‘জয় বাংলা’ শব্দের অর্থ কী?
প্রশ্নটি খুব সহজ মনে হলেও, দু-এক দিন আগেও এই প্রশ্নের উত্তর আমি নিশ্চিতভাবে দিতে পারতাম না। এতদিন শুধু জানতাম, ‘জয় বাংলা’ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান ছিল। সে সময় একজনের সঙ্গে আরেকজনের দেখা হলে ‘জয় বাংলা’ বলে অভিবাদন জানানো হতো; প্রত্যুত্তরেও উচ্চারিত হতো—‘জয় বাংলা’।
শওকত ওসমানের ‘জয় বাংলার জয়’ নামে একটি উপন্যাস আছে। সেখানে তিনি ‘জয় বাংলা’ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। বইটি আমি পড়েছিলাম, কিন্তু এখন সেসব কথা আর মনে নেই। তাই আজকের লেখার বিষয় শওকত ওসমানের সেই উপন্যাস নয়। আমার কৌতূহল অন্য জায়গায়—‘জয় বাংলা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ কী?
ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি, আওয়ামী ঘরানার মানুষ ‘জয় বাংলা’ বলেন; অন্যদিকে বিএনপির সমর্থকদের মুখে শুনেছি ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। ব্যক্তিগতভাবে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-এর চেয়ে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।
কেন?
কারণ আমার কাছে ‘জয় বাংলা’ প্রথমত মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি শব্দ। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ময়দানে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করতেন। আক্রমণের আগে, আক্রমণের সাফল্যে, বিজয়ের আনন্দে—এই শব্দটি উচ্চারিত হতো। কমান্ডার বলতেন, ‘জয় বাংলা’; তাঁর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অন্যরাও বলে উঠতেন—‘জয় বাংলা’।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই সর্বজনীন স্লোগানটি রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়ে গেছে যে, অনেকের কাছে ‘জয় বাংলা’ এখন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের স্লোগান বলেই মনে হয়। আওয়ামী লীগবিরোধীরাও অনেক সময় এটিকে আওয়ামী লীগের দলীয় স্লোগান হিসেবে বিবেচনা করেন। এর ফলে ‘জয় বাংলা’র ঐতিহাসিক ও সর্বজনীন তাৎপর্যটি যেন আড়ালে পড়ে যায়।
আমার মনে প্রশ্ন জাগল—‘জয় বাংলা’ কি সত্যিই কোনো দলের একক স্লোগান?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি বইয়ের কথা মনে পড়ল।
এ পর্যন্ত আমি চারটি পাকিস্তানি বইয়ের অনুবাদ পড়েছি। এর মধ্যে তিনটি উপন্যাস এবং একটি রাও ফরমান আলীর মুক্তিযুদ্ধকালীন স্মৃতিচারণমূলক বই ‘বাংলাদেশের জন্ম’। উপন্যাস তিনটি হলো ইন্তিজার হোসেনের ‘বাস্তি’ (অনুবাদক—সালেহ ফুয়াদ), মোহাম্মদ হানিফের ‘অ্যা কেস অব এক্সপ্লোডিং ম্যাংগোস’ (অনুবাদক—অনন্ত মাহফুজ) এবং এনায়েতুল্লাহ আলতামাশের ‘মুসাফির ও মঞ্জিল’ (অনুবাদক—আবদুল্লাহ মারুফ)।
তিনটি উপন্যাসই আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। বিশেষ করে ‘মুসাফির ও মঞ্জিল’ বেশ দীর্ঘ হলেও লেখকের লেখার শক্তির কারণে এর দীর্ঘতা বিরক্তিকর মনে হয়নি। বরং বইটি পড়তে গিয়ে পেয়েছি এক ধরনের রোমাঞ্চ।
উপন্যাসটি মূলত লেখকের আত্মজীবনীমূলক কাহিনি। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা শেষ করে জীবনযুদ্ধে একপ্রকার বাধ্য হয়েই তিনি ইংরেজ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজ সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে সুভাষ বসুর ন্যাশনাল ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগদানের জন্য বিপদসংকুল পথ পাড়ি দেন।
রাইফেল হাতে ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারত, পাকিস্তান, বার্মা, কলকাতা, বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। কখনো ব্রিটিশদের পক্ষে যুদ্ধ করেছেন, আবার কখনো জাপানিদের পক্ষেও যুদ্ধ করেছেন। একসময় যোগ দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার গেরিলাদের সঙ্গে—তাদের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নিতে।
এই বই থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারি।
ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান ছিল ‘মার্দেকা’। ‘মার্দেকা’ শব্দের অর্থ—আজাদী বা স্বাধীনতা। স্বাধীনতাকামী ইন্দোনেশীয় মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ একে অপরের সঙ্গে দেখা হলে বলতেন, ‘মার্দেকা’; প্রত্যুত্তরেও আসত—‘মার্দেকা’।
তখন আমার মনে হলো—আমাদের ‘জয় বাংলা’ও কি একই ধরনের কোনো অর্থ বহন করে না?
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান ছিল—‘জয় বাংলা’। একজন আরেকজনের সঙ্গে দেখা হলে উচ্চারিত হতো ‘জয় বাংলা’; প্রত্যুত্তরেও আসত ‘জয় বাংলা’।
তাহলে ‘জয় বাংলা’র অর্থ কী?
আমার উপলব্ধিতে, ‘জয় বাংলা’ শুধু দুটি শব্দের সমষ্টি নয়; এর মধ্যে রয়েছে মুক্তি, স্বাধীনতা ও আজাদির আকাঙ্ক্ষা।
‘জয়’ মানে বিজয়। আর ‘বাংলা’ মানে এই ভূখণ্ড, এই মানুষ, এই দেশ ও তার অস্তিত্ব। তাই মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণের মধ্যে নিহিত ছিল স্বাধীন বাংলার বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা।
এ কারণেই ‘জয় বাংলা’কে কেবল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের স্লোগান হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক ব্যাপ্তি সংকুচিত হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলো কোনো স্লোগান ব্যবহার করতে পারে, তার রাজনৈতিক তাৎপর্যও তৈরি হতে পারে; কিন্তু একটি স্লোগানের ঐতিহাসিক জন্ম ও ব্যবহারকে তার পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবহারের সঙ্গে এক করে দেখা সবসময় যথার্থ নাও হতে পারে।
‘জয় বাংলা’ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি শব্দ।
এই শব্দটি নিয়ে আমাদের আরও সচেতন থাকা প্রয়োজন। কারণ কোনো ঐতিহাসিক শব্দ বা স্লোগান যখন কেবল দলীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়, তখন তার বৃহত্তর ঐতিহাসিক অর্থ ও স্মৃতি ধীরে ধীরে সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
‘জয় বাংলা’ যদি সত্যিই আমাদের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মুক্তির সংগ্রাম এবং বিজয়ের প্রতীক হয়ে থাকে, তবে তার ঐতিহাসিক অর্থকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রেখে দেখার প্রয়োজন রয়েছে।
‘জয় বাংলা’—শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি আমাদের মুক্তি, স্বাধীনতা ও আজাদির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি ঐতিহাসিক উচ্চারণ।
তাই আমাদের সজাগ থাকতে হবে—‘জয় বাংলা’ যেন কোনো একক রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে বন্দী হয়ে না যায়।