বেহুদা বৃষ্টিতে ভাদ্র মাসের সন্ধ্যায় কমলাপুর স্টেশনের ফুটওভারব্রিজে আটকে আছে হুমায়ুন কবির। মনে মনে গজগজ করতেছে—হালার কী দিন আইলো! ভাদ্র মাসে দিনে এমন বাইস্যা নামে!
দেশটাতে চাঁদাবাজদে ভইরা গেছে। ফুটওভারব্রিজে বাজার জমায়া ফেলছে। শান্তিতে দাঁড়ানোর মতো জায়গা নাই। আজকাল ঢাকার শহরের ফুটওভারব্রিজে সব পাওয়া যায়, মাছ থাইকা শুরু কইরা মুদির বাজার।
চারপাশে মাছি ভনভন করছে। গলা আঁকশি দিয়ে টানা দুইবার থুথু ফেলে পকেট থেকে মোবাইল বের করে। মাঙ্গের বৃষ্টি থামবো কহন, কেডা জানে।
পাশে আমলকি আর আমড়া বেচে এক বুড়া কাস্টমারের অভাবে হুমায়ন কবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। হুমায়ন কবিরের বয়স ত্রিশের কোঠা ছুঁই ছুঁই,পেশায় কেরানি বোধহয়।
হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজটা দেখে মোবাইলটা কবির পকেটে ঢুকাইতে হইলো। সেলিম হালাই জানলো কেমনে আইজকা বেতন হইছে। টাকা ধার আনছি ভালো কথা, দুইটা মাস যাইতে দে। তোর হালার টেহা কম আছে।
সামনে দিকে চোখ যাইতেই দেখে দুইটা একচোখ-কানা বামন আছে। সামনে সিলভারের ভাঙা প্লেট, দুই টাকা, পাঁচ টাকার কয়েন। পুরাতন দশ-বিশ টাকার নোট কয়েকটা।
দুইটার চেহারা হুবহু এক, একচুল এদিক-সেদিক নাই, মাথায় টুপি। ভিক্ষুক দুইটা দেইখা কবিরের নিজেরই চোর চোর মনে হইতেছে। গত মাসে ট্রেন থাইকা নামার সময় কমলাপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দেখে পাঁচশত টাকার নোট পড়ে আছে, আশেপাশে তাকিয়ে টাকাটা পকেটে ঢুকিয়ে ছিলো।দিন পনের রাখার পরে, মাসের শেষে অভাবে নোটটা ভাঙাইলো। এর পর থাইকা ভিক্ষুক দেখলে ওর মনটা কচমচ করে।
কাছে যেতেই হাত বাড়ালো। কবিরদেখে একটার কপালে ছোট একটা টিউমার আছে। ওর হাতে পাঁচশত টাকার কড়কড়ে নোটটা বাড়িয়ে দিলো। নোট দেখে ওরা দুজনে ফুল ফোটার মতো হাসি দিলো
অপরজন কবির মিয়ার হাতে এক হাজার টাকার নোট বাড়ায়া দিলো।
“জনাব, এইটা আমাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য সামান্য উপহার। দয়া করে গ্রহণ করুন। আপনার অপেক্ষায় আমরা ছিলাম।”
কবির মিয়া ভাবতেছে, কোন ধান্দালের পাল্লায় পড়লাম, আল্লাহ জানে। নোটটা নিয়ে পকেটে রাখলো। ধীরে ধীরে বৃষ্টিও থেমে গেলো।
সেইদিন রাতে কবিরের কয়েকবার ঘুম ভাঙলো। আর সেই অদ্ভুত চেহারার বেঁটে দুইটা লোকের কথা মনে পড়লো। কয়েকবার চ্যাটজিপিটিকে জিগাইলো, নোটটা আসল না নকল।
পরদিন অফিস থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় কমলাপুর স্টেশনের ফুটওভারব্রিজে উঠলো। আগের জায়গায় দূর থেকে দেখলো, আধাশোয়া অবস্থায় বসে আছে ওরা। কবিরকে দেখে দুজনে হাত বাড়িয়ে তার চোখের দিকে তীব্রভাবে তাকিয়ে আছে।
