Story

স্বখাত সলিলে

September 28, 2026

34 views

‎দশ বছর আগের কথা। চাকরি-বাকরি নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছি তিন বছর হলো। সরকারি চাকরির জন্য যে চেষ্টা করা দরকার, সেটাও খুব একটা হচ্ছিল না। রুমে পড়তে বসলে হাজারটা চিন্তা মাথায় ভিড় করতো। সরকারি চাকরি হবে তো? যদি না হয়? সার্টিফিকেট অনুযায়ী সরকারি চাকরির বয়সও বাকি আর মাত্র দুই বছর।

‎

‎বেশির ভাগ সময় হাতে টাকা থাকত না। গলির দোকান থেকে বাকিতে সিগারেট কিনতাম। মাঝে মাঝে দোকানদার বাকিতে সিগারেট দেবে না বলে লম্বা বয়ান শোনাত। সিগারেট টানতে টানতে ভাবতাম, এই ঢাকার শহরে কী রাজকীয় জীবনটাই না কাটিয়েছি! ক্যাম্পাসে থাকাকালে যেন এই শহরেই উড়ে বেড়াতাম। আর এখন ঢাকার কত অপরিচিত গলিতে থাকি, কতভাবে নিজেকে লুকিয়ে রাখি।

‎

‎একসময় সিদ্ধান্ত নিলাম, বাসায় যেহেতু পড়া হয় না, লাইব্রেরিতে গিয়ে পড়ব। গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের বিপরীতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি লাইব্রেরি ছিল। সেখানে যাওয়া-আসা শুরু করলাম। জায়গাটা আমার ভালো লাগত। লোকজন কম, কর্তৃপক্ষও তেমন কড়াকড়ি করত না। লাইব্রেরিতে প্রচুর বই ছিল, আবার নিজের বই নিয়েও বসে পড়া যেত।

‎

‎একদিন বাসায় ফিরে ব্যাগ খুলে দেখি, লাইব্রেরির একটি বই ভুল করে সঙ্গে চলে এসেছে। ভাবলাম, যেহেতু চলে এসেছে, পড়ে শেষ করে ফেরত দেব। রাতে মাঝে মাঝেই বইটা পড়ি। পড়ে আনন্দও পাচ্ছিলাম। আর মাত্র দুই দিন পড়লেই শেষ হবে। কিন্তু কেন জানি বইটা শেষ হোক, সেটাই চাইছিলাম না।

‎

‎মাঝে মাঝে মনে হতো, বইটা তো লাইব্রেরিতে ফেরত দেওয়া দরকার। কিন্তু দেওয়া আর হয়ে উঠত না।

এরপর কেটে গেল কয়েক বছর। এর মধ্যে কয়েকটি চাকরি হয়েছে । সামনে বিসিএসের ভাইভা—সেই প্রস্তুতির জন্য পলাশী মোড়ের একটি সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে নিয়মিত যাওয়া শুরু করলাম।

‎

‎এই লাইব্রেরির নিয়মকানুন বেশ কড়া। ঢোকার আগে ব্যাগ লকারে তালাবদ্ধ করে রাখতে হয়। নিজের বই নিয়েও ভেতরে ঢোকা নিষেধ।

‎

‎একদিন পড়া শেষ করে বের হব। স্টাফের কাছ থেকে লকারের চাবি নিতে যাব, এমন সময় তিনি বললেন,

‎

‎— "আপনার হাতের বইটা দেখি।"

‎

‎বইটার দিকে তাকিয়ে আমার বুক ধক করে উঠল। কখন যে দুই খাতার ভাঁজে বইটা চলে এসেছে, বুঝতেই পারিনি। তিনি বইটা খুলে দেখলেন। ভেতরে তাঁদের লাইব্রেরির সিল।

‎

‎আমি বললাম,— "ভাই, এটা ভুলে হয়ে গেছে।"

‎

‎তিনি শান্ত গলায় বললেন,— "ধরা পড়লে সবাই এই কথাই বলে।"

‎

‎বিষয়টা সামলিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু চোরের মতো কথা বলাটা আমার সহ্য হলো না। ভুল করেছি, কিন্তু চুরি করিনি—এই কথাটাই বারবার মাথায় ঘুরছিল। আমার মেজাজ চড়ে গেল। কথা-কাটাকাটি শুরু হলো। একপর্যায়ে অন্য স্টাফরাও জড়ো হলেন। পরে লাইব্রেরিয়ানকে ডেকে আনা হলো।

‎

‎স্টাফটি তাঁকে আরও উল্টাপাল্টা কিছু বোঝাল। সব শুনে তিনি শুধু বললেন,

‎

‎— "আপনি আর লাইব্রেরিতে আসবেন না।"

‎

‎লাইব্রেরির গেট থেকে বেরিয়ে ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ গুলিস্তানের সেই লাইব্রেরির বইটার কথা মনে পড়ল। বইটা এখনো আমার কাছে আছে। কোনো দিন আর লাইব্রেরিতে ফেরত দেওয়া হয়নি।

‎

‎সেদিন বুঝলাম, সব ভুলের বিচার সঙ্গে সঙ্গে হয় না।

‎

‎

‎২৭.০৪.২৬

‎ময়মনসিংহ

‎

@highlight

Picked up where you left off

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 2 weeks ago

    ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা।

  • অনেক সুন্দর গল্প। অনেক ভালো হয়েছে।