-ও দাইমা, কিসের বাইদ্য বাজে?
দাইমা এক গাল হেসে কয়, বিয়ার বাইদ্য বাজে।
-কার বিয়া গো দাইমা?
-ওরে আমার রূপবান, আইজ তো তোর বিয়া।
এটুকু শুনেই নড়েচড়ে বসলেন কালাম মেম্বার। এই পালাটা দেখতে দেখতে তার মুখস্থ হয়ে গেছে। তবু এটা তার দেখতে হবেই। গ্রামের পাশেই একটা মেলা বসে প্রতি বছর পৌষ মাসে। আমতলীর মেলা। মেলা হলেই যাত্রার দল আসে। বিউটি অপেরা হলে তো কথাই নাই। সেটা না দেখে থাকতে পারেন না। জ্ঞান বুদ্ধি হবার পর হতে সম্ভবত বয়স বার বা তের হবার সময় থেকেই এ পালাটা দেখে আসছে। শৈশব হতেই কালাম মেম্বার এ পালায় রূপবানের প্রতি খুব দূর্বল। ঘটনাক্রমে কালাম মেম্বার কলেজে উঠেই পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে ভিলেজ পলিটিক্সে জড়িয়ে পড়ে। বাবা চেয়ারম্যান হওয়ায় এলাকায় আলাদা একটা দৌরাত্ম্য নিয়ে চলেছে সে। সে সময়টায় একটা অন্যরকম ঝামেলা করে ফেলেছিল। বিউটি অপেরার রূপবান রহিম বাদশা পালায় রূপবানকে দেখে মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো। গ্রিনরুমে ঢুকে কয়েকজন লোকসহ রূপবানকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলো। এ নিয়ে এলাকায় খুব একটা বদনামের ভাগীদার হতে হয়েছিলো কালামকে।
ওদিকে কালামের অবস্থা হয়েছিলো একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। পালায় অভিনয়ের সময় রূপবানের সৌন্দর্য আর গ্রিনরুমের লাল নীল আলোতে যেটুকুই দেখাক না কেন, নিজের ডেরাতে নিয়ে যাবার পর রূপবানকে দেখে সে হতাশ হয়ে গিয়েছিলো। অভিনেত্রীকে সসম্মানে পালার মালিকের কাছে সে নিজে নিয়ে গিয়েছিলো। পরিণতিতে সে বছর বিউটি অপেরা এখান হতে তাদের তাঁবু গুটিয়ে চলে গিয়েছিলো এবং পরের চার বছর আর আসেনি। এলাকার লোকজন সারা বছর এটা মনে রাখে না, কিন্তু পৌষ মাস এলেই মানুষের বিউটি অপেরার কথা মনে পড়ে। এদিকে আমতলীর মেলাতে আর কোন অপেরা দলও আসলোনা সে চারবছর। কালাম মেম্বার নিজেও জানতোনা, অপেরা দলের মালিকেরা সবাই সবার খবর রাখে এবং নিজেদের মান সম্মানের বিষয়ে টনটনে।
এর মধ্যে কালাম এর চেয়ারম্যান বাবা ইহকাল ত্যাগ করেছেন। কালাম ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে দাঁড়িয়ে মেম্বার হয়ে গেছে। মেম্বার হবার জন্য নির্বাচনী প্রচারণায় অনেকগুলো প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি ছিলো, আমতলী মেলায় বিউটি অপেরাকে নিয়ে আসবেন। তরুণ মেম্বার তারপর ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়ে নিজে বিউটি অপেরার মালিকের কাছে মাফ চাইতে গিয়েছেন, পালার রূপবানের কাছে মাফ চেয়ে অনুরোধ করে বলে এসেছে। সেই থেকে বিউটি অপেরা আবার আমতলীর মেলায় আসতে শুরু করেছে। কালাম মেম্বারের বয়স বেড়ে গেলো এর মাধ্বয়ে। আজ বারো বছর ধরে মেম্বার হিসাবে আসছেন। এখন তার নামের সাথে মেম্বার শব্দটা স্থায়ীভাবে জুড়ে গেছে। বত্রিশ বছর বয়সেও কালাম মেম্বার মেলার প্রতিদিন রাতের যাত্রায় আসেন। অজ্ঞাত কোন বিরহে বিয়ে থা করেন নি। প্রতিদিন বিউটি অপেরার মালিককে দিনে একবার জিজ্ঞেস করেন, আবার কোনদিন রূপবান রহিম বাদশা পালাটা হবে? মালিক সেটার জবাব না দিয়ে শুধু বলে, মেম্বার, তোমার রূপবানরে যেইদিন পামু, সেই দিন আবার রূপবান রহিম বাদশা পালা হইবো। কালাম মেম্বার কিছুই বলেন না। শুধু গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