মনে সংশয়—এগোরে টাকা দিলে টাকা নিইয়া আবার ফেরত না দিলে, তখন আরেক মসিবত। এক দিলে কি দুই দিবে? না, নতুন কোনো ফন্দি আছে ওগোর।
আজকে এক হাজার দিলাম, ওরা দিলো দুই হাজার। এমন করে প্রতিদিন যাচ্ছে, আর টাকা দ্বিগুণ করছে।এমন করেই ডাবল হইতে লাগলো কবিরের দিনকাল।
গতকাল দশ হাজার দিয়ে বিশ হাজার নিলো। এর মধ্যে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে নাজিরা বাজারে গেলো, ঢাকাইয়া খাবার টেস্ট করতে। পেট চুক্তি কইরা যা ইচ্ছা তাই খাওয়ালো।
বউয়ের জন্য আড়ং থেকে জলপাই রঙের সেই শাড়িটা কিনলো। যেটি গত ঈদে বউ পছন্দ করেছিল, বাজেট লো ছিল বলে কেনা হয়নি। এর পর আরও দুইবার বেতন পাওয়ার পর শোরুমে গিয়েছিল,কিন্তু কেনার সাহস হয়নি ।
মানুষের কপাল বলে একটা কথা আছে। কবির কিছুটা হলেও এখন বিশ্বাস করে। কপালে থাকলে সবই সম্ভব। দিনে অফিসের কলিগদের সাথে কথায় কথায় এই কথাটা একবার হলেও বলে। এর পরে পকেট থেকে বেনসনের প্যাকেট কলিগদের দিকে বাড়িয়ে দেয়।
অফিস শেষ করে ট্যাক্সি দিয়ে কমলাপুরে আসে।
ডিমপাড়া হাঁস, কতদিন ডিম দেয় কে জানে। তবুও এদের উপর পুরোপুরি ভরসা পায় না এখনো। এরা কি এমন ব্যবসায় নামছে, যা দেয় তার দ্বিগুণ ফেরত দেয়?
কবিরের মন চায় মেলা টাকা এনে এদের দিতে।
ঢাকার শহর হইলো ভেজাইল্যা জায়গা। হইতো ওদের পেছনে কোনো চক্র আছে।
তবুও একটা রিস্ক নিতে ইচ্ছে করে কবিরের। যা আছে কপালে, তাই হইবো । আগামী মাসে বেতন আর সেলিমের কাছ থাইকা পঞ্চাশ হাজার টাকা ধার নিয়ে বড় একটা দান মারবে। দুই-চার-দশ হাজার মন ভরে না।
প্রত্যেক দিনের মতো ফুটওভারব্রিজে উঠলো। টাকা নিয়ে মনে মনে একটা পরিকল্পনা সাজাইছে। অফিস থেকে লম্বা ছুটি নিবে। এই বছরে মাত্র দুই দিন সিএল কাটেছে। বউ নিয়ে সমুদ্র দেখতে যাবে সেন্টমার্টিনে, সাথে বাপ-মারে নিয়ে যাবে।
বিয়ের আগে বউকে বলেছিল, সেন্টমার্টিন দ্বীপে হানিমুনে যাবে।কবির মনে করে দুনিয়ার সবচেয়ে সুন্দর সূর্য ওঠার দৃশ্য সেন্টমার্টিনে দেখা যায়। ভোরে সৈকতে হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে দুজনে দেখবে।
বাপের একটা খায়েশ পূরণ করবে। উনার খুব খায়েশ বিমান ওঠার। বাপের একটা স্যুট বানায়া বিমানে করে সমুদ্র দেখতে নিয়ে যাবে।
লোক দুইটা ফুটওভারব্রিজে নাই। কয়েকবার ওভারব্রিজটা চক্কর দিলো। পুরো কমলাপুর স্টেশনটা তন্নতন্ন করে খুঁজলো। নাই মানে নাই। হাওয়া হয়ে গেছে ভিক্ষুক দুইটা। শরীরটা ঘামে ভিজে গেছে, টেনশনে না পরিশ্রমে।
কবিরের মাথা আউলাইয়া গেছে। ইস, দুই দিন আগে টাকাটা ম্যানেজ করতে পারলে হইতো টাকাটা দ্বিগুণ হয়ে যাইতো। কবিরের একটা ভালো গুণ আছে—ধৈর্য ধরা। হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধরতে হবে। ধৈর্য ধরার ফল সে জীবনে অনেক বার পেয়েছে।
প্রতিদিন অফিস থেকে বের হয়ে ওই একচোখ-কানা বামন দুইটারে খুঁজে।
