Story

ডাকঘর ও ডাকহরকরা

September 23, 2026

Original Author মোঃ আবু হানিফ

95
View

এখন, চিঠি আর আসে না! ঘূর্ণায়নের চাকায় সময় বদলে গেছে। মানুষের পকেটে এখন বন্দী হাজার হাজার বার্তা, সময়-অসময়ের খবরও পৌঁছায় ঠিকই;  কিন্তু সেই হলুদ খামের গন্ধ, কাগজের ছোঁয়া আর ডাক পিয়নের পথ চেয়ে বসে থাকার ব্যাকুলতা আজ আর কোথাও নেই। নেই প্রিয়তমার অপেক্ষার প্রহর, বাবার জন্য সন্তান, সন্তানের জন্য মায়ের। এক যান্ত্রিক চোঁয়াছে বদলে গেছে  ডাকঘর ও ডাকবাক্সের ইতিকথা। সময় খুব দ্রুতই বদলায় ও ফুরিয়েও যায়, ফুরায় না শুধু মানসপটের স্মৃতি।

বাজারের এক কোণে মহাকালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে  আছে জবুথবু এক জরাজীর্ণ ডাকঘর ও বারান্দার খুঁটিতে একা, নিঃসঙ্গ ঝুলে আছে এক চিরচেনা লাল লোহার ডাকবাক্স। বাক্সটায় জং ধরেছে নিস্তব্ধতার। তার পিঠে এখন ধুলোর পুরু আস্তরণ, বুকের ভেতর মাকড়সার বোনা জালের সংসার। অথচ এই একটা লোহার বাক্সের অন্ধকার গর্ভেই একসময় জমা হতো আবেগ জমানো ভালবাসা, হাসি-কান্না, কত অসহায়ত্বে পাওয়া- না পাওয়ার আবেগঘন অনুভূতি ও একটা গোটা প্রজন্মের হৃদস্পন্দন।

হেমন্তের কুয়াশা মোড়ানো অলস ভোরে কিংবা চৈত্রের তপ্ত দুপুরে, দিগন্তজোড়া মেঠোপথ ধরে ছুটে চলত এক চিরচেনা অবয়ব। কাঁধে তার খাকি রঙের একটা ঝোলা, এক হাতে বর্শার ফলায় বাঁধা লাঠি আর অন্য হাতে ঝুলন্ত লণ্ঠন। ডাকহরকরা কি জানতো, কাঁধের ঝোলাতে কি আছে? হয়তোবা; ঝোলার মধ্যে খামের ভিতর কাহারো প্রতিক্ষার প্রহর গোনা অশ্রুশিক্ত নয়নে ভেজা ভাঙা ভাঙা হাতে লিখা চিঠি। হয়তোবা, বাবা ও মায়ের কাছে সন্তানের চিঠি, মা তোমরা ভাল থেক, আমি ভাল আছি। বা উত্তরে মায়ের জিজ্ঞাসা, বাবা কবে আসবি? সেই চিঠি এখন আর কেউ লিখে না! যুগের প্রয়োজনে ডাকহরকরা এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে মানুষের বুকের ভেতর জমানো খবরের পিঠোপিঠি বয়ে চলা এক পাহারাদার। সে যুগে তার খাকি ঝোলার ভেতর কেবল কাগজের টুকরো থাকত না, থাকত একটা গোটা প্রজন্মের স্পন্দন, কত শত বিনিদ্র রাতের দীর্ঘশ্বাস আর না-বলা ভালোবাসার উপাখ্যান।

