় পোঁচ বসিয়ে দিলো।
গভীর রাতে এমন চিৎকার চেঁচামেচি অনেকের কানে গেলো। নিচ থেকে দারোয়ান সহ আরো অনেকে ছুটে এলো। কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় তারা পুলিশ খবর দিলো। পুলিশ আর এলাকা বাসির সহায়তায় দরজা ভাঙ্গা হল। সবাই দেখল স্বামী স্ত্রীর দেহ গেস্ট রুমে পড়ে আছে। ছেলেটার ডান হাতে ছুরি। মেয়েটা ছেলেটার কোলে গলা চাপ দিয়ে পড়ে আছে।
লাশ উদ্ধার হল।
পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হল ময়নাতদন্তের পড়ে।
তদন্তে তেমন কিছু বের হল না।
আত্মহত্যা বলে কেস ক্লোজ করা হল।
ঘটনার প্রায় মাসখানেক পড়ে, এক পড়ন্ত বিকেলে, সেই পুরনো জিনিস-পত্র বিক্রেতা চাচার দোকানে বোরকা পড়া এক মহিলা আসলো একটা ব্যাগ নিয়ে। ব্যাগ খুলে চাচা দেখল সেই পর্দা গুলো। একটা ছেলে আর মেয়ে অনেকদিন আগে এসে কিনে নিয়েছিল। তাঁদের দেখেই চাচা ভেবেছিল, এরা নতুন বিয়ে করেছে। ঘর সাজাতে আপাতত পুরনো জিনিস কিনে নিচ্ছে। নতুন জিনিস নিলে এটা ফেরত আসবে।
বোরকা পড়া মহিলাকে সে কিছু জিজ্ঞেস করলো না। তার তো সবসময়ই লাভ। যে দামে বিক্রি করেছিল তার থেকে একটু কম দাম বলল।
বোরকা পড়া মহিলা কিছু বলল।
শুধু টাকা গুলো হাতে নিয়ে বলল, আমার অনেক পছন্দ হয়েছিল। আমার যা পছন্দ হয় সেটা আমি সহজে ছাড়ি না। কিন্তু এটা রাখতে পারলাম না।
কথা শেষ করে টাকা নিয়ে বের হয়ে গেলো।
চাচার মনে হল কথা গুলো শুনেছে এর আগে কোথাও, কিন্তু মাথা খাটাল না আর। এই বুড়ো বয়সে অনেক কিছুই ভুলে বসে আছেন উনি।
শুধু পকেট থেকে বাটন ফোনটা বের করে ওর পরিচিত লণ্ড্রীর ছেলেটাকে ফোন দিয়ে বলল, ওই সন্ধ্যার পড়ে একটু আহিস তো, সেই পর্দাডা আবার ফেরত আইছে।
***সমাপ্ত***