অনেক রাতে বাসায় এলো বুনো। নিজের ঘরে ঢুকে ফোনে ভয়েস রেকর্ডার চালিয়ে দিলো।
একটা সিগারেট ধরিয়ে বলতে শুরু করল ধীরেধীরে, হেয়, শুনবে কি গল্প??? দুটো মানুষের, দুটো জীবনের। তবে দরজাটা বন্ধ কর, নিভিয়ে দাও আলো। শুরু হোক জীবনের গল্প। ভাবি বসে সারারাত, নির্ঘুম চোখ নিয়ে। ভাবি বসে নিয়ে একরাশ আধার। ভাবি বসে সারারাত সিগারেট আর চায়ের কাপে, যে কথা গুলো বলেছিলে আমায়।
এতোটুকু বলে চুপ হয়ে যায় বুনো। পা টেনে হাটার খসখস শব্দ শুনতে পায় সে বারান্দা থেকে।
সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে আবার বলতে শুরু করে, গাইতে পারিনা গান, যেভাবে গেতাম আগে। মাঝে মাঝে অবশ আমার হাত। রক্ত ঝরে আমার এই শরীর জুড়ে। লাল হয়ে যায় সিগারেটের ফিল্টার। আজও কেন যে ফিরে আসো তুমি, আজও কেন যে কাদায়? আজও কেন যে তোমায় শুধু খুঁজে ফিরি? তোমার সেই কথাগুলো ভাবায়।
সিগারেটের ফিল্টারটা বুনোর ভেজাভেজা লাগে। ঘরের আধো আলো আধো ছায়ায় দেখতে পায় লাল ফিল্টার। নাক থেকে কখন রক্ত পরে সিগারেটের ফিল্টার ভিজে গেছে টের পায়নি সে। বারান্দার পায়ের শব্দটা দরজার কাছে থেমে যায়। বুনো একটা নারী কণ্ঠ শুনতে পায়।
সেই কণ্ঠ বলে উঠে, তুমি কেঁদো না, তুমি কেঁদো না যাচ্ছি আমি চলে। আমি তো নই তোমার মত কিংবা তোমার জন্য।
তুমি কেঁদো না, তুমি কেঁদো না যাচ্ছি আমি চলে। হঠাৎ করে দেখবে তুমি গেছো আমায় ভুলে।
বুনো এবার ঘুরে গিয়ে দরজার কাছে বসে। দরজার ওপাশে খোলা বারান্দায় কেউ আছে সে বুঝতে পারছে। কিন্তু দরজা খুললো না বুনো।
সে আবার বলা শুরু করল, হঠাৎ কেন আজ তোমায় শুধু মনে পরে, হঠাৎ করে কেন তোমায় ভাবি? জানি নেই তুমি মোর পাশে, চলে এসেছি ছেড়ে। কেন যে আজ শুধু তোমায় খুঁজি?
কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো সে, বারান্দার দরজা খুলে ফেলল। গ্রিল ছাড়া খোলা বারান্দার রেলিঙে পা ঝুলিয়ে উল্টো দিকে ফিরে একটা মেয়ে বসে আছে। ছায়া মুর্তির মতন। পিছন থেকে চেনাচেনা লাগছে তার। বুনো অস্পষ্ট গলায় নাম ধরে ঢাকল, বিন্তি?
মেয়েটার মুখ ডান দিক থেকে একেবারে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। অন্য কেউ দেখলে হয়তো ভয়ে পালাত। কিন্তু বুনো সেটা পারলো না। এই মুখ যে তার অনেক চেনা, অনেক আপন। সে তাকাতেই বুনোর চোখ বেয়ে পানি নেমে এলো।
বুনো আবার বলতে শুরু করল, ভাবি বসে সারারাত নির্ঘুম চোখ নিয়ে, ভাবি বসে নিয়ে একরাশ আধার। ঝাপসা চোখে বসে থাকি, টেবিলে চশমাটা রেখে। ফিরবো কবে আমি তোমার কাছে???
বুনো ধীর পায়ে হেটে বিন্তির ছায়া মুর্তির পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মুর্তিটা শুন্যে ভেসে একটু দুরে চলে যেতে থাকে।
বুনো তার ডান হাত বাড়িয়ে বলতে শুরু করে, অনেকদিন পরে আমি ফিরে যাই তোমার ঘরে, তাকিয়ে দেখি তুমি নাই। রক্তে লাল মেঝে, চলে গেছো তুমি আমায় ছেড়ে। মনে হয় বলছ তুমি আমায়।
কথা শেষ করে বুনো রেলিঙয়ের উপর উঠে দাঁড়ালো। একি ভাবে হাত বাড়িয়ে দেয়া বিন্তির দিকে।
শুন্যে ভাসা বিন্তির ছায়া মুর্তিটা বলতে শুরু করল, তুমি কেঁদো না, তুমি কেঁদো না যাচ্ছি আমি চলে। আমি তো নই তোমার মত কিংবা তোমার জন্য।
তুমি কেঁদো না, তুমি কেঁদো না যাচ্ছি আমি চলে। হঠাৎ করে দেখবে তুমি গেছো আমায় ভুলে।
বিন্তির কথা শেষ হতেই বুনো এবার এক পা সামনে শুন্যে এগিয়ে দিলো, তার চোখ বন্ধ।
অস্পষ্ট গলায় বলল, তোমায় ভুলিনি আমি।
এরপরে দুজন একসাথে বলে উঠলো...
কে কি পেলো!
কি হারাল!
আর কিছু নাই, গল্পটা শেষ।
৯ তলা থেকে ভাসতে ভাসতে বুনো আর বিন্তি নিচে নেমে এলো। বিন্তি মাটি থেকে একটু উপরে দাঁড়িয়ে পরল। আর বুনোর শরীরটা আছড়ে পড়লো রাস্তায়। ছিটকে রক্ত বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। মাথা থেঁৎলে মগজ রাস্তায় ছিটে পড়ল।
বিন্তি হাসি মুখে চেয়ে আছে বুনোর রক্তাক্ত শরীরের দিকে। কিছুক্ষন পরে সেই শরীর থেকে বুনোর আত্মা বের হয়ে শুন্যে ভাসতে ভাসতে বিন্তির সামনে দাঁড়ালো। দুজন এবার একসাথে বলে উঠলো...
কে কি পলো!
কি হারাল!
আর কিছু নাই, গল্পটা শেষ।
ধীরেধীরে দুজন শুন্যে মিলিয়ে গেলো।
*****সমাপ্ত*****
প্রিয় গায়ক, গিটারিস্ট বেজবাবা সুমনের “শেষ” গানের কথা দিয়ে ছোট একটা গল্প।