আজ রূপবান রহিম বাদশা পালা হচ্ছে। কালাম মেম্বার আজ সবার আগে সামিয়ানার নিচে এসে বসেছেন। তার সামনে পান সুপারি দেয়া হয়েছে। মাঝে মাঝে একজন এসে চা দিয়ে যাচ্ছে। মঞ্চ হতে চোখ সরাচ্ছেন না কালাম মেম্বার। একাব্বর বাদশার জন্য খারাপ লাগছে তার। একাব্বর বাদশা তার উজিরের কাছে শুনলেন, প্রজারা তাঁকে আঁটকুড়ে বাদশা বলেছে, তার মুখ দেখলে প্রজাদের মুখে অন্ন জোটে না। সন্তানহীন রাজা বনে গিয়ে মুনির কাছ হতে শুনলেন, তিনি অচিরেই পুত্র সন্তানের বাবা হবেন। তবে বার দিন বয়সে পুত্রকে বার বছর বয়সই কোন কন্যার সাথে বিয়ে দিয়ে বনবাসে পাঠাতে হবে। কালাম মেম্বারের চোখ ভিজে এলো। এদিকে একাব্বর বাদশা প্রাসাদে ফিরে স্ত্রী জাহানারাকে এ সংবাদ দিতেই সেও কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে বলল, ‘খোদা, আমি মা হয়ে বারো দিনের ছেলেকে বনে পাঠিয়ে কেমন করে গৃহে থাকব? আমি এ শোক সহ্য করতে পারব না। তুমি একি করলে খোদা!’
কালাম মেম্বার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলেন না। রীতিমতো কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন।
পাশ হতে জুলমত একটা ছোট তোয়ালে এগিয়ে দিলো কালাম মেম্বারের দিকে। চোখ দুটো মুছতেই জুলমত ফিসফিস করে বলল,
-হুজুর, সাইফুলের পোলায় আইচে পালা দেখতে।
কথাটা শুনেই সটান সোজা হয়ে বসলেন কালাম মেম্বার। সাইফুল গত ইলেকশনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলো। কালাম মেম্বারের নির্বাচনী মিটিং এ হামলা চালিয়েছিল তার লোকজন। কালাম মেম্বারের দুজন লোক মারা গিয়েছিলো। সাইফুলের এই ঘটনার জন্যে এলাকার লোকজনের সাপোর্ট কালামের দিকে চলে আসে। তার জন্য নির্বাচনে জয় অপেক্ষাকৃত সহজ হয়ে যায়।
মঞ্চে উজিরের মেয়ের সাথে বিয়ে হয়ে গেলো একাব্বর বাদশার ছেলে রহিমের। উজিরের মেয়ে রূপবান বাসরঘরে কেঁদে বুক ভাসায় আর মনের দুঃখে গান ধরে
‘বাসরঘরে থাকো পতি গো,
ও পতি খেলো নানা ছলে গো
আমার পতি গো
কে পরাবে তৈল কাজল রে,
ও আল্লা কে খাওয়াবে দুধ রে’।
কালাম মেম্বার ঘাড় ফিরিয়ে জুলমতকে বলে, আমগো কয়জন লোক আছে?
-হুজুর আমরা আটজন আছি।
-অহন কি করতে চাস?
-ফালাইয়া দেই, হুজুর? জুলমত জিজ্ঞেস করলো।
কালাম মেম্বার কিছুক্ষণ চুপ থেকে সামনে রাখা পান নিয়ে পানে চুন মাখালেন। তাঁকে চুন মাখাতে দেখে বিউটি অপেরার দলের একটা ফুটফুটে মেয়ে এসে তার হাত হতে পাঁটা নিয়ে নিলো। পাঁটা খুব সুন্দর করে ভাঁজ করে সুপারি, জর্দ্দা দিলো। সাথে আরো কিছু মিষ্টি মশলা দিয়ে সামনে এগিয়ে দিলো। মুখে নিয়ে প্রথম চিবোনোর সাথে পানের খিলি থেকে একটা আশ্চর্য মন ভুলানো সুগন্ধে সারা মুখ ভোরে গেল। মুখের ভেতর প্রচুর লালা এসে পাঁটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আর কি! মুখে জমে থাকা পানের মশলা মাখা তরলটুকু সুড়ুৎ করে গিলে ফেললেন কালাম মেম্বার। মঞ্চ হতে চোখ না সরিয়ে বললেন,
-গায়ে কোন দাগ থাকবোনা, হাতে মারবিনা, লাঠির বাড়িও পড়বে না, আস্তে বাইরে নিয়া যা। সামিয়ানার পূর্ব দিকে ছনক্ষেতে নিয়া গলায় পাড়া দিয়া বাংলা মদ ঢালবি মুখে, চিক্কুর যেন না মারে। তারপর পকেটে বাংলা মোদের ছোড একটা বোতল ঢুকাইবি। এরপর ধইরা নিয়া ছনক্ষেতের পিছে পুকুরে চুবাইয়া ধরবি। কাহিনী বুঝছস?
