কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলায় আমি তখন ইউএনও। নাঙ্গলকোট শহর থেকে অনেক দূরের গ্রাম এলাকা। কাজের পরিবেশ ভালো, কিন্তু অবসরে সময় কাটানো কঠিন। কর্তব্যের বাইরে কারও সঙ্গে পাঁচ মিনিট কথা বলার মতো মানুষ নেই।
হুট করে উপজেলায় একজন নতুন অডিট সুপার এলেন। সরকারি বিভিন্ন বিল পাস করাতে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে হতো। কথা বলতে বলতে একসময় বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গেল। তিনিও পড়ুয়া মানুষ। ইতিহাস-সাহিত্যে আগ্রহ আছে। রাতে দুজনের ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প হতো।
ভদ্রলোক থাকলে আমার সময়টা ভালো কাটত।
একদিন ছুটির সকালে লালমাই পাহাড়ের দিকে বেরিয়ে পড়লাম। কুমিল্লা বার্ডে নাশতা সেরে গাড়ি রেখে ময়নামতি বুদ্ধবিহারের দিকে হাঁটতে লাগলাম।
কার্তিকের নীল আকাশ। লাল পুরোনো ইটের ওপর রোদের ঝিলিক। চারপাশে সবুজ ঘাস।
বিহারের মাঝামাঝি এসে একটি বিশাল পুরোনো স্নানাগার চোখে পড়ল। একটা উঁচু টিলায় গিয়ে বসলাম। অনেকক্ষণ স্নানাগারটির দিকে তাকিয়ে রইলাম।
হঠাৎ ছোটবেলার একটা পুকুরের কথা মনে পড়ে গেল।
অডিট সুপার সাহেব সিগারেট ধরিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
—কী ভাবছেন?
সিগারেটটা হাতে নিয়ে বললাম,
—মামার বাড়িতে একটা পুকুর ছিল।
আমার মামাবাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদিতে। ছোটবেলায় আব্বা-আম্মার হাত ধরে সেখানে যেতাম। মামাবাড়ির দক্ষিণ পাশে ছিল বিশাল একটা পুকুর।
বাড়িটাও বিশাল। আশপাশের দশ গ্রামে এমন বড় বাড়ি আর নেই।
পুকুরটা ছিল এজমালি। সবাই আদর করে ডাকত—‘দক্ষিণের দিঘি’।
পানির রং কালো। কিন্তু পানি ছিল স্বচ্ছ।
দিঘির দক্ষিণ আর পূর্ব পাশে বিল। কাছারে একটা বিশাল অশ্বত্থগাছ। দক্ষিণ দিক বাদে বাকি তিন দিকে তিনটা ঘাট।
প্রাইমারিতে পড়ার সময় আম্মা-আব্বার সঙ্গে মামাবাড়ি গেলে ওই পুকুরেই গোসল করতাম।
দুপুর হওয়ার আগ থেকেই বাড়ির সবাই পুকুরে নামত। কেউ গোসল করত, কেউ কাপড় ধুত।
মামারা এক ঘাট দিয়ে নেমে সাঁতার কাটত। অন্য ঘাটে নানারা গোসল করতেন। আরেক ঘাটে নানুরা গোসল করতেন, কাপড় কাচতেন।
একেবারে উৎসব উৎসব ভাব।
হাইস্কুলে ওঠার পর একাই মামাবাড়ি চলে যেতাম। গ্রীষ্মের ছুটিতে টানা পনেরো-বিশ দিন থাকতাম।
দুপুর হলেই মামাদের প্রিয় ভাগিনা হিসেবে পুকুরে নেমে যেতাম। সারাদিন সাঁতার কাটতাম।
তারপর ধীরে ধীরে বড় ক্লাসে উঠলাম। মামাবাড়িতে যাওয়া কমে গেল। গেলেও দিনে দিনে ফিরে আসতাম। খুব বেশি জোরাজুরি করলে রাতে থেকে সকালে চলে আসতাম।
এর মধ্যে কলেজ শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলাম। মামারাও সবাই কর্মব্যস্ত হয়ে গেলেন। যার যার সংসার হলো।
মামাবাড়িতে গেলেও আগের মতো স্বাদ পেতাম না।
সেই পুকুরটার কথাও একসময় ভুলে গেলাম।
আম্মা অবশ্য মাঝেমধ্যে মামাবাড়ি যেতেন। আমি জিজ্ঞেস করতাম,
—দক্ষিণের দিঘি কেমন আছে?
আম্মা বলতেন,
—বাড়িতে এখন আরও নতুন নতুন পুকুর হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে বিসিএস পরীক্ষায় ঢুকে গেলাম।
তারপর বছরের পর বছর কেটে গেল।
জীবন যেন ওই একটা পরীক্ষার ভেতর আটকে রইল।
একটা পরীক্ষা, আরেকটা পরীক্ষা। লিখিত, ভাইভা, ফলাফল। আবার শুরু।
নিজের ব্যস্ততা, বেকারত্ব—সব মিলিয়ে কোথাও যাওয়া হতো না। অনেক ঈদে বাড়িতেও যাওয়া হয়নি।
একাধিক বিসিএস ভাইভা দিয়েও বাদ পড়লাম।
বাড়িতে গেলে গ্রামের মানুষ জিজ্ঞেস করত, কী করি। চাকরি হয়েছে কি না।
এই প্রশ্নগুলোর সামনে পড়ার ভয়েই কোথাও যেতে ইচ্ছে করত না।
একবার বিসিএসের ফল প্রকাশের পর হঠাৎ মনে হলো, মামাবাড়ি যাব।
কেন জানি সেই পুকুরটার কথা খুব মনে পড়ছিল।
আবার সেই পুকুরে সাঁতার কাটব।
প্রায় এক দশক পর মামাবাড়িতে গিয়ে দেখি, পুরোনো অনেক কিছুই আর পুরোনো নেই।
বাড়িঘর বদলে গেছে। উঠানে নতুন নতুন মুখ। তাদের আমি চিনি না। তারাও আমাকে চেনে না।
আমি সোজা পুকুরের দিকে গেলাম।
পুকুরপাড়ে গিয়ে থেমে গেলাম।
কোনো ঘাট নেই।
পানিটা কচকচে কালো। চারপাশে পচা পানির গন্ধ। বাড়ির ময়লা-আবর্জনা পুকুরে ফেলা হয়।
একসময় যে পুকুরে দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত মানুষের ভিড় লেগে থাকত, সেটি এখন মজা পুকুর।
অনেকক্ষণ পুকুরটার দিকে তাকিয়ে রইলাম।
অশ্বত্থগাছটা নেই।
ঘাটগুলো নেই।
সাঁতার কাটার সেই জায়গাটাও নেই।
শুধু পুকুরটা পড়ে আছে।
আমি আর পানিতে নামলাম না।
চুপচাপ ফিরে এলাম।
ময়নামতির টিলায় বসে এতক্ষণ গল্প করছিলাম। অডিট সুপার সাহেব কখন যে সিগারেটটা শেষ করেছেন, খেয়াল করিনি।
তিনি বললেন,
—চলবেন?
আমি উঠে দাঁড়ালাম।
পেছনে পড়ে রইল লাল ইটের পুরোনো বিহার।
আর আমার ভেতরে কোথাও পড়ে রইল দক্ষিণের দিঘি।