কোনো দিন মহাখালী-গুলিস্তান শেষে কমলাপুর, নয়তো মেট্রোর স্টেশনের নিচে।
শুক্রবারের সকাল সকাল বের হয়ে পড়ে—আজিমপুর নয়তে বনানী কবরস্থানে খুঁজতে।
কবির দমে যাওয়ার লোক না। টাকা যত লাগুক, তারপরও লোক দুইটা আমার চাই-ই।
ঢাকা ভিক্ষুক উন্নয়ন দলের সভাপতি ফুরকান আলীর সাথে কথা হয়েছে। উনাকে হাজার দুইয়েক টাকাও দিয়েছে।
“ভাইজান, আপনি চিন্তা কইরেন না। ঢাকা শহর হইলো আমাগোর লাইগা হাতের তালুর মতো। এই শহরে যদি জানোয়ার দুইটা থাহে, তাইলে আমগোর লগে কইয়া থাকতো হইবো।”
এইটা বইলাই কোমর থেকে অ্যান্ড্রয়েড ফোনটা বের করে দেখাইলো একটা ছবি।
“গত সপ্তাহে পুলিশের কাছে ধরায়া দিছি এক বান্দিরপুতরে। এই হালা মার্ডার কইরা দশ বছর ধইরা ভিক্ষুক সাইজ্জা গাফটি মাইরা আছিলো। ডিবির লোক ছবিটা দিল, পনের দিনের মধ্যে বাইর করলাম।”
একদিন ফুরকান আলী ফোন দিল।
“ভাইজান, মাল তো পাইছি। আজিমপুরে আয়েন। সাথে টাকা-পয়সা নিয়ে আইসেন।”
“একচোখ-কানা ঠিক আছে?”
“দূর মিয়া, কী কইলাম আর আপনি কী দেখাইলেন! এরা না?”
“তাইলে ছবি দেন।”
“ভাই, ছবি থাকলে আপনের পিছে ঘুরি।”
“ভাইজান, বাকি টাকাটা দেন।”
“কাজ হয় নাই, টাকা কিসের আবার?”
“ভাইজান, খরচাপাতির বিষয় আছে।”
এক হাজার টাকা দিতে হইলো কবিরের।
শেষ পর্যন্ত কবিরের আশাও কমতে লাগলো।
কপালে না থাকলে কিছু করার নাই।
সংসার আর চাকরিতে মনোযোগ দিলো।
একদিন রাতে অফিসের কাজে বরিশাল যাওয়ার জন্য সদরঘাট লঞ্চঘাটে আসলো। তিন দিনের ট্যুর।
লঞ্চ ছাড়তে আর মাত্র এক মিনিট বাকি। কলিগ শোয়েব ভাই লঞ্চে বসে আছে।
এমন সময় পল্টুনের পাশে আলো-অন্ধকারে মাদুরের ওপর শুয়ে থাকা দুইজন মানুষের দিকে চোখ পড়লো কবিরের।
বুকের ভেতরটা হঠাৎ ধক করে উঠলো।
এরা তো—
সেই দুই বামন! একচোখ-কানা। হুবহু সেই চেহারা।
কিন্তু লঞ্চ ছাড়ার সময় হয়ে গেছে।
লঞ্চে উঠবে?
কবির শেষ পর্যন্ত লঞ্চে উঠলো না।
কাছে গিয়ে বললো—
“আমারে চিনছেন? আমি হুমায়ুন কবির।”
দুজনই চুপ।
আমরা আপনাকে চিনেছি।
আপনার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে দিনে দিনে আপনার লোভ বাড়তে ছিল। এতো লোভ মানুষের জন্য ভয়ংকর ক্ষতির কারণ হয়। আপনার ভালোর জন্য আমরা দূরে ছিলাম।”
“আপনারা থাকেন কোথায়?
একজন বামন বললো
“যাবেন?”
দুই বামন নিজেদের দিকে তাকাইলো।
“আপনি যেতে পারেন আমাদের সাথে। তবে একটা শর্ত আছে—অতিরিক্ত লোভ করতে পারবেন না। করলে এর ফলাফল ভয়ংকর শাস্তি হবে।”
সদরঘাট থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে একেবারে জিনজিরাতে নিয়ে আসলো। জিনজিরা প্যালেসের পাশেই একটা গলি দিয়ে একটা পরিত্যক্ত দুইতলা বিল্ডিংয়ের ভিতরে নিয়ে আসলো কবিরকে।
কবির ডরাইতাছে আর মনে মনে কইতাছে—এই রাইত কই আইলাম! যাওয়া কথা বরিশাল। এরা কোন কিডন্যাপার চক্রের লোক, কী?