--জ্বী। মাথা নেড়ে জুলমত বলেই উঠে চলে গেলো।
এদিকে রূপবান বনের মধ্যে পানি আনতে ঘাটে গেছে। এসে দেখে একটি হিংস্র বাঘ রহিমের দিকে এগোচ্ছে। রূপবান ভয়ংকর ওই দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে গান ধরে :
‘খেয়ো না খেয়ো না বাঘ রে,
ও বাঘ খেয়ো না মোর পতি রে
বনের বাঘ বাঘ রে
হাতে ধরি পায়ে ধরি রে,
ও বাঘ ছেড়ে দাও মোর পতি রে
বনের বাঘ বাঘ রে।
জুলমত তখন লোকজনসহ সাইফুলের ছেলেকে ছনক্ষেতে নিয়ে হাত পা বেঁধে ফেলেছে। মেলায় চারদিকে অনেক শোরগোল, বিউটি অপেরার মাইকের আওয়াজ তো আছেই। ছেলেটা চোখে মুখে আকুতিমিনতি করছে। তার চোখের সামনে একটা বড় চাকু ধরে আছে জুলমত। ছেলেটা আতংকে চিৎকার করতেও ভুলে গেছে। জুলমতের একজন সঙ্গী জুলমতের দিকে একটা বাংলা মদের বোতল এগিয়ে দিলো।
এদিকে মঞ্চে নতুন উত্তেজনা এসে হাজির। ছায়েদ বাদশার কন্যা তাজেল রহিম বাদশার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে গেছে। রূপবান গান ধরেছে,
মন না জেনে প্রেমে মইজোনা,
শোনো তাজেল গো
মন না জেনে প্রেমে মইজোনা।
কালাম মেম্বার ঠিক এখানে এসে উসখুস করেন। এ জায়গাটা তার ভালো লাগে না।
সাইফুলের ছেলের মুখে বোতল ঠেসে ধরেছে জুলমত। মাঝে মাঝে ছেলেটার পেটে ঘুসি মারছে সে। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ছেলেটা। ছায়েদ বাদশা রহিম বাদশার সাথে ঘোড়ার রেসে যাচ্ছে। কালাম মেম্বার নড়েচড়ে বসেছেন। পালা শেষ হবার পথে। কিছুক্ষণ পর রূপবান রহিম বাদশার বার বছর পূর্ণ হয়ে যাবে। বিভোর হয়ে তাকিয়ে আছেন কালাম মেম্বার। বিউটি অপেরার মালিক এবারে রূপবান হিসাবে একজন সত্যিকারের রূপবান নিয়ে এসেছে।
সাইফুলের ছেলেটার ফুসফুস একফোঁটা বাতাসের জন্য আকুপাকু করছে। পানির নিচে তার মাথাটা ঠেসে ধরে রেখেছে জুলমত। ওদিকে জংলীরাজা রূপবান রহিম বাদশাকে একাব্বর বাদশার কাছে নিয়ে এসেছে। উপস্থিত দর্শকের বিপুল তালি দিয়ে বাহবা দিচ্ছে।
বিউটি অপেরার মালিক কালাম মেম্বারের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কালাম মেম্বারের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে আছে। রূপবান রহিম বাদশা পালাটি তার ভীষণ প্রিয় পালা। বিউটি অপেরার মালিক বললেন,
-হুজুর, একটু যদি আমার সাথে আমাদের গ্রিনরুমে তসরিফ রাখতেন?
কালাম মেম্বার মুচকি হেসে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন,
-আবার কলঙ্ক দিবা?
-না হুজুর, এইবার আসল অলংকার আনছি আপনের লাইগা। আমি কথা দিছিলাম। আইজ নিজের চক্ষে দেখবেন, নিজের হাতে বুইঝা নেন আপ্নের রূপবান।
কালাম মেম্বার উঠে দাঁড়াতেই দেখলেন কিছু দুরে জুলমত দাঁড়িয়ে। পরনের লুঙ্গীর নিচের অংশ ভেজা দেখাচ্ছে। তাকে দেখে রসিকতা করে বলে উঠলেন,
-কিরে? ঘটনায় যাইতাছি আমি। তুই ভিজলি ক্যামনে?
কথাটা শুনেই বিউটি অপেরার মালিক খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে উঠলেন।
Comments
-
-
probash khobor 3 hours ago
এটি একটি ক্লাসিক গল্প হবার দাবী রাখে। এক্সিলেন্ট লিখেছেন।