৩.
বিয়ে করা আর পদার্থবিজ্ঞানের কঠিন কোনো এক্সপেরিমেন্ট করা—এই দুটোর মধ্যে আমি কিন্তু বিন্দুমাত্র পার্থক্য খুঁজে পাই না। দুটোতেই অনিশ্চয়তা তুঙ্গে, আর একটা ছোট্ট ভুলের মাশুল গুণতে হয় আজীবন।
ঘটনাটা ঘটেছিল গত পরশু। ঘটক করিম চাচা কায়দা করে আমাকে আর আম্মাকে পাত্রীপক্ষের ড্রয়িংরুমে এনে বসিয়ে দিলেন। সোফায় বসে আমি মন দিয়ে চিন্তা করছিলাম—মানুষ কেন বিয়ের মতো একটা জটিল বায়োলজিক্যাল ও সোশিওলজিক্যাল প্রসেসে নিজের সুনির্দিষ্ট ফ্রি-উইল বা স্বাধীন ইচ্ছাকে জলাঞ্জলি দেয়?
গরম চা আর রসগোল্লার প্লেট টেবিলে আসতেই পাত্রীর বাবা বেশ বিজ্ঞের মতো হেসে বললেন, "আমাদের মেয়ে মিলি কিন্তু খুব শান্তশিষ্ট। এক্কেবারে মাটির মানুষ।"
আমি চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে শুধালাম, "অ্যাঁ? মাটির মানুষ মানে? আপনি কি সিলিকন আর অ্যালুমিনিয়াম সিলিকেটের কম্পোজিশনের কথা বলছেন? নাকি এটা স্রেফ একটা মেটাফোর?"
ড্রয়িংরুমের বাতাস মুহূর্তেই জমাট বেঁধে গেল। আম্মা ট্রিপল এক্স স্পিডে আমার পায়ে একটা মারাত্মক চিমটি কাটলেন। কিন্তু সত্যিটা বলতে তো দোষ নেই! পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে অসত্য তথ্য আমি হজম করি কীভাবে?
ঠিক তখনই মিলির প্রবেশ। পরনে লাল শাড়ি, হাতে ট্রে। ট্রে-তে দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। সে অত্যন্ত সতর্ক পায়ে হেঁটে এসে ট্রে-টা টেবিলে রাখল।
আমি চোখ সরু করে খেয়াল করলাম, মেয়েটি যখন ট্রে-টা রাখল, চায়ের কাপের ভেতরের তরল পদার্থের তল কিন্তু সামান্য কেঁপে উঠেছিল।
মিলি আমার সামনে এসে বসতেই আমি আর থাকতে পারলাম না। গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলাম, "আচ্ছা মিলি, আপনি যখন হেঁটে এলেন, তখন আপনার প্রতিটা কদমে 'সিম্পল হারমোনিক মোশন' বা সরল দোলগতির সৃষ্টি হচ্ছিল। কিন্তু ড্রয়িংরুমে ঢোকার মুহূর্তে আপনি বাঁকা পথ ধরলেন কেন? আলো যেমন সবসময় সংক্ষিপ্ততম পথ বা ফারম্যাটের নীতি মেনে চলে, আপনারও তো উচিত ছিল সোজা রেখায় আসা। এতে শক্তি আর সময়—দুটোই সাশ্রয় হতো!"
মিলি থমকে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে ততক্ষণে তীব্র বিস্ময় আর হালকা থ কান্নার ভাব ফুটে উঠেছে।
ঘটক চাচা পরিস্থিতি সামাল দিতে হেসেই খুন, "আহা! আমাদের পাত্র তো ভারী রসিক! বিজ্ঞান দিয়ে পাত্রীর হাঁটা মাপছে!"
আম্মা ততক্ষণে চোখের ইশারায় আমাকে জ্যান্ত কবর দেওয়ার প্ল্যান কষে ফেলেছেন। কিন্তু আমি তো আমার মেটাফিজিক্সের হিসাব থেকে সরতে পারি না!
আমি রসগোল্লার বাটির দিকে আঙুল নির্দেশ করে আবার বললাম, "আরেকটা বিষয়। এই রসগোল্লাটার ব্যাসার্ধ আনুমানিক ২.৫ সেন্টিমিটার। কিন্তু পাত্রে রসগোল্লাটি যে পরিমাণ রসে নিমজ্জিত হয়ে আছে, তাতে এর ওপর প্রযুক্ত ঊর্ধ্বমুখী প্লবতা বল বা আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী এটি পুরোপুরি ডুবে যাওয়ার কথা নয়। অথচ দেখুন, গোল্লাটি কিন্তু ডেস্কে বসে আছে। এর অর্থ কী জানো মিলি?"
মিলি কাঁপাকাঁপা গলায় শুধাল, "কী... কী অর্থ?"
"এর অর্থ হলো, এই সিরার ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি! যা খেলে আমার পেটের মেটাবলিজমে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, এই রসগোল্লা গ্রহণ করা মানে আত্মঘাতী হওয়ার সামিল!"
মিলির বাবা চশমা খুলে ঝাড়তে শুরু করলেন। আর মিলির মা সোজাসুজি উঠে গিয়ে ভেতরের ঘরে ঢুকে পড়ে ধড়াম করে দরজা লাগিয়ে দিলেন।
মিলি এবার একটু রেগে গিয়ে বলল, "আপনি কি এখানে মেটাফিজিক্সের ক্লাস নিতে এসেছেন, নাকি পাত্রী দেখতে এসেছেন?"
আমি অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় জবাব দিলাম, "দুটোই আসলে একসূত্রে গাঁথা, মিলি। আপনি আর আমি—আমরা দুজন আসলে মহাবিশ্বের দুটি পৃথক বস্তু। নিউটনের মহাকর্ষ সূত্র অনুযায়ী আমাদের মধ্যে একটা আকর্ষণ বল কাজ করার কথা। কিন্তু মেটাফিজিক্স বলছে, আপনার আর আমার চিন্তাভাবনার তরঙ্গদৈর্ঘ্য যদি মেলবন্ধন না ঘটায়, তবে এই কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট বা বিয়ের বন্ধন শেষ পর্যন্ত কলাপস করবে। অর্থাৎ, এ এক চরম বিশৃঙ্খলা বা এনট্রপির জন্ম দেবে!"
কথাটা শেষ হতে না হতেই ড্রয়িংরুমে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এলো।
আম্মা এবার আর চিমটি কাটাতে সীমাবদ্ধ থাকলেন না। এক টানে আমার হাত ধরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বললেন, "চলো করিম ভাই! এরা মাটির মানুষ চেয়েছে, কিন্তু আমার পোলা তো মঙ্গলের এলিয়েন! এদের সাথে হিসেব মিলবে না!"
বেরিয়ে আসার সময় আমি মিলির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললাম, "আমার কোনো দোষ নেই মিলি। মহাবিশ্বের গতিপথ নির্ধারণ করে মেটাফিজিক্স, আমরা তো স্রেফ কতগুলো পরমাণুর খেলা মাত্র!"
রাস্তায় বেরিয়ে আম্মা আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন নিউটনের তৃতীয় গতিসূত্র প্রয়োগ করে আমার পিঠে একটা চড় কষিয়ে দেবেন। কিন্তু আমি চশমাটা আর একবার ঠিক করে ভাবলাম—যাক, আজকের মতো এনট্রপি তো অন্তত নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে!
#মিস্টার_পারফেক্ট