দুইতলা পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের নিচে ছোট একটা গোপন সুড়ঙ্গ । বিল্ডিংটার বাইরে থেকে তালা লাগানো। কেউ থাকে বলে মনে হয় না।
সুড়ঙ্গ দিয়ে দশ ফুট এগোতেই একটা বিশাল আলোকোজ্জ্বল রুম। রুমের ভেতরে পুরাতন আমলের দামি সোফা, হরিণের শিং। ফ্লোরজুড়ে মুঘল আমলের মোজাইক করা টাইলস। দেয়ালে বিভিন্ন কারুকার্য, জানালায় মসলিনের পর্দা।
রুমের দুটি দরজা।
একটা দরজা খুলতেই রুমভর্তি টাকা—পাঁচশ-এক হাজার টাকার নোট। মনে মনে ভাবলো, এতো দিনে কষ্ট সুদে-আসলে আজ পাইলাম।
কবির প্রথমে একটা ব্যাগে টাকা ভরলো।মনে মনে ভাবলো এতো টাকার মধ্যে এক বস্তা টাকা আর কত?কয়েক বছর বসে খেলেই ফুরিয়ে যাবে।যদি আরেক ব্যাগ নেওয়া যেত!তারপর ওদের কাছে আরেকটি ব্যাগ চাইলো।
ঠিক আছে নেন। দ্বিতীয় ব্যাগ ভরার পর, কবিরের হুট করে মনে হলো, পাশের ওই দরজাটা তো খুলেই দেখা হলো না।
খুলতেই দেখে পুরো রুমে সোনার বিস্কুট। কবির মনে মনে ভাবে যদি এক ব্যাগ সোনা নিতা পারতাম তাহলে ঢাকার শহরে একটা বাড়ি কিনতে পারতাম।ওদের কাছে সোনা নেওয়ার জন্য অনুমতি চাইলো।
ওরা হেসে বললো ঠিক আছে নেন।ওরা সোনা নেওয়ার জন্য
দুইটা ব্যাগ দিলো। কবিরের মন খুশিতে দুলতেছিল।
সবগুলো নিয়ে যখন বের হবে, হুট করে দেখে স্টোররুমের ছোট একটা জায়গায় চকচক করছে।
ওদের কাছে জানতে চাইলো, “এগুলো কী?”
“হীরা।”
হিরা তো অনেক দামি।
ইস, যদি এক ব্যাগ হীরা নিতে পারতাম,তাহলে ঢাকার শহরের ধনী লোক হইয়া যাইতাম।আসে পাশে কতো লোক আমারে চিনবে,আমার টাকা পয়সার সুনাম চারপাশে ছড়িয়ে পড়বে।
ওরা ওকে এক ব্যাগ হীরা দিলো।
কবির আসলে এতো কিছু দেখে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।যদি আরেক ব্যাগ পাই তাহলে তো টাকার কুমির হইয়া যামু।লজ্জা শরম ভুলে আরেক ব্যাগ হীরা চাইলো--
“দেখেন, "এই পৃথিবী প্রতিটি মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারে, কিন্তু কারও লোভ মেটাতে সম্ভব নয়।"
হঠাৎ কবির চিৎকার করে উঠলো।হাত দিয়ে বাঁ চোখটা চেপে ধরলো।হাত সরাতেই দেখে--চোখের জায়গাটা ফাঁকা।
গরীবের অনেক কিছু দরকার। লোভীর দরকার সবকিছু।কথা দিয়ে ছিলে, অতিরিক্ত লোভ করতে পারবে না। কিন্তু তুমি সেটিই করছো।
একদিন আমরাও তোমার মতো লোভে পড়ে এখানে এসেছিলাম।সেই লোভে নিজেদের এক চোখ হারিয়েছিলাম।”
“এখন থেকে তুমিও আমাদের সঙ্গী।”
পরের সপ্তাহে কমলাপুরের ফুটওভারব্রিজে দুইজনের জায়গায় তিনজন একচোখ-কানা বামন বসে আছে।
এইবার তারা দ্বিগুণ নয়,তিনগুণ টাকা ফেরত দিবে বলে অপেক্ষা করছে।