গ্রামের এক কোণে নিভৃতে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের বা ছোট্ট টিনশেড ঘরটি কেবল কোনো সরকারি ডাকঘরই ছিল না; ওটা ছিল এক অবিনশ্বর বিশ্বাসের মন্দির। ওই ডাকঘরটির ভাঙা বারান্দায় প্রতিদিন রোদ-জল উপেক্ষা করে ভিড় জমাত কত জোড়া উদাসীন চোখ। কারও চোখে অপেক্ষার কানায় কানায় ভরা জল, কারও চোখে দূর প্রবাসে থাকা প্রিয়জনের জন্য আশঙ্কার কালো মেঘ। হরকরা যখন তার ঝোলা থেকে একটি একটি করে চিঠি বের করত, তখন যেন একেকটি মানুষের অবরুদ্ধ ভাগ্যলিপি উন্মোচিত হতো। যদি চিঠি না আসতো, বিষন্ন ও ব্যতিত হৃদয় নিয়ে ফিরে যেত। হয়তো আজ আসেনি, কাল.....? চিঠির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকত কোনো স্যাঁতসেঁতে মেসে বসবাস করা চাকুরিজীবী সন্তানের মায়ের জন্য পাঠানো সামান্য কিছু টাকা আর একমুঠো আকুতি। সেখানে থাকত নবপরিণীতা বধূর কাঁচা হাতের আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা প্রথম প্রেমের প্রথম স্বীকারোক্তি, কিংবা কোনো বিরহী মনের অশ্রুসিক্ত ব্যাথিত হৃদয়ের বেদনা। চিঠির খামটা খুলতেই ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ত এক অদ্ভুত মায়া, যে মায়ায় মেশানো থাকত দূর দেশের চেনা মাটির গন্ধ, চন্দনের ছোঁয়া আর আঙুলের স্পর্শ। ডাকহরকরা শুধু চিঠিই বহন করত না, সে অক্ষরে অক্ষরে লেখা মানুষের কান্না, হাসি, অভিমান আর অপেক্ষাগুলোকে নিজের পিঠে করে বয়ে বেড়াত। নিরক্ষর বুড়ো মা যখন হরকরাকে বুকে টেনে নিয়ে বলতেন, "বাবা, আমার মনটা কেমন জানি করতাছে, চিঠিটা একটু পইড়া শোনাও দেখি," তখন সেই হরকরার বুকেই বেজে উঠত নিখোঁজ সন্তানের শেষ আকুতি। সে ছিল এক অদৃশ্য ভালোবাসার সেতুবন্ধন, যে পৃথিবীর সমস্ত দূরত্বকে এক নিমেষে মুছে দিয়ে পরকে আপন করে তুলত যা ছিল এক অকৃত্রিম ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ।

সময়-অসময়ের যান্ত্রিক খবরগুলো এখন ঠিকই আলোর গতিতে পৌঁছায়; কিন্তু সেই হলুদ খামের চেনা গন্ধ, কাগজের বুক চিরে নেমে আসা কলমের কালির ছোঁয়া আর পিয়নের পথ চেয়ে দুপুরের রোদে বসে থাকার সেই তীব্র ব্যাকুলতা আজ আর কোথাও নেই। নেই প্রিয়তমার জানালার গ্রিল ধরে চাতক পাখির মতো অপেক্ষার প্রহর, বাবার জন্য সন্তানের আর্তি, কিংবা সন্তানের জন্য মায়ের আঁচলে চোখ মোছার সেই চেনা দৃশ্য।

আজকের এই আধুনিকায়নের যুগে ডাক পিয়ন বা ডাকহরকরার অপেক্ষায় দিন কাটাতে হয় না। আবার কখনও কখনও চিঠির উত্তর লিখতে লিখতে চোখের অশ্রুতে কাগজ ভেজাতে হয় না। ডাকহরকরাকে রাতের ঘন আঁধারে লণ্ঠন হাতে, বুনো বাঘ-ভালুকের ভয় কিংবা চোর-ডাকাতের শঙ্কা উপেক্ষা করে মাইলের পর মাইল পথ ছুটে চলতে হয় না। ঝোলা কাঁধে খাকি পোশাকের সেই মায়াময় মানুষগুলো আজ ইতিহাসের ধুলোবালি মাখা পাতায় চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। কাঁচের নীল স্ক্রিনের যান্ত্রিক ফন্টে টাইপ করা 'কেমন আছো' শব্দটার মাঝে আজ আর কোনোভাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না চিঠির ভাঁজে লুকিয়ে থাকা কান্নার সেই নোনা গন্ধ কিংবা হৃদয়ের গভীর উষ্ণতা। আজও যখন নিঝুম রাতে শ্রাবণের অবিরল বৃষ্টি নামে, তখন সেই পরিত্যক্ত ডাকঘরের জং ধরা লাল বাক্সটা যেন এক বুক হাহাকার আর না-বলা অভিমান নিয়ে কাঁদে। সে আজও যেন পথ চেয়ে থাকে সেই পুরোনো ডাকহরকরার জন্য, যে এসে তার বুক থেকে বের করে নেবে একমুঠো অবহেলা, এক ফোঁটা কান্না আর এক চিলতে হারিয়ে যাওয়া খাঁটি ভালোবাসা। সভ্যতা হয়তো আমাদের আধুনিকতার আলোয় অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেছে, আমাদের একা করে দিয়েছে এক বিশাল ভিড়ের মাঝে। কিন্তু, ডাকঘর আর ডাকহরকরার সেই মায়াভরা, প্রেমময় অতীত আজও আমাদের অবচেতন মনে এক অন্তহীন ও মর্মস্পর্শী দীর্ঘশ্বাস হয়েই থাকবে।

উৎসর্গ: শ্রদ্ধেয় বাবাকে—যার হাত ধরে আমার এই পথচলা। বাবা আজ এমন এক দূর দেশে, যেখানে কোনো চিঠি পৌঁছায় না, কোনো মুঠোফোন বাজে না। শুধু বুকের গভীরে একটা হাহাকার রোজ নিভৃতে শুধায়- বাবা, তুমি কেমন আছো?

মোঃ আবু হানিফ
০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

Comments

    Please login to post comment. Login